15 June, 2018

আয়েশা (রাঃ) -এর সাথে রাসূল (ছাঃ) -এর বিবাহ


মাসাধিক কাল ত্বায়েফ সফর শেষে দশম নববী সনের যুলক্বা‘দাহ মাসে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মক্কায় ফিরে আসেন। এ সময় একটানা তিনটি হারাম মাসের সুবর্ণ সুযোগকে তিনি পুরোপুরি কাজে লাগানোর মনস্থ করেন। তিনি হজ্জে আগত দূরদেশী কাফেলা সমূহের তাঁবুতে গিয়ে গিয়ে তাওহীদের দাওয়াত দিতে থাকেন। যদিও কেউ তাঁর দাওয়াতে সাড়া দেয়নি।
একাদশ নববী বর্ষ :

এই বছর বাইরের দেশের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ওমরা করার জন্য বা অন্য কোন উদ্দেশ্যে মক্কায় আসেন এবং নবী আগমনের সংবাদ শুনে রাসূলের সঙ্গে সাক্ষাত করেন। তারা এ সময় ইসলাম কবুল করে ধন্য হন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন, ইয়াছরিবের বিখ্যাত কবি ও উচ্চ সামাজিক মর্যাদার অধিকারী ও ‘কামিল’ লকবধারী সুওয়াইদ বিন ছামেত ( , ইয়াছরিবের আউস গোত্রের ইয়াস বিন মু‘আয , ইয়াছরিবের বিখ্যাত ‘গেফার’ গোত্রের আবু যার গেফারী , দাওস গোত্রের নেতা ও কবি তুফায়েল বিন আমর দাওসী , ইয়ামনের যেমাদ আযদী প্রমুখ নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিগণ। এই সকল ব্যক্তির মাধ্যমে তাদের স্ব স্ব এলাকায় ইসলামের বাণী দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে দলে দলে লোক ইসলাম কবুল করে।

ইয়ামনের অধিবাসী যেমাদ আযদী ছিলেন ঝাড়-ফুঁকের মাধ্যমে জিন ছাড়ানো চিকিৎসক। মক্কাবাসীদের কাছে সবকিছু শুনে তিনি রাসূলকে জিনে ধরা রোগী মনে করে তাঁর কাছে আসেন এবং বলেন, ‘হে মুহাম্মাদ! ঝাড়-ফুঁকের মাধ্যমে আমি চিকিৎসা করে থাকি। আপনার কোন প্রয়োজন আছে কি?’ জবাবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে শুনিয়ে দেন খুৎবাতুল হাজতের সেই অমৃত বাণী সমূহ- যা প্রতিটি খুৎবা ও বক্তৃতার সূচনায় আবৃত্তি করা পরবর্তীতে সুনণাতে পরিণত হয়ে যায়। খুৎবাটি নিম্নরূপ : إن الحمد لله نحمده ونستعينه، من يهده الله فلا مضل له ومن يضلل فلا هادى له، وأشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له وأشهد أن م حمدا عبده ورسوله، أما بعد:
‘নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আমরা তাঁর প্রশংসা করি, তাঁর নিকটে সাহায্য প্রার্থনা করি। আল্লাহ যাকে হেদায়াত দান করেন, তাকে পথভ্রষ্টকারী কেউ নেই। আর তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তাকে হেদায়াতকারী কেউ নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, তিনি একক তাঁর কোন শরীক নেই এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও তাঁর রাসূল।’

যেমাদ কথাগুলি শুনে ভাবে গদগদ হয়ে রাসূলকে বারবার কথাগুলি বলতে অনুরোধ করেন। ফলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কথাগুলি তিনবার বলেন। অতঃপর যেমাদ বলে উঠলেন, ‘আমি জ্যোতিষীদের, জাদুকরদের ও কবিদের কথা শুনেছি। কিন্তু আপনার কথাগুলির মত কারুর কাছে শুনিনি। এগুলি সমুদ্রের গভীরে পৌঁছে গেছে। আপনি হাত বাড়িয়ে দিন আমি আপনার নিকটে ইসলামের উপরে বায়‘আত করব।’ অতঃপর তিনি বায়‘আত করেন।


হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর সাথে বিবাহ :

একাদশ নববী বর্ষের শাওয়াল মাসে অর্থাৎ হযরত সওদা বিনতে যাম‘আর সাথে বিয়ের ঠিক এক বছরের মাথায় নবীর সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ার মানসে হযরত আবুবকরের একান্ত ইচ্ছায় তাঁর নাবালিকা কন্যা আয়েশাকে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বিবাহ করেন। বিয়ের তিন বছর পরে সাবালিকা হলে নয় বছর বয়সে মদীনায় ১ম হিজরী সনের শাওয়াল মাসে তিনি নবীগৃহে গমন করেন।


একাদশ নববী বর্ষের হজ্জের মওসুম :

ছয় জন পবিত্রাত্মা যুবকের ইসলাম গ্রহণ

দিনের বেলায় আবু লাহাব ও অন্যান্যদের পিছু লাগা ও পদে পদে অপদস্থ হবার ভয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রাত্রির গভীরে দাওয়াতে বের হওয়ার মনস্থ করেন। সেমতে তিনি একরাতে আবুবকর ও আলীকে সাথে নিয়ে বহিরাগত বিভিন্ন হজ্জ কাফেলার লোকদের সঙ্গে তাদের তাঁবুতে বা বাইরে সাক্ষাত করে তাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দিতে থাকেন। এমন সময় তাঁরা মিনার আক্বাবাহ গিরি সংকটের আলো-আধারীর মধ্যে কিছু লোকের কথাবার্তা শুনে তাদের দিকে এগিয়ে গেলেন। জিজ্ঞাসায় জানতে পারলেন যে, তারা ইয়াছরিব থেকে হজ্জে এসেছেন এবং তারা ইহুদীদের মিত্র খাযরাজ গোত্রের লোক। তারা ছিলেন সংখ্যায় ছয়জন এবং ছয়জনই ছিলেন তরতাজা তরুণ যুবক। তারা ছিলেন ইয়াছরিবের জ্ঞানী ও নেতৃস্থানীয় যুবকদের শীর্ষস্থানীয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাদের মধ্যে বসে পড়লেন। অতঃপর তাওহীদের দাওয়াত দিলেন এবং কুরআনের কিছু আয়াত তেলাওয়াত করে শুনালেন। তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করল। তারা ইতিপূর্বে তাদের মিত্র ইহুদীদের নিকটে শুনেছিল যে, সত্বর আখেরী যামানার নবীর আবির্ভাব ঘটবে এবং তাঁকে সাথে নিয়ে তারা ইয়াছরিববাসী প্রতিপক্ষদের পিষে মারবে’। ইনিই যে সেই নবী, এ ব্যাপারে তারা নিশ্চিত হয়ে তখনই ইসলাম কবুল করল।

অতঃপর তারা বলল, সদ্য সমাপ্ত বু‘আছ যুদ্ধের ফলে ইয়াছরিববাসীগণ পর্যুদস্ত হয়ে গেছে। পারস্পরিক হানাহানি ও শত্রুতার ফলে তাদের সমাজে এখন অশান্তির আগুন জ্বলছে। অতএব এ অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যদি ইয়াছরিবে হিজরত করেন, তবে তাঁর আহবানে সেখানে শান্তি স্থাপিত হতে পারে এবং আউস ও খাযরাজ উভয় দল তাঁর নেতৃত্ব মেনে নিতে পারে। ফলে তাঁর চাইতে অধিকতর সম্মানিত ব্যক্তি সেখানে আর কেউ হবে না। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাদের দাওয়াত শুনলেন এবং তাদেরকে ফিরে গিয়ে ইয়াছরিবের ঘরে ঘরে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে বললেন (যাতে হিজরতের পরিবেশ সৃষ্টি হয়)।

উপরোক্ত সৌভাগ্যবান ছয়জন খাযরাজী যুবনেতা ছিলেন-
(১) আস‘আদ বিন যুরারাহ ইনি ছিলেন কনিষ্ঠতম। কিন্তু ইনিই ছিলেন তাদের নেতা।
(২) আওফ বিন হারেছ বিন রেফা‘আহ
(৩) রাফে‘ বিন মালেক বিন আজলান
(৪) কুৎবা বিন আমের বিন হাদীদাহ
(৫) উকবা বিন আমের বিন নাবী
(৬) জাবের বিন আবদুল্লাহ (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহুম)।
এদের মধ্যে প্রথমোক্ত দুজন ছিলেন আব্দুল মুত্ত্বালিবের মাতুল গোষ্ঠী বনু নাজ্জার গোত্রের। ইয়াছরিববাসীগণের উক্ত দাওয়াতই মদীনায় হিজরতের বীজ বপন করে। যা মাত্র তিন বছরের মাথায় গিয়ে ফল দান করে।

নাজাশীর দরবারে কুরায়েশ প্রতিনিধি দল


হাবশায় গিয়ে যাতে মুসলমানগণ শান্তিতে থাকতে না পারে, সেজন্য কুরায়েশ নেতারা তাদেরকে ফিরিয়ে আনার ষড়যন্ত্র করল। এ উদ্দেশ্য সফল করার জন্য তারা কুশাগ্রবুদ্ধি কুটনীতিবিদ আমর ইবনুল ‘আছ এবং আবদুল্লাহ ইবনে আবী রাবী‘আহকে দায়িত্ব দিল। এ দুজন পরে মুসলমান হন। তারা মহামূল্য উপঢৌকনাদি নিয়ে হাবশা যাত্রা করেন এবং সেখানে গিয়ে প্রথমে খৃষ্টানদের নেতৃস্থানীয় পাদ্রী ও পোপদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তাদের ক্ষুরধার যুক্তি এবং মূল্যবান উপঢৌকনাদিতে ভুলে দরবারের পাদ্রী নেতারা একমত হয়ে গেল। পরের দিন আমর ইবনুল ‘আছ উপঢৌকনাদি নিয়ে বাদশাহ নাজ্জাশীর দরবারে উপস্থিত হলেন। অতঃপর তারা বললেন,
হে বাদশাহ! আপনার দেশে আমাদের কিছু অজ্ঞ-মূর্খ ছেলে-ছোকরা পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছে। যারা তাদের কওমের দ্বীন পরিত্যাগ করেছে এবং তারা আপনাদের ধর্মেও প্রবেশ করেনি। তারা এমন এক নতুন দ্বীন নিয়ে এসেছে, যা আমরা কখনো শুনিনি বা আপনিও জানেন না। আমাদের কওমের নেতৃবৃন্দ আমাদেরকে আপনার নিকটে পাঠিয়েছেন, যাতে আপনি তাদেরকে তাদের কওমের কাছে ফেরৎ পাঠান’। তাদের কথা শেষ হ’লে উপস্থিত পাদ্রীনেতাগণ কুরায়েশ দূতদ্বয়ের সমর্থনে মুহাজিরগণকে তাদের হাতে সোপর্দ করে দেওয়ার জন্য বাদশাহকে অনুরোধ করল। তখন বাদশাহ রাগতঃ স্বরে বললেন, আল্লাহর কসম! এটা কখনোই হতে পারে না। তারা আমার দেশে এসেছে এবং অন্যদের চাইতে আমাকে পসন্দ করেছে। অতএব তাদের বক্তব্য না শুনে কোনরূপ সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।
ফলে তাঁর নির্দেশক্রমে জাফর বিন আবু তালিবের নেতৃত্বে মুসলিম প্রতিনিধি দল বাদশাহর দরবারে উপস্থিত হয়ে তাঁকে সালাম দিলেন। কিন্তু সিজদা করলেন না। বাদশাহ তাদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা প্রথানুযায়ী আমাকে সিজদা করলে না কেন? যেমন ইতিপূর্বে তোমাদের কওমের প্রতিনিধিদ্বয় এসে করেছে? বাদশাহ আরও বললেন, বাপ-দাদার ধর্ম ত্যাগ করে এমনকি আমাদের ধর্ম গ্রহণ না করে নতুন যে ধর্মে তোমরা দীক্ষা নিয়েছে, সেটা কী আমাকে শোনাও!’
জা‘ফর বিন আবু তালিব বললেন, হে বাদশাহ! আমাদের ধর্মের নাম ‘ইসলাম’। আমরা স্রেফ আল্লাহর ইবাদত করি এবং তার সাথে কাউকে শরীক করি না। বাদশাহ বললেন, কে তোমাদের এসব কথা শিখিয়েছেন? জাফর বললেন, আমাদের মধ্যকারই একজন ব্যক্তি। ইতিপূর্বে আমরা মূর্তিপূজা ও অশ্লীলতা এবং অন্যায় ও অত্যাচারে আকণ্ঠ নিমজ্জিত ছিলাম এবং আমরা শক্তিশালীরা দুর্বলদের শোষণ করতাম। এমতাবস্থায় আল্লাহ মেহেরবানী করে আমাদের মধ্যে তাঁর শেষনবীকে প্রেরণ করেছেন। তাঁর নাম ‘মুহাম্মাদ’। তিনি আমাদের চোখের সামনে বড় হয়েছেন। তাঁর বংশ মর্যাদা, সততা, ন্যায়পরায়ণতা, আমানতদারী, সংযমশীলতা, পরোপকারিতা প্রভৃতি গুণাবলী আমরা জানি। নবুঅত লাভের পর তিনি আমাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন এবং মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করে সর্বাবস্থায় এক আল্লাহর ইবাদত করার আহবান জানিয়েছেন। সাথে সাথে যাবতীয় অন্যায়-অপকর্ম হতে তওবা করে সৎকর্মশীল হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা তাঁর উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছি এবং এক আল্লাহর ইবাদত করছি ও হালাল-হারাম মেনে চলছি। এতে আমাদের কওমের নেতারা আমাদের উপর ক্রুদ্ধ হয়েছেন এবং আমাদের উপর প্রচন্ড নির্যাতন চালিয়েছেন। সেকারণ বাধ্য হয়ে আমরা সবকিছু ফেলে আপনার রাজ্যে আশ্রয় নিয়েছি আপনার সুশাসনের খবর শুনে। আমরা অন্যস্থান বাদ দিয়ে আপনাকে পসন্দ করেছি এবং আপনার এখানেই আমরা থাকতে চাই। আশা করি আমরা আপনার নিকটে অত্যাচারিত হব না’। অতঃপর জাফর বললেন, হে বাদশাহ! অভিবাদন সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) আমাদের জানিয়েছেন যে, জান্নাতবাসীদের পরস্পরে অভিবাদন হল ‘সালাম’ এবং রাসূলুলাহ (ছাঃ) আমাদেরকে পরস্পরে ‘সালাম’ করার নির্দেশ দিয়েছেন।’

বাদশাহ বললেন, ঈসা ও তাঁর দ্বীন সম্পর্কে তোমরা কি বলতে চাও? উত্তরে জা‘ফর বিন আবু ত্বালিব সূরা মারিয়ামের শুরু থেকে ৩৬ আয়াত পর্যন্ত হযরত যাকারিয়া ও ইয়াহইয়া (আঃ)-এর বিবরণ, মারিয়ামের প্রতিপালন, ঈসার জন্মগ্রহণ ও লালন-পালন, দোলনায় কথোপকথন প্রভৃতি আয়াতগুলি পাঠ করে শুনিয়ে দিলেন। বাদশাহ ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক এবং তাওরাত-ইঞ্জীলে পন্ডিত ব্যক্তি। কুরআনের অপূর্ব বাকভঙ্গি, শব্দশৈলী ও ভাষালংকার এবং ঘটনার সারবত্তা উপলব্ধি করে বাদশাহ অঝোর নয়নে কাঁদতে থাকলেন। সাথে উপস্থিত পাদ্রীগণও কাঁদতে লাগলো। তাদের চোখের পানিতে তাদের হাতে ধরা ধর্মগ্রন্থগুলি ভিজে গেল। অতঃপর নাজ্জাশী বলে উঠলেন, ‘নিশ্চয়ই এই কালাম এবং ঈসার নিকটে যা নাযিল হয়েছিল দু’টিই একই আলোর উৎস হতে নির্গত’। বলেই তিনি কুরায়েশ দূতদ্বয়ের দিকে ফিরে বললেন, ‘তোমরা চলে যাও! আল্লাহর কসম! আমি কখনোই এদেরকে তোমাদের হাতে তুলে দেব না’।

আমর ইবনুল ‘আছ এবং আব্দুল্লাহ বিন আবী রাবী‘আহ দরবার থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমর বললেন, কালকে এসে এমন কিছু কথা বাদশাহকে শুনাবো, যাতে এদের মূলোৎপাটন হয়ে যাবে এবং এরা ধ্বংস হয়ে যাবে। একথা শুনে আব্দুল্লাহ বললেন, না, না এমন নিষ্ঠুর কিছু করবেন না। ওরা আমাদের স্বগোত্রীয় এবং নিকটাত্মীয় তো বটেই। কিন্তু আমর ওসব কথায় কর্ণপাত করলেন না। পরের দিন বাদশাহর দরবারে এসে তিনি বললেন,

‘হে সম্রাট! এরা ঈসা ইবনে মারিয়াম সম্পর্কে ভয়ংকর সব কথা বলে থাকে’। একথা শুনে বাদশাহ মুসলমানদের ডাকালেন। মুসলমানেরা একটু চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। কেননা নাছারারা ঈসাকে উপাস্য মানে। কিন্তু মুসলমানরা তাকে আল্লাহর বান্দা বলে থাকে। যাই হোক কোনরূপ দ্বৈততার আশ্রয় না নিয়ে সত্য বলার ব্যাপারে তারা মনস্থির করলেন এবং আল্লাহর উপর ভরসা করে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে সত্য প্রকাশ করে দিয়ে জাফর বিন আবু তালিব বললেন,

‘তিনি ছিলেন আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। তিনি ছিলেন আল্লাহ প্রেরিত রূহ এবং তাঁর নির্দেশ। যা তিনি মহীয়সী কুমারী মাতা মারিয়ামের উপরে ফুঁকে দিয়েছিলেন। কোন পুরুষ লোক তাকে স্পর্শ করেনি’।
তখন নাজ্জাশী মাটি থেকে একটা কাঠের টুকরা উঠিয়ে বললেন, ‘আল্লাহর কসম! তুমি যা বলেছ, ঈসা ইবনে মারিয়াম তার চাইতে এই কাষ্ঠখন্ড পরিমাণও বেশী ছিলেন না’। তিনি একথাও বলেন যে, ‘আল্লাহর শোকর যে, আমি এই রাসূলের যামানা পেয়েছি’। তিনি জাফর ও তার সাথীদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘যাও! তোমরা আমার দেশে সম্পূর্ণ নিরাপদ। যে ব্যক্তি তোমাদের গালি দেবে, তার জরিমানা হবে। যে ব্যক্তি তোমাদের গালি দেবে, তার জরিমানা হবে। তোমাদের কাউকে কষ্ট দেওয়ার বিনিময়ে যদি কেউ আমাকে স্বর্ণের পাহাড় এনে দেয়, আমি তা পসন্দ করব না’। অতঃপর তিনি কুরায়েশ দূতদ্বয়ের প্রদত্ত উপঢৌকনাদি ফেরৎ দানের নির্দেশ দিলেন।

ঘটনার বর্ণনাদানকারিণী হযরত উম্মে সালামাহ (রাঃ) (পরবর্তীকালে উম্মুল মুমেনীন) বলেন, ‘ঐ দু’জন চরম বেইযযতির সাথে দরবার থেকে বেরিয়ে গেল… এবং আমরা উত্তম প্রতিবেশীর সাথে উত্তম গৃহবাসীরূপে বসবাস করতে থাকলাম’।

দুঃখের বছর


দীর্ঘ তিন বছর বয়কট অবস্থায় থেকে গাছের ছাল-পাতা খেয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে বার্ধক্য জর্জরিত দেহ নিয়ে চাচা আবু ত্বালিব ও স্ত্রী খাদীজাতুল কুবরা চূড়ান্ত অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিলেন।


আবু ত্বালিবের মৃত্যু (রজব ১০ম নববী বর্ষ) :

১০ম নববী বর্ষের মুহাররম মাসে ঠিক তিন বছরের মাথায় বয়কট শেষ হওয়ার ৬ মাস পরে রজব মাসে আবু ত্বালিবের মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে আবু জাহল, আব্দুল্লাহ ইবনে আবী উমাইয়া প্রমুখ মুশরিক নেতৃবৃন্দ তাঁর শিয়রে বসে ছিল। এ সময় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এসে মৃত্যুপথযাত্রী পরম শ্রদ্ধেয় চাচাকে বললেন, ‘হে চাচা! আপনি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ কলেমাটি পাঠ করুন, যাতে আমি সেটাকে আপনার জন্য প্রমাণ হিসাবে আল্লাহর নিকটে পেশ করতে পারি’।
কিন্তু এ সময় দুরাচার আবু জাহল ও আব্দুল্লাহ বিন আবু উমাইয়া বারবার তাঁকে উত্তেজিত করতে থাকে যেন তিনি পিতৃধর্ম ত্যাগ না করেন। ফলে শেষ বাক্য তাঁর মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়‘আব্দুল মুত্ত্বালিবের দ্বীনের উপরে’। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলে উঠলেন,

‘আমি আপনার জন্য আল্লাহর নিকটে ক্ষমা প্রার্থনা করে যাব। যতক্ষণ না আমাকে নিষেধ করা হয়’।

ফলে এ সময় আয়াত নাযিল হয়-
مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِيْنَ آمَنُوْا أَنْ يَّسْتَغْفِرُوْا لِ لْمُشْرِكِيْنَ وَلَوْ كَانُوْا أُوْلِيْ قُرْبَى مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَابُ الْجَحِيْمِ-
‘নবী ও ঈমানদারগণের জন্য সিদ্ধ নয় যে, তারা ক্ষমাপ্রার্থনা করবে মুশরিকদের জন্য। যদিও তারা নিকটাত্মীয় হয়, একথা স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পর যে তারা জাহান্নামের অধিবাসী’ (তওবাহ ৯/১১৩)।
এরপরে নবীকে সান্ত্বনা দিয়ে আয়াত নাযিল হয়,
إِنَّكَ لاَ تَهْدِيْ مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللهَ يَهْدِيْ مَنْ يَّشَآءُ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِيْنَ-
‘নিশ্চয়ই তুমি হেদায়াত করতে পার না যাকে তুমি পসন্দ কর। বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হেদায়াত করে থাকেন এবং তিনি হেদায়াতপ্রাপ্তদের সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত’ (ক্বাছাছ ২৮/৫৬)।

আবু ত্বালিবের এই করুণ বিদায়ে ব্যথিত ভ্রাতা আববাস (রাঃ) একদিন ভাতিজা রাসূলের কাছে তার প্রাণপ্রিয় চাচার আখেরাতের অবস্থা কেমন হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জাহান্নামবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে হালকা আযাব প্রাপ্ত হবে আবু তালিব। তিনি আগুনের দুটি জুতা পরিহিত হবেন, যাতে তার মাথার মগয গলে টগবগ করবে’।


খাদীজা (রাঃ)-এর মৃত্যু (রামাযান ১০ম নববী বর্ষ)

স্নেহশীল চাচা আবু তালিবের মৃত্যুর মাত্র দুমাস বা তিন মাস পরে দশম নববী বর্ষের রামাযান মাসে প্রাণাধিক প্রিয়া স্ত্রী খাদীজাতুল কুবরা ‘তাহেরা’-র মৃত্যু হয়। এ সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর এবং রাসূলের বয়স ছিল ৫০ বছর। তাঁদের দাম্পত্য জীবন স্থায়ী হয়েছিল ২৫ বছর। দীর্ঘ তিন বছর যাবৎ বয়কটকালীন নিদারুণ কষ্ট অবসানের মাত্র ৬ মাসের মাথায় চাচা ও ৮ মাসের মাথায় স্ত্রীকে হারিয়ে শত্রু পরিবেষ্টিত ও আশ্রয়হারা নবীর অবস্থা কেমন হয়েছিল, তা চিন্তাশীল মাত্রই বুঝতে পারেন। চাচা আবু তালেব ছিলেন সামাজিক জীবনে রাসূলের জন্য ঢাল স্বরূপ। অন্যদিকে পারিবারিক ও অর্থনৈতিক জীবনে খাদীজা ছিলেন রাসূলের বিশ্বস্ততম নির্ভরকেন্দ্র। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘বিশ্বে পূর্ণতাপ্রাপ্ত মহিলা হলেন চারজন। ফেরাঊনের স্ত্রী আসিয়া, ইমরানের কন্যা মারিয়াম, খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ ও তার কন্যা ফাতিমাতুয যাহরা (রাঃ)। তিনি ছিলেন সেই মহীয়সী মহিলা যাকে আল্লাহ পাক জিব্রীল মারফত সালাম পাঠান এবং জান্নাতে তার জন্য বিশেষভাবে নির্মিত মতিমহলের সুসংবাদ দেন। তিনিই একমাত্র স্ত্রী যার জীবদ্দশায় রাসূল (ছাঃ) অন্য কোন স্ত্রী গ্রহণ করেননি এবং তার মৃত্যুর পরেও আজীবন রাসূল (ছাঃ) তাকে বারবার স্মরণ করেছেন। অন্য স্ত্রীদের সামনে অকুণ্ঠচিত্তে তার প্রশংসা করেছেন। এমনকি তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে খাদীজার বান্ধবীদের কাছেও উপঢৌকন পাঠাতেন। অল্প সময়ের ব্যবধানে চাচা ও খাদীজার মৃত্যু হওয়ার কারণে আল্লাহর রাসূল এই বছরকে عام الحزن বা দুঃখের বছর বলে অভিহিত করেন।

সওদার সাথে বিবাহ :

খাদীজা (রাঃ)-এর মৃত্যুর পর বিপর্যস্ত সংসারের হাল ধরার জন্য এবং মাতৃহারা কন্যাদের দেখাশুনার জন্য রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সাওদাহ বিনতে যাম‘আহ নাম্নী জনৈকা বিধবা মহিলাকে বিবাহ করেন ১০ম নববী বর্ষের শাওয়াল মাসে।

ত্বায়েফ গমন (শাওয়াল ১০ম নববী বর্ষ) :

খাদীজার মৃত্যুর পরবর্তী মাসে অর্থাৎ দশম নববী বর্ষের শাওয়াল মাস মোতাবেক ৬১৯ খৃষ্টাব্দের গ্রীষ্মকালে মে মাসের শেষে অথবা জুন মাসের প্রথমে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) স্বীয় মুক্তদাস যায়েদ বিন হারেছাহকে সাথে নিয়ে প্রধানতঃ নতুন সাহায্যকারীর সন্ধানে পদব্রজে ত্বায়েফ রওয়ানা হন। যা ছিল মক্কা হ’তে প্রায় ষাট মাইল দূরে। অতঃপর ত্বায়েফ পৌঁছে তিনি সেখানকার বনু ছাক্বীফ গোত্রের তিন নেতা তিন সহোদর ভাই ইবনু আব্দে ইয়ালীল, মাসঊদ ও হাবীব-এর সাথে সাক্ষাত করেন এবং তাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দেন। সাথে সাথে ইসলামকে সাহায্য করার জন্য তিনি তাদের প্রতি আহবান জানান। উক্ত তিনভাইয়ের একজনের কাছে কুরায়েশ গোত্র বনু জুমাহ (بنو جمح) -এর একজন মহিলা বিবাহিতা ছিলেন (ইবনু হিশাম)। সেই আত্মীয়তার সূত্র ধরেই রাসূল (ছাঃ) সেখানে গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনজনই তাঁকে নিরাশ করল।
একজন বলল, সে কা‘বার গোলাফ ছিঁড়ে ফেলবে, যদি আল্লাহ তোমাকে রাসূল করে পাঠিয়ে থাকেন’।
অন্যজন বলল, ‘আল্লাহ কি তোমাকে ব্যতীত অন্য কাউকে পাননি’? ‘যার একটা সওয়ারী পর্যন্ত নেই! যদি কাউকে রাসূল বানানোর দরকার হত, তাহলে তো আল্লাহ কোন শাসক বা নেতাকে রাসূল করে পাঠাতে পারতেন’।
তৃতীয় জন বলল,‘আমি তোমার সাথে কোন কথাই বলব না। কেননা যদি তুমি সত্যিকারের নবী হও, তবে তোমার কথা প্রত্যাখ্যান করা আমার জন্য হবে সবচেয়ে বিপজ্জনক। আর যদি তুমি আল্লাহর নামে মিথ্যা প্রচারে লিপ্ত হয়ে থাক, তবে তোমার সাথে কথা বলা সমীচীন নয়।

নেতাদের কাছ থেকে নিরাশ হয়ে এবার তিনি অন্যদের কাছে দাওয়াত দিতে থাকেন। কিন্তু সবার একই কথা ‘তুমি আমাদের শহর থেকে বেরিয়ে যাও’। অবশেষে দশদিন পর তিনি সেখান থেকে প্রত্যাবর্তনের জন্য পা বাড়ান। এমন সময় নেতাদের উস্কানীতে একদল ছোকরা এসে তাঁকে ঘিরে ধরে অশ্রাব্য ভাষায় গালি-গালাজ ও হৈ চৈ শুরু করে দিল। এক পর্যায়ে তাঁকে লক্ষ্য করে পাথর ছুঁড়তে আরম্ভ করল। যাতে তাঁর পায়ের গোড়ালী ফেটে রক্তে জুতা ভরে গেল’। এ সময় যায়েদ বিন হারেছাহ ঢালের মত থেকে রাসূলকে প্রস্তরবৃষ্টি থেকে রক্ষার চেষ্টা করেন। এইভাবে রক্তাক্ত দেহে তিন মাইল হেঁটে তায়েফ শহরের বাইরে এক আঙ্গুর বাগিচায় ক্লান্ত-শ্রান্ত অবস্থায় তিনি আশ্রয় নেন। তখন ছোকরার দল ফিরে যায়।


মযলূমের দোআ :

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বাগানে প্রবেশ করে আঙ্গুর গাছের ছায়ায় একটি দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে পড়লেন। এই সময় ক্লান্ত-শ্রান্ত দেহ নিয়ে ব্যাকুল মনে আল্লাহর নিকটে যে দোআ তিনি করেছিলেন, তা (মযলূমের দোআ হিসাবে) ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। দো‘আটি ছিল নিম্নরূপ :

‘হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকটে আমার শক্তির দুর্বলতা, কৌশলের স্বল্পতা ও মানুষের নিকটে অপদস্থ হওয়ার অভিযোগ পেশ করছি- হে দয়ালুগণের সেরা! হে দুর্বলদের প্রতিপালক! তুমিই আমার একমাত্র পালনকর্তা। কাদের কাছে তুমি আমাকে সোপর্দ করেছ? তুমি কি আমাকে এমন দূর অনাত্মীয়ের কাছে পাঠিয়েছ যে আমাকে কষ্ট দেয়? অথবা এমন শত্রুর কাছে যাকে তুমি আমার কাজের মালিক-মুখতার বানিয়ে দিয়েছ? যদি আমার উপরে তোমার কোন ক্রোধ না থাকে, তাহলে আমি কোন কিছুরই পরোয়া করি না। কিন্তু তোমার ক্ষমা আমার জন্য অনেক প্রশস্ত। আমি তোমার চেহারার জ্যোতির আশ্রয় প্রার্থনা করছি, যার জন্য সব অন্ধকার আলোকিত হয়ে যায় এবং দুনিয়া ও আখেরাতের কর্মসমূহ সুষ্ঠু হয়ে যায়- এই বিষয় হতে যে, আমার উপরে তোমার গযব নাযিল হৌক অথবা তোমার ক্রোধ আপতিত হৌক। কেবল তোমারই সন্তুষ্টি কামনা করব, যতক্ষণ না তুমি খুশী হও। নেই কোন শক্তি নেই কোন ক্ষমতা তুমি ব্যতীত।

আঙ্গুর বাগানের মালিক দু’ভাই ওৎবা ও শায়বা যখন দূর থেকে রাসূলের এ দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা দেখল, তখন তারা দয়াপরবশ হয়ে তাদের খৃষ্টান গোলাম ‘আদ্দাস’-এর মাধ্যমে এক গোছা আঙ্গুর পাঠিয়ে দিল। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ‘বিসমিল্লাহ’ বলে তা হাতে নিয়ে খেতে আরম্ভ করলেন। বিস্মিত হয়ে আদাস বলে উঠল, এ ধরনের কথা তো এ অঞ্চলের লোকদের মুখে কখনো শুনিনি’? রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, তুমি কোন দেশের লোক? তোমার ধর্ম কি? সে বলল, আমি একজন খৃষ্টান। আমি ‘নীনাওয়া’-এর বাসিন্দা। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, নেককার ব্যক্তি ইউনুস বিন মাত্তা -এর জনপদের লোক? লোকটি আশ্চর্য হয়ে বলল, আপনি ইউনুস বিন মাত্তা-কে কিভাবে চিনলেন? রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, ‘তিনি আমার ভাই। তিনি নবী ছিলেন এবং আমিও নবী।

ত্বায়েফ হ’তে মক্কার পথে :

কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ব্যথিত ও ভারাক্রান্ত মনে সেখান থেকে উঠে মক্কাভিমুখে রওয়ানা হলেন। পথিমধ্যে ‘ক্বারনুল মানাযিল’ নামক স্থানে পৌঁছলে জিব্রীল (আঃ) ‘মালাকুল জিবাল’ বা পাহাড় সমূহের নিয়ন্ত্রক ফেরেশতাকে সাথে নিয়ে অবতীর্ণ হলেন। জিব্রীল তাঁকে বললেন, ‘আপনার সম্প্রদায় আপনাকে কি কথা বলেছে এবং আপনার প্রতি কিরূপ আচরণ করেছে, সবই আল্লাহ দেখেছেন ও শুনেছেন। এক্ষণে তিনি আপনার নিকটে পাহাড় সমূহের নিয়ন্ত্রক ফেরেশতাকে পাঠিয়েছেন তাকে আপনি তাদের বিষয়ে যা ইচ্ছা হুকুম করুন’। অতঃপর ‘মালাকুল জিবাল’ এসে রাসূলকে সালাম দিয়ে বলল, ‘যদি আপনি চান যে, আমি দুই পাহাড়কে একত্রিত করে এদেরকে পিষে মারি, তাহলে আমি তাই-ই করব’। ফেরেশতার জবাবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, ‘না। বরং আমি আশা করি যে, আল্লাহ তাদের পৃষ্ঠদেশ হতে এমন বংশধর সৃষ্টি করবেন, যারা কেবলমাত্র মহান আল্লাহরই ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না’।

এই ঘটনায় আল্লাহর নবী (ছাঃ) হৃদয়ে প্রশান্তি অনুভব করলেন এবং সব দুঃখ-কষ্ট ভুলে গিয়ে পুনরায় পথ চলতে শুরু করলেন। অতঃপর ‘নাখ্লা’ উপত্যকায় পৌঁছে সেখানকার জনপদে কয়েকদিন অবস্থান করলেন। এখানেই জিনদের ইসলাম গ্রহণের ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে। যা সূরা আহক্বাফ ২৯, ৩০ ও ৩১ আয়াতে এবং সূরা জিন ১-১৫ আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। এতে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) মনের মধ্যে আরও শক্তি অনুভব করেন। তিনি নিশ্চিত হ’লেন যে, কোন শক্তিই তার দাওয়াতকে বন্ধ করতে পারবে না। কেননা আহক্বাফ ৩২ আয়াত নাযিল করে এ সময়েই আল্লাহ তাকে নিশ্চিত করেছিলেন যে,

وَمَن لاَّ يُجِبْ دَاعِيَ اللهِ فَلَيْسَ بِمُع ْجِزٍ فِي الْأَرْضِ وَلَيْسَ لَهُ مِنْ دُوْنِهِ أَوْلِيَاءَ أُوْلَئِكَ فِيْ ضَلاَلٍ مُّبِيْنٍ-
‘যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে আহবানকারীর ডাকে সাড়া না দেয়, সে ব্যক্তি এ পৃথিবীতে আল্লাহকে পরাজিত করতে পারবে না এবং আল্লাহ ব্যতীত সে কাউকে সাহায্যকারীও পাবে না। বস্ত্ততঃ এলোকগুলিই হল স্পষ্ট ভ্রষ্টতার মধ্যে নিপতিত’ (আহক্বাফ ৪৬/৩২)। উপরোক্ত ঘটনায় প্রমাণিত হয় যে, শেষনবী (ছাঃ) জিন ও ইনসানের নবী ছিলেন। বরং তিনি সকল সৃষ্ট জীবের নবী ছিলেন। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, و أرسلتُ إلى الخلق كافة و خُتِمَ بِىَ الن بيُّون- ‘আমি সকল সৃষ্ট জীবের প্রতি প্রেরিত হয়েছি এবং আমাকে দিয়ে নবীদের সিলসিলা সমাপ্ত করা হয়েছে’।

মক্কায় প্রত্যাবর্তন :

অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নাখলা উপত্যকা হতে মক্কাভিমুখে রওয়ানা করে হেরা গুহার পাদদেশে পৌঁছে মক্কায় প্রবেশের জন্য সম্ভাব্য কিছু হিতাকাংখীর নিকটে খবর পাঠালেন। কিন্তু কেউ ঝুঁকি নিতে চায়নি। অবশেষে মুত্ব‘ইম বিন ‘আদী রাযী হন এবং তার সম্মতিক্রমে যায়েদ বিন হারেছাহকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মক্কায় এসে মসজিদুল হারামে প্রবেশ করেন ও হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করেন। অতঃপর দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করেন। এ সময় মুত্ব‘ইম ও তার পুত্র সশস্ত্র অবস্থায় তাঁকে পাহারা দেয় এবং পরে তাঁকে বাড়ীতে পৌঁছে দেয়। আবু জাহল মুত্ব‘ইমকে প্রশ্ন করল ‘তুমি কি তাকে আশ্রয় দিয়েছ না, অনুসারী মুসলিম হয়ে গেছ’? মুত্ব‘ইম জবাবে বলেন, ‘আশ্রয় দিয়েছি মাত্র’। তখন আবু জাহল বলে উঠল, আমরাও তাকে আশ্রয় দিলাম, যাকে তুমি আশ্রয় দিয়েছ’।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মুত্ব‘ইম বিন আদীর এই সৌজন্যের কথা কখনো ভুলেননি। এই ঘটনার প্রায় পাঁচ বছর পরে সংঘটিত বদরের যুদ্ধে বন্দী কাফেরদের মুক্তির ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘যদি মুত্ব‘ইম বিন আদী বেঁচে থাকত এবং এইসব দুর্গন্ধময় মানুষগুলোর জন্য সুফারিশ করত, তাহলে তার খাতিরে আমি এদের সবাইকে ছেড়ে দিতাম’।

হামযা ও ওমর (রাঃ) -এর ইসলাম গ্রহণ


হামযার ইসলাম গ্রহণ (৬ষ্ঠ নববী বর্ষের শেষ দিকে) :

৬ষ্ঠ নববী বর্ষের শেষ দিকে যিলহাজ্জ মাসের কোন এক দিনে ছাফা পাহাড়ের পাশ দিয়ে যাবার সময় আবু জাহল রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে প্রথমে অশ্লীল ভাষায় গালি-গালাজ করল। তাতে তাঁর কোন ভাবান্তর দেখতে না পেয়ে আবু জাহল একটা পাথর ছুঁড়ে রাসূলের মাথায় আঘাত করল। তাতে তাঁর মাথা ফেটে রক্ত ধারা প্রবাহিত হতে থাকল। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নীরবে সবকিছু সহ্য করলেন। আবু জাহল অতঃপর কা‘বা গৃহের নিকটে গিয়ে তার দলবলের সাথে বসে উক্ত কাজের জন্য গৌরব যাহির করতে থাকল।
আব্দুল্লাহ বিন জুদ‘আনের জনৈক দাসী ছাফা পাহাড়ের উপরে তার বাসা থেকে এ দৃশ্য অবলোকন করে। ঐ সময় হামযা বিন আব্দুল মুত্ত্বালিব মৃগয়া থেকে তীর-ধনুকে সুসজ্জিত অবস্থায় ঘরে ফিরছিলেন। তখন উক্ত দাসীর নিকটে সব ঘটনা শুনে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে ছুটলেন আবু জাহলের খোঁজে। তিনি ছিলেন কুরায়েশগণের মধ্যে মহাবীর ও শক্তিশালী যুবক। তিনি গিয়ে আবু জাহলকে মাসজিদুল হারামে পেলেন এবং তীব্র ভাষায় তাকে গালি দিয়ে বললেন,
‘হে গুহ্যদ্বার দিয়ে বায়ু নিঃসরণকারী (অর্থাৎ হে কাপুরুষ)! তুমি আমার ভাতিজাকে গালি দিয়েছ, অথচ আমি তার দ্বীনের উপরে আছি’? বলেই তার মাথায় ধনুক দিয়ে এমন জোরে আঘাত করলেন যে, সে দারুণভাবে যখম হয়ে রক্তাক্ত হয়ে গেল। তখন আবু জাহলের বনু মাখযূম গোত্র এবং হামযার বনু হাশেম গোত্র পরস্পরের বিরুদ্ধে চড়াও হল। এমতাবস্থায় আবু জাহল নিজের দোষ স্বীকার করে নিজ গোত্রকে নিরস্ত করল। ফলে আসন্ন খুনোখুনি হতে উভয় পক্ষ বেঁচে গেল। বলা বাহুল্য, হামযার এই ইসলাম কবুলের ঘোষণাটি ছিল আকস্মিক এবং ভাতিজার প্রতি ভালোবাসার টানে। পরে আল্লাহ তার অন্তরকে ইসলামের জন্য প্রশস্ত করে দেন এবং তিনি নির্যাতিত মুসলমানদের জন্য শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য স্তম্ভরূপে আবির্ভূত হন।

ওমরের ইসলাম গ্রহণ :

হামযার ইসলাম গ্রহণের মাত্র তিন দিন পরেই আল্লাহর অপার অনুগ্রহে আরেকজন কুরায়েশ বীর ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব আকস্মিকভাবে মুসলমান হয়ে যান। অবশ্য এটি ছিল রাসূলের বিশেষ দোআর ফসল। কেননা তিনি খাছভাবে দো‘আ করেছিলেন যে, ‘হে আল্লাহ! ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব অথবা আমর ইবনু হেশাম (আবু জাহল) এই দুজনের মধ্যে তোমার নিকটে যিনি অধিকতর প্রিয় তার মাধ্যমে তুমি ইসলামকে শক্তিশালী কর। পরের দিন সকালে তিনি এসে ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং কা‘বা গৃহে গিয়ে প্রকাশ্যে ছালাত আদায় করলেন। অতঃপর ওমরের ইসলাম গ্রহণের ফলে প্রমাণিত হল যে, তিনিই ছিলেন আল্লাহর নিকটে অধিকতর প্রিয়। ওমর ছিলেন অত্যন্ত কঠোর প্রকৃতির মানুষ এবং পিতৃধর্মের প্রতি অন্ধ আবেগ পোষণকারী। একই কারণে তিনি ছিলেন ইসলামের একজন বিপজ্জনক শত্রু। সে কারণেই একদিন তিনি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে হত্যা করার উদ্দেশ্যে তরবারি নিয়ে রওয়ানা হলেন। পথিমধ্যে নু‘আইম বিন আব্দুল্লাহ্র সঙ্গে দেখা হল, যিনি তার ইসলাম গোপন রেখেছিলেন। তিনি বলেন, কোথায় চলেছ ওমর? তিনি বললেন, ‘আমি এই বিধর্মী মুহাম্মাদের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছি। এ ব্যক্তি কুরায়েশদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি করেছে, তাদের জ্ঞানীদের বোকা বলেছে, তাদের ধর্মে দোষারোপ করেছে, তাদের উপাস্যদের গালি দিয়েছে। অতএব আমি তাকে হত্যা করব’। নু‘আইম বললেন, তাকে হত্যা করে বনু হাশেম ও বনু যোহরা থেকে কিভাবে রক্ষা পাবে? ওমর বললেন, তুমিও দেখছি পূর্ব পুরুষের ধর্ম পরিত্যাগ করে বেদ্বীন হয়ে গেছ’? নু‘আইম বললেন, আমি কি তোমাকে একটি আশ্চর্যজনক খবর দেব না? ওমর বললেন, কি খবর? নু‘আইম বলল, ‘তোমার বোন ও ভগ্নিপতি বেদ্বীন হয়ে গেছে এবং তারা তোমার ধর্ম পরিত্যাগ করেছে’। এতে ওমরের আত্মসম্মানে ঘা লাগলো এবং ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে বোনের বাড়ীর দিকে ছুটলেন। হযরত খাববাব ইবনুল আরত ঐসময় ঘরের মধ্যে গোপনে স্বামী-স্ত্রীকে কুরআনের সূরা ত্বোয়াহা-এর তা‘লীম দিচ্ছিলেন। ওমরের পদশব্দে হতচকিত হয়ে তিনি ঘরের এক কোণে লুকিয়ে যান। ওমর ঘরে ঢুকে বললেন, শুনলাম তোমরা দু’জনে বেদ্বীন হয়ে গেছ? ভগ্নিপতি সাঈদ বললেন, ‘হে ওমর! যদি আপনার ধর্ম ছাড়া অন্য ধর্মে সত্য নিহিত থাকে, তবে সেবিষয়ে আপনার রায় কি’? একথা শুনে ওমর তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে ভগ্নিপতির উপরে ঝাঁপিয়ে পড়লেন ও তাকে নির্মমভাবে প্রহার করতে থাকলেন। তখন বোন (ফাতেমা) তাকে স্বামী থেকে পৃথক করে দিলেন। এতে ওমর ক্ষিপ্ত হয়ে বোনের গালে জোরে চপেটাঘাত করলেন। তাতে বোনের মুখমন্ডল রক্তাক্ত হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে বোন তেজস্বী কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘হে ওমর! তোমার ধর্ম ছাড়া যদি অন্য ধর্মে সত্য থাকে? বলেই তিনি সোচ্চার কণ্ঠে কলেমায়ে শাহাদাত উচ্চারণ করলেন (আর-রাহীক্ব) এবং বললেন, ‘আমরা ইসলাম কবুল করেছি এবং আল্লাহ ও তার রাসূলের উপর ঈমান এনেছি। এক্ষণে তোমার যা খুশী কর’ (ইবনু হিশাম)। বোনের রক্তাক্ত চেহারা দেখে এবং তার মুখে এ দৃপ্ত সাক্ষ্য শুনে ওমরের মধ্যে ভাবান্তর দেখা দিল। তিনি লজ্জিত হলেন ও দয়ার্দ্র কণ্ঠে বললেন, তোমাদের কাছে যে পুস্তিকাটা আছে, ওটা আমাকে একটু পড়তে দাও’। বোন সরোষে বললেন, তুমি অপবিত্র। ঐ কিতাব পবিত্র ব্যক্তি ভিন্ন স্পর্শ করতে পারে না। ওঠ, গোসল করে এসো। ওমর তাই করলেন। অতঃপর কুরআনের উক্ত খন্ডটি হাতে নিয়ে সূরা ত্বোয়াহা পড়তে শুরু করলেন। যখন ১৪তম আয়াত পাঠ করলেন

إِنَّنِي أَنَا اللهُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ أَنَا فَاعْبُدْنِي وَأَقِمِ الصَّلاَةَ لِذِكْرِي-
‘নিশ্চয়ই আমিই আল্লাহ, আমি ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই। অতএব তুমি আমারই ইবাদত কর এবং আমার স্মরণে ছালাত কায়েম কর’ (ত্বোয়াহা ২০/১৪)।

এ আয়াত পাঠ করেই ওমর বলে উঠলেন, ‘কতই না সুন্দর ও কতই না মর্যাদাপূর্ণ এ বাণী? তোমরা আমাকে মুহাম্মাদ কোথায় বাৎলে দাও! ওমরের একথা শুনে খাববাব গোপন স্থান থেকে ত্বরিৎ বেরিয়ে এসে বললেন, ‘সুসংবাদ গ্রহণ কর হে ওমর! আমি আশা করি গত বৃহস্পতিবার রাতে আল্লাহর রাসূল যে দো‘আ করেছিলেন তা তোমার শানে কবুল হয়েছে’। চল আল্লাহর রাসূল ছাফা পাহাড়ের পাদদেশের বাড়ীতে অবস্থান করছেন। যথাসময়ে কোষবদ্ধ তরবারি সহ ওমর সেখানে উপস্থিত হলেন। তাঁকে তরবারিসহ দেখে হামযা (রাঃ)-এর নেতৃত্বে সবাই তাকে মোকাবিলার জন্য প্রস্ত্তত হয়ে গেলেন। হামযা সবাইকে আশ্বস্ত করে বললেন, তাকে স্বাচ্ছন্দে আসতে দাও। যদি সে সদিচ্ছা নিয়ে এসে থাকে তবে ভাল। নইলে তরবারি দিয়েই তার ফায়ছালা করা হবে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে ওমরের জামার কলার ও তরবারির খাপ ধরে জোরে টান দিয়ে বললেন, অলীদ বিন মুগীরাহ্র মত অপদস্থ ও শাস্তিপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত কি তুমি বিরত হবে না’? অতঃপর আল্লাহর নিকটে প্রার্থনা করে বললেন, ‘হে আল্লাহ! এই যে ওমর! হে আল্লাহ তুমি ওমর ইবনুল খাত্ত্বাবের মাধ্যমে ইসলামের শক্তি বৃদ্ধি কর’। এই দো‘আর প্রভাব ওমরের উপরে এমনভাবে পড়ে যে, তিনি সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠেন, ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই এবং আপনি অবশ্যই আল্লাহর রাসূল’। সাথে সাথে তিনি ইসলাম কবুল করলেন এবং আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) ও গৃহবাসী ছাহাবীগণ এমন জোরে তাকবীর ধ্বনি করলেন যে, মসজিদুল হারাম পর্যন্ত সে আওয়ায পৌঁছে গেল’।

ওমরের ইসলাম পরবর্তী ঘটনা :

ইসলাম কবুলের পরপরই তিনি ইসলামের সবচেয়ে বড় দুশমন আবু জাহলের গৃহে গমন করলেন এবং তার মুখের উপরে বলে দিলেন যে, ‘আমি তোমার কাছে এসেছি এ খবর দেওয়ার জন্য যে, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল মুহাম্মাদের উপরে ঈমান এনেছি এবং তিনি যে শরী‘আত এনেছেন, আমি তা সত্য বলে জেনেছি’। একথা শুনেই আবু জাহল সরোষে তাকে গালি দিয়ে বলে উঠল ‘আল্লাহ তোমার মন্দ করুন এবং তুমি যে খবর নিয়ে এসেছ, তার মন্দ করুন’। অতঃপর তার মুখের উপরে দরজা বন্ধ করে ভিতরে চলে গেল। এরপর ওমর গেলেন সে সময়ের সেরা মাউথ মিডিয়া জামীল বিন মা‘মার আল-জামহীর কাছে এবং তাকে বললেন যে, আমি মুসলমান হয়ে গেছি’। সে ছিল কুরায়েশ বংশের সেরা ঘোষক এবং অত্যন্ত উচ্চ কণ্ঠের অধিকারী। গুরুত্বপূর্ণ কোন সংবাদ তার মাধ্যমেই সর্বত্র প্রচার করা হত। ওমর (রাঃ)-এর মুখ থেকে তাঁর ইসলাম গ্রহণের সংবাদ শোনামাত্র সে বেরিয়ে পড়ল। আর চিৎকার দিয়ে সবাইকে শুনাতে থাকল, ‘খাত্বাবের বেটা বিধর্মী হয়ে গেছে’। ওমর (রাঃ) তার পিছনেই ছিলেন। তিনি বললেন, ‘সে মিথ্যা বলছে। বরং আমি মুসলমান হয়েছি’। একথা শোনা মাত্র চারিদিক থেকে লোক জমা হয়ে গেল এবং সকলে ওমরের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে গণপিটুনী শুরু করল। এই মারপিট দুপুর পর্যন্ত চলল। এই সময় কাফিরদের উদ্দেশ্যে ওমর বলেন, যদি আমরা সংখ্যায় তিনশ’ পুরুষ হতাম, তবে দেখতাম এরপরে মক্কায় তোমরা থাকতে, না আমরা থাকতাম’।

এই ঘটনার পর নেতারা ওমরকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে তার বাড়ী আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিল। ওমর (রাঃ) ঘরের মধ্যেই ছিলেন। এমন সময় তাদের গোত্রের সঙ্গে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ বনু সাহম গোত্রের জনৈক নেতা আছ ইবনে ওয়ায়েল সাহ্মী সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। ওমর (রাঃ) তাকে বললেন যে, আমি মুসলমান হয়েছি বিধায় আপনার সম্প্রদায় আমাকে হত্যা করতে চায়’। তিনি বলে উঠলেন, ‘কখনোই তা হবার নয়’। বলেই তিনি সোজা চলে গেলেন জনতার ভিড়ের সামনে। জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা এখানে জটলা করছ কেন? তারা বলল, ‘ইবনুল খাত্ত্বাব বিধর্মী হয়ে গেছে’। তিনি বললেন, ‘যাও! সেখানে যাবার কোন প্রয়োজন নেই’। তার একথা শুনে লোকেরা ফিরে গেল। এরপর ওমর (রাঃ) রাসূলের খিদমতে হাযির হয়ে বললেন,
‘হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি হক-এর উপরে নই? তিনি বললেন, হাঁ। যার হাতে আমার জীবন, তার কসম করে বলছি, নিশ্চয়ই তোমরা সত্যের উপরে আছ যদি তোমরা মৃত্যুবরণ কর কিংবা জীবিত থাক’। তখন ওমর বললেন, তাহলে লুকিয়ে থাকার কি প্রয়োজন? যিনি আপনাকে সত্য সহকারে প্রেরণ করেছেন তার কসম করে বলছি, অবশ্যই আমরা প্রকাশ্যে বের হব’। অতঃপর রাসূলকে মাঝখানে রেখে দুই সারির মাথায় ওমর ও হামযার নেতৃত্বে মুসলমানগণ প্রকাশ্যে মিছিল সহকারে মসজিদুল হারামে উপস্থিত হলেন। বনু হাশিম ও বনু মুত্ত্বালিব গোত্রের প্রতি আবু ত্বালিবের আহবান :

হামযা ও ওমর (রাঃ)-এর পরপর মুসলমান হয়ে যাওয়ায় কুরায়েশরা দারুণভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল। ইতিপূর্বে তারা মুহাম্মাদকে হত্যা করে তার রক্তের বিনিময়ে জনৈক উমারাহ বিন ওয়ালীদ নামক এক যুবককে আবু তালিবের কাছে সমর্পণ করতে এসেছিল। ফলে হামযা ও ওমরের ইসলাম গ্রহণে মুসলমানদের মধ্যে আনন্দ ও সাহসের সঞ্চার হলেও দূরদর্শী ও স্নেহশীল চাচা আবু ত্বালিবের বুকটা ভয়ে সব সময় দুরু দুরু করত কখন কোন মুহূর্তে শয়তানেরা আকস্মিকভাবে মুহাম্মাদকে হামলা করে মেরে ফেলে। দূরদর্শী ও স্নেহশীল চাচা আবু ত্বালিব সবদিক ভেবে একদিন স্বীয় প্রপিতামহ আবদে মানাফের দুই পুত্র হাশেম ও মুত্ত্বালিবের বংশধরগণকে একত্রিত করলেন। অতঃপর তাদের সামনে বললেন যে, এতদিন আমি এককভাবে ভাতিজা মুহাম্মাদের তত্ত্বাবধান করেছি। কিন্তু এখন এই চরম বার্ধক্যে ও প্রচন্ড বৈরী পরিবেশে আমার পক্ষে এককভাবে আর মুহাম্মাদের নিরাপত্তা বিধান করা সম্ভবপর নয়। সেকারণ আমি আপনাদের সকলের সহযোগিতা চাই’। গোত্র নেতা আবু ত্বালিবের এই আহবানে ও গোত্রীয় রক্তধারার আকর্ষণে সবাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হল এবং মুহাম্মাদের হেফাযতের ব্যাপারে সবাই একযোগে তাকে সহযোগিতা করার আশ্বাস দিল। একমাত্র চাচা আবু লাহাব বিরোধিতা করল এবং সে মুহাম্মাদের বিপক্ষ দলের প্রতি সমর্থন দানের ঘোষণা দিল।

বিরোধী পক্ষের পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ :

এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ঘটে যাওয়া পরপর চারটি ঘটনায় মুশরিক নেতাদের মধ্যে যেমন আতংক সৃষ্টি হয়, তেমনি মুহাম্মাদ ও তার সাথীদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আঘাত হানার জন্য তারা মরিয়া হয়ে ওঠে। কারণগুলি ছিল যথাক্রমে-

(১) মুহাম্মাদকে প্রদত্ত লোভনীয় প্রস্তাব সমূহ নাকচ হওয়া। অতঃপর উভয় দলের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানাদির কিছু গ্রহণ ও কিছু বর্জনের আপোষ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়া
(২) হামযার ইসলাম গ্রহণ ও সরাসরি আবু জাহলের উপরে হামলা করা
(৩) ওমরের ইসলাম গ্রহণ ও সরাসরি আবু জাহলের বাড়ীতে গিয়ে তার মুখের উপর তার ইসলাম গ্রহণের সংবাদ দেওয়া। অতঃপর মুসলমানদের মিছিল করে সর্বপ্রথম মসজিদুল হারামে আগমন ও প্রকাশ্যে ধর্মীয় বিধি-বিধান সমূহ পালন শুরু করা এবং
(৪) সবশেষে আবু তালিবের আহবানে সাড়া দিয়ে বনু হাশেম ও বনু মুত্ত্বালিবের মুসলিম-কাফির সকলের পক্ষ হতে মুহাম্মাদকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দানের অঙ্গীকার ঘোষণা করা। এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে মুশরিক নেতৃবৃন্দ মুহাছছাব উপত্যকায় সমবেত হয় এবং বিস্তারিত আলোচনার পর বনু হাশেম ও বনু মুত্ত্বালিব গোত্রদ্বয়ের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক বয়কটের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

সর্বাত্মক বয়কট (৭ম নববী বর্ষের শুরুতে) :

সিদ্ধান্ত মোতাবেক সকলে এই মর্মে প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করে যে,
(১) বনু হাশেম ও বনু মুত্ত্বালিবের সাথে বিয়ে-শাদী বন্ধ থাকবে
(২) তাদের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও যাবতীয় লেন-দেন বন্ধ থাকবে
(৩) তাদের সাথে উঠাবসা, মেলা-মেশা, কথাবার্তা ও তাদের বাড়ীতে যাতায়াত বন্ধ থাকবে- যতদিন না তারা মুহাম্মাদকে হত্যার জন্য তাদের হাতে তুলে দিবে। সপ্তম নববী বর্ষের ১লা মুহাররমের রাতে সম্পাদিত উক্ত অঙ্গীকারপত্রটি কা‘বা গৃহের ভিতরে টাঙিয়ে রাখা হল। উক্ত অঙ্গীকারনামার লেখক বুগায়েয (بغيض) বিন আমের বিন হাশেম-এর প্রতি আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) বদ দো‘আ করেন। ফলে তার হাতটি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যায়।

শে‘আবে আবু ত্বালিবে তিন বছর :

উপরোক্ত অন্যায় চুক্তি সম্পাদনের ফলে বনু হাশেম ও বনু মুত্ত্বালিব উভয় গোত্রের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা নিদারুণ কষ্টের সম্মুখীন হল। সঞ্চিত খাদ্যশস্য ফুরিয়ে গেলে তাদের অবস্থা চরমে ওঠে। ফলে তারা গাছের ছাল-পাতা খেয়ে জীবন ধারণে বাধ্য হন। নারী ও শিশুরা ক্ষুধায়-তৃষ্ণায় উচ্চৈঃস্বরে ক্রন্দন করত। তাদের ক্রন্দন ধ্বনি গিরি-সংকটের বাইরের লোকেরা শুনতে পেত। ফলে কেউ কেউ অতি সংগোপনে তাদের কাছে খাদ্য পৌঁছাতো। একবার হাকীম বিন হেযাম স্বীয় ফুফু খাদীজা (রাঃ)-এর নিকটে গম পৌঁছাতে গিয়ে আবু জাহলের হাতে ধরা পড়ে যান। কিন্তু আবুল বুখতারীর হস্তক্ষেপে অবশেষে সমর্থ হন। হারামের চার মাস ব্যতীত অবরুদ্ধ গোত্রদ্বয়ের লোকেরা বের হতে পারতেন না। অবশ্য যেসব কাফেলা বাহির থেকে মক্কায় আসত, তাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় খাদ্য-শস্য ক্রয়ে বাধা ছিল না। কিন্তু সেক্ষেত্রেও মক্কার ব্যবসায়ীরা জিনিষপত্রের এমন চড়ামূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছিল যে, তা ক্রয় করা প্রায় অসম্ভব ছিল। অন্যদিকে আবু তালিবের দুশ্চিন্তা ছিল রাসূলের জীবন নিয়ে। রাতের বেলা সকলে শুয়ে যাওয়ার পর তিনি রাসূলকে উঠিয়ে এনে তার বিশ্বস্ত নিকটাত্মীয়দের সাথে বিছানা বদল করাতেন। যাতে কেউ তাকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ না পায়। উক্ত কঠোর অবরোধ চলাকালীন সময়েও হজ্জের মওসুমে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বহির্দেশ থেকে আগত কাফেলা সমূহের তাঁবুতে গিয়ে তাওহীদের দাওয়াত দিতেন। ওদিকে আবু লাহাব তাঁর পিছে পিছে গিয়ে লোকদেরকে তাঁর কথা না শোনার জন্য বলত।

অঙ্গীকারনামা ছিন্ন ও বয়কটের সমাপ্তি :

প্রায় তিন বছর পূর্ণ হতে চলল। ইতিমধ্যে মুশরিকদের মধ্যে অসন্তোষ ও দ্বিধাবিভক্তি প্রকাশ্য রূপ নিল। যারা এই অন্যায় চুক্তিনামার বিরোধী ছিল, তারা ক্রমেই সংগঠিত হ’তে থাকল। বনু আমের বিন লুওয়াই গোত্রের হেশাম বিন আমরের উদ্যোগে যোহায়ের বিন আবী উমাইয়া ও মুত্ব‘ইম বিন ‘আদীসহ পাঁচজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ‘হাজূন’ নামক স্থানে বসে এ ব্যাপারে একমত হন এবং তাঁদের পক্ষে যোহায়ের কা‘বা গৃহ তাওয়াফ শেষে প্রথম সরাসরি আবু জাহলের মুখের উপরে উক্ত চুক্তিনামা ছিঁড়ে ফেলার হুমকি দেন। সাথে সাথে বাকী চারজন পরপর তাকে সমর্থন দেন। আবু জাহল বলল, বুঝেছি। তোমরা রাতের বেলা অন্যত্র পরামর্শ করেই এসেছ’।
ঐ সময়ে আবু ত্বালিব কা‘বা চত্বরে হাযির হলেন। তিনি কুরায়েশ নেতাদের উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘আল্লাহ তাঁর রাসূলকে তোমাদের চুক্তিনামা সম্পর্কে অবহিত করেছেন যে, ‘আল্লাহ ঐ অঙ্গীকারপত্রের উপরে কিছু কীট প্রেরণ করেছেন’। ‘অতঃপর তারা এর মধ্যকার যাবতীয় অন্যায়, বয়কট ও অত্যাচারমূলক কথাগুলো খেয়ে ফেলেছে, কেবল আল্লাহর নামগুলি ব্যতীত’। অতঃপর আবু তবালেব নেতৃবৃন্দকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘যদি তাঁর কথা মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তাহলে তোমাদের ও তার মধ্য থেকে আমরা সরে দাঁড়াব। আর যদি তার কথা সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে তোমরা আমাদের প্রতি বয়কট ও যুলুম থেকে ফিরে যাবে’। আবু ত্বালিবের এ সুন্দর প্রস্তাবে সকলে সমস্বরে বলে উঠল ‘আপনি ইনছাফের কথাই বলেছেন’।
ওদিকে আবু জাহল ও মুত্ব‘ইম এবং অন্যান্যদের মধ্যে বাকযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে মুত্ব‘ইম বিন আদী কা‘বা গৃহে প্রবেশ করে অঙ্গীকারনামাটি ছিঁড়ে ফেলার উদ্দেশ্যে বাইরে নিয়ে এলেন। দেখা গেল যে, সত্য সত্যই তার সব লেখাই পোকায় খেয়ে ফেলেছে কেবলমাত্র ‘বিসমিকা আল্লাহুম্মা’ (‘আল্লাহ তোমার নামে শুরু করছি’) বাক্যটি এবং অন্যান্য স্থানের আল্লাহর নামগুলি ব্যতীত। এভাবে আবু ত্বালিবের মাধ্যমে প্রেরিত রাসূলের প্রাপ্ত অহীর সংবাদ সত্যে পরিণত হল। কুরায়েশ নেতারা অবাক বিস্ময়ে তা অবলোকন করল। অতঃপর অঙ্গীকার নামাটি মুত্ব‘ইম সর্বসমক্ষে ছিঁড়ে ফেললেন এবং এভাবে যথারীতি বয়কটের অবসান ঘটল ঠিক তিন বছরের মাথায় ১০ম নববী বর্ষের মুহাররম মাসে।

হাবশায় হিজরত


হাবশায় প্রথম হিজরত (রজব ৫ম বর্ষ)

চতুর্থ নববী বর্ষের মাঝামাঝি থেকে মুসলমানদের উপরে যে নির্যাতন শুরু হয় ৫ম নববী বর্ষের মাঝামাঝি নাগাদ তা চরম আকার ধারণ করে। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এই মযলূম মুসলমানদের রক্ষার জন্য উপায় খুঁজতে লাগলেন। তিনি অনেক আগে থেকেই পার্শ্ববর্তী হাবশার ন্যায়নিষ্ঠ খৃষ্টান রাজা আছহামা নাজ্জাশী (أصحمة النجاشى) -র প্রশংসা শুনে আসছিলেন যে, তার রাজ্যে মানুষ সুখে-শান্তিতে বসবাস করে। সেমতে নবুঅতের পঞ্চম বর্ষের রজব মাসে হযরত ওছমান (রাঃ)-এর নেতৃত্বে ১২ জন পুরুষ ও ৪ জন মহিলার প্রথম দলটি রাতের অন্ধকারে অতি সঙ্গোপনে হাবশার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে যায়। এই দলে রাসূলের কন্যা ‘রুক্বাইয়া’ ছিলেন। রাসূল (ছাঃ) বলেন,
‘তারা দু’জন ছিল ইবরাহীম ও লূত্ব-এর পরে আল্লাহর রাস্তায় হিজরতকারী প্রথম দল’।

হাবশায় ২য় হিজরত (সম্ভবত : যুলক্বা‘দাহ ৫ম বর্ষ)

হাবশার বাদশাহ কর্তৃক সদ্ব্যবহারের খবর শুনে কুরায়েশ নেতারা মুসলমানদের উপরে যুলুমের মাত্রা বাড়িয়ে দিল এবং কেউ যাতে আর হাবশায় যেতে না পারে, সেদিকে কড়া নযর রাখতে লাগল। কারণ এর ফলে তাদের দুটি ক্ষতি ছিল।
এক- বিদেশের মাটিতে কুরায়েশ নেতাদের যুলুমের খবর পৌঁছে গেলে তাদের ভাবমূর্তি বিনষ্ট হবে।
দুই- সেখানে গিয়ে মুসলমানেরা সংঘবদ্ধ হয়ে শক্তি সঞ্চয় করার সুযোগ পাবে। যাই হোক তাদের অত্যাচারের মাত্রা বৃদ্ধি এবং কড়া নযরদারী সত্তেবও ৮২ বা ৮৩ জন পুরুষ এবং ১৮ বা ১৯ জন মহিলা দ্বিতীয়বারের মত হাবশায় হিজরত করতে সমর্থ হন।

আবু তালিবের নিকটে কুরায়েশ নেতাদের আগমন (৬ষ্ঠ নববী বর্ষের মাঝামাঝি)

(১) কুরায়েশ নেতাগণ সম্মিলিতভাবে আবু তালিবের কাছে এলেন। এই দলে ছিলেন আবু সুফিয়ান ছাখর ইবনু হারব, ওৎবা ও শায়বাহ বিন রাবী‘আহ, আবু জাহল আমর ইবনু হেশাম (যিনি ‘আবুল হাকাম’ উপনামে পরিচিত ছিলেন), অলীদ বিন মুগীরাহ, নুবাইহ ও মুনাবিবহ বিন হাজ্জাজ ও ‘আছ বিন ওয়ায়েল এবং আরও কয়েকজন। তারা এসে বললেন, ‘আপনার ভাতিজা আমাদের উপাস্যদের গালি দিয়েছে, আমাদের দ্বীনকে দোষারোপ করেছে, আমাদের জ্ঞানীদের বোকা ঠাউরেছে এবং আমাদের বাপ-দাদাদের পথভ্রষ্ট মনে করেছে।’ এক্ষণে হয় আপনি তাকে বিরত রাখুন। অথবা আমাদের ও তার মাঝ থেকে সরে দাঁড়ান। কেননা আপনিও আমাদের ন্যায় তার আদর্শের বিরোধী। সেকারণ আমরা আপনাকে তার ব্যাপারে যথেষ্ট মনে করি’। ধৈর্য্যের সঙ্গে তাদের কথা শুনে আবু তালেব তাদেরকে নম্র ভাষায় বুঝিয়ে বিদায় করলেন।

২য় বার আগমন (৬ষ্ঠ নববী বর্ষ)

(২) মুসলমানদের সংখ্যা ক্রমে বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং নির্যাতনের ভয়ে সকলে পার্শ্ববতী খৃষ্টান রাজ্য হাবশায় গিয়ে আশ্রয় নেওয়ায় নেতারা প্রমাদ গুনলেন। অতঃপর বিদেশে তাদের ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য এবং হিজরতকারীদের ফিরিয়ে আনার জন্য আমর ইবনুল আছ ও আবু জাহলের বৈপিত্রেয় সহোদর ভাই আবদুল্লাহ বিন রাবী‘আহকে নাজ্জাশীর দরবারে প্রেরণ করেন। কিন্তু তারা নিরাশ হয়ে ফিরে আসেন। নেতারা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে মুহাম্মাদের দাওয়াত ও প্রচারাভিযানকে একেবারেই বন্ধ করে দিতে পুনরায় আবু তালেবের কাছে এলেন এবং বললেন, আমাদের মধ্যে বয়সে, সম্মানে ও পদমর্যাদায় আপনি বিশেষ স্থানের অধিকারী। আমরা চেয়েছিলাম যে, আপনি আপনার ভাতিজাকে বিরত রাখবেন। কিন্তু আপনি তাকে বিরত রাখেননি। আল্লাহর কসম! আমরা আর এ ব্যক্তির ব্যাপারে ধৈর্য রাখতে পারছি না। এক্ষণে হয় আপনি তাকে বিরত রাখুন, নয়তো আমরা তাকে ও আপনাকে এ ব্যাপারে একই পর্যায়ে নামাবো। যতক্ষণ না আমাদের দুপক্ষের একটি পক্ষ ধ্বংস হয়’। গোত্র নেতাদের এই চূড়ান্ত হুমকি শুনে আবু তালেব দুশ্চিন্তায় পড়লেন। অতঃপর রাসূলকে ডেকে এনে বললেন

‘হে আমার ভাতিজা! তোমার বংশের নেতারা আমার কাছে এসেছেন এবং এই এই কথা বলছেন।… অতএব তুমি আমার উপরে এমন বোঝা চাপিয়ো না, যা বহন করার ক্ষমতা আমার নেই’। চাচার এই কথা শুনে তিনি তাকে ছেড়ে যাচ্ছেন ধারণা করে সাময়িকভাবে বিহবল নবী আল্লাহর উপরে গভীর আস্থা রেখে বলে উঠলেন,
‘হে চাচা! যদি আমার ডান হাতে সূর্য এবং বাম হাতে চন্দ্র এনে দেওয়া হয় তাওহীদের এই প্রচার বন্ধ করার বিনিময়ে, আমি তা কখনোই পরিত্যাগ করব না। যতক্ষণ না আল্লাহ এই দাওয়াতকে বিজয়ী করেন অথবা আমি তাতে ধ্বংস হয়ে যাই’।
বলেই তিনি অশ্রুপূর্ণ নয়নে চলে যেতে উদ্যত হলেন। পরম স্নেহের ভাতিজার এই অসহায় দৃশ্য দেখে বয়োবৃদ্ধ চাচা তাকে পিছন থেকে ডাকলেন। তিনি তার দিকে মুখ তুলে তাকাতেই চাচা বলে উঠলেন, ‘যাও ভাতিজা! তুমি যা খুশী প্রচার কর। আল্লাহর কসম! কোন কিছুর বিনিময়ে আমি তোমাকে ওদের হাতে তুলে দেব না’।
আবু তালিবের এই কথা শুনে নেতারা বিফল মনোরথ হয়ে চলে গেলেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) খুশীতে বুক বাঁধলেন।

লোভনীয় প্রস্তাব : শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে মুহাম্মাদের দাওয়াত ও প্রচারাভিযানকে একেবারেই বন্ধ করে দিতেকঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে তারা রাসূলকে লোভ দেখানোর ফাঁদে আটকানোর চিন্তা করেন। সে মোতাবেক তারা মক্কার ধনীশ্রেষ্ঠ ওৎবা বিন রাবী‘আহকে সরাসরি রাসূলের কাছে কয়েকটি প্রস্তাব দিয়ে পাঠান। একদিন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কা‘বা চত্বরে একাকী বসেছিলেন। তখন কুরায়েশ নেতাদের অনুমতি নিয়ে ওৎবা তাঁর কাছে গিয়ে বসলেন এবং বললেন, হে ভাতিজা! তোমার এই নতুন দ্বীন প্রচারের উদ্দেশ্য যদি সম্পদ উপার্জন হয়, তাহলে তুমি বললে আমরা তোমাকে আরবের সেরা ধনী বানিয়ে দেব। আর যদি তোমার উদ্দেশ্য নেতৃত্ব লাভ হয়, তাহলে আমরা সবাই মিলে তোমাকে আমাদের নেতা বানিয়ে দেব। আর যদি আরবের বাদশাহ হতে চাও, তাহলে আমরা তোমাকে বাদশাহ বানিয়ে দেব। এমনকি তুমি যদি সুন্দরী স্ত্রী কামনা কর, তবে আমরা তোমার জন্য আরবের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী স্ত্রীর ব্যবস্থা করে দেব। আর যদি মনে কর, তোমার মাথার চিকিৎসা প্রয়োজন, তাহলে আমরাই তোমার জন্য সারা আরবের সেরা চিকিৎসককে এনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করব। আমাদের একটাই মাত্র দাবী, তুমি তোমার ঐ নতুন দ্বীনের দাওয়াত পরিত্যাগ কর।

জবাবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, আমার সম্পর্কে আপনি যেসব কথা বললেন, এগুলির একটিও সত্য নয়। আমার মাল-ইযযত-হুকুমত, সুন্দরী স্ত্রী বা নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব কিছুই প্রয়োজন নেই। আমার মাথার চিকিৎসারও কোন প্রয়োজন নেই। আপনার প্রস্তাবসমূহের জওয়াবে আমি কেবল কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতগুলি পেশ করতে চাই। অতঃপর তাকে তিনি ৫৪ আয়াত বিশিষ্ট সূরা ফুছছিলাত/হা-মীম সাজদাহ পাঠ করে শুনাতে লাগলেন। কুরআন শুনতে শুনতে ওৎবা মন্ত্রমুগ্ধের মত হয়ে গেলেন। এক বর্ণনায় এসেছে, যখন তিনি ১৩তম আয়াত পাঠ করলেন, তখন ওৎবা ভয়ে রাসূলের মুখের উপরে হাত রেখে গযব নাযিলের ভয়ে বলে উঠলেন,
আল্লাহর দোহাই! তুমি তোমার সম্প্রদায়ের উপরে রহম কর’। অতঃপর ৩৮তম আয়াতের পর রাসূল সিজদা করলেন এবং উঠে বললেন, ‘আবুল ওয়ালীদ আপনি তো সবকিছু শুনলেন। এখন আপনার যা বিবেচনা হয় করুন’।
এরপর ওৎবা উঠে গেলেন। কুরায়েশ নেতারা সাগ্রহে ওৎবার কাছে জমা হলে তিনি বললেন, নেতারা শুনুন! আমি মুহাম্মাদের মুখ থেকে এমন বাণী শুনে এসেছি, যা কোন কাহিনী নয়, কবিতা নয় বা জাদুমন্ত্র নয়। সে এক অলৌকিক বাণী। আপনারা আমার কথা শুনুন! মুহাম্মাদকে বাধা দিবেন না। তাকে তার পথে ছেড়ে দিন’। লোকেরা হতবাক হয়ে বলে উঠলো ‘আল্লাহর কসম হে আবুল ওয়ালীদ! মুহাম্মাদ তার কথা দিয়ে তোমাকে জাদু করে ফেলেছে।’

পুনরায় আবু তালিব সমীপে নেতাগণ (৬ষ্ঠ নববী বর্ষে)

(৩) হুমকিতে ও লোভনীয় প্রস্তাবে কোন কাজ না হওয়ায় ক্ষুব্ধ নেতারা অল্প দিনের মধ্যে পুনরায় তার কাছে এক অভিনব প্রস্তাব নিয়ে গেলেন। তারা ওয়ালীদ বিন মুগীরাহ এর পুত্র ওমারাহ-কে সাথে নিয়ে গেলেন এবং আবু তালিবকে বললেন, হে আবু তালিব! এই ছেলেটি হল কুরায়েশদের সবচেয়ে সুন্দর ও ধীমান যুবক। আপনি একে পুত্ররূপে গ্রহণ করুন এবং মুহাম্মাদকে আমাদের হাতে সোপর্দ করুন। কেননা
‘মুহাম্মাদ আপনার দ্বীন ও আপনার বাপ-দাদার দ্বীনের বিরোধিতা করেছে এবং আপনার সম্প্রদায়ের জামাআতী ঐক্য বিনষ্ট করেছে এবং তাদের জ্ঞানীদেরকে বোকা বলেছে। অতএব আমরা তাকে হত্যা করব’।
একজনের বদলে একজন হিসাবে এই ছেলেটিকে এনেছি মুহাম্মাদের বিনিময়ে আপনাকে দেবার জন্য।’ একথা শুনে ক্রুদ্ধ আবু তালেব রাগতঃস্বরে বলে উঠলেন,
‘আল্লাহর কসম! তোমরা কতবড় জঘন্য কথা আমাকে বলেছ। তোমরা তোমাদের ছেলেকে দিচ্ছ, যাতে আমি তাকে খাইয়ে-পরিয়ে মানুষ করি। আর আমার সন্তানকে তোমাদের হাতে তুলে দেব যাতে তোমরা তাকে হত্যা করতে পার? আল্লাহর কসম! তা কখনোই হবার নয়। …যাও তোমরা যা খুশী করতে পার’।

(৪) আবু তালেবের কাছ থেকে নিরাশ হওয়ার পর গোত্রনেতারা বসে আবু তালেবের গোত্র বনু হাশেম ও বনু আব্দুল মুত্ত্বালিবের সঙ্গে বয়কটের সিদ্ধান্ত নেন এবং ৭ম নববী বর্ষের ১লা মুহাররম হতে একটানা তিন বছর উক্ত বয়কট অব্যাহত থাকে। বয়কট শেষে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) পুনরায় স্বাভাবিকভাবে তাওহীদের দাওয়াত চালিয়ে যেতে থাকেন। এ সময় একদিন যখন তিনি কা‘বা ত্বাওয়াফ করছিলেন, তখন অলীদ বিন মুগীরাহ, ‘আছ বিন ওয়ায়েল, আসওয়াদ বিন আব্দুল মুত্ত্বালিব, উমাইয়া ইবনে খালাফ প্রমুখ মক্কার বিশিষ্ট নেতৃবর্গ এসে সরাসরি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে প্রস্তাব দেন ‘এসো আমরা ইবাদত করি, যার তুমি ইবাদত কর এবং তুমি ইবাদত কর, যার আমরা ইবাদত করি। তাতে আমরা ও তুমি আমাদের উপাসনার কাজে অংশীদার হব’। যদি দেখা যায় যে, তোমার মা‘বূদ আমাদের মা‘বূদের চেয়ে উত্তম, তাহলে আমরা তার থেকে উত্তমটুকু গ্রহণ করব। আর যদি দেখা যায় যে, আমাদের মা‘বূদ তোমার মা‘বূদ থেকে উত্তম, তাহলে তুমি তার থেকে উত্তমটুকু গ্রহণ করবে’। তখন আল্লাহ সূরা কাফেরূণ নাযিল করেন।

(৫) শেষ বারের আগমন (১০ম নববী বর্ষে) :

হুমকি, লোভনীয় প্রস্তাব ও বয়কট কোনটাতে কাজ না হওয়ায় এবং ইতিমধ্যে হামযাহ ও ওমরের ইসলাম গ্রহণ করায় এবং আবু তালিবের স্বাস্থ্যহানির খবর শুনে মক্কার নেতারা শেষবারের মত তাঁর সাথে সাক্ষাতের সিদ্ধান্ত নেন। সেমতে আবু জাহল, আবু সুফিয়ান, উমাইয়া বিন খালাফ, ওৎবা ও শায়বা বিন রাবী ‘আহ সহ প্রায় ২৫ জন নেতা আবু তালেবের কাছে আসেন এবং বলেন, হে আবু তালেব! আপনি যে মর্যাদার আসনে আছেন, তা আপনি জানেন। আপনার বর্তমান অবস্থাও আপনি বুঝতে পারছেন। আমরা আপনার জীবনাশংকা করছি। এমতাবস্থায় আপনি ভালভাবে জানেন যা আমাদের ও আপনার ভাতিজার মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। এক্ষণে আপনি তাকে ডাকুন এবং উভয় পক্ষে অঙ্গীকার নিন যে, সে আমাদের ও আমাদের দ্বীন থেকে বিরত থাকবে এবং আমরাও তার থেকে বিরত থাকব। তখন আবু তালেব রাসূল (ছাঃ)-কে ডাকালেন। অতঃপর রাসূল (ছাঃ) তাদের সম্মুখে এসে বললেন,

‘হাঁ, একটি কলেমার ওয়াদা আপনারা আমাকে দিন। তাতে আপনারা আরবের বাদশাহী পাবেন এবং অনারবরা আপনাদের অনুগত হবে’। আবু জাহ্ল খুশী হয়ে বলে উঠল, তোমার পিতার কসম, এমন হলে একটা কেন দশটা কলেমা পাঠ করতে রাযী আছি। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন

‘আপনারা বলুন, ‘আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই এবং এতদ্ব্যতীত যাদের পূজা করেন, সব পরিত্যাগ করুন’।

তখন সবাই দু’হাতে তালি বাজিয়ে বলে উঠলো ‘সব উপাস্য বাদ দিয়ে তুমি একজন উপাস্য চাও? নিশ্চয়ই তোমার এ কাজ বড়ই বিস্ময়কর!’ অতঃপর তারা একথা বলতে বলতে চলে গেল যে,‘চলো! তোমরা তোমাদের বাপ-দাদার ধর্মের উপরে চলতে থাক, যতক্ষণ না আল্লাহ তোমাদের ও তার মধ্যে একটা ফায়ছালা করেন’। এ প্রসঙ্গেই আল্লাহ সূরা ছোয়াদের ১ হতে ৭ আয়াত সমূহ নাযিল করেন-

ص- وَالْقُرْآنِ ذِي الذِّكْرِ- بَلِ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا فِيْ عِزَّةٍ وَّشِقَاقٍ- كَمْ أَهْلَكْنَا مِنْ قَبْلِهِم مِّنْ قَرْنٍ فَنَادَوْا وَلاَتَ حِيْنَ مَنَاصٍ- وَعَجِبُ وْا أَنْ جَاءَهُمْ مُّنْذِرٌ مِّنْهُمْ وَقَالَ الْكَافِرُوْنَ هَذَا سَاحِرٌ كَذَّابٌ- أَجَعَلَ الْآلِهَةَ إِلَهاً وَاحِداً إِنَّ هَذَا لَشَيْءٌ عُجَابٌ- وَانْطَلَقَ الْمَلَأُ مِنْ هُمْ أَنِ امْشُوْا وَاصْبِرُوْا عَلَى آلِهَتِكُمْ إِنَّ هَذَا لَشَيْءٌ يُرَادُ- مَا سَمِعْنَا بِهَذَا فِيْ الْمِلَّةِ الْآخِرَةِ إِنْ هَذَا إِلاَّ اخْتِلاَقٌ-
(১) ছোয়াদ- শপথ উপদেশপূর্ণ কুরআনের (২) বরং কাফের দল অহমিকা ও হঠকারিতায় লিপ্ত (৩) তাদের পূর্বেকার বহু জনগোষ্ঠীকে আমরা ধ্বংস করেছি। তারা আর্তনাদ করেছে। কিন্তু নিষ্কৃতি লাভের উপায় তাদের ছিল না (৪) তারা বিস্ময়বোধ করে যে, তাদের কাছে তাদেরই মধ্য থেকে একজন সতর্ককারী আগমন করেছেন। আর কাফেররা বলে এতো একজন জাদুকর ও মহা মিথ্যাবাদী (৫) সে কি বহু উপাস্যের বদলে একজন উপাস্যকে সাব্যস্ত করে? নিশ্চয় এটা এক বিস্ময়কর ব্যাপার (৬) তাদের নেতারা একথা বলে চলে যায় যে, তোমরা তোমাদের উপাস্যদের পূজায় দৃঢ় থাকো। নিশ্চয়ই (মুহাম্মাদের) এ বক্তব্য কোন বিশেষ উদ্দেশ্য প্রণোদিত (৭) আমরা তো আমাদের সাবেক ধর্মে এ ধরনের কোন কথা শুনিনি। এটা মনগড়া উক্তি ভিন্ন কিছুই নয়’।


(৬) মৃত্যুকালে আগমন (১০ নববী বর্ষে) :

শেষবার নেতারা এসেছিলেন আবু তালিবের মৃত্যুকালে, যেন তিনি তাওহীদের কালেমা পাঠ না করেন ও বাপ-দাদাদের ধর্মে শিরকের উপর মৃত্যুবরণ করেন, সেটা নিশ্চিত করার জন্য। বস্ত্তত একাজে তারা সফল হয়েছিলেন। রাসূলের শত আকুতি উপেক্ষা করে সেদিন আবু তালেব আবু জাহলের কথায় সায় দিয়ে শিরকের উপর মৃত্যুবরণ করেন।

ছাহাবীগণের উপর অত্যাচার


নিম্নে উদাহরণ স্বরূপ জাহেলী যুগের নির্যাতনের কিছু দৃষ্টান্ত পেশ করা হল।-

(১) মদীনায় প্রেরিত ইসলামের প্রথম দাঈ মুছ‘আব বিন উমায়ের (রাঃ) ইসলাম কবুল করেছেন, এ সংবাদ জানতে পেরে তার মা তার খানাপিনা বন্ধ করে দেন। অবশেষে বাড়ি থেকে বহিষ্কার করেন। বিলাস-ব্যসনে লালিত-পালিত এই তরুণ অবশেষে ক্ষুৎ-পিপাসায় কাতর হয়ে অস্থি-চর্মসার ও কংকাল সর্বস্ব হয়ে পড়েছিলেন। ইনি ওহোদের যুদ্ধে শহীদ হন।

(২) ইসলামের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ মুওয়াযযিন বেলাল বিন রাবাহ (রাঃ) কুরায়েশ নেতা উমাইয়া বিন খালাফের হাবশী ক্রীতদাস ছিলেন। ইসলাম কবুল করার অপরাধে তাকে তার মনিব নানাবিধ নির্যাতন করে। তার হাত-পা বেঁধে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে প্রখর রৌদ্রে উত্তপ্ত বালুকার উপর উপুড় করে পাথর চাপা দিয়ে ফেলে রাখা হত। কখনো তার গলায় দড়ি বেঁধে গরু-ছাগলের মত ছেলে-ছোকরাদের দিয়ে পাহাড়ে ও প্রান্তরে টেনে-হিচঁড়ে নেওয়া হত। যাতে তার গলার চামড়া রক্তাক্ত হয়ে যেত। খানা-পিনা বন্ধ রেখে ক্ষুৎ-পিপাসায় কষ্ট দেওয়া হত। কখনো উত্তপ্ত কংকর-বালুর উপরে হাত-পা বেঁধে ফেলে রেখে বুকে পাথর চাপা দেওয়া হত আর বলা হত
‘মুহাম্মাদের দ্বীন পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তোকে আমৃত্যু এভাবেই পড়ে থাকতে হবে’।
কিন্তু বেলাল শুধুই বলতেন ‘আহাদ’ ‘আহাদ’। একদিন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) পাশ দিয়ে যাবার সময় এই দৃশ্য দেখে বললেন
أحد ينجيك ‘আহাদ’ অর্থাৎ আল্লাহ তোমাকে মুক্তি দেবেন’।
অতঃপর তিনি আবু বকরকে যেয়ে বললেন, হে আবুবকর। বেলাল আল্লাহর পথে শাস্তি ভোগ করছে’। আবুবকর ইঙ্গিত বুঝলেন। অতঃপর উমাইয়ার দাবী অনুযায়ী নিজের কাফের গোলাম নিসতাস এর বিনিময়ে এবং একটি মূল্যবান চাদর ও দশটি উকিয়ার (স্বর্ণমুদ্রা) বিনিময়ে তাকে খরিদ করে মুক্ত করে দেন।

(৩) খাববাব ইবনুল আরিত বনু খোযা‘আ গোত্রের জনৈকা মহিলার গোলাম ছিলেন। মুসলমান হওয়ার অপরাধে মুশরিক নেতারা তার উপরে লোমহর্ষক নির্যাতন চালায়। নানাবিধ অত্যাচারের মধ্যে সবচাইতে মর্মান্তিক ছিল এই যে, তাকে কাঠের জ্বলন্ত অঙ্গারের উপরে চিৎ করে শুইয়ে দিয়ে বুকের উপরে পাথর চাপা দেওয়া হয়েছিল। ফলে পিঠের চামড়া ও মাংস গলে অঙ্গার নিভে গিয়েছিল। ওমর ফারূক (রাঃ) স্বীয় খেলাফতকালে একদিন খাববাবের পিঠের কুঞ্চিত সাদা চামড়া দেখে ও তার উপরে অত্যাচারের কাহিনী শুনে কেঁদে বুক ভাসিয়েছিলেন।

(৪) ইয়াসির পরিবার : ইয়াসির বনু মাখযূমের ক্রীতদাস ছিলেন। তিনি ও তার স্ত্রী ও পুত্র মুসলমান হন। ফলে তাদের উপরে যে ধরনের অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছিল, তা ভাষায় বর্ণনার যোগ্য নয়। আবু জাহলের নির্দেশে বনু মাখযূমের এই ক্রীতদাস মুসলিম পরিবারের উপরে নৃশংসতম শাস্তি নেমে আসে। তাদেরকে খোলা ময়দানে নিয়ে উত্তপ্ত বালুকার উপরে শুইয়ে রেখে নানাভাবে নির্যাতন করা হ’ত। একদিন চলার পথে তাদের এই আযাবের দৃশ্য দেখে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাদের উদ্দেশ্যে বলেন,
صبرًا آل ياسر فإن موعدكم الجنة ‘ধৈর্য ধর হে ইয়াসির পরিবার! তোমাদের ঠিকানা হল জান্নাত’
ইয়াসিরের দুই পায়ে দুটি রশি বেঁধে দুদিকে দুটি উটের পায়ে উক্ত রশির অন্য প্রান্ত বেঁধে দিয়ে উট দুটিকে দুদিকে জোরে হাঁকিয়ে নেওয়া হয়। তাতে জোরে হেঁচকা টানে ইয়াসিরের দেহ দ্বিখন্ডিত হয়ে যায় এবং সেখানেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন।

অতঃপর পাষাণহৃদয় আবু জাহল নিজ হাতে ইয়াসিরের স্ত্রী সুমাইয়ার গুপ্তাঙ্গে বর্শা বিদ্ধ করে তাকে হত্যা করে। তিনিই ছিলেন ইসলামে প্রথম মহিলা শহীদ। অতঃপর তাদের একমাত্র পুত্র আম্মারের উপরে শুরু হয় অবর্ণনীয় নির্যাতনের পালা। তাকে উত্তপ্ত কংকরময় বালুর উপরে হাত পা বেঁধে পাথর চাপা দিয়ে ফেলে রাখা অবস্থায় নির্যাতন করা হয়। একদিন আম্মারকে পানিতে চুবিয়ে আধামরা অবস্থায় উঠিয়ে বলা হল, তুমি যতক্ষণ মুহাম্মাদকে গালি না দিবে এবং লাত-মানাত-উযযা দেব-দেবীর প্রশংসা না করবে, ততক্ষণ তোমাকে মুক্তি দেওয়া হবে না। অবশেষে বাধ্য হয়ে তিনি তাদের কথা মেনে নেন। পরেই তিনি রাসূলের দরবারে গিয়ে কান্না-জড়িত কণ্ঠে সব ঘটনা খুলে বললেন ও আল্লাহর নিকটে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। তখন নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল হয়-

مَنْ كَفَرَ بِاللهِ مِنْ بَعْدِ إيْمَانِهِ إِلاَّ مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنٌّ بِالْإِيْمَانِ-
‘ঈমান আনার পরে যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কুফরী করে তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর ক্রোধ এবং কঠিন শাস্তি। কিন্তু যাকে বাধ্য করা হয়, অথচ তার অন্তর বিশ্বাসে অটল থাকে (তার জন্য কোন চিন্তা নেই)’ (নাহল ১৬/১০৬)।

(৫) হযরত ওছমানের মত ধনশালী ব্যক্তি যখন ইসলাম কবুল করেন, তখন তাঁর বদবখ্ত চাচা তাঁকে খেজুর পাতার চাটাইয়ে জড়িয়ে বেঁধে নীচ থেকে ধোঁয়া দিয়ে শাস্তি দেয়।

(৬) কোন কোন ছাহাবীকে উট বা গরুর কাঁচা চামড়ায় জড়িয়ে প্রখর রৌদ্র তাপের মধ্যে ফেলে রাখা হয়। কাউকে লোহার বর্ম পরিয়ে উত্তপ্ত পাথরের উপরে শুইয়ে রাখা হত।

(৭) যানীরাহ, নাহদিয়াহ ও তার মেয়ে এবং উম্মে আবীস প্রমুখ ক্রীতদাসীরা মুসলমান হলে বর্বরতম নির্যাতনের শিকার হন। আবুবকর তাদেরকে খরিদ করে মুক্ত করে দেন। এভাবে কুরায়েশ নেতারা মুসলিম দাস-দাসী ও তাদের পরিবারের উপরে সর্বাধিক নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করত। আবুবকর (রাঃ) এইসব নির্যাতিত দাস-দাসীকে বহু মূল্যের বিনিময়ে তাদের নিষ্ঠুর মনিবদের নিকট থেকে খরিদ করে নিয়ে মুক্ত করে দিতেন।

(৮) খোদ আবুবকর (রাঃ)-কে একদিন ওৎবা বিন রাবী‘আহ তার লোকজন নিয়ে একদিন হঠাৎ আক্রমণ করে বসে। মর্মান্তিক প্রহারে তাঁর চেহারা এমন ফুলে যায় যে, তাকে চেনাই যাচ্ছিল না। বানু তামীম তাকে অজ্ঞান অবস্থায় বাড়ী নিয়ে আসে। সন্ধ্যার পরে তাঁর জ্ঞান ফিরলে প্রথমে জিজ্ঞেস করেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কেমন আছেন? শত চেষ্টায়ও তিনি কিছু খেলেন না! অবশেষে খাত্তবাব কন্যা উম্মে জামীল এসে গোপনে তাকে খবর দেন যে, রাসূল (ছাঃ) ভাল আছেন এবং এখন আরক্বামের গৃহে অবস্থান করছেন। তারপর রাত্রি অধিক হলে উম্মে জামীলের সাথে তিনি আরক্বামের গৃহে যান। সেখানে রাসূলকে দেখার পর কুশল জেনে নিয়ে পানাহার করেন।




আরক্বামের গৃহে প্রচার কেন্দ্র (৫ম নববী বর্ষ)

মুসলমানগণ পাহাড়ের পাদদেশে ও বিভিন্ন গোপন স্থানে মিলিত হয়ে জামাআতের সাথে ছালাত আদায় করতেন এবং দ্বীনের তালীম নিতেন। একদিন কতিপয় মুশরিক এটা দেখে ফেলে এবং মুসলমানদের অশ্রাব্য ভাষায় গালি দিতে দিতে তাদের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তখন হযরত সা‘দ বিন আবী ওয়াকক্বাছ (রাঃ) তাদেরকে পাল্টা আক্রমণ করে রক্তাক্ত করে ফেলেন। ফলে তারা পালিয়ে যায়। এ কারণেই হযরত সা‘দকে ‘আল্লাহর রাস্তায় প্রথম বর্শা নিক্ষেপকারী’ বলা হয়। এটি ছিল চতুর্থ নববী বর্ষের ঘটনা।

এই ঘটনার পরে ৫ম নববী বর্ষে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) আরক্বাম বিন আবুল আরক্বামের বাড়িটিকে প্রশিক্ষণ ও প্রচার কেন্দ্র হিসাবে বেছে নেন। বাড়িটি ছিল ছাফা পাহাড়ের উপরে। যা ছিল অপেক্ষাকৃত নিরাপদ এবং মুশরিকদের দৃষ্টির আড়ালে। কাফের নেতাদের সম্মেলনস্থল ‘দারুন নাদওয়া’ থেকে এটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন স্থানে। যদিও আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) নিজে সর্বদা প্রকাশ্যে ছালাত আদায় করতেন।

রাসূল (ছাঃ) -এর উপর বিভিন্নমুখী অত্যাচার


সমস্ত যুক্তি, কৌশল ও আপোষ প্রস্তাব ব্যর্থ হওয়ার পর আবু লাহাবের নেতৃত্বে কুরায়েশ নেতাদের মধ্য থেকে ২৫ জনের একটি কমিটি গঠিত হয় এবং সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, মুহাম্মাদ ও তাঁর সাথীদের বিরুদ্ধে এখন থেকে কঠোরতম নির্যাতন চালাতে হবে। মুসলিমরা অধিকাংশই সমাজের দুর্বল শ্রেণীর। আবু বকর, ওছমান প্রমুখ যারা উচ্চ শ্রেণীর আছেন, তারা ভদ্র মানুষ। দুষ্টদের অভদ্রতার সামনে তারা মুহাম্মাদকে রক্ষা করার ক্ষমতা রাখেন না। সমস্যা হল খোদ মুহাম্মাদ ও তাঁর চাচা আবু তালেবকে নিয়ে। এ দুজনই অত্যন্ত সম্মানিত ও ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ। তাদের উপরে হস্তক্ষেপ করলে তাদের দুটি গোত্র বনু হাশেম ও বনু মুত্তালিব ঝাঁপিয়ে পড়বে। যদিও তারা মুশরিক। সবদিক ভেবেচিন্তে তারা দুর্বল মুসলমানদের উপরে নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধি করার সাথে সাথে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে দৈহিকভাবে ও মানসিকভাবে অপদস্থ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। যেমন-

১. রাসূলের উপর প্রতিবেশীদের অত্যাচার

আবু লাহাব ছিল রাসূলের চাচা ও নিকটতম প্রতিবেশী। সে ও তার স্ত্রী ছাড়াও অন্যতম প্রতিবেশী ছিল হাকাম বিন আবুল ‘আছ বিন উমাইয়া, উক্ববা বিন আবু মু‘আইত্ব, আদী বিন হামরা ছাক্বাফী, ইবনুল আছদা আল-হুযালী। এদের মধ্যে কেবল হাকাম বিন আবুল ‘আছ বিন উমাইয়া ইসলাম কবুল করেছিলেন। কাফেররা মুসলিমদের বাড়ির যবেহ করা দুম্বা-ভেড়ার নাড়ি-ভুঁড়ি তারা রাসূলের বাড়ীর মধ্যে ছুঁড়ে মারত। তাদের বাড়ীর আবর্জনাসমূহ রাসূলের রান্না ঘরের মধ্যে নিক্ষেপ করত যাতে রান্না অবস্থায় সব তরকারি নষ্ট হয়ে যায়। রাসূল সেগুলি কুড়িয়ে এনে দরজায় খাড়া হয়ে তাদের ডাক দিয়ে বলতেন ‘হে বনু আবদে মানাফ! এটা কেমন প্রতিবেশী সূলভ আচরণ?’এরপর তিনি সেগুলি দূরে ফেলে আসতেন।

২. কা‘বা গৃহে ছালাতরত অবস্থায় কষ্টদান

আব্দুল্লাহ ইবনে মাস‘ঊদ (রাঃ) বলেন যে, একদিন রাসূল (ছাঃ) বায়তুল্লাহ্র পাশে ছালাত আদায় করছিলেন। আবু জাহল ও তার সাথীরা অদূরে বসেছিল। কিছুক্ষণ পর তার নির্দেশে ভুঁড়ি এনে সিজদারত রাসূলের দুই কাঁধের মাঝখানে চাপিয়ে দিল, যাতে ঐ বিরাট ভুড়ির চাপে ও দূর্গন্ধে দম বন্ধ হয়ে তিনি মারা যান। ইবনু মাসঊদ বলেন, আমি সব দেখছিলাম। কিন্তু এই অবস্থায় আমার কিছুই করার ক্ষমতা ছিল না। অন্যদিকে শত্রুরা দানবীয় উল্লাসে ফেটে পড়ছিল। এই সময় কিভাবে এই দুঃসংবাদ ফাতেমার কানে পৌঁছলে তিনি দৌঁড়ে এসে ভুঁড়িটি সরিয়ে দিয়ে পিতাকে সাক্ষাত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচান। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মাথা উঁচু করে তিনবার বলেন,

‘হে আল্লাহ তুমি কুরায়েশকে ধরো (তিনবার)! হে আল্লাহ তুমি আমর ইবনে হেশাম আবু জাহলকে ধরো। হে আল্লাহ তুমি উৎবা ও শায়বাহ বিন রাবী‘আহ, অলীদ বিন উৎবা, উমাইয়া বিন খালাফ, ওক্ববা বিন আবু মু‘আইত্ব এবং উমারাহ বিন অলীদকে ধরো’। ইবনু মাস‘ঊদ বলেন, আমি তাদের (উক্ত ৭ জনের) সবাইকে বদর যুদ্ধে নিহত হয়ে কূয়ায় নিক্ষিপ্ত অবস্থায় দেখেছি’। (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫৮৪৭; ‘রাসূলের আবির্ভাব ও অহি-রসূচনা’ অনুচ্ছেদ। )

৩. সম্মুখে ও পশ্চাতে নিন্দা করা ও অভিশাপ দেওয়া :

এ ব্যাপারে উমাইয়া বিন খালাফ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। সে পশ্চাতে সর্বদা নিন্দা করত। তাছাড়া রাসূলকে দেখলেই তাঁর সামনে গিয়ে যাচ্ছে তাই বলে নিন্দা ও ভৎর্সনা করত এবং তাঁকে অভিশাপ দিত। এ প্রসঙ্গেই নাযিল হয়,

وَيْلٌ لِّكُلِّ هُمَزَةٍ لُّمَزَةٍ
‘প্রত্যেক সম্মুখ নিন্দাকারী ও পশ্চাতে নিন্দাকারীর জন্য রয়েছে ধ্বংস’ (হুমাযাহ১০৪/১)।

৪. রাসূলের মুখে থুথু নিক্ষেপ করা :

(ক) উমাইয়া বিন খালাফের ভাই উবাই বিন খালাফ ছিল আরেক দুরাচার। সে যখন শুনতে পেল যে, ওক্ববা বিন আবু মু‘আইত্ব রাসূলের কাছে বসে কিছু আল্লাহর বাণী শুনেছে, তখন ভীষণ ক্ষেপে গিয়ে ওক্ববাকে বাধ্য করল যাতে সে তৎক্ষণাৎ গিয়ে রাসূলের মুখে থুথু নিক্ষেপ করে আসে। ওক্ববা তাই-ই করল।

(খ) অনুরূপ এক ঘটনায় একদিন আবু লাহাবের পুত্র উতায়বা বিন আবু লাহাব এসে রাসূল (ছাঃ)-কে বলল, আমি সূরা নাজমের ১ ও ৮ আয়াত (وَالنَّجْمِ إِذَا هَوَى- ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّى) দু’টিকে অস্বীকার করি বলেই একটা হেঁচকা টানে রাসূলের গায়ের জামা ছিঁড়ে দিল এবং তাঁর মুখে থুথু নিক্ষেপ করল। আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) তখন তাকে বদ দোআ করে বললেন, اللهم سلط عليه كلبا من كلابك ‘আল্লাহ তুমি এর উপরে তোমার কোন একটি কুকুরকে বিজয়ী করে দাও’ । কিছুদিন পরে ওতায়বা সিরিয়ায় ব্যবসায়িক সফরে গেলে সেখানে যারক্বা নামক স্থানে রাত্রি যাপন করে। এমন সময় হঠাৎ একটা বাঘকে সে তাদের চারপাশে ঘুরতে দেখে ভয়ে বলে উঠল, ‘আল্লাহর কসম! এ আমাকে খেয়ে ফেলবে। এভাবেই তো মুহাম্মাদ আমার বিরুদ্ধে দো‘আ করেছিল। সে আমাকে হত্যা করল। অথচ সে মক্কায় আর আমি শামে’। পরদিন সকালে বাঘ এসে সবার মধ্য থেকে তাকে ধরে নিয়ে ঘাড় মটকে হত্যা করল।

৫. রাসূলের মুখে পচা হাড্ডি চূর্ণ ছুঁড়ে মারা :

উবাই বিন খালাফ নিজে একবার মরা-পচা হাড্ডি চূর্ণ করে রাসূলের কাছে গিয়ে তাঁর মুখের দিকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেয়। যাতে তাঁর মুখ ভর্তি হয়ে যায় এবং দুর্গন্ধে বমি হবার উপক্রম হয়।

৬. তার সামনে এসে মিথ্যা শপথ করা এবং পরে চোগলখুরী করা :

রাসূলকে নির্যাতনকারীদের মধ্যে অন্যতম সেরা বদমাশ ছিল আখনাস বিন শুরাইক্ব ছাক্বাফী। সে ভাল মানুষ সেজে রাসূলের সামনে মিথ্যা শপথ করে কথা বলত এবং পরে লোকদের কাছে গিয়ে চোগলখুরী করত। আল্লাহ পাক তার নয়টি বদ স্বভাবের কথা বর্ণনা করেছেন। যেমন আল্লাহ বলেন,

وَلَا تُطِعْ كُلَّ حَلاَّفٍ مَّهِينٍ- هَمَّازٍ مَّشَّاءٍ بِنَمِيْمٍ- مَنَّاعٍ لِّلْخَيْرِ مُعْتَدٍ أَثِيْمٍ- عُتُلٍّ بَعْدَ ذَلِكَ زَنِيْمٍ-
‘আপনি কথা শুনবেন না ঐ ব্যক্তির, যে অধিক শপথকারী ও হীন স্বভাব বিশিষ্ট’। ‘যে সম্মুখে নিন্দা করে এবং একের কথা অন্যকে লাগিয়ে চোগলখুরী করে’। ‘সে ভালকাজে অধিকহারে বাধাদানকারী, সীমা লংঘনকারী ও পাপিষ্ঠ’। ‘রুক্ষ স্বভাবী এবং সে জারজ সন্তান’ (ক্বলম৬৮/১০-১৩)।

ক্বিয়ামতের দিন তার নাসিকা দাগিয়ে দিয়ে চিহ্নিত করে দেওয়া হবে এজন্য যে, অন্যের সামনে তার লাঞ্ছনা যেন পরিষ্কারভাবে ফুটে ওঠে। দুনিয়াতে সে রাসূলের দাওয়াত থেকে নাক সিটকিয়েছিল, তাই ক্বিয়ামতের দিন তার বদলা হিসাবে তার নাসিকা দাগানো হবে। একাজ অন্যেরা করলেও তার পাপ ছিল বেশী এবং সে ছিল নেতা। তাই তাকে সেদিন চিহ্নিত করে দেওয়া হবে।

৭. রাসূলের সামনে বসে কুরআন শোনার পর তাঁকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করে গর্বের সাথে বুক ফুলিয়ে চলে যাওয়া :

এ কাজটা প্রায়ই আবু জাহল করত, আর ভাবত আমি মুহাম্মাদকে ও তাঁর কুরআনকে গালি দিয়ে একটা দারুণ কাজ করলাম। অথচ তার এই কুরআন শোনাটা ছিল কপটতা এবং লোককে একথা বুঝানো যে, আমার মত আরবের সেরা জ্ঞানী ব্যক্তির নিকটেই যখন কুরআনের কোন মূল্য নেই, তখন তোমরা কেন এর পিছনে ছুটবে? আবু জাহলের এই কপট ও গর্বিত আচরণের কথা বর্ণনা করেন আল্লাহ এভাবে-

فَلَا صَدَّقَ وَلَا صَلَّى- وَلَكِنْ كَذَّبَ وَتَوَلَّى- ثُمَّ ذَهَبَ إِلَى أَهْلِهِ يَتَمَطَّى-
‘সে বিশ্বাস করেনি এবং ছালাত আদায় করেনি’। ‘পরন্তু সে মিথ্যারোপ করেছে ও পৃষ্ঠপ্রদর্শন করেছে’। ‘অতঃপর সে দম্ভভরে নিজ পরিবারের কাছে ফিরে গিয়েছে’ (ক্বিয়ামাহ৭৫/৩১-৩৩)।

৮. কা‘বা গৃহে ছালাত আদায়ে নানারূপ বাধা সৃষ্টি :

(ক) প্রথম দিকে সকালে ও সন্ধ্যায় দু’রাক‘আত করে ছালাত আদায়ের নিয়ম ছিল। প্রথম তিন বছর সকলে সেটা গোপনে আদায় করতেন। পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এটা প্রকাশ্যে কা‘বা গৃহে আদায় করতে থাকেন। একদিন তিনি ছালাত আদায় করছেন। এমন সময় আবু জাহল গিয়ে তাঁকে ধমকের সুরে বলল, ألم أنهك عن هذا يا محمد! ‘হে মুহাম্মাদ! আমি কি তোমাকে এসব করতে নিষেধ করিনি’? তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে পাল্টা ধমক দেন। এতে সে বলে, بأى شيء تهددنى يا محمد أما والله إنى لأكثر هذا الوادى ناديًا. ‘কিসের জোরে তুমি আমাকে ধমকাচ্ছ। আল্লাহর কসম! মক্কার এই উপত্যকায় আমার বৈঠক সবচেয়ে বড়’। অর্থাৎ আমার দল সবচেয়ে বড়। তখন আল্লাহ সূরা আলাক্ব-এর নিম্নোক্ত আয়াত গুলি নাযিল করেন।(তিরমিযীহা/৩৩৪৯, সিলসিলাছাহীহাহহা/২৭৫। )

كَلَّا إِنَّ الْإِنسَانَ لَيَطْغَى- أَن رَّآهُ اسْتَغْنَى- إِنَّ إِلَى رَبِّكَ الرُّجْعَى- أَرَأَيْتَ الَّذِي يَنْهَى- عَبْداً إِذَا صَلَّى- أَرَأَيْتَ إِنْ كَانَ عَلَى الْهُدَى- أَوْ أَمَرَ بِالتَّقْوَى- َرَأَيْتَ إِنْ كَذَّبَ وَتَوَلَّى- أَلَمْ يَعْلَمْ بِأَنَّ اللَّهَ يَرَى- كَلَّا لَئِن لَّمْ يَنتَهِ لَنَسْفَعاً بِالنَّاصِيَةِ- نَاصِيَةٍ كَاذِبَةٍ خَاطِئَةٍ- فَلْيَدْعُ نَادِيَه- سَنَدْعُ الزَّبَانِيَةَ- كَلَّا لَا تُطِعْهُ وَاسْجُدْ وَاقْتَرِبْ-
‘কখনোই না। সত্য-সত্যই মানুষ সীমা লংঘন করে’। ‘এ কারণে যে, সে নিজেকে অভাবমুক্ত মনে করে’। ‘নিশ্চয়ই আপনার প্রভুর দিকেই সবার প্রত্যাবর্তন হবে’। ‘আপনি কি তাকে (আবু জাহলকে) দেখেছেন যে নিষেধ করে’? ‘এক বান্দাকে (রাসূলকে) যখন সে ছালাত আদায় করে’। ‘আপনি কি দেখেছেন যদি সে সৎপথে থাকে’। ‘অথবা আল্লাহ ভীতির নির্দেশ দেয়’। ‘আপনি কি দেখেছেন যদি সে মিথ্যারোপ করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়’। ‘সে কি জানেনা যে, (তার ভাল মানুষী ও মিথ্যাচার সবই) আল্লাহ দেখেন’। ‘কখনোই না’, যদি সে বিরত না হয়, তবে আমি তার মাথার সামনের কেশগুচ্ছ ধরে কষে টান দেব’। ‘মিথ্যুক পাপিষ্ঠের কেশগুচ্ছ’। ‘অতএব সে তার পারিষদবর্গকে ডাকুক’। ‘আমরাও ডাকব আযাবের ফেরেশতাদের’। ‘কখনোই না। আপনি তার কথা শুনবেন না। আপনি সিজদা করুন ও (আপনার প্রভুর) নৈকট্য তালাশ করুন’ (আলাক্ব৯৬/৬-১৯)।

আবু জাহল ও রাসূলের মধ্যকার এই ঘটনা স্মরণ করে এই আয়াত পাঠের পর পাঠক ও শ্রোতাকে সিজদা করার বিধান দেওয়া হয়েছে’।(মুসলিম, মিশকাতহা/১০২৪ ‘ছালাত’ অধ্যায়, ২১অনুচ্ছেদ) ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, এতদ্ব্যতীত আবু জাহল অন্যান্যদেরকে প্ররোচিত করেছিল যে, মুহাম্মাদ যখন কুরআন তেলাওয়াত করে তখন তোমরা হৈ-হুল্লোড় ও হট্টগোল করবে, যাতে কেউ তার তেলাওয়াত শুনতে না পায়। এ প্রসঙ্গে আয়াত নাযিল হয়-

وَقَالَ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا لاَ تَسْمَعُوْا لِهَذَا الْقُرْآنِ وَالْغَوْا فِيْهِ لَعَلَّكُمْ تَغْلِبُوْنَ- فَلَنُذِيْقَنَّ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا عَذَاباً شَدِيْداً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَسْوَأَ الَّذِيْ كَا نُوْا يَعْمَلُوْنَ-
‘আর কাফেররা বলে যে, তোমরা এ কুরআন শুনোনা এবং এর তেলাওয়াত কালে হট্টগোল কর, যাতে তোমরা জয়ী হও’। ‘আমরা অবশ্যই কাফিরদের কঠিন আযাব আস্বাদন করাব এবং আমরা অবশ্যই তাদের কাজের হীনতম বদলা নেব’ (হামীম সাজদাহ ৪১/২৬-২৭)।

এইভাবে হোটেলে ও বাজারে ব্যস্ততার সময় মাইকে কুরআন তেলাওয়াতের ক্যাসেট চালানোও ঠিক নয়। কেননা কুরআন শোনার জন্য মনোযোগ দেওয়া শর্ত। অথচ ঐ সময় মনোযোগ দেওয়া যায় না।

১০. সত্যনবী হ’লে তাকে অমান্য করায় গযব নাযিল হয় না কেন বলে যুক্তি প্রদর্শন করা :

নযর বিন হারিছ প্রমুখ কুরায়েশ নেতারা নও মুসলিমদের সম্মুখে এবং নিজেদের লোকদের সম্মুখে জোরে-শোরে একথা প্রচার করত যে, যদি মুহাম্মাদ সত্য নবী হতেন ও তার আনীত কুরআন সত্য কিতাব হয়ে থাকে, তাহলে তা অমান্য করার অপরাধে আমাদের উপরে গযব নাযিল হয় না কেন? বস্ত্ততঃ তাদের এসব কথা দ্বারা দুর্বলদের মন আরও দুর্বল হয়ে যেত এবং ইসলাম গ্রহণ করা হতে মানুষ পিছিয়ে যেত। তাদের এই দাবী ও তার জওয়াবে আল্লাহ বলেন,

وَإِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ آيَاتُنَا قَالُوْا قَدْ سَمِعْنَا لَوْ نَشَاءُ لَقُلْنَا مِثْلَ هَـذَا إِنْ هَـذَا إِلاَّ أَسَاطِيْرُ الْأَوَّلِيْنَ- وَإِذْ قَالُوْا اللَّهُمَّ إِنْ كَانَ هَـذَا هُ وَ الْحَقَّ مِنْ عِنْدِكَ فَأَمْطِرْ عَلَيْنَا حِجَارَةً مِّنَ السَّمَاءِ أَوِ ائْتِنَا بِعَذَابٍ أَلِيْمٍ- وَمَا كَانَ اللهُ لِيُعَذِّبَهُمْ وَأَنْتَ فِيْهِمْ وَمَا كَانَ اللهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُوْنَ-
‘যখন তাদের নিকটে আমাদের আয়াত সমূহ পাঠ করা হয়, তখন তারা (তাচ্ছিল্যের সাথে) বলে, আমরা শুনেছি, ইচ্ছা করলে আমরাও এরূপ বলতে পারি। এসব তো পূর্ববর্তীদের উপকথা ভিন্ন কিছুই নয়’। ‘এতদ্ব্যতীত যখন তারা বলতে আরম্ভ করে যে, হে আল্লাহ! যদি এটাই তোমার নিকট থেকে আগত সত্য দ্বীন হয়ে থাকে, তাহ’লে তুমি আমাদের উপরে আসমান থেকে প্রস্তর বর্ষণ কর কিংবা আমাদের উপরে বেদনাদায়ক আযাব নাযিল কর’। ‘অথচ আল্লাহ কখনোই তাদের উপরে আযাব নাযিল করবেন না, যতক্ষণ আপনি তাদের মধ্যে অবস্থান করবেন। তাছাড়া তারা (দুর্বল মুসলমানেরা) যতক্ষণ ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে, আল্লাহ কখনো তাদের উপরে আযাব দিবেন না’ (আনফাল ৮/৩১-৩৩)।

আয়াত তিনটির মর্মকথা

উপরোক্ত তিনটি আয়াতের মধ্যে প্রথম আয়াতে কাফেররা ‘কুরআনকে পুরাকালের ইতিকথা এবং ইচ্ছা করলে আমরাও এরূপ বলতে পারি’ বলে দম্ভ প্রকাশ করেছে। অথচ ঐ নেতারা নিজেরাই গোপনে রাতের অন্ধকারে বাইরে দাঁড়িয়ে তাহাজ্জুদের ছালাতে রাসূলের সুমধুর তেলাওয়াত শুনত। আর ফিরে যাওয়ার সময় মন্তব্য করত ليس هذا كلام البشر ‘এটা কখনোই মানুষের কালাম নয়’।

দ্বিতীয় আয়াতে কাফের নেতাদের আরেকটি কৌশল বর্ণিত হয়েছে যে, মুহাম্মাদ সত্যনবী হলে তাকে অমান্য করার কারণে আমাদের উপরে গযব নাযিল হয় না কেন? অথচ তারা ভালভাবেই জানত যে, আল্লাহ তার বান্দাকে বুঝবার ও তওবা করার অবকাশ দিয়ে থাকেন।
তারা রাসূলকে ‘ছাবেঈ’ (صابئ) অর্থাৎ বিধর্মী, ও ‘কাযযাব’ (كذّاب) অর্থাৎ ‘মহা মিথ্যাবাদী’ এবং ‘সমাজে বিভক্তি সৃষ্টিকারী’ বলেছিল। আর সেকারণ তাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। বর্তমান যুগে ইসলামের শত্রুরা দ্বীনের সত্যিকারের সেবকদের বিরুদ্ধে একই অপবাদ ও একই কৌশল অবলম্বন করেছে। তারাও আল্লাহর গযব সঙ্গে সঙ্গে নাযিল না হওয়াকে তাদের সত্যতার পক্ষে দলীল হিসাবে পেশ করে এবং সমাজ সংস্কারক দ্বীনদার ব্যক্তির অত্যাচারিত হওয়াকে তার অসত্য হওয়ার প্রমাণ হিসাবে যুক্তি পেশ করে থাকে।

তৃতীয় আয়াতে আল্লাহ কাফেরদের কথার জওয়াবে বলেন, যতক্ষণ হে মুহাম্মাদ! আপনি তাদের মধ্যে অবস্থান করবেন অথবা আপনার হিজরতের পরেও যতদিন মক্কার দুর্বল ঈমানদারগণ আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে, ততদিন আল্লাহ কখনোই তাদের উপর গযব নাযিল করবেন না। কারণ একজন নবী ও ঈমানদারের মূল্য সমস্ত আরববাসী এমনকি সারা পৃথিবীর সমান নয়। এ কারণেই হাদীছে এসেছে, لاتقوم الساعة حتى لايقال فى الأرض: الله الله ‘অতদিন ক্বিয়ামত হবে না, যতদিন পৃথিবীতে একজন আল্লাহ বলার মত (প্রকৃত তাওহীদপন্থী ঈমানদার) লোক বেঁচে থাকবে’।

১১. রাস্তায় ছেলে-ছোকরাদের লেলিয়ে দেওয়া :

উপরে বর্ণিত অত্যাচার সমূহের সাথে যোগ হল একটি নিষ্ঠুরতম অত্যাচার। সেটি হল নেতাদের কারসাজিতে ছেলে-ছোকরাদের অত্যাচার। যেহেতু ছোট ছেলেদের সাত খুন মাফ। তাই নেতারা তাদের কাজে লাগালো। আধুনিক পরিভাষায় নেতারা হল গডফাদার এবং ছোকরারা হল টিন এজার সন্ত্রাসী।
আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) যখন রাস্তায় বেরোতেন, তখনই আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকা ছোকরার দল ছুটে আসত। আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) ওদের সালাম দিতেন। ওরা পাল্টা গালি দিত। তিনি ওদের উপদেশ দিতেন। ওরা তখন হি হি করে অট্টহাস্য করত। এভাবে কোন এক পর্যায়ে যখন ওরা রাসূলের দিকে ঢিল ছুঁড়ে মারা শুরু করত, তখন রাসূল (ছাঃ) আবু সুফিয়ানের গৃহে আশ্রয় নিতেন। তখন ছোকরারা চলে যেত। আবু সুফিয়ান বাহ্যিক সৌজন্য বজায় রাখতেন। সম্ভবতঃ এরই প্রতিদান স্বরূপ মক্কা বিজয়ের রাতে সুফিয়ান গোপন অভিযানে এসে ধরা পড়লে রাসূল (ছাঃ) তাকে মাফ করে দেন এবং ঘোষণা দেন, ‘যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের গৃহে আশ্রয় নিবে, সে ব্যক্তি নিরাপদ থাকবে।

রাসূল (ছাঃ) -এর দাওয়াতী কার্যক্রম


প্রকাশ্য দাওয়াতের সাধারণ প্রতিক্রিয়া

প্রথমে ছাফা পর্বত চূড়ার আহবান মক্কানগরী ও তার আশপাশ এলাকার আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার মধ্যে এক নতুনের শিহরণ জাগিয়ে তুলেছিল। অতঃপর সর্বত্র প্রকাশ্য দাওয়াতের প্রতিক্রিয়ায় সকলের মুখে মুখে একই কথার অনুবৃত্তি হতে থাকে, কি শুনছি আজ আমরা আব্দুল্লাহর পুত্রের মুখে। এযে নির্যাতিত মানবতার প্রাণের কথা। এযে মযলূমের হৃদয়ের ভাষা। যে ক্রীতদাস ভাবত এটাই তার নিয়তি, সে এখন নিজেকে স্বাধীন মানুষ ভাবতে লাগল। যে নারী ভাবত, সবলের শয্যাসঙ্গিনী হওয়াই তার নিয়তি, সে এখন নিজেকে অধিকার সচেতন সাহসী নারী হিসাবে ভাবতে লাগল। যে গরীব ভাবত সূদখোর মহাজনের করাল গ্রাস হতে মুক্তির কোন পথ নেই, সে এখন মুক্তির দিশা পেল। সর্বত্র যেন একটা জাগরণের শিহরণ। এ যেন নিদ্রাভঙ্গের পূর্বক্ষণে ছুবহে ছাদিকের আগমন। ভারতের উর্দূ কবি আলতাফ হোসায়েন হালী (১৮৩৭-১৯১৪ খৃঃ) এই সময়ের অবস্থা বর্ণনা করেন নিম্নোক্ত ভাষায়-

وه بجلى كا كڑكا تها يا صوت هادى عرب كى زمين جس نے سارى هلا دى
‘এটি বিদ্যুতের বজ্রধ্বনি ছিল, না পথপ্রদর্শকের ঘোষণা ছিল; আরবের মাটিকে যা নিমেষে কাঁপিয়ে দিল’।


সমাজ নেতাদের প্রতিক্রিয়া

রাসূলের আহবানের সত্যতা ও যথার্থতার বিষয়ে সমাজ নেতাদের মধ্যে কোনরূপ দ্বিমত ছিল না। কিন্তু ধুরন্ধর নেতারা তাওহীদের এ অমর আহবানের মধ্যে তাদের দুনিয়াবী স্বার্থের নিশ্চিত অপমৃত্যু দেখতে পেয়েছিল। এক আল্লাহকে মেনে নিলে শিরক বিলুপ্ত হবে। দেব-দেবীর পূজা বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে সারা আরবের উপর তাদের ধর্মীয় নেতৃত্ব ও পৌরহিত্যের মর্যাদা শেষ হয়ে যাবে। এছাড়া লোকেরা যে পূজার অর্ঘ্য সেখানে নিবেদন করে, তা ভোগ করা থেকে তারা বঞ্চিত হবে।
তাওহীদের এ সাম্য ও মৈত্রীর আহবান আমরা কোনমতেই মানতে রাযী নই। এইভাবে প্রধানতঃ সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের বিরোধী বিবেচনা করে তারা রাসূলের বিরোধিতা করার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে ‘জ্ঞানের চূড়া’ বলে পরিচিত কুরায়েশ নেতা ‘আবুল হেকাম’ এরপর থেকে মুসলমানদের নিকটে ‘মূর্খতার চূড়া’ বা ‘আবু জাহল’ নামে পরিচিত হয়। আল্লাহ বলেন,

قَدْ نَعْلَمُ إِنَّهُ لَيَحْزُنُكَ الَّذِي يَقُولُونَ فَإِنَّهُمْ لاَ يُكَذِّبُونَكَ وَلَكِنَّ الظَّال ِمِينَ بِآيَاتِ اللّهِ يَجْحَدُونَ-
‘তারা যেসব কথা বলে তা যে তোমাকে খুবই কষ্ট দেয়, তা আমরা জানি। তবে ওরা তোমাকে মিথ্যাবাদী বলে না। বরং যালেমরা আল্লাহর আয়াত সমূহকে অস্বীকার করে’ (আন‘আম ৬/৩৩)।




বিরোধিতার কৌশল সমূহ নির্ধারণ

তারা মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে ঠেকানোর জন্য বিভিন্ন পথ-পন্থা উদ্ভাবন করল।

(১) আবু ত্বালেবকে দলে টানা:

প্রথম পন্থা হিসাবে বেছে নিল মুহাম্মাদের আশ্রয়দাতা আবু ত্বালেবকে দলে টানা। সেমতে নেতৃবৃন্দ সেখানে গেলেন এবং তাঁর নিকটে বাপ-দাদার ধর্মের দোহাই দিয়ে ও সামাজিক ঐক্য বিনষ্টের কথা বলে মুহাম্মাদকে বিরত রাখার দাবী জানালেন। আবু ত্বালিব স্থিরভাবে তাদের সব কথা শুনলেন। অতঃপর ধীরকণ্ঠে নরম ভাষায় তাদেরকে বুঝিয়ে বিদায় করলেন।

(২) হজ্জের সময় দাওয়াতে বাধা দেওয়া :

হজ্জের মৌসুম সমাগত। অতএব এই সুযোগে মুহাম্মাদ বহিরাগতদের নিকটে তার দ্বীনের দাওয়াত পেশ করবেন এটাই স্বাভাবিক। অতএব তারা সিদ্ধান্ত নিল যে, এমন একটা কথা মুহাম্মাদের বিরুদ্ধে তৈরী করতে হবে এবং তা সকলের মধ্যে প্রচার করে দিতে হবে, যাতে কোন লোক তার কথায় কর্ণপাত না করে। এক একজন এক এক প্রস্তাব করল। কেউ বলল, তাকে ‘কাহেন’ (ভবিষ্যদ্বক্তা) বলা হউক। কেউ বলল, ‘পাগল’ বলা হউক। কেউ বলল, ‘কবি’ বলা হউক। সব শুনে দলনেতা অলীদ বলল, আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদ-এর কথাবার্তা বড়ই সুন্দর ও মিষ্ট-মধুর। তার কাছে কিছুক্ষণ বসলেই লোকেদের নিকট তোমাদের দেওয়া ঐসব অপবাদ মিথ্যা প্রতিপন্ন হবে। তারা বলল, তাহলে আপনিই বলুন, কী বলা যায়। অলীদ অনেকক্ষণ ভেবে-চিন্তে বলল, তার সম্পর্কে যদি কিছু বলতেই হয়, তবে বেশীর বেশী তাকে ‘জাদুকর’ বলা যায়। কেননা তার কথা যেই-ই মন দিয়ে শোনে তার মধ্যে জাদুর মত আছর করে (মুদ্দাচ্ছির ৭৪/২৪) একসময় লোকেরা তার দলে ভিড়ে যায়। ফলে আমাদের পিতা-পুত্রের মধ্যে, ভাই-ভাইয়ের মধ্যে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে, আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে এমনকি গোত্রে-গোত্রে বিভক্তি সৃষ্টি হয়ে গেছে।

ওইদিন অলীদের গৃহে অনুষ্ঠিত বৈঠকে রাসূলকে ‘জাদুকর’ বলে প্রচার করার সিদ্ধান্তের ঘটনা এবং অলীদের বাকভঙ্গী আল্লাহ নিজস্ব রীতিতে বর্ণনা করেন নিম্নোক্ত ভাবে-

إِنَّهُ فَكَّرَ وَقَدَّرَ- فَقُتِلَ كَيْفَ قَدَّرَ- ثُمَّ قُتِلَ كَيْفَ قَدَّرَ- ثُمَّ نَظَرَ- ثُمَّ عَبَسَ وَبَسَرَ- ثُمَّ أَدْبَرَ وَاسْتَكْبَرَ- فَقَالَ إِنْ هَذَا إِلاَّ سِحْرٌ يُّؤْثَرُ- إِنْ هَذَا إِ لاَّ قَوْلُ الْبَشَرِ- ‘সে চিন্তা করল ও মনস্থির করল’। ‘ধ্বংস হৌক সে কিরূপ মনস্থ করল’? ‘ধ্বংস হৌক সে কিরূপ মনস্থ করল’? ‘অতঃপর সে তাকাল’। ‘অতঃপর ভ্রুকুঞ্চিত করল ও মুখ বিকৃত করল’। ‘অতঃপর পৃষ্ঠ প্রদর্শন করল ও অহংকার করল’। ‘তারপর বলল, অর্জিত জাদু বৈ কিছু নয়’। ‘এটা মানুষের উক্তি বৈ কিছু নয়’(মুদ্দাছছির৭৪/১৮-২৫)।

মৌসুমে রাসূলের দাওয়াত :

যথা সময়ে হজ্জের মৌসুম এসে গেল। হজ্জের মাসের আগে-পিছে দুমাস হল হরমের মাস। এ তিন মাস মারামারি-কাটাকাটি নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হজ্জে আগত মেহমানদের তাঁবুতে গিয়ে গিয়ে দ্বীনের দাওয়াত দিতে থাকেন। ওদিকে অলীদের পরামর্শ মতে আবু লাহাবের নেতৃত্বে পরিচালিত গীবতকারী দল সবার কাছে গিয়ে গিয়ে রাসূল (ছাঃ) সম্পর্কে বিভিন্ন অপবাদ প্রচার করতে থাকে এবং শেষে বলে আসে যে, সে একজন জাদুকর। তার কথা শুনলেই জাদুগ্রস্ত হয়ে যেতে হবে। অতএব কেউ যেন তার ধারে কাছে না যায়। খোদ আবু লাহাব নির্লজ্জের মত রাসূলের পিছে পিছে ঘুরতে লাগল। রাসূল (ছাঃ) যেখানেই যান, সেখানেই সে গিয়ে বলে
لاَتُطِيْع ُوْهُ فَإِنَّهُ صَابِىءٌ كَذَّابٌ‘তোমরা কেউ এর কথা শুনো না। সে বেদ্বীন ও মিথ্যুক’।
শুধু তাই নয়, সে উপরোক্ত গালি দিয়ে হজ্জ মৌসুমের বাইরে যুল-মাজাযের বাজারে রাসূলের পায়ে সজোরে পাথর ছুঁড়ে মেরেছিল। যাতে তাঁর গোড়ালী রক্তাক্ত হয়ে গিয়েছিল।

লাভ ও ক্ষতি

এই ব্যাপক অপপ্রচারের ফলে রাসূলের জন্য লাভ ও ক্ষতি দু’টিই হ’ল। লাভ হ’ল এই যে, তাঁর নবুঅত দাবীর কথা সর্বত্র প্রচারিত হল। পক্ষান্তরে ক্ষতি হল এই যে, একজন লোকও তাঁর দাওয়াতে সাড়া দিল না। বরং অনেকের মধ্যেই তাঁর সম্পর্কে বিরূপ মনোভাবের সৃষ্টি হল। সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক ছিল আবু লাহাবের নোংরা প্রচারণা। কেননা সে ছিল রাসূলের আপন চাচা, নিকটতম প্রতিবেশী, তাঁর দুই মেয়ের সাবেক শ্বশুর এবং সুপরিচিত নেতা ও বড় ব্যবসায়ী। তার কথা সবাই বিশ্বাস করে নিল। পরিণামে দীর্ঘ তিন মাসব্যাপী দিন-রাতের দাওয়াত বাহ্যতঃ নিষ্ফল হল।

বিরোধিতার নয়া কৌশল সমূহ,

১. অপবাদের সংখ্যা বৃদ্ধি :

হজ্জের মৌসুম শেষে নেতারা পুনরায় হিসাব-নিকাশে বসে গেল। তারা দেখল অপবাদ রটনায় কাজ হয়েছে সবচেয়ে বেশী। এর দ্বারা যেমন প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে দুর্বল করা যায়। অন্যদিকে তেমনি সাধারণ মানুষ দ্রুত সেটা লুফে নেয়। কেউ যাচাই-বাছাই করতে চাইলে তো আমাদের কাছেই আসবে। অতএব অপবাদের ধারা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। একটি হিসাব মতে রাসূলের বিরুদ্ধে তারা অনেকগুলি অপবাদ তৈরী করল। যেমন-তিনি

(১) পাগল
(২) কবি
(৩) জাদুকর ও
(৪) মহা মিথ্যাবাদী
(৫) পুরাকালের উপাখ্যান বর্ণনাকারী
(৬) অন্যের সাহায্যে মিথ্যা রচনাকারী
(৭) মিথ্যা রটনাকারী
(৮) ভবিষ্যদ্বক্তা
(৯) ফেরেশতা নয়, এতো সাধারণ মানুষ
(১০) পথভ্রষ্ট
(১১) বেদ্বীন
(১২) পিতৃধর্ম বিনষ্টকারী
(১৩) জামা‘আত বিভক্তকারী
((১৪) জাদুগ্রস্ত
(১৫) ‘মুযাম্মাম’ (নিন্দিত)
(১৬) এতদ্ব্যতীত মদীনায় হিজরত করার পর সেখানকার দুরাচার ইহুদীরা রাসূলকে ‘রা‘এনা’ (رَاعِنَا) বলে ডাকত। তাদের মাতৃভাষা হিব্রুতে যার অর্থ شريرنا ‘আমাদের দুষ্ট ব্যক্তিটি’। এইসব অপবাদের জওয়াবে আল্লাহ বলেন,

انْظُرْ كَيْفَ ضَرَبُوْا لَكَ الأَمْثَالَ فَضَلُّوْا فَلاَ يَسْتَطِيْعْوْنَ سَبِيْلاً
‘দেখ ওরা তোমার জন্য কেমন সব উপমা দেয়। ওরা পথভ্রষ্ট হয়েছে। অতএব ওরা পথ পেতে পারে না’(বনুইস্রাঈল১৭/৪৮)।

২. নাচ-গানের আসর করা :

অন্যতম কুরায়েশ নেতা ও বিত্তশালী ব্যবসায়ী নযর বিন হারেছ তৎকালীন সমৃদ্ধ নগরী ইরাকের ‘হীরা’ চলে গেল এবং সেখান থেকে পারস্যের প্রাচীন রাজা-বাদশাদের কাহিনী, মহাবীর রুস্তম ও খৃষ্টপূর্বকালের দিগ্বিজয়ী বীর আলেকজান্ডারের কাহিনী শিখে এসে মক্কায় বিভিন্ন স্থানে গল্পের আসর বসাতে শুরু করল। যেখানেই রাসূল (ছাঃ) মানুষকে জাহান্নামের ভয় ও জান্নাতের সুখ-শান্তির কথা শুনিয়ে মানুষকে দ্বীনের পথে দাওয়াত দিতেন, নযর বিন হারেছ সেখানে গিয়ে উক্ত সব কাহিনী শুনিয়ে বলত, এগুলো কি মুহাম্মাদের কাহিনীর চেয়ে উত্তম নয়? এতেও সে ক্ষান্ত না হয়ে অনেকগুলি সুন্দরী দাসী ক্রয় করল, যারা নাচ-গানে পারদর্শী ছিল।
উপরোক্ত ঘৃণ্য ক্রিয়া-কলাপের প্রেক্ষিতেই নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল হয়-

وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيْثِ لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيْلِ اللهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَّيَتَّخِذَهَا هُزُواً أُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُّهِيْنٌ-
‘লোকেদের মধ্যে একটি শ্রেণী আছে, যারা মানুষকে আল্লাহর পথ হ’তে গোমরাহ করার জন্য অলীক কল্পকাহিনী খরিদ করে অজ্ঞতাবশে এবং এগুলো খেল-তামাশা রূপে গ্রহণ করে। এদের জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি’ (লোকমান৩১/৬)।

৩. ইহুদী-নাছারা পন্ডিতদের সাহায্য নিয়ে তাঁকে ভন্ডনবী প্রমাণের চেষ্টা

এতদুদ্দেশ্যে কুরায়েশ নেতারা পরামর্শ করে নযর ইবনে হারেছ এবং ওক্ববা ইবনে আবী মু‘আইত্বকে মদীনায় পাঠায়। সেখানকার ইহুদী-নাছারা পন্ডিতেরা তাদেরকে তিনটি প্রস্তাব শিখিয়ে দিয়ে বলল যে, যদি মুহাম্মাদ এগুলির সঠিক জবাব দিতে পারে, তাহলে সে যথার্থ নবী। প্রশ্ন তিনটি ছিল নিম্নরূপ :

(১) আছহাবে কাহফের সেই যুবকদের ঘটনা, যারা প্রাচীনকালে শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিল।
(২) যুল-ক্বারনায়েন-এর ঘটনা, যিনি পৃথিবীর পূর্ব ও পশ্চিমে বিশ্বব্যাপী সফর করেছিলেন।
(৩) রূহ কি? এগুলির মধ্যে রূহ কি- এ প্রশ্নের জবাবে সূরা বনু ইস্রাঈলের ৮৫ আয়াতে নাযিল হয়। অতঃপর বাকী দুটি ঘটনার প্রেক্ষিতে সূরা কাহফ নাযিল হয় (ইবনুজারীরইবনুআববাস (রাঃ) হতেএবংকুরতুবী, ইবনুকাছীর)।

৪. ইহুদী পন্ডিতদের আনিয়ে সরাসরি নবীকে পরীক্ষা করা

৫. চাঁদ দ্বিখন্ডিত করণের প্রস্তাব :

কুরায়েশ নেতারা দল বেঁধে রাসূলের কাছে গিয়ে এক চন্দ্রোজ্জ্বল রাত্রিতে চাঁদকে দ্বিখন্ডিত করার জন্য বলল। কুরায়েশ নেতাদের দাবী মোতাবেক আল্লাহর হুকুমে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) উক্ত মু‘জেযা প্রদর্শন করলেন। মুহূর্তের মধ্যে চাঁদ দ্বিখন্ডিত হয়ে পূর্ব ও পশ্চিমে ছিটকে পড়ল। উভয় টুকরার মাঝখানে পাহাড় আড়াল হয়ে গেল। অতঃপর পুনরায় দুই টুকরা এসে সংযুক্ত হল। উক্ত ঘটনার প্রেক্ষিতে শূরা ক্বামার নাযিল হয়। যার শুরু হল

اقْتَرَبَتِ السَّاعَةُ وَانْشَقَّ الْقَمَرُ
‘ক্বিয়ামত আসন্ন। চন্দ্র বিদীর্ণ হয়েছে’(ক্বামার৫৪/১)।

এতবড় ঘটনা চাক্ষুষ দেখা সত্ত্বেও কুরায়েশ নেতারা ঈমান আনলো না। পরে বিভিন্ন এলাকা হতে লোকদের কাছেও তারা একই ঘটনা শুনলো। কিন্তু যিদ ও অহংকার তাদেরকে বিরত রাখলো। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন,

وَإِن يَرَوْا آيَةً يُعْرِضُوا وَيَقُولُوا سِحْرٌ مُّسْتَمِرٌّ، وَكَذَّبُوا وَاتَّبَعُوا أَهْوَاءهُمْ وَكُلُّ أَمْرٍ مُّسْتَقِرٌّ،
‘তারা যদি কোন নিদর্শন (যেমন চন্দ্র দ্বিখন্ডিত করণ) দেখে, তবে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে যে, এটা তো বড় শক্ত জাদু’। ‘তারা মিথ্যারোপ করল এবং নিজেদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করল। অথচ প্রত্যেক কাজই স্থিরীকৃত (ক্বামার২-৩)।

তারীখে ফিরিশতায় বর্ণিত হয়েছে যে, চন্দ্র দ্বিখন্ডিত করণের এই দৃশ্য ভারতের মালাবারের জনৈক মহারাজা স্বচক্ষে দেখেন এবং তা নিজের রোজনামচায় লিপিবদ্ধ করেন। পরে আরব বণিকদের মুখে ঘটনা শুনে তিনি মুসলমান হয়ে যান।

৬. আপোষমুখী দাওয়াতী পদ্ধতি গ্রহণের প্রস্তাব পেশ :

বুদ্ধিবৃত্তিক ও অলৌকিক সকল পন্থায় পরাজিত হওয়ায় কুরায়েশ নেতারা এবার আপোষমুখী পদ্ধতি গ্রহণ করল। কিছু গ্রহণ ও কিছু বর্জনের নীতিতে তারা রাসূলের সাথে আপোষ করতে চাইল। কুরআনের ভাষায়

وَدُّوا لَوْ تُدْهِنُ فَيُدْهِنُوْنَ
‘তারা চায় যদি আপনি কিছুটা শিথিল হয়ে যান, তাহ’লে তারাও নমনীয় হয়ে যাবে’ (ক্বলম৬৮/৯)।

এ বিষয়ে তাদের প্রস্তাবগুলি ছিল নিম্নরূপ :

(ক) মুহাম্মাদ এক বছর আমাদের মা‘বূদের (অর্থাৎ দেব-দেবীর) পূজা করবে, আমরাও একবছর মুহাম্মাদের রব-এর পূজা করব (ইবনুজারীরওত্বাবারাণী)।

(খ) যদি মুহাম্মাদ আমাদের উপাস্যগুলির স্বীকৃতি দেয়, তাহলে আমরা সকলে তার উপাস্যের ইবাদত করব

(গ) আমরা উভয়ে উভয়ের মা‘বূদের পূজা করব। তারপর দেখব, যার মা‘বূদ যে অংশে উত্তম, আমরা সেই অংশটুকু পরস্পরে গ্রহণ করে নেব

(ঘ) মুহাম্মাদ আমাদের দেব-দেবীর গায়ে কেবল একটু হাত বুলিয়ে দিক, তাতেই আমরা তাকে সত্য বলে মেনে নিব। তখন সূরা কাফেরূণ নাযিল হয় এবং তাদের সাথে চূড়ান্ত বিচ্ছেদ ঘোষণা করা হয়।

৭. লোভনীয় প্রস্তাব পেশ :

অতঃপর তারা সাধারণ মুসলমানদের ফিরিয়ে আনার জন্য লোভনীয় প্রস্তাব সমূহ প্রেরণ করল। সেরা ধনী অলীদ বিন মুগীরাহর নেতৃত্বে তারা নির্যাতিত-নিপীড়িত নওমুসলিমদের বলতে লাগলো যে, তোমরা পিতৃধর্মে ফিরে এলে তোমাদের জীবনে সচ্ছলতা ও সুখ-সাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এ প্রেক্ষিতে আল্লাহ আয়াত নাযিল করেন,

قُلْ أَغَيْرَ اللهِ أَبْغِي رَبّاً وَهُوَ رَبُّ كُلِّ شَيْءٍ وَلاَ تَكْسِبُ كُلُّ نَفْسٍ إِلاَّ عَلَيْهَا وَلاَ تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى ثُمَّ إِلَى رَبِّكُم مَّرْجِعُكُمْ فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ فِيهِ تَخْتَلِفُونَ-
‘আপনি বলুন, আমি কি আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে পালনকর্তা হিসাবে কামনা করব? অথচ তিনিই সকল বস্ত্তর প্রতিপালক। যে ব্যক্তি কোন পাপ করে, সেটা তারই। কেউ কারু বোঝা বহন করবে না। তোমাদের প্রভুর নিকটেই তোমাদের ফিরে যেতে হবে। অতঃপর তিনিই তোমাদের জানিয়ে দিবেন যেসব বিষয়ে তোমরা বিরোধ করতে’ (আন‘আম ৬/১৬৪)।

৮. উদ্ভট দাবী সমূহ পেশ :
যেমন

(ক) কুরায়েশ নেতারা বলল, মুহাম্মাদ তুমি তোমার প্রভুকে বল যেন মক্কার পাহাড়গুলি সরিয়ে এস্থানটিকে সমতল ভূমিতে পরিণত করে দেন

(খ) এখানে নহর সমূহ প্রবাহিত করে দেন, যেমন সিরিয়া ও ইরাকে রয়েছে’ (

গ) ছাফা পাহাড়কে যেন স্বর্ণের পাহাড় বানিয়ে দেন।[6] (ঘ) তিনি যেন আমাদের বাপ-দাদাদের জীবিত করে দেন এবং তার মধ্যে যেন অবশ্যই আমাদের বিশ্বস্ত নেতা ও পূর্বপুরুষ কুছাই বিন কিলাব থাকেন। যিনি এসে বলবেন যে, হাঁ, আল্লাহর কাছে তোমার কিছু মর্যাদা আছে এবং তিনি তোমাকে রাসূল বানিয়ে পাঠিয়েছেন।
জবাবে রাসূল প্রেরণের তিনটি উদ্দেশ্য বর্ণনা করে আল্লাহ বলেন,

هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولاً مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِن كَانُوا مِن قَبْلُ لَفِي ضَلاَلٍ مُّبِيْنٍ-
‘তিনি সেই মহান সত্তা যিনি নিরক্ষরদের মধ্যে তাদের মধ্যকার একজনকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন, যিনি তাদের নিকটে তাঁর আয়াত সমূহ তেলাওয়াত করেন ও তাদের (হৃদয় জগতকে) পরিচ্ছন্ন করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত (অর্থাৎ কুরআন ও সুন্নাহ) শিক্ষা দেন। যদিও তারা ইতিপূর্বে ছিল স্পষ্ট ভ্রষ্টতার মধ্যে’(জুম‘আ ৬২/২)।

৯. দুনিয়াবী স্বার্থ লাভের দাবী পেশ :

এক সময় তারা তিনটি দাবী নিয়ে উপস্থিত হয়।

এক- যদি তুমি সত্যই নবী হয়ে থাক, তবে মো‘জেযার মাধ্যমে সারা পৃথিবীর ধন-ভান্ডার আমাদের কাছে এনে দাও।

দুই-আমাদের ভবিষ্যৎ ভাল-মন্দের বিষয়গুলি বলে দাও। যাতে আমরা আগেভাগে সাবধান হ’তে পারি।

তিন-তুমি একজন ফেরেশতাকে নবী হিসাবে এনে দাও, আমরা তাকে নেতা রূপে মেনে নেব। কেননা তুমি তো আমাদেরই মত একজন মানুষ মাত্র।
জবাবে আল্লাহ নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করেন,

قُل لآ أَقُولُ لَكُمْ عِنْدِيْ خَزَآئِنُ اللهِ وَلا أَعْلَمُ الْغَيْبَ وَلا أَقُولُ لَكُمْ إِنِّي مَلَكٌ إِنْ أَتَّبِعُ إِلاَّ مَا يُوحَى إِلَيَّ قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الأَعْمَى وَالْبَصِيرُ أَفَلاَ تَتَفَكَّرُونَ-
‘আপনি বলে দিন যে, আমি তোমাদেরকে একথা বলিনা যে, আমার কাছে আল্লাহর ধন-ভান্ডার সমূহ রয়েছে। তাছাড়া আমি অদৃশ্য বিষয় অবগত নই। আমি একথাও বলি না যে, আমি ফেরেশতা। আমি তো কেবল অহি-র অনুসরণ করি। যা আমার নিকটে প্রেরণ করা হয়। আপনি বলে দিন যে, অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কখনো কি সমান হয়? তোমরা কি চিন্তা করবে না? (আন‘আম৬/৫০)।

১০. বিভিন্ন অপযুক্তি প্রদর্শন :
যেমন-

(ক) তারা যুক্তি দেখিয়ে বলে, আল্লাহ প্রেরিত রাসূল হ’লে সে কখনো মানুষের মত খাওয়া-দাওয়া ও বাজার-ঘাট করে বেড়াত না। আল্লাহ বলেন,

وَقَالُوا مَالِ هَذَا الرَّسُولِ يَأْكُلُ الطَّعَامَ وَيَ مْشِي فِي الْأَسْوَاقِ لَوْلاَ أُنزِلَ إِلَيْهِ مَلَكٌ فَيَكُونَ مَعَهُ نَذِيراً-
‘তারা বলে যে, এ কেমন রাসূল খাদ্য আহার করে ও হাটে-বাজারে চলাফেরা করে? কেন তার নিকটে ফেরেশতা নাযিল হ’ল না যে তার সাথে ভয় প্রদর্শনকারী হ’ত’ (ফুরক্বান২৫/৭)।
জবাবে আল্লাহ বলেন,

وَلَوْ جَعَلْنَاهُ مَلَكاً لَّجَعَلْنَاهُ رَجُلاً وَلَلَبَسْنَا عَلَيْهِم مَّا يَلْبِسُونَ-
‘যদি আমরা কোন ফেরেশতাকে রাসূল করে পাঠাতাম, তবে সে মানুষের আকারেই হ’ত এবং তাকে ঐ ধরনের পোষাক পরাতাম, যা তারা পরিধান করে’(আন‘আম৬/৯)।

(খ) তারা বলল, যদি নিতান্তই কোন মানুষকে নবী করার ইচ্ছা ছিল, তাহ’লে মক্কা ও ত্বায়েফের বিত্তবান প্রভাবশালী কোন ব্যক্তিকে কেন নবী করা হল না? আল্লাহ বলেন,

وَقَالُوا لَوْلَا نُزِّلَ هَذَا الْقُرْآنُ عَلَى رَجُلٍ مِّنَ الْقَرْيَتَيْنِ عَظِيمٍ-
‘তারা বলে, কুরআন কেন দুই জনপদের কোন প্রধান ব্যক্তির উপরে অবতীর্ণ হল না?(যুখরুফ৪৩/৩১)।

জবাবে আল্লাহ বলেন,
أَهُمْ يَقْسِمُونَ رَحْمَةَ رَبِّكَ
‘তারা কি আপনার প্রতিপালকের রহমত বণ্টন করবে? (যুখরুফ৪৩/৩২)।
অর্থাৎ আল্লাহ কাকে নবুঅত দান করবেন এটা কেবল তাঁরই এখতিয়ার। রহমত বণ্টনের দায়িত্ব সম্পর্ণরূপে তাঁর হাতে।

(গ) কোন যুক্তিতে কাজ না হওয়ায় অবশেষে তারা অজুহাত দিল, যদি আল্লাহ চাইতেন, তাহ’লে আমরা শিরক করতাম না।
যেমন আল্লাহ বলেন, سَيَقُولُ الَّذِينَ أَشْرَكُواْ لَوْ شَاء اللهُ مَا أَشْرَكْنَا وَلاَ آبَاؤُنَا وَلاَ حَرَّمْنَا مِن شَيْءٍ كَذَلِكَ كَذَّبَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِم حَتَّى ذَاقُواْ بَأْسَنَا قُلْ هَل ْ عِندَكُم مِّنْ عِلْمٍ فَتُخْرِجُوهُ لَنَا إِن تَتَّبِعُونَ إِلاَّ الظَّنَّ وَإِنْ أَنتُمْ إَلاَّ تَخْرُصُونَ-
‘এখন মুশরিকরা বলবে, যদি আল্লাহ ইচ্ছা করতেন তাহলে না আমরা শিরক করতাম, না আমাদের বাপ-দাদারা … আপনি বলুন, তোমাদের কাছে কি কোন প্রমাণ আছে যে, আমাদের দেখাতে পার? তোমরা কেবল ধারণার অনুসরণ কর এবং কেবল অনুমান করে কথা বলে থাক’ (আন‘আম৬/১৪৮)। অথচ বান্দা শিরক ও কুফরীতে লিপ্ত হউক, এটা কখনোই আল্লাহ চান না। যেমন তিনি বলেন, وَلاَيَرْضَى لِعَبِادِهِ الْكُفْرَ ‘তিনি তার বান্দাদের কুফরীতে সন্তুষ্ট নন (যুমার৩৯/৭)।

রাসূল (ছাঃ) -এর নবুঅত লাভ ও ছালাতের নির্দেশনা


নবুঅতের দ্বারপ্রান্তে নিঃসঙ্গপ্রিয়তা :

নবুঅত লাভের সময়কাল যতই ঘনিয়ে আসতে লাগল, তাঁর মধ্যে নিঃসঙ্গপ্রিয়তার প্রবণতা ততই বাড়তে লাগল। এক সময় তিনি কা‘বা গৃহ থেকে প্রায় ৬ কিঃ মিঃ উত্তর-পূর্বে হেরা পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত ৪১১/৩ গজ আকারের ছোট গুহার নিরিবিলি স্থানকে বেছে নিলেন। বাড়ী থেকে পানি ও ছাতু নিয়ে যেতেন। ফুরিয়ে গেলে আবার আসতেন। কিন্তু বাড়ীতে তার মন বসতো না। কখনো কখনো সেখানে রাত কাটাতেন। পরপর ২টি রামাযান তিনি সেখানে ই‘তেকাফে কাটান।

বয়স চল্লিশে পদার্পণ করল। রবীউল আউয়ালের জন্ম মাস থেকে শুরু হ’ল ‘সত্য স্বপ্ন’ (الرؤيا الصادقة) দেখা। তিনি স্বপ্নে যাই দেখতেন তাই-ই দিবালোকের মত সত্য হয়ে দেখা দিত। এভাবে চলল প্রায় ছয় মাস। যা ছিল ২৩ বছরের নবুঅতকালের ৪৬ ভাগের এক ভাগ। রাসূলের নির্জনতা ও একাগ্রতা এমনভাবে বেড়ে গেল যে, এখন আর তিনি বাড়ী ফিরতে চান না। খাদীজা তাকে খাদ্য সরবরাহ ও অন্যান্য সহযোগিতা করতে থাকলেন। স্বগোত্রীয় লোকদের পৌত্তলিক ও বস্ত্তবাদী ধ্যানধারণা তাকে পাগল করে তুলত।

নুযূলে কুরআন :

এভাবে এসে গেল সেই শুভক্ষণ। ২১শে রামাযান সোমবারের ক্বদরের রাত্রি। ফেরেশতা জিবরীলের আগমন হল। ধ্যানমগ্ন মুহাম্মাদকে বললেন, اِقْرَأْ ‘পড়’। বললেন, مَاأَنَا بِقَاِرئ ‘আমি তো পড়তে জানিনা’। অতঃপর তাকে বুকে চেপে ধরলেন ও বললেন, পড়। কিন্তু একই জবাব, ‘পড়তে জানিনা’। এভাবে তৃতীয়বার আলিঙ্গন শেষে তিনি পড়তে শুরু করলেন,

اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِيْ خَلَقَ- خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ- اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ- الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ- عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ-
(১) ‘পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন’ (২) ‘সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে’ (৩) ‘পড় এবং তোমার প্রভু বড়ই দয়ালু’ (৪) ‘যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দান করেছেন’ (৫) ‘তিনি মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন যা সে জানত না’। মাত্র পাঁচটি আয়াত নাযিল হল। তারপর ফেরেশতা অদৃশ্য হয়ে গেল।

নতুনের শিহরণ ও খাদীজার বিচক্ষণতা

নতুন অভিজ্ঞতা লাভে শিহরিত মুহাম্মাদ দ্রুত বাড়ী ফিরলেন। স্ত্রী খাদীজাকে বললেন, زَمِّلُوْنِى زَمِّلُوْنِى ‘শিগগীর আমাকে চাদর মুড়ি দাও। চাদর মুড়ি দাও’। কিছুক্ষণ পর ভয়ার্তভাব কেটে গেলে সব কথা খাদীজাকে খুলে বললেন। রাসূলের নিকটে খাদীজা কেবল স্ত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন তাঁর নির্ভরতার প্রতীক ও সান্ত্বনার স্থান। ছিলেন বিপদের বন্ধু। তিনি অভয় দিয়ে বলে উঠলেন, এটা খারাপ কিছু হতেই পারে না। ‘কখনোই না। আল্লাহর কসম! তিনি কখনোই আপনাকে অপদস্থ করতে পারেন না। ‘আপনি আত্মীয়দের সঙ্গে সদাচরণ করেন, দুস্থদের বোঝা বহন করেন, নিঃস্বদের কর্মসংস্থান করেন, অতিথিদের আপ্যায়ন করেন এবং বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করেন’।

অতঃপর তিনি তাঁকে সাথে নিয়ে চাচাতো ভাই অরাক্বা বিন নওফেলের কাছে গেলেন। যিনি ইনজীল কিতাবের আলেম ছিলেন এবং ঐ সময় চরম বার্ধক্যে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি সবকথা শুনে বললেন, ‘এ তো সেই ফেরেশতা যাকে আল্লাহ মূসার প্রতি নাযিল করেছিলেন। হায়! যদি আমি সেদিন তরুণ থাকতাম! হায়! যদি আমি সেদিন জীবিত থাকতাম, যেদিন তোমার কওম তোমাকে বহিষ্কার করবে’। একথা শুনে চমকে উঠে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, ‘ওরা কি আমাকে বের করে দিবে’? অরাক্বা বললেন, ‘হ্যাঁ! তুমি যা নিয়ে আগমন করেছ, তা নিয়ে ইতিপূর্বে এমন কেউ আগমন করেননি, যার সাথে শত্রুতা করা হয়নি’। অতঃপর অরাক্বা তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, إِ ‘যদি তোমার সেই দিন আমি পাই, তবে আমি তোমাকে যথাযোগ্য সাহায্য করব’।

অহি-র বিরতিকাল

অরাক্বা বিন নওফেলের কাছে সবকিছু শুনে নবী করীম (ছাঃ) আশা ও আশংকার দোলায় দোলায়িত হয়ে পুনরায় হেরা গুহায় ই’তেকাফে ফিরে এলেন এবং পুনরায় অহি নাযিলের অপেক্ষা করতে লাগলেন। এভাবে দশদিন অতিবাহিত করে রামাযান শেষে পূর্বের নিয়মানুযায়ী ১লা শাওয়াল সকালে ই’তেকাফ শেষ করে বাড়ী অভিমুখে রওয়ানা হলেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, এমন সময় আমি আসমান থেকে একটা আওয়ায পাই। তাকিয়ে দেখি যে, সেদিনের সেই ফেরেশতা আসমান ও যমীনের মধ্যবর্তী স্থানে কুরসীর উপরে বসে আছেন। আমি ভীত বিহবল হয়ে মাটিতে পড়ে যাবার উপক্রম হই। অতঃপর দ্রুত বাড়ী ফিরে স্ত্রীকে বলি, আমাকে চাদর মুড়ি দাও, চাদর মুড়ি দাও, চাদর মুড়ি দাও’।
কিন্তু না অল্পক্ষণের মধ্যেই গুরুগম্ভীর স্বরে ‘অহি’ নাযিল হ’ল-

يَآ أَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ- قُمْ فَأَنذِرْ- وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ- وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ- وَالرُّجْزَ فَاهْجُرْ-
(১) ‘হে চাদরাবৃত! (২) উঠো, মানুষকে (আল্লাহর) ভয় দেখাও, (৩) তোমার প্রভুর মাহাত্ম্য ঘোষণা কর, (৪) তোমার পোশাক পবিত্র রাখো, (৫) অপবিত্রতা পরিহার কর’(মুদ্দাছছির ৭৪/১-৫)। এরপর থেকে ‘অহি’ চালু হয়ে গেল’। ২১শে রামাযানের কদর রাতে প্রথম অহি নাযিলের পর থেকে এই দশদিনের বিরতিকালকে فترة الوحى বা অহি-র বিরতিকাল বলা হয়। এটি আড়াই বা তিন বছরের জন্য ছিল না, যা প্রসিদ্ধ আছে। = (আর-রাহীক্ব পৃঃ ৬৯)।

অহি-র প্রকারভেদ

‘অহি’ (الوحى) অর্থ প্রত্যাদেশ, যা আল্লাহর পক্ষ হ’তে তাঁর নির্বাচিত বান্দার নিকটে হয়ে থাকে। হাফেয ইবনুল ক্বাইয়িম নবীদের নিকটে অহি-র সাতটি প্রকারভেদ বর্ণনা করেছেন:-

(১) সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে।

(২) অদৃশ্য থেকে হৃদয়ে অহি-র প্রক্ষেপন, যা জিব্রীল মাঝে-মধ্যে রাসূলের উপরে করতেন

(৩) মানুষের রূপ ধারণ করে জিব্রীল এসে অহী বর্ণনা করে শুনাতেন।

(৪) ঘণ্টাধ্বনির আওয়ায করে ‘অহি’ নাযিল হ’ত। এ সময় রাসূল (ছাঃ) খুব কষ্ট অনুভব করতেন।

(৫) জিব্রীল (আঃ) স্বরূপে এসে অহি প্রদান করতেন। এটি দু’বার ঘটেছে

(৬) মে‘রাজ রজনীতে আসমানে অবস্থানকালে আল্লাহর সরাসরি অহি-র মাধ্যমে ছালাত ফরয করণ

(৭) আল্লাহ স্বীয় নবীর সঙ্গে সরাসরি ফেরেশতার মাধ্যম ছাড়াই পর্দার অন্তরাল থেকে কথা বলেন। যেমন মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে তূর পাহাড়ে কথা বলার প্রমাণ কুরআনে বর্ণিত হয়েছে এবং শেষনবীর সঙ্গে মে‘রাজ রজনীতে আরশের নিকটে কথোপকথনের প্রমাণ হাদীছে বিধৃত হয়েছে। =(আর-রাহীক্ব পৃঃ ৭০)।

ছালাতের নির্দেশনা

মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে নবুঅতের শুরু থেকেই সকাল ও সন্ধ্যায় দু’বার ছালাত আদায়ের নির্দেশনা দান করা হয়। যেমন আল্লাহ বলেন,

وَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ بِالْعَشِيِّ وَالْإِبْكَارِ
‘তুমি তোমার প্রভুর প্রশংসা জ্ঞাপন কর সন্ধ্যায় ও সকালে’ (মুমিন/গাফের ৪০/৫৫)। প্রথম কুরআন নাযিলের পর জিব্রীলের মাধ্যমে তিনি ওযূ ও ছালাত আদায় শিখেন।হিজরতের স্বল্পকাল পূর্বে মে‘রাজ সংঘটিত হবার আগ পর্যন্ত ফজরের দুরাক‘আত ও মাগরিবের দুরাক‘আত করে ছালাত আদায়ের নিয়ম জারি থাকে। অতঃপর নিয়মিতভাবে পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত ফরয হয় মে‘রাজের রাত্রিতে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও তাঁর সাথীগণ প্রথম তিন বছর গোপনে এই ছালাত আদায় করতেন এবং লোকদেরকে গাছ, পাথর, চন্দ্র, সূর্য ইত্যাদির উপাসনা পরিত্যাগ করে আল্লাহর ইবাদত শিক্ষা দিতেন। পরে يَااَيُّهَا الْمُزَّمِّلُ (হে বস্ত্রাবৃত!) বলে সূরা মুযযাম্মিল নাযিল করে আল্লাহ রাতে প্রায় সিকি অংশ তাহাজ্জুদের ছালাতে কাটিয়ে দেবার জন্য তাঁর নবী ও সাথীদের উপরে ফরয করে দেন। পরবর্তীতে মে‘রাজে পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত ফরয হলে তাহাজ্জুদ নফল হয়ে যায়।

শিশু, যুবক ও ব্যবসায়ী মুহাম্মাদ


ধাত্রীগৃহে মুহাম্মাদ :
সে সময়ে শহরবাসী আরবদের মধ্যে এই প্রথা চালু ছিল যে, শহরের জনাকীর্ণ পংকিল পরিবেশ থেকে দূরে গ্রামের উন্মুক্ত পরিবেশে শিশুদের লালন-পালন করলে তারা বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি হতে মুক্ত থাকে এবং তাদের স্বাস্থ্য সুঠাম ও সবল হয়। সর্বোপরি তারা বিশুদ্ধ আরবী ভাষায় কথা বলতে অভ্যস্ত হয়। সে হিসাবে দাদা আব্দুল মুত্ত্বালিব সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত ধাত্রী হিসাবে বনু সাদ গোত্রের হালীমা সাদিয়াহকে নির্বাচন করেন এবং তার হাতেই প্রাণাধিক পৌত্রকে সমর্পণ করেন।

বক্ষ বিদারণ :

হালীমার নিকটে আসার পর জন্মের চতুর্থ কিংবা পঞ্চম বছরে শিশু মুহাম্মাদের সীনা চাক বা বক্ষ বিদারণের বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে। ব্যাপারটি ছিল এই যে, মুহাম্মাদ অন্যান্য সাথীদের সাথে খেলছিলেন। এমন সময় জিবরাঈল ফেরেশতা এসে তাকে অনতিদূরে নিয়ে বুক চিরে ফেলেন। অতঃপর কলীজা বের করে যমযমের পানি দিয়ে ধুয়ে কিছু জমাট রক্ত ফেলে দিলেন এবং বললেন, هذا حظ الشيطان منك ‘শয়তানের যে অংশ তোমার মধ্যে ছিল, সেটা এই’। অতঃপর বুক পূর্বের ন্যায় জোড়া লাগিয়ে দিয়ে তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন। এই অলৌকিক ঘটনায় হালীমা ভীত হয়ে পড়েন এবং একদিন তাঁকে তার মায়ের কাছে ফেরত দিয়ে যান। তখন তার বয়স ছয় বছর।

আমেনার ইয়াছরিব গমন ও মৃত্যুবরণ :

প্রাণাধিক সন্তানকে কাছে পেয়ে আমেনা তার প্রাণপ্রিয় স্বামীর কবর যেয়ারত করার মনস্থ করেন। শ্বশুর আব্দুল মুত্ত্বালিব সব ব্যবস্থা করে দেন। সেমতে পুত্র মুহাম্মাদ ও পরিচারিকা উম্মে আয়মনকে নিয়ে তিনি মক্কা হতে ৫০০ কিঃ মিঃ দূরে মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। অতঃপর যথাসময়ে মদীনায় পৌঁছে নাবেগা আল-জাদী পরিবারের গোরস্থানে স্বামীর কবর যেয়ারত করেন। অতঃপর সেখানে এক মাস বিশ্রাম নেন। এরপর পুনরায় মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। কিন্তু কিছু দূর এসেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন ও ‘আবওয়া’ নামক স্থানে মৃত্যুবরণ করেন। উম্মে আয়মন শিশু মুহাম্মাদকে মক্কায় নিয়ে আসেন। এভাবে জন্ম থেকে পিতৃহারা ইয়াতীম মুহাম্মাদ মাত্র ৬ বছর বয়সে মাকে হারিয়ে পুনরায় ইয়াতীম হলেন।

দাদার স্নেহনীড়ে মুহাম্মাদ : ইয়াতীম মুহাম্মাদ এবার এলেন প্রায় ৮০ বছরের বৃদ্ধ দাদা আব্দুল মুত্ত্বালিবের স্নেহনীড়ে। কিন্তু এ স্নেহনীড় বেশী দিন স্থায়ী হয়নি। মাত্র দু’বছর পরে শিশু মুহাম্মাদের বয়স যখন ৮ বছর ২ মাস ১০দিন, তখন তার দাদা আব্দুল মুত্ত্বালিব ৮২ বছর বয়সে মক্কায় ইন্তেকাল করেন। ফলে তাঁর অছিয়ত অনুযায়ী আপন চাচা আবু ত্বালিব তার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং আমৃত্যু প্রায় চল্লিশ বছর যাবৎ তিনি ভাতীজার অভিভাবক হিসাবে জীবনপাত করেন।

শিশু মুহাম্মাদের কিছু বরকত মন্ডিত নিদর্শন :

(১) হালীমা সা‘দিয়াহ বলেন, ক্ষুধায়-তৃষ্ণায় আমার বুকের দুধ শুকিয়ে গিয়েছিল। বাহন মাদী গাধাটির অবস্থাও ছিল তদ্রুপ। কেননা এই সময় আরব ভূমিতে দুর্ভিক্ষের বছর চলছিল। ফলে বেশী অর্থ পাবে না বলে ইয়াতীম মুহাম্মাদকে কেউ নিতে চাচ্ছিল না। অবশেষে আমি তাকে নিতে সম্মত হ’লাম। অতঃপর যখন তাকে বুকে রাখলাম, তখন সে এবং আমার গর্ভজাত সন্তান দুজনে পেটভরে আমার বুকের দুধ খেয়ে ঘুমিয়ে গেল। ওদিকে উটনীর পালান দুধে ভরে উঠল। যার দুধ আমরা সবাই তৃপ্তির সাথে পান করলাম। তখন আমার স্বামী হারেছ বললেন, হালীমা। আল্লাহর শপথ! তুমি এক মহাভাগ্যবান সন্তান লাভ করেছ। তারপর বাড়ীতে ফিরে আসার সময় দেখা গেল যে, আমাদের সেই দুর্বল মাদী গাধাটি এত তেযী হয়ে গেছে যে, কাফেলার সবাইকে পিছনে ফেলে সে এগিয়ে যাচ্ছে। যা দেখে সবাই আশ্চর্য হয়ে গেল।

(২) বাড়ীতে ফিরে এসে দেখা গেল আমাদের রাখাল যে চারণভূমিতে পশুপাল নিয়ে যেত অন্যান্য রাখালরাও সেখানে তাদের পশুপাল নিয়ে যেত। কিন্তু তাদের পশুগুলো ক্ষুধার্ত অবস্থায় ফিরত। অথচ আমাদের পশুপাল পরিতৃপ্ত অবস্থায় এবং পালানে দুধভর্তি অবস্থায় বাড়ী ফিরত।

(৩) কা‘বা চত্বরের যে নির্দিষ্ট স্থানটিতে দাদা আব্দুল মুত্ত্বালিব বসতেন, সেখানে তার জন্য নির্দিষ্ট আসনে কেউ বসতো না। কিন্তু শিশু মুহাম্মাদ ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি এসে সরাসরি দাদার আসনেই বসে পড়তেন। তার চাচারা তাকে সেখান থেকে নামিয়ে দিতে চাইলে দাদা আব্দুল মুত্ত্বালিব তাকে নিজের কাছেই বসাতেন ও গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বলতেন, دعوا إبنى هذا فو الله إن له لشأنًا ‘আমার এ বেটাকে ছেড়ে দাও। আল্লাহর কসম এর মধ্যে বিশেষ কিছু শুভ লক্ষণ আছে’।

(৪) দাদার মৃত্যুর পর শিশু মুহাম্মাদ চাচা আবু ত্বালিবের নিকটে লালিত-পালিত হন। আবু ত্বালিব তখন কুরায়েশগণের সরদার। বৃষ্টির অভাবে মক্কায় দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। লোকেরা এসে আবু ত্বালিবকে বলল, চলুন সবাই আল্লাহর নিকটে পানি প্রার্থনা করি। আবু ত্বালিব শিশু মুহাম্মাদকেও সাথে নিলেন এবং কা‘বা গৃহের দেয়াল ঘেঁষে নিজের কাছে দাঁড় করিয়ে পানি প্রার্থনা করলেন। এমন সময় আকাশ জুড়ে মেঘের আনাগোনা শুরু হয়ে গেল। অতঃপর মুষলধারে বৃষ্টি নেমে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সব ভরে উঠলো। তৃষিত মক্কায় আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। এই ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করে মুগ্ধ-বিস্মিত আবু ত্বালিব ভাতীজার প্রশংসায় বলেন,

وابيض يستقسى الغمام بوجهه * ثمال اليتامى عصمة الأرامل
‘শুভ্র দর্শন (মুহাম্মাদ) যার চেহারার অসীলায় বৃষ্টি প্রার্থনা করা হয়ে থাকে। সে যে ইয়াতীমদের আশ্রয়স্থল ও বিধবাদের রক্ষক’।

কিশোর মুহাম্মাদ

১২ বছর বয়সে চাচার সাথে ব্যবসা উপলক্ষে সর্বপ্রথম সিরিয়া গমন করেন। সেখানে জারজীস ওরফে বুহায়রা নামক জনৈক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাহেব অর্থাৎ খৃষ্টান পাদ্রীর সাথে সাক্ষাৎ হলে তিনি মক্কার কাফেলাকে গভীর আতিথেয়তায় আপ্যায়িত করেন এবং কিশোর মুহাম্মাদের হাত ধরে কাফেলা নেতা আবু ত্বালেবকে বলেন, هَذَا سَيِّدُ الْعَالَمِيْنَ هَذَا يَبْعَثُهُ اللهُ رَحْمَةً لِِّلْعَالَمِيْنَ ‘এই বালক হল বিশ্ব জাহানের নেতা একে আল্লাহ বিশ্ব চরাচরের রহমত হিসাবে প্রেরণ করবেন’। অতঃপর চাচা তাকে কিছু গোলামের সাথে মক্কায় পাঠিয়ে দিলেন।

তরুণ মুহাম্মাদ

তিনি যখন পনের কিংবা বিশ বছর বয়সে উপনীত হন, তখন ‘ফিজার যুদ্ধ’ শুরু হয়। এই যুদ্ধে একপক্ষে ছিল কুরায়েশ ও তাদের মিত্র বনু কিনানাহ এবং অপর পক্ষে ছিল ক্বায়েস আয়লান। যুদ্ধে কুরায়েশ পক্ষের জয় হয়। কিন্তু এ যুদ্ধের ফলে সম্মানিত মাস (যে মাসে যুদ্ধ বিগ্রহ নিষিদ্ধ) এবং কা‘বার পবিত্রতা বিনষ্ট হয় বলে একে ‘হারবুল ফিজার’ বা দুষ্টদের যুদ্ধ বলা হয়। তরুণ মুহাম্মাদ এই যুদ্ধে চাচাদের তীর যোগান দেবার কাজে সহায়তা করেন।

‘হিলফুল ফুযূল’ বা ‘কল্যাণকামীদের সংঘ’ :

ফিজার যুদ্ধের ভয়াবহতা স্বচক্ষে দেখে দয়াশীল মুহাম্মাদের মনে দারুণ প্রতিক্রিয়া হয়। যাতে ভবিষ্যতে এইরূপ ধ্বংসলীলা আর না ঘটে, সেজন্য তিনি গভীর চিন্তায় মগ্ন হলেন। রাসূল তার চাচা যুরায়ের বিন আব্দুল মুত্ত্বালিব এর সহায়তায় সর্বজন শ্রদ্ধেয় প্রবীণ নেতা আব্দুল্লাহ বিন জাদ‘আন তায়মীর গৃহে বনু হাশেম, বনু মুত্ত্বালিব, বনু আসাদ, বনু যোহরা, বনু তামীম প্রভৃতি গোত্রপ্রধানদের ডেকে বৈঠক করেন। উক্ত বৈঠকে রাসূলের দাদা ও নানার গোত্র সহ পাঁচটি গোত্র যোগদান করে। তারা হ’ল বনু হাশেম, বনু মুত্ত্বালিব, বনু আসাদ, বনু যোহরা, বনু তামীম। উক্ত বৈঠকে তরুণ মুহাম্মাদ কতগুলি কল্যাণমূলক প্রস্তাব পেশ করেন, যা নেতৃবৃন্দের প্রশংসা অর্জন করে এবং চাচা যোবায়েরের দৃঢ় সমর্থনে বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে চারটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। মূলতঃ ভাতিজা মুহাম্মাদ ছিলেন উক্ত কল্যাণচিন্তার উদ্ভাবক এবং পিতৃব্য যোবায়ের ছিলেন তার প্রথম ও প্রধান সমর্থক।

আল-আমীন মুহাম্মাদ :

হিলফুল ফুযূল গঠন ও তার পরপরই যবরদস্ত কুরায়েশ নেতার কাছ থেকে বহিরাগত মযলূমের হক আদায়ের ঘটনায় চারিদিকে তরুণ মুহাম্মাদের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল। সবার মুখে মুখে তিনি ‘আল-আমীন’ অর্থাৎ বিশ্বস্ত ও আমানতদার বলে অভিহিত হতে থাকেন। অল্পবয়স হওয়া সত্ত্বেও কেউ তার নাম ধরে ডাকতো না। সবাই শ্রদ্ধাভরে ‘আল-আমীন’ বলে ডাকত।

যুবক ও ব্যবসায়ী মুহাম্মাদ

এখন তিনি পঁচিশ বছরের পরিণত যুবক। কুরায়েশ বংশে অনেকে ছিলেন, যারা নির্দিষ্ট লভ্যাংশের বিনিময়ে ব্যবসায়ে পুঁজি বিনিয়োগ করতেন। কিন্তু নিজেরা সরাসরি ব্যবসায়িক সফরে যেতেন না। এজন্য তারা সর্বদা বিশ্বস্ত ও আমানতদার লোক তালাশ করতেন। খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ ছিলেন এমনই একজন বিদুষী ব্যবসায়ী মহিলা। মুহাম্মাদের সততা ও আমানতদারীর কথা শুনে তিনি তার নিকটে অন্যদের চেয়ে অধিক লভ্যাংশ দেওয়ার অঙ্গীকারে ব্যবসায়ের প্রস্তাব পাঠান। চাচার সাথে পরামর্শক্রমে তিনি এতে রাযী হয়ে যান। অতঃপর খাদীজার গোলাম মায়সারাকে সাথে নিয়ে প্রথম ব্যবসায়িক সফরে তিনি সিরিয়া গমন করেন। ব্যবসা শেষে মক্কায় ফিরে আসার পরে হিসাব-নিকাশ করে মূল পুঁজি সহ এতবেশী লাভ হস্তগত হয় যে, খাদীজা ইতিপূর্বে কারু কাছ থেকে এত লাভ পাননি।

বিবাহ :

ব্যবসায়ে অভাবিত সাফল্যে খাদীজা দারুণ খুশী হন। অন্যদিকে গোলাম মায়সারার কাছে মুহাম্মাদের মিষ্টভাষিতা, সত্যবাদিতা, আমানতদারী এবং উন্নত চিন্তা-চেতনার কথা শুনে বিধবা খাদীজা মুহাম্মাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে পড়েন। তিনি নিজেই বান্ধবী নাফীসার মাধ্যমে নিজের বিয়ের পয়গাম পাঠালেন যুবক মুহাম্মাদ- এর নিকটে। তখন উভয় পক্ষের মুরববীদের সম্মতিক্রমে শাম থেকে ফিরে আসার মাত্র দুমাসের মাথায় সমাজ নেতাদের উপস্থিতিতে ধুমধামের সাথে তাদের বিবাহ সম্পন্ন হয়। মুহাম্মাদ স্বীয় বিবাহের মোহরানা স্বরূপ ২০টি উট প্রদান করেন। এই সময় খাদীজা ছিলেন মক্কার শ্রেষ্ঠ ধনী ও সম্ভ্রান্ত মহিলা এবং সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারিণী হিসাবে তিনি ‘তাহেরা’ (পবিত্রা) নামে খ্যাত ছিলেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ৪০ এবং মুহাম্মাদের বয়স ছিল ২৫। মুহাম্মাদ ছিলেন খাদীজার তৃতীয় স্বামী। অন্যদিকে খাদীজা ছিলেন মুহাম্মাদের প্রথমা স্ত্রী।

সন্তান-সন্ততি :

পঁচিশ বছর তাঁদের দাম্পত্য জীবন স্থায়ী হয়। ইবরাহীম ব্যতীত রাসূলের সকল সন্তান ছিলেন খাদীজার গর্ভজাত। তিনি বেঁচে থাকা অবধি রাসূল (ছাঃ) দ্বিতীয় বিবাহ করেননি। খাদীজার গর্ভে রাসূলের প্রথম সন্তান ছিল ক্বাসেম। তার নামেই রাসূলের উপনাম ছিল আবুল ক্বাসেম। অতঃপর কন্যা যয়নব, রুক্বাইয়া, উম্মে কুলছূম, ফাতেমা সবশেষে পুত্র আব্দুল্লাহ, যার লকব ছিল ত্বাইয়িব ও ত্বাহের। রাসূলের সকল পুত্র সন্তান শৈশবেই মারা যান। কন্যাগণ সবাই বিবাহিত হন ও হিজরত করেন। কিন্তু ফাতেমা ব্যতীত সবাই রাসূলের জীবদ্দশায় মৃত্যুবরণ করেন। রাসূলের মৃত্যুর ছয় মাস পরে ফাতেমা মৃত্যু বরণ করেন। রাসূলের অন্য পুত্র ‘ইবরাহীম’ ছিলেন অন্য স্ত্রী মারিয়া ক্বিবতীয়ার গর্ভজাত। যিনি মদীনায় সর্বশেষ সন্তান হিসাবে জন্মগ্রহণ করেন এবং দুধ ছাড়ার আগেই ১০ম হিজরীর ২৯ শাওয়াল সোমবার মাত্র ১৮ মাস বয়সে ইন্তেকাল করেন।

কা‘বা গৃহ পুনর্নির্মাণ ও মুহাম্মাদের মধ্যস্থতা

আল-আমীন মুহাম্মাদ-এর বয়স যখন ৩৫ বছর, তখন কুরায়েশ নেতাগণ কা‘বাগৃহ ভেঙ্গে পুনর্নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। কা‘বা অর্থই হ’ল চতুর্দেওয়াল বিশিষ্ট ঘর। অধিকন্তু একটি দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঐ সময় ঘটে যায়, যা ইতিপূর্বে কখনো ঘটেনি এবং যা কা‘বা পুনর্নির্মাণে প্রত্যক্ষ কারণ হিসাবে কাজ করে। ঘটনাটি ছিল এই যে, কিছু চোর দেওয়াল টপকে কা‘বা গৃহে প্রবেশ করে এবং সেখানে রক্ষিত মূল্যবান মালামাল ও অলংকারাদি চুরি করে নিয়ে যায়। অতঃপর কা‘বা গৃহ পুনর্নির্মাণের উদ্দেশ্যে কুরায়েশ নেতৃবৃন্দ বৈঠকে বসে স্থির করেন যে, কারু কোনরূপ হারাম মাল এর নির্মাণ কাজে লাগানো যাবে না। কোন্ কোন্ গোত্র কোন্ পাশের দেওয়াল নির্মাণ করবে সে সিদ্ধান্ত হয়ে যায়। সাথে সাথে এবার ছাদ নির্মাণের প্রস্তাব গৃহীত হয়। কিন্তু কে আগে দেওয়াল ভাঙ্গার সূচনা করবে? অবশেষে ওয়ালীদ বিন মুগীরাহ মাখযূমী সাহস করে প্রথম ভাঙ্গা শুরু করেন। তারপর সকলে মিলে দেওয়াল ভাঙ্গা শেষ করে ইবরাহীম (আঃ)-এর স্থাপিত ভিত পর্যন্ত গিয়ে ভাঙ্গা বন্ধ করে দেন। অতঃপর সেখান থেকে নতুনভাবে সর্বোত্তম পাথর দিয়ে ‘বাকুম’ (باقوم بنّاء رومى) নামক জনৈক রোমক কারিগরের তত্ত্বাবধানে নির্মাণকার্য শুরু হয়।

কিন্তু গোল বাঁধে দক্ষিণ- পূর্ব কোণে ‘হাজারে আসওয়াদ’ স্থাপনের পবিত্র দায়িত্ব কোন্ গোত্র পালন করবে সেটা নিয়ে। এই বিবাদ অবশেষে রক্তারক্তিতে গড়াবার আশংকা দেখা দিল। এই সময় প্রবীণ নেতা আবু উমাইয়া মাখযূমী প্রস্তাব করলেন যে, আগামীকাল সকালে যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম ‘হারাম’ শরীফে প্রবেশ করবেন, তিনিই এই সমস্যার সমাধান করবেন। সবাই এ প্রস্তাব মেনে নিল।

আল্লাহর অপার মহিমা। দেখা গেল যে, সকালে সবার আগে মাসজিদুল হারামে প্রবেশ করলেন সকলের প্রিয় আল-আমীন। তাকে দেখে সবাই বলে উঠলো- هذا محمد هذا الأمين قد رضينابه ‘এযে মুহাম্মাদ, এযে আল-আমীন, আমরা সবাই তার উপরে সন্তুষ্ট’। তিনি ঘটনা শুনে সহজেই মীমাংসা করে দিলেন। তিনি একটা চাদর চাইলেন। অতঃপর সেটা বিছিয়ে নিজ হাতে ‘হাজারে আসওয়াদ’-টি তার মাঝখানে রেখে দিলেন। অতঃপর নেতাদের বললেন, আপনারা সকলে মিলে চাদরের চারপাশ ধরুন অতঃপর উঠিয়ে নিয়ে চলুন। তাই করা হল। কা‘বার নিকটে গেলে তিনি পাথরটি উঠিয়ে যথাস্থানে রেখে দিলেন। সবাই সন্তুষ্ট হয়ে মুহাম্মাদের তারিফ করতে করতে চলে গেল।

ইসমাইল হোসেন