19 December, 2018

আল্লামা শেক সা’দী (রঃ) এর জীবনী

ফারসি সাহিত্যে নীতিশাস্ত্র বা নীতিসাহিত্য রচনায় যে কয়েকজন কবি-সাহিত্যিকদের নাম উল্লেখ করা যায় শেখ সা'দী তাদের মধ্যে উজ্জ্বলতর।
তিনি ছিলেন সুস্পষ্টভাষী যার পুরো নাম ‘মোশারফ উদ্দিন বিন মোছলেহ উদ্দিন আব্দুল্লাহ সা'দী শিরাজী' (তারিখে আদাবিয়্যাতে ইরান, পৃ. ২১০), ইরানের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিদের মধ্যে অন্যতম যিনি ফেরদৌসির পর ফারসি সাহিত্যের সুন্দর আকাশকে নিজ আলো দ্বারা উজ্জ্বলতর করেছেন এবং যিনি শুধু ইরানেরই নন বরং বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ বাকপটু লেখকদের মধ্যে অন্যতম।
সা'দী সপ্তম হিজরীর প্রথমদিকে ১১৮৪ খৃস্টাব্দে (এডওয়ার্ড ব্রাউন, আরবেরী, আর রথন্ট মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ প্রমুখ ১১৮২, ১১৯১ ও ১১৯৩, ১১৭৫ সাল বলে উল্লেখ করেছেন) ইরানের প্রসিদ্ধ নগরী শিরাজে জন্মগ্রহণ করেন এবং ‘১২০ বছর জীবিত থেকে' (পারস্য প্রতিভা পৃ. ১১৩) ১২৯২ (এডওয়ার্ড ব্রাউন এর মতে ১২৯১) সালে মৃত্যুবরণ করেন।
তিনি আলেম পরিবারে সদস্য ছিলেন। তার পিতা সালজুকী রাজ দরবারের কর্মচারী ছিলেন। সা'দীর সুদীর্ঘ জীবনকে প্রধানত তিনভাগে ভাগ করা যায়। ‘‘সা'দী তার দীর্ঘ জীবনের ৩০ বছর অধ্যয়নে, ৩০ বছর ভ্রমণে ও কাব্য রচনায়, ৩০ বছর ধ্যানে ও আরাধনায় এবং স্বীয় রচনার বিন্যাস ও পূর্ণতা সাধনে এবং শেষ ১২ বছর সুফীতত্ত্বের শিক্ষা প্রদান ও প্রচারে অতিবাহিত করেন’’।জন্মকাল থেকে শুরু করে ১২২৬ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত সময়ে সা'দী শৈশবকালীন শিক্ষা পিতার তত্ত্বাবধানে সমাপ্ত করেন।
কিন্তু সে শৈশবেই পিতাকে হারান। তার রক্ষাণাবেক্ষণের ভার তার নানা'র উপর অর্পিত হয়। তিনি শরয়ী ও সাহিত্যিক প্রাথমিক শিক্ষা শিরাজে গ্রহণ করেন এবং যৌবন বয়সে বাগদাদ গমন করেন যা সা'দীর দীর্ঘ ভ্রমণের প্রাথমিক পর্যায় ছিল।
বাগদাদে সা'দী তৎকালীন নামকরা সূফী বেশ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দীর প্রভাবে প্রভাবান্বিত হন যা তিনি বোস্তানের হেকায়েতে উল্লেখ করেছেন। একইভাবে গোলিস্তানের ২য় অধ্যায়ে আমরা বুঝতে পারি শামছুদ্দিন আবুল ফারাজ ইবনুল জাওযী যিনি তৎকালীন নামকরা ব্যক্তিত্ব ছিলেন; তার শিক্ষায় দীক্ষিত হন' (তারিখে আদাবিয়্যাতে ইরান, পৃ. ২১১-১২)।
তিনি তদানীন্তন ইরাকের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ বাগদাদের নিজামিয়া মাদরাসায় শিক্ষা গ্রহণ করেন; ‘‘সা'দী বাগদাদের বিখ্যাত নিজামিয়া কলেজে অধ্যয়নকালে আবুল ফারাজ ইবনুল জাওযী (মৃ. ৫৯৭/১২০০) এবং শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দী (মৃ. ১২৩৪) এর নিকট শিক্ষালাভ করেছেন। তার অন্যান্য শিক্ষকের নাম জানা যায়নি। অধ্যয়ন সমাপ্ত করে তিনি আধ্যাত্মিক জ্ঞান-অর্জনের প্রতি মনোযোগ দেন’’এবং জামালউদ্দিন আবুল ফারাজ আব্দুর রহমান মু'তাসের এর সান্নিধ্যে পৌঁছেন ও তার কাছে শিক্ষাগ্রহণ করেন। সা'দী তাকে অভিভাবক ও শেখ হিসাবে গ্রহণ করেন।
‘‘তাপসশ্রেষ্ঠ শেখ আব্দুল কাদের জিলানীর অলৌকিক তপঃপ্রভাবের কথা আরবের সর্বত্র প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। সা'দী অবসর সময় এই মহর্ষির আশ্রয়ে গিয়ে অতীন্দ্রিয় জগতের তথ্য সংগ্রহ করতেন। সিদ্ধপুরুষের সঙ্গ লাভ করে অল্পদিনের মধ্যেই সা'দীর ধর্মগতপ্রাণ তত্ত্বজ্ঞান ও পুণ্যের আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। সা'দী এ স্থানে ‘সূফী ধর্মে' দীক্ষা গ্রহণ করেন।’’ (পারস্য প্রতিভা, পৃ. ১১৭)অবশ্য আব্দুল কাদের জিলানীর বিষয় নিয়ে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়।
ইসলামী বিশ্বকোষে বলা হয়েছে: ‘শায়খ আব্দুল কাদির জিলানী রঃ (মৃ. ৫৬১/১১৬৬)-এর নিকট তিনি বায়আত গ্রহণ করেছেন বলে যে বর্ণনা পাওয়া যায় তা গ্রহণযোগ্য নহে।
কারণ তার ইন্তিকালের পর সা'দীর জন্ম হয়’’ (দৌলতশাহ. পৃ. ২০২) কথিত আছে, শায়খ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দীর নিকট তিনি তাসাওউফের শিক্ষাও লাভ করেছেন। আফ্লাকীর একটি বর্ণনা অনুযায়ী জালালুদ্দিন রুমী (মৃ. ৬২১/১২৩১)-এর সঙ্গেও তার সাক্ষাত হয়েছিল (বুস্তা, অনু. huart, পৃ. ২৩৮)।১২২৬ থেকে ১২৫৬ সাল ছিল সা'দীর (মোগলদের অত্যাচারের ভয়ে) জীবনের দীর্ঘ ভ্রমণ।
তিনি এ সময় হেজাজ থেকে শুরু করে রোম হয়ে পায়ে হেঁটে হজ্বে গমন করেন। ‘‘তিনি কমপক্ষে ১৪ বার হজ্ব সম্পন্ন করেছেন’’।
সা'দীর ভ্রমণ ১২২৬ সালে (৬২০ হিঃ ৬২১ হিঃ) শুরু করেন এবং ১২৫৬ সালে (৬৫৪ মতান্তরে ৬৫৫ হিঃ) সমাপ্ত করে প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান এবং বাস্তব জ্ঞানের এক বিশাল অভিজ্ঞতা নিয়ে আবার শিরাজে ফিরে আসেন। ‘‘ভ্রমণকালে তিনি সকল শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করতেন। ফলে বিভিন্ন জাতির সভ্যতা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে অবহিত হন।
সিরিয়া সফরকালে ত্রিপলীতে তিনি খৃস্টানদের (Crusders) হতে বন্দী হন। Henry Masse-এর মতে এই এলাকা ৬১৮/১২২১ সালে খৃস্টানগণ অবরোধ করেছিলেন।
তার পিতার এক বন্ধু মুক্তিপণ আদায় করে তাকে মুক্ত করে আনেন এবং তার সাথে নিজ কন্যার বিবাহ দেন। কিন্তু এই বিবাহ স্থায়ী হয়নি। কথিত আছে যে, ইয়ামান ভ্রমণকালে তিনি আবার বিবাহ করেছিলেন ‘ভারত ভ্রমণের একটি ঘটনা তিনি বোস্তান কাব্যগ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।
ঘটনাটি হলো: তিনি সোমনাথ গমন করেছিলেন; সেখানকার প্রসিদ্ধ মন্দিরের দেবমূর্তিটিকে প্রতিদিন রাতে ভক্তদের প্রার্থনার জওয়াবে হাত উঠাতে দেখে তিনি আশ্চর্যন্বিত হন।
এর রহস্য উ ঘাটনের জন্য তিনি পূজারীর ছদ্মবেশে কিছুদিন সেখানে অবস্থান করেন; অবশেষে তিনি আবিষ্কার করেন যে, এক ব্যক্তি মূর্তিটির পশ্চাতে একটি গুপ্ত স্থানে বসে রুজ্জুর সাহায্যে নির্দিষ্ট সময় মূর্তিটির হাত উত্তোলন করে (শিরুল আজাম, পৃ. ৪০)। দীর্ঘ ভ্রমণ পর্যায় শেষ করে তিনি ১২৫৬ খৃ. শীরাজে প্রত্যাবর্তন করেন এবং মৃত্যু পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করেন'।
খৃষ্টীয় ১৩শ শতাব্দীর শেষ ভাগে মুলতানের শাসনকর্তা যুবরাজ মুহাম্মদ খান শাহীদ তার পিতা গিয়াসুদ্দীন বালবানের পক্ষ হতে শেখ সা'দীকে ভারতের আগমন করার জন্য দুইবার আমন্ত্রণ জানান।
বয়োবৃদ্ধির কারণে তিনি আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে পারেননি। কিন্তু গুলিস্তান ও বোস্তানের নিজ হস্তে নকল করে তার নিকট উপঢৌকনস্বরূপ প্রেরণ করেছিলেন’’।
এ সুদীর্ঘ ৩০ বছর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করে জীবন ও জগত সম্বন্ধে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
বাকি জীবন এখানেই সূফী ধর্মতত্ত্ব চর্চা এবং গ্রন্থ রচনায় অতিবাহিত করেন। সা'দী বিশেষ করে যে সকল দেশভ্রমণ করেন তার মধ্যে অন্যতম ছিল ইরাক, শাম ও হেজাজ।
হিন্দুস্থান, গজনী, তুর্কিস্থান, আজারবাইজান, বায়তুল মুকাদ্দাস, ইয়ামান ও দক্ষিণ আফ্রিকার কথাও সা'দী তার ভ্রমণ সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন।সা'দী গুলিস্তানে লিখেছেন, ‘‘দর আক্সায়ে আলম ব'গাশ্ তামবসে; বসর্ বোরদম্ আয়ামে ব'হর কাসে;/তামাত্তায় হে হর্ গোশা ইয়াফ্তাম্, যে হর্ থেরমনে, খোশা ইয়াফ্তাম।
’’ অর্থাৎ ‘ভ্রমিয়াছি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রদেশ, মিলিয়াছি সর্বোদেশে সবাকার সনে।/প্রতিস্থানে জ্ঞান-রেণু করি আহরণ, প্রতি মওসুমের শস্য করেছি ছেদন।’’
সাদীর এ উক্তি মহাকবি টেনিসনের বর্ণিত সেই গ্রীক বীর ইউলিসিসের ভ্রমণকাহিনী স্মরণ করয়য়ে দেয়:- "Always roaming with a hungry heart/Much have I seen and known; cities and men/And manners, climates, councils, government/(Myself not least but honoured of them all)/And drunk delight of battle with my peers/Far on the ringing plains of Troy. I am a part of all tht I met." (পারস্য প্রতিভা. পৃ. ১১৮-১১৯)
‘‘সা'দীর নিজস্ব রচনায় তার জীবনী ও রচনা সম্পর্কে বহু তথ্য পাওয়া যায়। অধিকাংশ কাসিদা তিনি জীবনের শেষের দিকে রচনা করেছেন বলে মনে হয়।
কারণ এতে এমন কয়েকজন ব্যক্তি সম্পর্কে ইঙ্গিত আছে, যাদের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছে দেশ ভ্রমণ হতে শীরাজে প্রত্যাবর্তনের পর। প্রাচীন গজলসমূহ তার যৌবনকালের বলে মনে হয়।
Henry Masse সা'দী সম্পর্কে তার Essaisur le poets Saadi (Paris 1419) প্রবন্ধে সা'দীর রচনাসমূহের কাল নির্ণয়ের প্রয়াস পেয়েছেন ।সা'দীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ দু'জন বন্ধু ছিলেন; শামছুদ্দিন মোহাম্মদ ও আলাউদ্দিন আতা মুলক জুইনি যারা মোগলযুগে বিজ্ঞ মন্ত্রী ছিলেন।
সা'দীর নিজ কথা দ্বারা এটাই ফুটে উঠে যে তিনি তাসাউফ ও এরফানে বিশ্বাসী ছিলেন। ‘‘সূফী তত্ত্বের নিগুঢ় বিষয়ে তার সুগভীর জ্ঞান ছিল। তিনি তার পদ্য ও গদ্য রচনায় নৈতিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধকে জাগ্রত ও সমুন্নত করার উদ্দেশ্যে তাসাউফের মর্ম ব্যাখ্যা করেছিলেন। তিনি তার রচনায় সূফীতত্ত্বের বর্ণনা দিয়েছেন এই উদ্দেশ্যে যে, তা নৈতিক শিক্ষার সহায়ক হবে। নীতি শিক্ষক হিসাবে তার সুখ্যাতি দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে।’’। সা'দী সূফীতত্ত্বের অত্যন্ত গভীরে প্রবেশ করেছিলেন, এবং এটাও বলা হয়ে থাকে যে, বর্তমানে তার রওজা এক খানকায় পরিণত হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো; এ মহাকবি নিজ জীবনে এবং মৃত্যুর পর যে সুনাম অর্জন করেন তা নতুন কোন বিষয় নয়। তার এ বৈশিষ্ট্য অন্যান্য কবিদের মধ্যে প্রতীয়মান হয় না।
আরেকটি বিষয় হলো সা'দীর প্রসিদ্ধি শুধু ইরানেই নয়, এমনকি তার যুগে ইরানের বহির্বিশ্বে যেমন: হিন্দুস্থান ও এশিয়া মহাদেশেও পৌঁছে ছিল; তার নিজ বাণী থেকে এ বিষয়ে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
কার্যত সা'দীর এ প্রসিদ্ধির কয়েকটি বৈশিষ্ট্য বা দিক রয়েছে:‘‘সা'দী সর্বপ্রথম হৃদয়ের আবেগ ও অনুভূতি গযলে সফলভাবে প্রকাশ করেন। গযলের ভাবধারা ও বিষয়বস্তুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সহজ ও সরল ভাষা ব্যবহার করে তিনি গযলের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেন।
এ জন্য সা'দীকে গযলের ইমাম আখ্যায়িত করা হয়েছে’’তিনি পর্যটক কবি ছিলেন, দিনের ঠান্ডা ও গরমের স্বাদগ্রহণ করেছেন এবং নিজ অভিজ্ঞতা অন্যান্যের জন্য সুন্দর ও মিষ্টি ভাষায় ব্যক্ত করেছেন আর একইভাবে তার নিজ বর্ণনা গদ্য বা পদ্যে উদাহরণ ও মনোহর ঘটনার মাধ্যমে ব্যবহার করেছেন। সা'দী ফুর্তিবাজ ও রসিক কবি হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেন যার দ্বারা পাঠকগণকে আকৃষ্ট করেছেন। এ বিষয়টি একে একে সকলের কাছেই পৌঁছেছিল আর এটাই ছিল তার প্রসিদ্ধির সবচেয়ে বড় কারণ।
তিনি তার প্রাঞ্জল ভাষায় প্রেমিকদের প্রশংসা ও অনুভূতি উল্লেখ করেননি। ‘‘তিনি কখনও সরাসরি উপদেশ দেননি এবং উপদেশ গ্রহণ করতেও বলেননি।
কাহিনী বর্ণনার মাধ্যমে শিক্ষণীয় বিষয়টি পরিস্ফুট করে তোলেন। ফলে পাঠকের মন স্বভাবত তাতে প্রভাবিত হয়। তার এ সকল লেখা সাধারণত গুলিস্তান, বোস্তান ও পান্দনামায় স্থান পেয়েছে। এতে একঘেয়েমি নাই।
ফলে পাঠকের বিরক্তির উদ্রেক হয় না। তার মতে স্বার্থের কথা ত্যাগ করে মানুষের প্রতি সহানুভূতির প্রদর্শনই প্রকৃত পুণ্য।
তার সুন্দর রচনাশৈলী, সরল-সহজ বর্ণনা ও উপমা উৎপ্রেক্ষার অপূর্ব ক্ষমতা তাকে জনপ্রিয় করেছে।’’।
সা'দী কবি জীবনে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির প্রশংসা করেছেন যার অধিকাংশই উজবেকী ও পারস্যের মন্ত্রী এবং কয়েকজন তার সমসাময়িক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
সা'দীর সবচেয়ে বড় প্রশংসনীয় ব্যক্তি হলেন সালজুকী যুগের মুজাফফর উদ্দিন আবুবকর বিন সাদ বিন জাঙ্গী' এ বাদশার যুগেই সা'দী শিরাজে প্রত্যাবর্তন করেন।
প্রশংসনীয় অন্য ব্যক্তি হলেন, সাদ বিন আবু বকর; সা'দী ৬৫৬ হিঃ সারে একেই গুলিস্তাঁন উৎসর্গ করেন এবং দু'টি মর্সিয়াও এ ব্যক্তির মৃত্যুতে পাঠ করেন।
আর অন্যান্যের মধ্যে হলেন সা'দী সামছুদ্দিন মুহাম্মদ এবং তার ভাই আলাউদ্দিন আতা মুলক জুইনি, তার এ প্রশংসার ভাষা ও ধরন অন্যান্যদের থেকে এক ভিন্ন রূপ যাতে কোন তোষামোদও নেই এবং অতিরঞ্জিত অবস্থাও নেই।
বরং সকল বাণীই উপদেশমূলক। ‘সা'দীর কাসিদাগুলোর একটি স্বতন্ত্র কাব্যশৈলী রয়েছে। তিনি প্রশংসা ও স্তুতির স্থলে উপদেশ ও নসিহত দান করেছেন এবং কখনো কখনো আধ্যাত্মিক বিষয়গুলোকে সুন্দরভাবে ব্যবহার করেছেন।
নতুন ধ্যান-ধারণা ও বিষয়বস্তুর মাধ্যমে সা'দীর সহজ ও সরল ভাষা কাসিদা রচনায় একটা পরিবর্তন সৃষ্টি করেছিল, যা ছিল তার সময়ে বিরল ও অতুলনীয়।
তদানীন্তন সময়ে যখন সনাতন ও ঐতিহ্যগত কাসিদাগুলো হারিয়ে যাচ্ছিল তখন সা'দীর কাসিদাগুলো সে অভাব পূরণ করে। তিনি তোষামোদকারীদের তিরস্কার করেছেন।
তিনি প্রশংসিতদের মজলুমের ডাকে সাড়া দেয়া, দয়াবান হওয়া, ফকির ও দরিদ্রদের মনোরঞ্জন করা, আল্লাহভীতি, আখেরাতের রসদপত্র সংগ্রহ, সুনাম অর্জনের ব্যাপারে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিতেন।
এ মহাকবির মৃত্যু মুহূর্তে বিদায়ী ভাষণে বলেন, তাঁর প্রসিদ্ধি বিশ্বে স্থায়ী স্থান লাভ করেছে।
সা'দীর কথার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, গদ্য বা পদ্য উভয়ে রয়েছে ভাষার প্রাঞ্জলতা, তাঁর বাক্যের বিশেষ ভঙ্গিতে রয়েছে মিষ্টি ভাষা।
তার ‘ভাষা ও ভঙ্গি সহজ ও গতিশীল এবং তা ফাসাহাত ও বালাগাতের, ভাষার বিশুদ্ধতা ও বাকপটুতা) পূর্ণ মানদন্ডে রচিত' (সাবক শেনা'সীয়ে শে'র, পৃ. ২১৬ তাঁর ‘কাব্যশৈলী এ জন্যই সহজ ও সরল যে, খোরাসানী রচনাশৈলীর কবিদের প্রতি তাঁর ঝোঁক-প্রবণতা ছিল।
তিনি সহজ ভাষা ব্যবহারে ছিলেন সক্ষম, ‘তিনি সাহিত্যের কলাকৌশল পরিমিত পরিমাণে ব্যবহার করেছেন এবং সর্বত্র শ্রোতাদের অবস্থান ও মর্যাদার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেছেন।
তাঁর কবিতার শৈল্পিক সত্তা এবং এগুলোর ভাষা সহজ ও সাবলীল হওয়ার কারণে তাঁকে সহজ ও সাবলীল পদ্ধতির শিক্ষক বলে মনে করা হয়'
৬ষ্ঠ থেকে ৭ম শতাব্দীকালে ফারসি কবিতায় যে বিস্মবয়কর ভন্ডামির চিত্র ফুটে উঠেছিল, সা'কী নিজকে তা থেকে মুক্ত রেখেছেন।
তাঁর কথার এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হল চঞ্চলতা, সাহসিকতা এবং মহত্ত্বব যার ফলে তিনি বাস্তব কথা বলতে সক্ষম হয়েছেন।
শক্তিশালী মোগল যুগে কর্তৃত্ব গ্রহণ বা কামনা চরিতার্থ করার কোন ইচ্ছাই তাঁর ছিল না।
এ মহান শেখ বাস্তবতাকে গদ্য ও পদ্যাকারে কোন প্রকারের ভীতিহীন ও পদার্থহীনভাবে বর্ণনা করেছেন এবং এভাবে বলেছেন যে, কোন কালে ও যুগে কেই এরূপ সুস্পষ্টভাষায় কথা বলেনি।
ফারসি সাহিত্যে সা'দীর দক্ষতা ও পারদর্শিতা এতটাই যে, তিনি প্রত্যেক প্রকারের অভিজ্ঞতাকে সহজ ও অনায়াসেই কবিতার আকৃতিতে তুলে ধরতে পাতেন।
তাঁর ‘বোস্তান' কাব্যগ্রন্থটি এ প্রকারেরই একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। যদিও তা শিক্ষামূলক কাব্যগ্রন্থ, কিন্তু সে গ্রন্থের পঞ্চম পরিচ্ছেদ মহাকাব্য রচনায় পারঙ্গম তুসের ফেরদৌসিক চ্যালেঞ্জ করে।
‘বোস্তান' কাব্যগ্রন্থে সা'দীর শৈল্পিকতা কখনোই সরলতা ও অনাড়ম্বরতার বিনাশের কারণ হয়নি।
সা'দী যখন নিজামিয়া মাদরাসার অধ্যয়ন সমাপ্ত করেন ও সাহিত্য, দর্শন, ধর্ম ও নীতিশাস্ত্রে অসামান্য পান্ডিত্য অর্জন করেন সেসময় বাগদাদে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে।
এশিয়ার দুর্ধর্ষ চেঙ্গিস খাঁর পৌত্র হালাকু খান এক তাতার বাহিনী নিয়ে বাগদাদ আক্রমণ করে এবং নির্বিচারে গণহত্যা চালায়।
বাগদাদের গণহত্যার অবস্থা এরূপ পর্যায় ছিল যে, মাত্র দু'-তিন দিনে মহানগরী এক মহাশ্মশানে পরিণত হয়।
সা'দী এই নৃশংস হত্যাযজ্ঞে মর্মাহত হন এবং শোকে-দুঃখে তিনি বাগদাদ ত্যাগ করে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে মনস্থির করেন। কিন্তু ইরানেও তখন চলছিল মোগলদের অত্যাচার।
সুতরাং তিনি আর স্বদেশেও প্রত্যাবর্তন না করে নানা দেশ ভ্রমণের উদ্দেশ্যে ইরাক ত্যাগ করেন।সাহিত্যকর্ম পরিচিতি : সা'দী যখন কাব্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন তখন তাঁর বয়স মাত্র একুশ বছর।
তারপর থেকে দীর্ঘ প্রায় একশ' বছরে তিনি কবিতা এবং গদ্যে প্রায় ২৪টি গ্রন্থ রচনা করেছেন। সা'দীর এসব গ্রন্থে ন্যায়বিচার, ইনসাফ, ঔদার্য, আখলাক, মানবাধিকার ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
এগুলোর মধ্যে ‘গোলিস্তন' ও ‘বুস্তা' গ্রন্থদ্বয়ই সর্বজনজ্ঞাত। ‘‘তিনি ৬৫৫/১২৫৭ সালে ‘বোস্তান' এবং এক বছর পর ‘গুলিস্তান' রচনা করেন। এ দু'টি তাঁর বিশ্ববিখ্যাত রচনা।
ফারসি সাহিত্যের অধ্যয়ন এ দু'টি ব্যতীত সম্পূর্ণ হয় না বলে অনেকে মনে করেন। ‘বোস্তান' নৈতিকতা বিষয়ে রচিত কাব্য গ্রন্থ।
গুলিস্তান গদ্যে লিখিত; হৃদয়গ্রাহী পদ্ধতিতে নৈতিকতার বিষয়াদি এতে গল্পে পরিবেশন করা হয়েছে। চিত্তাকর্ষক করার উদ্দেশ্যে বর্ণনার মাঝে মাঝে কবিতার সংযোজন রয়েছে।
কুরআন ও হাদীস থেকে উদ্ধৃতি প্রদান করে বক্তব্য সুন্দর ও জোরালো করা হয়েছে। এ দু'টি গ্রন্থ একত্রে ‘সাদীনামাহ' নামে পরিচিত। এতে বর্ণিত ঘটনাপুঞ্জ সাদীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অভিব্যক্তি’’।
সা'দীর সাহিত্যকর্ম দু'ভাগে (গদ্য ও পদ্য) বিভক্ত করা যায়, গদ্যের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হল ‘গুলিস্তাঁন' আর পদ্যের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হল ‘বোস্তান' যার মাধ্যমে কবিতাকারে চারিত্রিক ও প্রশিক্ষণ সম্পর্কে উপদেশ প্রদান করা হয়েছে।
‘‘আলী ইবনে আহমাদ আবুবকর বীসাতুন (সাদীর মৃত্যুর ৫৩ বছর পরে যাঁর জন্ম)-এর সংকলিত কুল্লিয়্যাতে গ্রন্থই সা'দীর রচনার প্রধান সংকলন। কলকাতা হতে প্রকাশিত কুল্লিয়্যাতে (২ খন্ডে, মুদ্রণ ১৭৭১ ও ১৭৯৫ খ্রি.) সংকলনের একটি ভূমিকাও রয়েছে এবং বীসাতুন-এর কুল্লিয়াতই এর উৎস।
কলিকাতা সংস্কারণের প্রথম খন্ডের শুরুতেই আছে সাতটি নিবন্ধ যেগুলোর বিষয়বস্তু সূফীতত্ত্ব ও নৈতিকতা’’। ‘‘সা'দীর পান্দনামাহ (কারীমাহ নামেও পরিচিত) ফরীদুদ্দীন আত্তারের পান্দনামাহর পদ্ধতিতে রচিত একটি মাছনাভী।
দ্বিতীয় খন্ডে রয়েছে ফারসি ও আরবি গাযালের দীওয়ান (কবিতা সংগ্রহ), নৈতিকতা বিষয়ক কাসীদা; মারছিয়া (শোকাগাথা), আরবি ও ফারসি এই দুই ভাষার মিশ্রণে রচিত কবিতা (মুলাম্মায়াত); তারজীবান্দ (প্রতি স্তবকের পরে একই পংক্তির পুনরাবৃত্তি এবং গাযালেল চারটি বিভাগ (১) প্রাচীন গাযাল; (২) তায়্যিবাত (সুন্দরগীতি কবিতা); (৩) বাদাই (অলংকার পূর্ণ কবিতা); (৪) খাওয়াতিম (অঙ্গুরীসমূহ); এর শেষাংশ সাহিবিয়্যাহ বা সাহিবনামাহ, মুকাত্তায়াত (খন্ড বা ক্ষুদ্র কবিতা), মৃদহিকাত (হাসির কবিতা), রুবাইয়াত (চতুদী) ও মুফরাদাত (এক চরনের কবিতা), স্থান পেয়েছে। হায়ালিয্যাত ও খাবীছাত (যা অশালীন কথাবার্তা প্রকাশ করে) নামেও তাঁর কিছু কবিতা রয়েছে।
খাওয়াতীম তাঁর শ্রেষ্ঠ গাযাল রচনা বলে ধারণা করা হয়।‘‘ইরানে গুলিস্তান ও বোস্তানের তুলনায় তাঁর দেওয়ানের সমাদরই বেশি (Browne, A year amongst the Persians, পৃ. ২৮১)।
তাঁর গুলিস্তান ও বোস্তানের অনেক অংশ প্রায় অনেক শিক্ষিত ইরানীর কণ্ঠস্থ। বেশ কয়েকজন কবি তাঁদের রচনায় সা'দীর অনুসরণ ও অনুকরণ করতে চেষ্টা করেছেন (এ ধরনের পুস্তকের তালিকার জন্য Ehte, Grundriss Iranis chen philogic, ২ খন্ড, ৯৭)। গুলিস্তানের পদ্ধতিতে জামীর বাহারিস্তান লিখিত হয়েছে। কিন্তু এ ধরনের কোন পুস্তকই গুলিস্তানের ন্যায় সমাদৃত হয়নি’’।
‘‘ইরানের বাইরে ভারত উপমহাদেশ ও তুরস্কে সা'দীর গ্রন্থরাজি সমাধিক পরিচিত এবং এ দুই দেশের সাহিত্যেও তাঁর রচনার প্রভাব যথেষ্ট রয়েছে।
বেশ কিছু ভারতীয় ভাষায় গুলিস্তানের অনুবাদ হয়েছে। আফ্সূস্কৃত (১৮০২ খৃ.) গুলিস্তানের উর্দু অনুবাদ সুবিদিত। গদ্যে-পদ্যের সংযোজন রীতি ভারতীয় সাহিত্য জগতে প্রাচীনকাল হতেই অনুসৃত হয়ে আসছে।
‘‘এই পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, সম্ভবত সা'দী গুলিস্তান রচনায় ভারতীয় রচনা রীতির দ্বারা কিছুটা প্রভাবিন্ত হয়েছিলেন’’। তুর্কী ভাষায় সাদীর প্রায় সকল রচনা অনূদিত হয়েছে। আল্লামা তাফতাসানী ৭৫৫/১৩৫৪ সালে তুর্কী ভাষায় বুস্তাঁন অনুবাদ করেছিলেন।
নব্য তুর্কী সাহিত্যে সা'দীর রচনার প্রভাব কিছুটা লক্ষ্য করা যায়। দিয়্যা পাশা সা'দীকে শ্রেষ্ঠ ফারসি সাহিত্যিক বলে মন্তব্য করেছেন’’।‘‘মুসলিম বিশ্বের বাইরেও সা'দী সুপরিচিত।
পাশ্চাত্যের বিভিন্ন ভাষায় গুলিস্তান ও বোস্তানের অনুবাদ হয়েছে। ১৬৩৪ খ্রি. Andre du Rye ফরাসী ভাষায় গুলিস্তাঁ অনুবাদ করেছিলেন। র্যা টিনে (১৬৫১ খ্রি.), জার্মান ভাষায় (১৬৫৪ খ্রি.) ও ইংরেজিতে (১৭৭৪ খ্রি.) ইহা অনূদিত হয় এবং কয়েকবার প্রকাশিত হয়। বোস্তানের অনুবাদ ডাচ (Dutch) ভাষায় ১৬৮৮ খ্রি. সম্পন্ন হয়েছে।

সাহিত্য পরিচিতি:

(১) গুলিস্তান
গুলিস্তান তাঁর সবচেয়ে সুন্দর গদ্য সাহিত্যকর্ম, সম্ভবত বলা চলে এটা সমগ্র সাহিত্য জগতে এক অবিস্মরণীয় অবদান (দৃষ্টান্ত)। এ মহাগ্রন্থের এক বিশেষত্ব হল এর ন্যায় অন্য কোন গ্রন্থ নেই; যা শিক্ষণীয় গদ্য কবিতাকারে রচিত। প্রত্যেকটি কবিতা, বাক্য ও লেখা পদ্যাকারে লিখিত এক বা একাধিক ফার্সী কবিতা ও মাঝে মাঝে আরবি দৃষ্টান্ত রয়েছে।
গুলিস্তানে আটটি অধ্যায় (বাব) রয়েছে যেমন: (১) বাদশাহের চরিত্র, (২) দরবেশদের চরিত্র, (৩) অল্পে তুষ্টির গুরুত্ব, (৪) নীরবতার উপকারিতা, (৫) প্রেম ও যৌবন, (৬) দুর্বলতা ও বৃদ্ধাবস্থা, (৭) শিষ্টাচারের প্রভাব, (৮) কথা বলার শিষ্টাচার (গুলিস্তানে সা'দী)
(২) বোস্তান
বোস্তান-এ রয়েছে ১০ অধ্যায় (বাব)। যেমন : (১) ন্যায়বিচার, (২) এহসান, (৩) প্রেম, (৪) ভদ্রতা, (৫) ক্ষমা, (৬) জিকির, (৭) প্রশিক্ষণ, (৮) কৃতজ্ঞতা, (৯) তৌবা, (১০) মোনাজাত ও পুস্তকের সমাপ্তি বোস্তানে সা'দী)।
কবি পুস্তকের সমাপ্তির তারিখ ৬৫৫ হিজরী বলে উল্লেখ করেছেন যা কবি শিরাজে প্রত্যাবর্তনের পূর্বেই রচনা করেছেন এবং উক্ত গ্রন্থ নিজ শহরের জন্য উপহার হিসেবে প্রদান করেছেন ও উক্ত গ্রন্থ আবুবকর বিন সাদ বিন জাঙ্গীর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেছেন। ১২৫৭ সালে বাদশাহ আবুবকর বিন সাদ বিন জাঙ্গীর পৃষ্ঠপোষকতাই সা'দী এ বোস্তান রচনা করেন; তাতে মূলত পুরো গ্রন্থ জুড়েই আদল-ইনসাফ ও মানবাধিকারের কথাই বিবৃত হয়েছে।
এ গ্রন্থে সা'দী বাদশাহ এবং শাহজাহাদের সম্বোধিত হিসেবে দাঁড় করিয়ে সাধারণ মানুষ ও অধীনস্তদের প্রতি তাদের কী করণীয় এবং কী বর্জনীয়, সে সম্পর্কে বিভিন্ন কাহিনী এবং ঘটনা নিয়ে উপদেশ বর্ণনা করেছেন এবং সে উপদেশের ফাঁকে ফাঁকে সাধারণ মানুষের অধিকারের কথাও চমৎকারভাবে বর্ণনা করেছেন। ‘‘ডি, হাবেল্ট নামক জনৈক লেখক সা'দীর ‘পান্দনামাকে পিথাগোরাসের ‘‘গোল্ডেন ভার্সেস' নামক গ্রন্থের সাথে তুলনা করেছেন। ‘গোল্ডন্ ভার্সেস' এক সময় সমগ্র গ্রীক জগতে বালকগণের নীতিপাঠ্য বলে নির্দিষ্ট ছিল।’’
(৩) রেসালেয়ে কাসায়েদে আরাবী
(সা'দীর ২য় পদ্য সাহিত্যকর্ম হল আরবি কাসিদা যা প্রায় ৭০০ শ্লোক বিশিষ্ট যা উহাতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে : প্রশংসা, উপদেশ এবং একটি মোস্তাছিম বিল্লাহর উদ্দেশ্যে বর্ণিত কাসিদা।
(৪) রেসালেয়ে কাসায়েদে ফারসি
(সাহিত্যকর্ম হল ফারসি কাসিদা। ওয়াজ-নছিহত, একত্ববাদ, বাদশাহদের প্রশংসা ও তাঁর যুগের প্রসিদ্ধ ব্যক্তিবর্গের প্রশংসায় সমৃদ্ধ)।
(৫) মিরাসী 
(শোকগাথা সমৃদ্ধ কয়েকটি কাসিদা যা মুসতাছিম বিল্লাহ ও আবুবকর বিন সাদ বিন জাঙ্গী ও সাদ বিন আবুবকর, আমির ফখরুদ্দিন আবুবকরের মৃত্যু সম্পর্কে আর একটি প্রসিদ্ধ ‘শোকগাথা' (মর্সিয়া) হল সালজুকী বাদশাহ সাদ বিন আবুবকর সম্পর্কে);
এছাড়াও আছে:
(৬) মোলাম্মায়াত; (৭) মোসালসাত (ত্রিকোণমিতি); (৮) তারজিয়াত (স্তবক); (৯) তাইয়্যেবাত (সুগন্ধ, পবিত্র); (১০) বেদায়েহ (অভিনব, বিরলতা); (১১) খাওয়াতেম; (১২) গায়লিয্যাতে কাদিম (পুরাতন গজল); (১৩) কেতয়াত (কিছু কিছু আরবি-ফারসি প্রশংসা সামছুদ্দিন সাহেব দেওয়ানী জুআনী সম্পর্কে); (১৪) হাযলিয়্যাত (রসিকতা সমৃদ্ধ কবিতার সংকলন, মিষ্ট ভাষী দু'টি মাসনাবী ও কয়েকটি গজল রোবায়ীর সংকলন); (১৫) রুবাইয়্যাত; (১৬) মুফরাদাত (নিঃসঙ্গতা); (১৭) রেসালেয়ে দার তাকরীরে দীবাচে; (১৮) রেসালেয়ে মাজালেছে পাঞ্জেগানে এতে রয়েছে সাদীর জিকির ও উপদেশ); (১৯) রেসালায়ে সাওয়ালে দার সাহেবে দিওয়ান (চিঠিপত্র দেওয়ান সামছুদ্দিন মুহাম্মদ জুইনির চিঠি ও সাদীর উত্তরপত্র); (২০) রেসালায়ে সাওয়ালে সাদ উদ্দিন দার আকল ও এশক (জ্ঞান ও প্রেম সম্পর্কিত চিঠি এবং এ সম্পর্কে সাদীর বিভিন্ন উত্তর); (২১) রেসালায়ে নাসিহাতুল মুলুক (বলা হয়ে থাকে যে সাদীর রাজনৈতিক অধ্যায়ে নছিহতে মুলুক রয়েছে); (২২) এক হাজার শে'র সম্বলিত একটি দেওয়ান; (২৩) কুল্লিয়্যাতে শেখ এ আছে তাঁর গদ্য-পদ্যের সংকলন, এ সকল সাহিত্যকর্ম প্রথমে সা'দী একত্র করেছেন, বিন্যস্ত করেছেন কিন্তু সাদীর মৃত্যুর পর আলী বিন আহমাদ বিন আবুবকর বিস্তুন এ সকল সাহিত্যকর্ম সুবিন্যস্ত ও একত্র করেছেন।
এস রুশো বলেন, ‘সাদীর ‘‘দিউয়ান’’ নামক গ্রন্থে প্রায় ১০০০ কবিতা আছে, তা আজ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। হয়ত ইউরোপে কোনও লাইব্রেরিতে তা রক্ষিত থাকতে পারে।
তাঁর মৃত্যু সাল অনেকে ৬৯১ হিজরী বলে উল্লেখ করেছেন, কেউ কেউ মনে করেন যে তিনি ৮০ বছর বয়সে ৬৯০ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেছেন এবং তাঁর সমাধি সৌধ (সাদিয়াহ) শিরাজ শহরের পূর্বাংশে রোকনাবাদের স্রোতশীল নদীর ফোয়ারার নিকটবর্তী একবাগানে অবস্থিত।
পাহলভী রাজত্বকালে উহা নতুন করে নির্মাণ করা হয়। সা'দীর সাহিত্যে মানবতা: সা'দী স্বীয় গুলিস্তানের ‘১ম অধ্যায়ের ১ম হেকায়েত' অসহায় মানুষের অবস্থা বর্ণনা করেছেন এভাবে :‘‘মানুষের বিপদের সময় যখন থাকে না কোন উপায়,তখন নিজ হাতে ধারাল তলোয়ার ঠেকায়।
’’সা'দী এ পৃথিবীতে কল্যাণমূলক কাজ করার জন্য সাধারণ মানুষের প্রতি আহবান জানিয়ে গুলিস্তানের প্রথম অধ্যায়ের ২য় হেকায়েতে এভাবে বলেছেন:‘‘বহু নামকরা মানুষ দাফন করা হয়েছে মাটির নিচে, যাদের কোন নাম-নিশানাও নেই এ পৃথিবীতে;সে বৃদ্ধ ব্যক্তিটির লাশ দাফন করা হল মাটিতে, মাটি তা এমনভাবে ভক্ষণ করলো; যার হাড়ও নেই বাকিতে।
বাদশাহ নও শেরোয়ানের (সৎকর্মের কারণে) নাম এখনও রয়েছে জীবিত,বহু যুগ থেকেই নওশেরোয়ান পৃথিবীতে নেই যদিও।হে মানব! গনিমতের সম্পদ মনে করেই কল্যাণকর্ম কর নিজ আয়ুকে,যেন আসে আওয়াজ অমুক নেই বলে বাঁশি থেকে।
’’বুস্তানের গুরুতেই সা'দী রাজা-বাদশাদের আরাম-আয়েশ পরিহার করে প্রজাদের প্রতি মনোনিবেশ হওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন :‘তোমার দেশের কেহই পাবে না শান্তি;যদি ব্যস্ত থাক নিজ সুখ-শান্তির কামনায় তুমি।
জ্ঞানীদের কাছে নয় পছন্দনীয়;ছাগলের পালে থাকবে চিতা আর রাখাল থাকবে সুখ নিন্দ্রীয়।
' গুলিস্তানে সা'দী শাসক সম্পর্কে আরও বলেন: বাদশাহ হলেন জনগণের রাখাল; যদিও তাঁর রয়েছে প্রচুর ধন-সম্পদ, রাখলের জন্য নয় ছাগল;ছাগলের সেবা করার জন্যই রাখাল।
অধীনস্থ কর্মচারী এবং খাদেমদের সম্পর্কে বলেছেন যদি কোন কর্মচারী বাধ্যর্কের কারণে কাজের অযোগ্য হয়ে যায় তাহলে তাঁর প্রতি তাচ্ছিল্য না করে তাঁর দীর্ঘকালের সেবার কথা চিন্তা করে তোমার দয়ার হাত প্রসারিত করে দাও।
‘‘যখন সেবক তোমার উপনীত হয় বার্ধক্যে,তখন তাঁর দীর্ঘকালের সেবার কথা যেও না ভুলে।বার্ধক্য যদি তার সেবার হস্ত দেয় বন্ধ করে,তাহলে তো তোমার অনুগ্রহের হাত রয়েছে তার জন্যে।
'সা'দী মানুষকে তার সঠিক গন্তব্যস্থল নির্ণয়ের উপদেশ দিয়ে ‘গুলিস্তানের ২য় অধ্যায়ের ৬ষ্ঠ হেকায়েত' বলেন:‘‘হে বেদুঈন! আমি শংকিত, তুমি পারবে না পৌঁছতে কাতারে; কারণ যে পথে তুমি করেছ গমন সে পথ যাবে তুর্কিস্থানে।’’
নিরুপায় মানুষদের প্রতি সাহায্যের হাত নিয়ে এগিয়ে আসার আহবান জানিয়ে সা'দী বলেন: যদি দেখি অন্ধ ও কূপ; খুবই অন্যায়, যদি থাকি বসে করিয়া চুপ।
ধর্মমত নির্বিশেষে পৃথিবীর সকল মানুষের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সা'দী বলেনঃঅঙ্গ স্বরূপ সকল আদম সন্তান একে অপরের; (কারণ) একই বস্তু থেকে সৃষ্টি তাদের।
যদি তার এক অঙ্গ হয় তখনও ব্যথিত,তাহলে তার অন্যান্য অঙ্গ সমভাবে হবে ব্যথিত।যদি তুমি অপরের দুঃখে না হও ব্যথিত ;জেনে রেখ মানুষ নামের অযোগ্য তুমিত।

No comments:

Post a Comment

ইসমাইল হোসেন