05 March, 2018

বাংলায় যুক্তাক্ষর লেখার নিয়ম। কম্পিউটারে বিজয় বাংলা টাইপিং এ যারা দুর্বল তাদের কাজে লাগবে।



আসসালামু আলাইকুম।
আজকের আমার পোস্ট তাদের জন্য উপকারে আসবে,
যারা বাংলা টাইপিং করে থাকেন।
অনেক সময় দেখা যাই, যুক্তাক্ষর না জানার কারনে কঠিন সময় গুলোতে বানান ভূল হয়ে বসে,
তাই আমি প্রত্যেক ইউজারকে বলবো,
প্রত্যেকেই যেন এই পোস্টি কপি করে নোট করে রাখবেন।
তাহলে শুরু করি,
১. ক্ষ = ক+ষ
২. ষ্ণ = ষ+ণ
৩. জ্ঞ = জ+ঞ
৪. ঞ্জ = ঞ+জ
৫. হ্ম = হ+ম
৬. ঞ্চ = ঞ+চ
৭. ঙ্গ = ঙ+গ
৮. ঙ্ক = ঙ+ক
৯. ট্ট = ট + ট
১০. ক্ষ্ম = ক্ষ + ম = ‍ক + ষ + ম
১১. হ্ন = হ + ন
১২. হ্ণ = হ + ণ
১৩. ব্ধ = ব + ধ
১৪. ক্র = ক + ্র (র-ফলা)
১৫. গ্ধ = গ + ধ
১৬. ত্র = ত + ্র (র-ফলা)
১৭. ক্ত = ক + ত
১৮. ক্স = ক + স
১৯. ত্থ = ত + থ
(উদাহরন: উত্থান,
উত্থাপন)
২০. ত্ত = ত + ত (উদাহরন: উত্তম, উত্তর,
সত্তর)
২১. ত্ম = ত + ম (উদাহরন: মাহাত্ম্য)
নিচের যুক্তবর্ণের
তালিকাটি বাংলা সঠিকভাবে লিখতে সহায়ক হতে পারে।
এখানে বাংলায় ব্যবহৃত
২৮৫টি যুক্তবর্ণ দেওয়া হয়েছে। এর
বাইরে কোন যুক্তবর্ণ সম্ভবত বাংলায়
প্রচলিত নয়।
ক্ক = ক + ক; যেমন- আক্কেল, টেক্কা
ক্ট = ক + ট;
যেমন- ডক্টর
(মন্তব্য: এই
যুক্তাক্ষরটি মূলত ইংরেজি/
বিদেশী কৃতঋণ শব্দে ব্যবহৃত)
ক্ট্র = ক + ট + র; যেমন- অক্ট্রয়
ক্ত = ক + ত; যেমন- রক্ত
ক্ত্র = ক + ত + র; যেমন- বক্ত্র
ক্ব = ক + ব; যেমন- পক্ব, ক্বণ
ক্ম = ক + ম; যেমন- রুক্মিণী
ক্য = ক + য; যেমন- বাক্য
ক্র = ক + র; যেমন- চক্র
ক্ল = ক + ল; যেমন- ক্লান্তি
ক্ষ = ক + ষ; যেমন- পক্ষ
ক্ষ্ণ = ক + ষ + ণ; যেমন- তীক্ষ্ণ
ক্ষ্ব = ক + ষ + ব; যেমন- ইক্ষ্বাকু
ক্ষ্ম = ক + ষ + ম; যেমন- লক্ষ্মী
ক্ষ্ম্য = ক + ষ + ম + য; যেমন- সৌক্ষ্ম্য
ক্ষ্য = ক + ষ + য; যেমন- লক্ষ্য
ক্স = ক + স; যেমন- বাক্স
খ্য = খ + য; যেমন- সখ্য
খ্র = খ+ র যেমন; যেমন- খ্রিস্টান
গ্ণ = গ + ণ; যেমন – রুগ্ণ
গ্ধ = গ + ধ; যেমন- মুগ্ধ
গ্ধ্য = গ + ধ + য; যেমন- বৈদগ্ধ্য
গ্ধ্র = গ + ধ + র; যেমন- দোগ্ধ্রী
গ্ন = গ + ন; যেমন- ভগ্ন
গ্ন্য = গ + ন + য; যেমন- অগ্ন্যাস্ত্র,
অগ্ন্যুৎপাত, অগ্ন্যাশয়
গ্ব = গ + ব; যেমন- দিগ্বিজয়ী
গ্ম = গ + ম; যেমন- যুগ্ম
গ্য = গ + য; যেমন- ভাগ্য
গ্র = গ + র; যেমন- গ্রাম
গ্র্য = গ + র + য; যেমন- ঐকাগ্র্য, সামগ্র্য,
গ্র্যাজুয়েট
গ্ল = গ + ল; যেমন- গ্লানি
ঘ্ন = ঘ + ন; যেমন- কৃতঘ্ন
ঘ্য = ঘ + য; যেমন- অশ্লাঘ্য
ঘ্র = ঘ + র; যেমন- ঘ্রাণ
ঙ্ক = ঙ + ক; যেমন- অঙ্ক
ঙ্ক্ত = ঙ + ক + ত; যেমন- পঙ্ক্তি
ঙ্ক্য = ঙ + ক + য; যেমন- অঙ্ক্য
ঙ্ক্ষ = ঙ + ক + ষ; যেমন- আকাঙ্ক্ষা
ঙ্খ = ঙ + খ; যেমন- শঙ্খ
ঙ্গ = ঙ + গ; যেমন- অঙ্গ
ঙ্গ্য = ঙ + গ + য; যেমন- ব্যঙ্গ্যার্থ,
ব্যঙ্গ্যোক্তি
ঙ্ঘ = ঙ + ঘ; যেমন- সঙ্ঘ
ঙ্ঘ্য = ঙ + ঘ + য; যেমন- দুর্লঙ্ঘ্য
ঙ্ঘ্র = ঙ + ঘ + র; যেমন- অঙ্ঘ্রি
ঙ্ম = ঙ + ম; যেমন- বাঙ্ময়
চ্চ = চ + চ; যেমন- বাচ্চা
চ্ছ = চ + ছ; যেমন- ইচ্ছা
চ্ছ্ব = চ + ছ + ব; যেমন- জলোচ্ছ্বাস
চ্ছ্র = চ + ছ + র; যেমন- উচ্ছ্রায়
চ্ঞ = চ + ঞ; যেমন- যাচ্ঞা
চ্ব = চ + ব; যেমন- চ্বী
চ্য = চ + য; যেমন- প্রাচ্য
জ্জ = জ + জ; যেমন- বিপজ্জনক
জ্জ্ব = জ + জ + ব; যেমন- উজ্জ্বল
জ্ঝ = জ + ঝ; যেমন- কুজ্ঝটিকা
জ্ঞ = জ + ঞ; যেমন- জ্ঞান
জ্ব = জ + ব; যেমন- জ্বর
জ্য = জ + য; যেমন- রাজ্য
জ্র = জ + র; যেমন- বজ্র
ঞ্চ = ঞ + চ; যেমন- অঞ্চল
ঞ্ছ = ঞ + ছ; যেমন- লাঞ্ছনা
ঞ্জ = ঞ + জ; যেমন- কুঞ্জ
ঞ্ঝ = ঞ + ঝ; যেমন- ঝঞ্ঝা
ট্ট = ট + ট; যেমন- চট্টগ্রাম
ট্ব = ট + ব; যেমন- খট্বা
ট্ম = ট + ম; যেমন- কুট্মল
ট্য = ট + য; যেমন- নাট্য
ট্র = ট + র; যেমন- ট্রেন
(মন্তব্য: এই যুক্তাক্ষরটি মূলত ইংরেজি/
বিদেশী কৃতঋণ শব্দে ব্যবহৃত)
ড্ড = ড + ড; যেমন- আড্ডা
ড্ব = ড + ব; যেমন- অন্ড্বান
ড্য = ড + য; যেমন- জাড্য
ড্র = ড + র; যেমন- ড্রাইভার, ড্রাম
(মন্তব্য: এই যুক্তাক্ষরটি মূলত ইংরেজি/
বিদেশী কৃতঋণ শব্দে ব্যবহৃত)
ড়্গ = ড় + গ; যেমন- খড়্গ
ঢ্য = ঢ + য; যেমন- ধনাঢ্য
ঢ্র = ঢ + র; যেমন- মেঢ্র (ত্বক) (মন্তব্য:
অত্যন্ত বিরল)
ণ্ট = ণ + ট; যেমন- ঘণ্টা
ণ্ঠ = ণ + ঠ; যেমন- কণ্ঠ
ণ্ঠ্য = ণ + ঠ + য; যেমন- কণ্ঠ্য
ণ্ড = ণ + ড; যেমন- গণ্ডগোল
ণ্ড্য = ণ + ড + য; যেমন- পাণ্ড্য
ণ্ড্র = ণ + ড + র; যেমন- পুণ্ড্র
ণ্ঢ = ণ + ঢ; যেমন- ষণ্ঢ
ণ্ণ = ণ + ণ; যেমন- বিষণ্ণ
ণ্ব = ণ + ব; যেমন- স্হাণ্বীশ্বর
ণ্ম = ণ + ম; যেমন- চিণ্ময়
ণ্য = ণ + য; যেমন- পূণ্য
ৎক = ত + ক; যেমন- উৎকট
ত্ত = ত + ত; যেমন- উত্তর
ত্ত্ব = ত + ত + ব; যেমন- সত্ত্ব
ত্ত্য = ত + ত + য; যেমন- উত্ত্যক্ত
ত্থ = ত + থ; যেমন- অশ্বত্থ
ত্ন = ত + ন; যেমন- যত্ন
ত্ব = ত + ব; যেমন- রাজত্ব
ত্ম = ত + ম; যেমন- আত্মা
ত্ম্য = ত + ম + য; যেমন- দৌরাত্ম্য
ত্য = ত + য; যেমন- সত্য
ত্র = ত + র যেমন- ত্রিশ, ত্রাণ
ত্র্য = ত + র + য; যেমন- বৈচিত্র্য
ৎল = ত + ল; যেমন- কাৎলা
ৎস = ত + স; যেমন- বৎসর, উৎসব
থ্ব = থ + ব; যেমন- পৃথ্বী
থ্য = থ + য; যেমন- পথ্য
থ্র = থ + র; যেমন- থ্রি (three)
(মন্তব্য: এই
যুক্তাক্ষরটি মূলত ইংরেজি/
বিদেশী কৃতঋণ শব্দে ব্যবহৃত)
দ্গ = দ + গ; যেমন- উদ্গম
দ্ঘ = দ + ঘ; যেমন- উদ্ঘাটন
দ্দ = দ + দ; যেমন- উদ্দেশ্য

01 March, 2018

একশ মনীষীর জীবনী


বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)

(৫৭০-৬৩২ খ্রি.)

সংক্ষিপ্ত পরিচিতিঃ
যে মহামানবের সৃষ্টি না হলে এ ধরাপৃষ্ঠের কোনো কিছুই সৃষ্টি হতো না, যার পদচারণে লাখ পৃথিবী ধন্য হয়েছে; আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও ভালোবাসা, অন্তরের পবিত্রতা, আত্মার মহত্ত্ব, ধৈর্য্য, ক্ষমতা, সততা, নম্রতা, বদান্যতা, মিতাচার, আমানতদারি, সুরুচিপূর্ণ মনোভাব, ন্যায়পরায়ণতা, উদারতা ও কঠোর কর্তব্যনিষ্ঠা ছিল যার চরিত্রের ভূষণ; যিনি ছিলেন একাধারে ইয়াতিম হিসেবে সবার স্নেহের পাত্র, স্বামী হিসেবে প্রেমময়, পিতা হিসেবে স্নেহের আধার, সঙ্গী হিসেবে বিশ্বস্ত; যিনি ছিলেন সফল ব্যবসায়ী, দূরদর্শী সংস্কারক, ন্যায়বিচারক, মহৎ রাজনীতিবিদ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। তিনি এমন এক সময় পৃথিবীর বুকে আবির্ভূত হয়েছিলেন যখন আরবের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, নৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থা অধঃপতনের চরম সীমায় নেমে গিয়েছিল।
জন্ম
৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ আগস্ট মোতাবেক ১২ রবিউল আউয়াল রোজ সোমবার প্রত্যুষে আরবের মক্কা নগরীতে সমভ্রান্ত কুরাইশ বংশে মাতা আমেনার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। প্রচলিত ধারনা মোতাবেক, উনার জন্ম ৫৭০ খৃস্টাব্দে। প্রখ্যাত ইতিহাসবেত্তা মন্টগোমারি ওয়াট তার পুস্তকে ৫৭০ সনই ব্যবহার করেছেন। তবে উনার প্রকৃত জন্মতারিখ বের করা বেশ কষ্টসাধ্য। তাছাড়া মুহাম্মদ(সা.) নিজে কোনো মন্তব্য করেছেন বলে নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমান পাওয়া যায়নি. এজন্যই এ নিয়ে ব্যাপক মতবিরোধ রয়েছে। এমনকি জন্মমাস নিয়েও ব্যপক মতবিরোধ পাওয়া যায় । যেমন, এক বর্ণনা মতে, উনার জন্ম ৫৭১ সালের ২০ বা ২২ শে এপ্রিল। সাইয়েদ সোলাইমান নদভী, সালমান মনসুরপুরী এবং মোহাম্মদ পাশা ফালাকির গবেষণায় এই তথ্য বেরিয়ে এসেছে। তবে শেষোক্ত মতই ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বেশী নির্ভরযোগ্য। যাই হোক, নবীর জন্মের বছরেই হস্তী যুদ্ধের ঘটনা ঘটে এবং সে সময় সম্রাট নরশেরওয়ার সিংহাসনে আরোহনের ৪০ বছর পূর্তি ছিল এ নিয়ে কারো মাঝে দ্বিমত নেই। জন্মের ৫ মাস পূর্বে পিতা আবদুল্লাহ ইন্তেকাল করেন। আরবের তৎকালীন অভিজাত পরিবারের প্রথানুযায়ী তাঁর লালন-পালন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব অর্পিত হয় বনী সা’দ গোত্রের বিবি হালিমার ওপর। এ সময় বিবি হালিমার আরেক পুত্রসন্তান ছিল, যার দুধ পানের মুদ্দত তখনো শেষ হয়নি। বিবি হালিমা বর্ণনা করেন ‘শিশু মুহামমদ কেবলমাত্র আমার ডান স্তনের দুধ পান করত। আমি তাঁকে আমার বাম স্তনের দুধ দান করতে চাইলেও, তিনি কখনো বাম স্তন হতে দুধ পান করতেন না।’ আমার বাম স্তনের দুধ তিনি তাঁর অপর দুধ ভাইয়ের জন্য রেখে দিতেন।’ দুধ পানের শেষ দিবস পর্যন্ত তাঁর এ নিয়ম বিদ্যমান ছিল। ইনসাফ ও সাম্যের মহান আদর্শ তিনি শিশুকালেই দেখিয়ে দিয়েছেন। মাত্র ৫ বছর তিনি ধাত্রী মা হালিমার তত্ত্বাবধানে ছিলেন। এরপর ফিরে আসেন মাতা আমেনার গৃহে। ৬ বছর বয়সে তিনি মাতা আমেনার সাথে পিতার কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে মদিনা যান এবং মদিনা থেকে প্রত্যাবর্তনকালে ‘আবওয়া’নামক স্থানে মাতা আমেনা ইন্তেকাল করেন। এরপর ইয়াতিম মুহাম্মদ (সা.) এর লালন-পালনের দায়িত্ব অর্পিত হয় ক্রমান্বয়ে দাদা আবদুল মোত্তালিব ও চাচা আবু তালিবের ওপর। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ যে মহামানব আবির্ভূত হয়েছেন সারা জাহানের রহমত হিসেবে; তিনি হলেন আজন্ম ইয়াতিম এবং দুঃখ-বেদনার মধ্য দিয়েই তিনি গড়ে ওঠেন সত্যবাদী, পরোপকারী এবং আমানতদারি হিসেবে।
শৈশব ও কৈশোর কাল
তত্কালীন আরবের রীতি ছিল যে তারা মরুভূমির মুক্ত আবহাওয়ায় বেড়ে উঠার মাধ্যমে সন্তানদের সুস্থ দেহ এবং সুঠাম গড়ন তৈরির জন্য জন্মের পরপরই দুধ পান করানোর কাজে নিয়োজিত বেদুইন মহিলাদের কাছে দিয়ে দিতেন এবং নির্দিষ্ট সময় পর আবার ফেরত নিতেন। এই রীতি অনুসারে মোহাম্মদকেও হালিমা বিনতে আবু জুয়াইবের (অপর নাম হালিমা সাদিয়া) হাতে দিয়ে দেয়া হয়। এই শিশুকে ঘরে আনার পর দেখা যায় হালিমার সচ্ছলতা ফিরে আসে এবং তারা শিশুপুত্রকে সঠিকভাবে লালনপালন করতে সমর্থ হন। তখনকার একটি ঘটনা উল্লেখযোগ্য – শিশু মোহাম্মদ কেবল হালিমার একটি স্তনই পান করতেন এবং অপরটি তার অপর দুধভাইয়ের জন্য রেখে দিতেন। দুই বছর লালনপালনের পর হালিমা শিশু মোহাম্মদকে আমিনার কাছে ফিরিয়ে দেন। কিন্তু এর পরপরই মক্কায় মহামারী দেখা দেয় এবং শিশু মুহাম্মাদকে হালিমার কাছে ফিরিয়ে দেয়া হয়। হালিমাও চাচ্ছিলেন শিশুটিকে ফিরে পেতে। এতে তার আশা পূর্ণ হল। ইসলামী বিশ্বাসমতে এর কয়েকদিন পরই একটি অলৌকিক ঘটনা ঘটে – একদিন শিশু নবীর বুক চিরে কলিজার একটি অংশ বের করে তা জমজম কূপের পানিতে ধুয়ে আবার যথাস্থানে স্থাপন করে দেয়া হয়। এই ঘটনাটি ইসলামের ইতিহাসে সিনা চাকের ঘটনা হিসেবে খ্যাত।
এই ঘটনার পরই হালিমা মুহাম্মাদকে মা আমিনার কাছে ফিরিয়ে দেন। ছয় বছর বয়স পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত তিনি মায়ের সাথে কাটান। এই সময় একদিন আমিনার ইচ্ছা হয় ছেলেকে নিয়ে মদীনায় যাবেন। সম্ভবত কোন আত্মীয়ের সাথে দেখা করা এবং স্বামীর কবর জিয়ারত করাই এর কারণ ছিল। আমিনা ছেলে, শ্বশুর এবং দাসী উম্মে আয়মনকে নিয়ে ৫০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মদীনায় পৌঁছেন। তিনি মদীনায় একমাস সময় অতিবাহিত করেন। একমাস পর মক্কায় ফেরার পথে আরওয়া নামক স্থানে এসে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। মাতার মৃত্যুর পর দাদা আবদুল মোত্তালেব শিশু মুহাম্মাদকে নিয়ে মক্কায় পৌঁছেন। এর পর থেকে দাদাই মুহাম্মাদের দেখাশোনা করতে থাকেন। মোহাম্মদের বয়স যখন ৮ বছর ২ মাস ১০ দিন তখন তার দাদাও মারা যান। মৃত্যুর আগে তিনি তার পুত্র আবু তালিবকে মোহাম্মদের দায়িত্ব দিয়ে যান।

আবু তালিব ব্যবসায়ী ছিলেন এবং আরবদের নিয়ম অনুযায়ী বছরে একবার সিরিয়া সফরে যেতেন। মুহাম্মাদের বয়স যখন ১২ ব্ছর তখন তিনি চাচার সাথে সিরিয়া যাওয়ার জন্য বায়না ধরলেন। প্রগাঢ় মমতার কারণে আবু তালিব আর নিষেধ করতে পারলেননা। যাত্রাপথে বসরা পৌঁছার পর কাফেলাসহ আবু তালিব তাঁবু ফেললেন। সে সময় আরব উপদ্বীপের রোম অধিকৃত রাজ্যের রাজধানী বসরা অনেক দিক দিয়ে সেরা ছিল। কথিত আছে, শহরটিতে জারজিস সামে এক খ্রিস্টান পাদ্রী ছিলেন যিনি বুহাইরা বা বহিরা নামেই অধিক পরিচিত ছিলেন। তিনি তার গীর্জা হতে বাইরে এসে কাফেলার মুসাফিরদের মেহমানদারী করেন। এ সময় তিনি বালক মুহাম্মাদকে দেখে শেষ নবী হিসেবে চিহ্নিত করেন। ফুজ্জারের যুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন নবীর বয়স ১৫ বছর। এই যুদ্ধে তিনি স্বয়ং অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধের নির্মমতায় তিনি অত্যন্ত ব্যথিত হন। কিন্তু তাঁর কিছু করার ছিলনা। সে সময় থেকেই তিনি কিছু একটি করার চিন্তাভাবনা শুরু করেন।

নবুয়ত-পূর্ব জীবন
আরবদের মধ্যে বিদ্যমান হিংস্রতা, খেয়ানতপ্রবণতা এবং প্রতিশোধস্পৃহা দমনের জন্যই হিলফুল ফুজুল নামক একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। মুহাম্মাদ এতে যোগদান করেন এবং এই সংঘকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে তিনি বিরাট ভূমিকা রাখেন। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় তরুণ বয়সে মুহাম্মাদের তেমন কোন পেশা ছিলনা। তবে তিনি বকরি চরাতেন বলে অনেকেই উল্লেখ করেছেন। সাধারণত তিনি যে বকরিগুলো চরাতেন সেগুলো ছিল বনি সা’দ গোত্রের। কয়েক কিরাত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে তিনি মক্কায় বসবাসরত বিভিন্ন ব্যক্তির বকরিও চরাতেন। এরপর তিনি ব্যবসায় শুরু করেন। মুহাম্মাদ অল্প সময়ের মধ্যেই একাজে ব্যাপক সফলতা লাভ করেন। এতই খ্যাতি তিনি লাভ করেন যে তার উপাধি হয়ে যায় আল আমিন এবং আল সাদিক যেগুলোর বাংলা অর্থ হচ্ছে যথাক্রমে বিশ্বস্ত এবং সত্যবাদী। ব্যবসায় উপলক্ষ্যে তিনি সিরিয়া, বসরা, বাহরাইন এবং ইয়েমেনে বেশ কয়েকবার সফর করেন। মুহাম্মাদের সুখ্যাতি যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে তখন খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ তা অবহিত হয়েই তাকে নিজের ব্যবসার জন্য সফরে যাবার অনুরোধ জানান। মুহাম্মাদ এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং খাদীজার পণ্য নিয়ে সিরিয়ার অন্তর্গত বসরা পর্যন্ত যান।
খাদীজা মাইছারার মুখে মুহাম্মাদের সততা ও ন্যায়পরায়ণতার ভূয়সী প্রশংশা শুনে অভিভূত হন। এছাড়া ব্যবসায়ের সফলতা দেখে তিনি তার যোগ্যতা সম্বন্ধেও অবহিত হন। এক পর্যায়ে তিনি মুহাম্মাদকে বিবাহ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি স্বীয় বান্ধবী নাফিসা বিনতে মুনব্বিহরের কাছে বিয়ের ব্যাপরে তার মনের কথা ব্যক্ত করেন। নাফিসার কাছে শুনে মুহাম্মাদ বলেন যে তিনি তার অভিভাবকদের সাথে কথা বলেন জানাবেন। মুহাম্মাদ তাঁর চাচাদের সাথে কথা বলে বিয়ের সম্মতি জ্ঞাপন করেন। বিয়ের সময় খাদীজার বয়স ছিল ৪০ আর মুহাম্মাদের বয়স ছিল ২৫। খাদীজার জীবদ্দশায় তিনি আর কোন বিয়ে করেননি। খাদীজার গর্ভে মুহাম্মাদের ৬ জন সন্তান জন্মগ্রহণ করে যার মধ্যে ৪ জন মেয়ে এবং ২ জন ছেলে। তাদের নাম যথাক্রমে কাসেম, যয়নাব, রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম’, ফাতিমা এবং আবদুল্লাহ। ছেলে সন্তান দুজনই শৈশবে মারা যায়। মেয়েদের মধ্যে সবাই ইসলামী যুগ পায় এবং ইসলাম গ্রহণ করে এবং একমাত্র ফাতিমা ব্যতিত সবাই নবীর জীবদ্দশাতেই মৃত্যুবরণ করে।

মুহাম্মাদের বয়স যখন ৩৫ বছর তখন কা’বা গৃহের পূনঃনির্মাণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। বেশ কয়েকটি কারণে কাবা গৃহের সংস্কার কাজ শুরু হয়। পুরনো ইমারত ভেঙে ফেলে নতুন করে তৈরি করা শুরু হয়। এভাবে পুনঃনির্মানের সময় যখন হাজরে আসওয়াদ (পবিত্র কালো পাথর) পর্যন্ত নির্মাণ কাজ শেষ হয় তখনই বিপত্তি দেখা দেয়। মূলত কোন গোত্রের লোক এই কাজটি করবে তা নিয়েই ছিল কোন্দল। নির্মাণকাজ সব গোত্রের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু হাজরে আসওয়াদ স্থাপন ছিল একজনের কাজ। কে স্থাপন করবে এ নিয়ে বিবাদ শুরু হয় এবং চার-পাঁচ দিন যাবৎ এ বিবাদ অব্যাহত থাকার এক পর্যায়ে এটি এমনই মারাত্মক রূপ ধারণ করে যে হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত ঘটার সম্ভাবনা দেখা দেয়। এমতাবস্থায় আবু উমাইয়া মাখজুমি একটি সমাধান নির্ধারণ করে যে পরদিন প্রত্যুষে মসজিদে হারামের দরজা দিয়ে যে প্রথম প্রবেশ করবে তার সিদ্ধান্তই সবাই মেনে নেবে। পরদিন মুহাম্মাদ সবার প্রথমে কাবায় প্রবেশ করেন। এতে সবাই বেশ সন্তুষ্ট হয় এবং তাকে বিচারক হিসেবে মেনে নেয়। আর তার প্রতি সবার সুগভীর আস্থাও ছিল। যা হোক এই দায়িত্ব পেয়ে মুহাম্মাদ অত্যন্ত সুচারুভাবে ফয়সালা করেন। তিনি একটি চাদর বিছিয়ে তার উপর নিজ হাতে হাজরে আসওয়াদ রাখেন এবং বিবদমান প্রত্যেক গোত্রের নেতাদের ডেকে তাদেরকে চাদরের বিভিন্ন কোণা ধরে যথাস্থানে নিয়ে যেতে বলেন এবং তারা তা ই করে। এরপর তিনি পাথর উঠিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপন করেন।


নবুওয়ত প্রাপ্তি
চল্লিশ বছর বয়সে ইসলামের নবী মুহাম্মাদ নবুওয়ত লাভ করেন, অর্থাৎ এই সময়েই স্রষ্টা তার কাছে ওহী প্রেরণ করেন। নবুওয়ত সম্বন্ধে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় আজ-জুহরির বর্ণনায়। জুহরি বর্ণিত হাদীস অনুসারে নবী সত্য দর্শনের মাধ্যমে ওহী লাভ করেন। ত্রিশ বছর বয়স হয়ে যাওয়ার পর নবী প্রায়ই মক্কার অদূরে হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন অবস্থায় কাটাতেন। তাঁর স্ত্রী খাদিজা নিয়মিত তাঁকে খাবার দিয়ে আসতেন। এমনি এক ধ্যানের সময় ফেরেশতা জিব্রাইল তার কাছে আল্লাহ প্রেরিত ওহী নিয়ে আসেন। জিব্রাইল তাঁকে এই পংক্তি কটি পড়তে বলেন:
“পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তার নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তা মহা দয়ালু, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন, শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না।”

উত্তরে নবী জানান যে তিনি পড়তে জানেন না, এতে জিব্রাইল তাকে জড়িয়ে ধরে প্রবল চাপ প্রয়োগ করেন এবং আবার একই পংক্তি পড়তে বলেন। কিন্তু এবারও মুহাম্মাদ নিজের অপারগতার কথা প্রকাশ করেন। এভাবে তিনবার চাপ দেয়ার পর মুহাম্মাদ পংক্তিটি পড়তে সমর্থ হন। অবর্তীর্ণ হয় কুরআনের প্রথম আয়াত গুচ্ছ; সূরা আলাকের প্রথম পাঁচ আয়াত। প্রথম অবতরণের পর নবী এতই ভীত হয়ে পড়েন যে কাঁপতে কাঁপতে নিজ গ্রহে প্রবেশ করেই খাদিজাকে কম্বল দিয়ে নিজের গা জড়িয়ে দেয়ার জন্য বলেন। বারবার বলতে থাবেন, “আমাকে আবৃত কর”। খাদিজা নবীর সকল কথা সম্পূর্ণ বিশ্বাস করেন এবং তাঁকে নবী হিসেবে মেনে নেন। ভীতি দূর করার জন্য মুহাম্মাদকে নিয়ে খাদিজা নিজ চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবন নওফেলের কাছে যান। নওফেল তাঁকে শেষ নবী হিসেবে আখ্যায়িত করে। ধীরে ধীরে আত্মস্থ হন নবী। তারপর আবার অপেক্ষা করতে থাকেন পরবর্তী প্রত্যাদেশের জন্য। একটি লম্বা বিরতির পর তাঁর কাছে দ্বিতীয় বারের মত ওহী আসে। এবার অবতীর্ণ হয় সূরা মুদ্দাস্‌সির-এর কয়েকটি আয়াত। এর পর থেকে গোপনে ইসলাম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন মুহাম্মাদ। এই ইসলাম ছিল জীবনকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়ার জন্য প্রেরিত একটি আদর্শ ব্যবস্থা। তাই এর প্রতিষ্ঠার পথ ছিল খুবই বন্ধুর। এই প্রতিকূলততার মধ্যেই নবীর মক্কী জীবন শুরু হয়।


মক্কী জীবন

প্রত্যাদেশ অবতরণের পর নবী বুঝতে পারেন যে, এটি প্রতিষ্ঠা করতে হলে তাকে পুরো আরব সমাজের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়াতে হবে; কারণ তৎকালীন নেতৃত্বের ভীত ধ্বংস করা ব্যাতীত ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠার অন্য কোন উপায় ছিলনা। তাই প্রথমে তিনি নিজ আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের মাঝে গোপনে ইসলামের বাণী প্রচার শুরু করেন। মুহাম্মাদের আহ্বানে ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম ব্যক্তি ছিলেন খাদিজা। এরপর মুসলিম হন মুহাম্মাদের চাচাতো ভাই এবং তার ঘরেই প্রতিপালিত কিশোর আলী, ইসলাম গ্রহণের সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১০ বছর। ইসলামের বাণী পৌঁছে দেয়ার জন্য নবী নিজ বংশীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে একটি সভা করেন; এই সভায় কেউই তাঁর আদর্শ মেনে নেয়নি, এ সভাতে শুধু একজনই ইসলাম গ্রহণ করে, সে হলো আলী। ইসলাম গ্রহণকারী তৃতীয় ব্যক্তি ছিল নবীর অন্তরঙ্গ বন্ধূ আবু বকর। এভাবেই প্রথম পর্যায়ে তিনি ইসলাম প্রচারের কাজ শুরু করেন। এবং এই প্রচারকাজ চলতে থাকে সম্পূর্ণ গোপনে।

প্রকাশ্য দাওয়াত
তিন বছর গোপনে দাওয়াত দেয়ার পর মুহাম্মাদ প্রকাশ্যে ইসলামের প্রচার শুরু করেন। এ ধরণের প্রচারের সূচনাটা বেশ নাটকীয় ছিল। নবী সাফা পর্বতের ওপর দাড়িয়ে চিৎকার করে সকলকে সমবেত করেন। এরপর প্রকাশ্যে বলেন যে, আল্লাহ ছাড়া কোন প্রভু নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহ্‌র রাসূল। কিন্তু এতে সকলে তার বিরুদ্ধে প্রচণ্ড খেপে যায় এবং এই সময় থেকে ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও অত্যাচার শুরু হয়।

মক্কায় বিরোধিতার সম্মুখীন
বিরুদ্ধবাদীরা কয়েকটি স্তরে নির্যাতন শুরু করে: প্রথমত উস্কানী ও উত্তেজনার আবহ সৃষ্টি, এরপর অপপ্রচার, কুটতর্ক এবং যুক্তি। এক সময় ইসলামী আন্দোলনকে সহায়হীন করার প্রচেষ্টা শুরু হয় যাকে সফল করার জন্য একটি নেতিবাচক ফ্রন্ট গড়ে উঠে। একই সাথে গড়ে তোলা হয় সাহিত্য ও অশ্লীল গান-বাজনার ফ্রন্ট, এমনকি একং পর্যায়ে মুহাম্মাদের সাথে আপোষেরও প্রচেষ্টা চালায় কুরাইশরা। কিন্তু মুহাম্মাদ তা মেনে নেননি; কারণ আপোষের শর্ত ছিল নিজের মত ইসলাম পালন করা, সেক্ষেত্র তার ইসলাম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যই ভেস্তে যেতো।
ইথিওপিয়ায় হিজরত
ধীরে ধীরে যখন মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংসতা চরম রূপ ধারণ করে, তখন নবী কিছু সংখ্যক মুসলিমকে আবিসিনিয়ায় হিজরত করতে পাঠান। সেখান থেকেও কুরাইশরা মুসলিমদের ফেরত আনার চেষ্টা করে, যদিও তৎকালীন আবিসিনিয়ার সম্রাট নাজ্জাশীর কারণে তা সফল হয়নি।
গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ইসলাম গ্রহণ
এরপর ইসলামের ইতিহাসে যে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি ঘটে তা হল উমর ইবনুল খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণ। নবী সবসময় চাইতেন যেন আবু জেহেল ও উমরের মধ্যে যেকোন একজন অন্তত ইসলাম গ্রহণ করে। তার এই ইচ্ছা এতে পূর্ণতা লাভ করে। আরব সমাজে উমরের বিশেষ প্রভাব থাকায় তার ইসলাম গ্রহণ ইসলাম প্রচারকে খানিকটা সহজ করে, যদিও কঠিন অংশটিই তখনও মুখ্য বলে বিবিচেত হচ্ছিল। এরপর একসময় নবীর চাচা হামযা ইসলাম গ্রহণ করেন। তার ইসলাম গ্রহণে আরবে মুসলিমদের আধিপত্য কিছুটা হলেও প্রতিষ্ঠিত হয়।
একঘরে অবস্থা
এভাবে ইসলাম যখন শ্লথ গতিতে এগিয়ে চলছে তখন মক্কার কুরাইশরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার অনুসারী সহ সহ গোটা বনু হাশেম গোত্রকে একঘরে ও আটক করে। তিন বছর আটক থাকার পর তারা মুক্তি পায়।
দুঃখের বছর ও তায়েফ গমন
কিন্তু মুক্তির পরের বছরটি ছিল মুহাম্মাদের জন্য দুঃখের বছর। কারণ এই বছরে খুব স্বল্প সময়ের ব্যবধানে তার স্ত্রী খাদিজা ও চাচা আবু তালিব মারা যায়। দুঃখের সময়ে নবী মক্কায় ইসলামের প্রসারের ব্যাপরে অনেকটাই হতাশ হয়ে পড়েন। হতাশ হয়ে তিনি মক্কা বাদ দিয়ে এবার ইসলাম প্রচারের জন্য তায়েফ যান (অবশ্য তায়েফ গমনের তারিখ নিয়ে মতভেদ রয়েছে)। কিন্তু সেখানে ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে তিনি চূড়ান্ত অপমান, ক্রোধ ও উপহাসের শিকার হন। এমনকি তায়েফের লোকজন তাদের কিশোর-তরুণদেরকে মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পিছনে লেলিয়ে দেয়; তারা ইট-প্রস্তরের আঘাতে নবীকে রক্তাক্ত করে দেয়। কিন্তু তবুও তিনি হাল ছাড়েননি; নব নব সম্ভবনার কথা চিন্তা করতে থাকেন।

মি’রাজ তথা উর্দ্ধারোহন
এমন সময়েই কিছু শুভ ঘটনা ঘটে। ইসলামী ভাষ্যমতে এ সময় মুহাম্মাদ এক রাতে মক্কায় অবস্থিত মসজিদুল হারাম থেকে জেরুজালেমে অবস্থিত মসজিদুল আকসায় যান; এই ভ্রমণ ইতিহাসে ইসরা নামে পরিচিত। কথিত আছে, মসজিদুল আকসা থেকে তিনি একটি বিশেষ যানে করে উর্দ্ধারোহণ করেন এবং মহান স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভ করেন, এছাড়া তিনি বেহেশ্‌ত ও দোযখ সহ মহাবিশ্বের সকল স্থান অবলোকন করেন। এই যাত্রা ইতিহাসে মি’রাজ নামে পরিচিত। এই সম্পূর্ণ যাত্রার সময়ে পৃথিবীতে কোন সময়ই অতিবাহিত হয়নি বলে বলা হয়।
মদীনায় হিজরত
এরপর আরও শুভ ঘটনা ঘটে। মদীনার বেশকিছু লোক ইসলামের প্রতি উৎসাহী হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে। তারা মূলত হজ্জ্ব করতে এসে ইসলামে দাওয়াত পেয়েছিল। এরা আকাব নামক স্থানে মুহাম্মাদের কাছে শপথ করে যে তারা যে কোন অবস্থায় নবীকে রক্ষা করবে এবং ইসলামে প্রসারে কাজ করবে। এই শপথগুলো আকাবার শপথ নামে সুপরিচিত। এই শপথগুলোর মাধ্যমেই মদীনায় ইসলাম প্রতিষ্ঠার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি হয় এবং একসময় মদীনার ১২ টি গোত্রের নেতারা একটি প্রতিনিধিদল প্রেরণের মাধ্যমে মুহাম্মাদকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদীনায় আসার আমন্ত্রণ জানায়। মদীনা তথা ইয়াসরিবে অনেক আগে থেকে প্রায় ৬২০ সাল পর্যন্ত গোত্র গোত্র এবং ইহুদীদের সাথে অন্যদের যুদ্ধ লেগে থাকে। বিশেষত বুয়াছের যুদ্ধে সবগুলো গোত্র যুদ্ধে অংশ নেয়ায় প্রচুর রক্তপাত ঘটে। এ থেকে মদীনার লোকেরা বুঝতে সমর্থ হয়েছিল যে, রক্তের বিনিময়ে রক্ত নেয়ার নীতিটি এখন আর প্রযোজ্য হতে পারেনা। এজন্য তাদের একজন নেতা দরকার যে সবাইকে একতাবদ্ধ করতে পারবে। এ চিন্তা থেকেই তারা মুহাম্মাদকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, যদিও আমন্ত্রণকারী অনেকেই তখনও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেনি। এই আমন্ত্রণে মুসলিমরা মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় চলে যায়। সবশেষে মুহাম্মাদ ও আবু বকর ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মদীনায় হিজরত করেন। তাদের হিজরতের দিনেই কুরাইশরা মুহাম্মাদকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)হত্যার পরিকল্পনা করেছিল যদিও তা সফল হয়নি। এভাবেই মক্কী যুগের সমাপ্তি ঘটে।
মাদানী জীবন
নিজ গোত্র ছেড়ে অন্য গোত্রের সাথে যোগদান আরবে অসম্ভব হিসেবে পরিগণিত হত। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে সেরকম নয়, কারণ এক্ষেত্রে ইসলামের বন্ধনই শ্রেষ্ঠ বন্ধন হিসেবে মুসলিমদের কাছে পরিগণিত হত। এটি তখনকার যুগে একটি বৈপ্লবিক চিন্তার জন্ম দেয়। ইসলামী পঞ্জিকায় হিজরতের বর্ষ থেকে দিন গণনা শুরু হয়। এজন্য ইসলামী পঞ্জিকার বর্ষের শেষে AH উল্লেখিত থাকে যার অর্থ: After Hijra।
স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও সংবিধান প্রণয়ন
মুহাম্মাদ মদীনায় গিয়েছিলেন একজন মধ্যস্থতাকারী এবং শাসক হিসেবে। তখন বিবদমান দুটি মূল পক্ষ ছিল আওস ও খাযরাজ। তিনি তার দায়িত্ব সুচারুরুপে পালন করেছিলেন। মদীনার সকল গোত্রকে নিয়ে ঐতিহাসিক মদীনা সনদ স্বাক্ষর করেন যা পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম সংবিধান হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে। এই সনদের মাধ্যমে মুসলিমদের মধ্যে সকল রক্তারক্তি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এমনকি এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় নীতির গোড়াপত্তন করা হয় এবং সকল গোত্রের মধ্যে জবাবদিহিতার অনুভুতি সৃষ্টি করা হয়। আওস, খাযরাজ উভয় গোত্রই ইসলাম গ্রহণ করেছিল। এছাড়াও প্রধানত তিনটি ইহুদী গোত্র (বনু কাইনুকা, বনু কুরাইজা এবং বনু নাদির)। এগুলোসহ মোট আটটি গোত্র এই সনদে স্বাক্ষর করেছিল। এই সনদের মাধ্যমে মদীনা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)হন তার প্রধান।
মক্কার সাথে বিরোধ ও যুদ্ধ
মদীনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরপরই মক্কার সাথে এর সম্পর্ক দিন দিন খারাপ হতে থাকে। মক্কার কুরাইশরা মদীনা রাষ্ট্রের ধ্বংসের জন্য যুদ্ধংদেহী মনোভাব পোষণ করতে থাকে। মুহাম্মাদ(স)মদীনায় এসে আশেপাশের সকল গোত্রের সাথে সন্ধি চুক্তি স্থাপনের মাধ্যমে শান্তি স্থাপনে অগ্রণী ছিলেন। কিন্তু মক্কার কুরাইশরা গৃহত্যাগী সকল মুসলিমদের সম্পত্তি ক্রোক করে। এই অবস্থায় ৬২৪ সালে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)৩০০ সৈন্যের একটি সেনাদলকে মক্কার একটি বাণিজ্যিক কাফেলাকে বাঁধা দেয়ার উদ্দেশ্যে পাঠায়। কারণ উক্ত কাফেলা বাণিজ্যের নাম করে অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা করছিল। কুরাইশরা তাদের কাফেলা রক্ষায় সফল হয়। কিন্তু এই প্রচেষ্টার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য যুদ্ধের ডাক দেয়। আত্মরক্ষামূলক এই যুদ্ধে মুসলিমরা সৈন্য সংখ্যার দিক দিয়ে কুরাইশদের এক তৃতীয়াংশ হয়েও বিজয় অর্জন করে। এই যুদ্ধ বদর যুদ্ধ নামে পরিচিত যা ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের ১৫ মার্চ তারিখে সংঘটিত হয়। মুসলিমদের মতে এই যুদ্ধে আল্লাহ মুসলিমদের সহায়তা করেছিলেন। যাহোক, এই সময় থেকেই ইসলামের সশস্ত্র ইতিহাসের সূচনা ঘটে। এরপর ৬২৫ সালের ২৩ মার্চে উহুদ যুদ্ধ সংঘটিতে হয়। এতে প্রথম দিকে মুসলিমরা পরাজিত হলেও শেষে বিজয়ীর বেশে মদীনায় প্রবেশ করতে সমর্থ হয়। কুরাইশরা বিজয়ী হওয়া সত্ত্বেও চূড়ান্ত মুহূর্তের নীতিগত দূর্বলতার কারণে পরাজিতের বেশে মক্কায় প্রবেশ করে। ৬২৭ সালে আবু সুফিয়ান কুরাইশদের আরেকটি দল নিয়ে মদীনা আক্রমণ করে। কিন্তু এবারও খন্দকের যুদ্ধে মুসলিমদের কাছে পরাজিত হয়। যুদ্ধ বিজয়ে উৎসাহিত হয়ে মুসলিমরা আরবে একটি প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হয়। ফলে আশেপাশের অনেক গোত্রের উপরই মুসলিমরা প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়।
মদীনার ইহুদিদের সাথে সম্পর্ক
কিন্তু এ সময় মদীনার বসবাসকারী ইহুদীরা ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য হুমকী হয়ে দেখা দেয়। মূলত ইহুদীরা বিশ্বাস করতনা যে, একজন অ-ইহুদী শেষ নবী হতে পারে। এজন্য তারা কখনই ইসলামের আদর্শ মেনে নেয়নি এবং যখন ইসলামী রাষ্ট্রের শক্তি বুঝতে পারে তখন তারা এর বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে। মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)প্রতিটি যুদ্ধের পরে একটি করে ইহুদী গোত্রের উপর আক্রমণ করেন। বদর ও উহুদের যুদ্ধের পর বনু কাইনুকা ও বনু নাদির গোত্র সপরিবারে মদীনা থেকে বিতাড়িত হয়; আর খন্দকের পর সকল ইহুদীকে মদীনা থেকে বিতাড়ন করা হয়। মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এই ইহুদী বিদ্বেশের দুটি কারণের উল্লেখ পাওয়া যায়, একটি ধর্মীয় এবং অন্যটি রাজনৈতিক। ধর্মীয় দিক দিয়ে চিন্তা করলে আহলে কিতাব হয়েও শেষ নবীকে মেনে না নেয়ার শাস্তি ছিল এটি। আর রাজনৈতিকভাবে চিন্তা করলে, ইহুদীরা মদীনার জন্য একটি হুমকী ও দুর্বল দিক ছিল। এজন্যই তাদেরকে বিতাড়িত করা হয়।
হুদাইবিয়ার সন্ধি
মুহাম্মদ (সা.) হন ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সভাপতি। তিনি যে একজন দূরদর্শী ও সফল রাজনীতিবিদ এখানেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। মদিনার সনদ নাগরিক জীবনে আমূল পরিবর্তন আনে এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে স্থাপিত হয় ঐক্য। বিশ্বনবী (সা.) তলোয়ারের মাধ্যমে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেননি বরং উদারতার মাধ্যমেই ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর ও নবদীক্ষিত মুসলমানগণের (সাহাবায়ে কেরাম) চালচলন, কথাবার্তা, সততা ও উদারতায় মুগ্ধ হয়ে যখন দলে দলে লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করতে লাগল তখন কুরাইশ নেতাদের মনে হিংসা ও শত্রুতার উদ্রেক হয়। অপরদিকে মদিনার কতিপয় বিশ্বাসঘাতক মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রাধান্য সহ্য করতে না পেরে গোপনভাবে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকে। কাফিরদের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রকে প্রতিহত করার জন্যই মুহাম্মদ (সা.) তলোয়ার ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ফলে ঐতিহাসিক বদর, উহুদ ও খন্দকসহ অনেকগুলো যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং এসব যুদ্ধের প্রায় সবগুলোতেই মুসলমানগণ জয়লাভ করেন। বিশ্বনবী (সা.) মোট ২৭টি যুদ্ধে প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ৬২৭ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক ষষ্ঠ হিজরিতে ১৪০০ নিরস্ত্র সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে মুহাম্মদ (সা.) মাতৃভূমি দর্শন ও পবিত্র হজ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা রওনা দেন। কিন্তু পথিমধ্যে কুরাইশ বাহিনী কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি সন্ধিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ইসলামের ইতিহাসে ‘হুদায়বিয়ার সন্ধি’ নামে পরিচিত। সন্ধির শর্তাবলির মধ্যে এ কথাগুলোও উল্লেখ ছিল যে- (১) মুসলমানগণ এ বছর ওমরা আদায় না করে ফিরে যাবে
(২) আগামী বছর হজে আগমন করবে, তবে ৩ দিনের বেশি মক্কায় অবস্থান করতে পারবে না
(৩) যদি কোনো কাফির স্বীয় অভিভাবকের অনুমতি ব্যতীত মুসলমান হয়ে মদিনায় গমন করে তাহলে তাকে মক্কায় ফিরিয়ে দিতে হবে। পক্ষান্তরে মদিনা হতে যদি কোনো ব্যক্তি পলায়নপূর্বক মক্কায় চলে আসে তাহলে তাকে ফিরিয়ে দেয়া হবে না
(৪) প্রথম থেকে যে সকল মুসলমান মক্কায় বসবাস করছে তাদের কাউকে সাথে করে মদিনায় নিয়ে যাওয়া যাবে না।
(৫) আরবের বিভিন্ন গোত্রগুলোর এ স্বাধীনতা থাকবে যে, তারা উভয় পক্ষের (মুসলমান ও কাফির) মাঝে যাদের সঙ্গে ইচ্ছা সংযোগ স্থাপন করতে পারবে
(৬) সন্ধিচুক্তির মেয়াদের মধ্যে উভয় পক্ষ শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে যাতায়াতের সম্পর্ক
চালু রাখতে পারবে। এছাড়া কুরাইশ প্রতিনিধি সুহায়েল বিন আমর সন্ধিপত্র থেকে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ এবং ‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ বাক্য দুটি কেটে দেয়ার জন্য দাবি করেছিল। কিন্তু সন্ধিপত্রের লেখক হযরত আলী (রা.) তা মেনে নিতে রাজি হলেন না। অবশেষে বিশ্বনবী (সা.) সুহায়েল বিন আমরের আপত্তির প্রেক্ষিতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানীর রাহীম’ এবং ‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ বাক্য দুটি নিজ হাতে কেটে দেন এবং এর পরিবর্তে সুহায়েল বিন আমরের দাবি অনুযায়ী ‘বিছমিকা আল্লাহুম্মা’ লিখতে নির্দেশ দেন। সুতরাং বাহ্যিক দৃষ্টিতে এ সন্ধি মুসলমানদের জন্য অপমানজনক হলেও তা মুহাম্মদ (সা.) কে অনেক সুযোগ ও সুবিধা ও সাফল্য এনে দিয়েছিল। এ সন্ধির মাধ্যমে কুরাইশরা মুহাম্মদ (সা.)-এর রাজনৈতিক সত্তাকে একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে স্বীকার করে নেয়। সন্ধির শর্তানুযায়ী অমুসলিমগণ মুসলমানদের সাথে অবাধে মেলামেশার সুযোগ পায়। ফলে অমুসলিমগণ ইসলামের মহৎ বাণী উপলব্ধি করতে থাকে এবং দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। এ সন্ধির পরই মুহাম্মদ (সা.) বিভিন্ন রাজন্যবর্গের নিকট ইসলামের দাওয়াত দিয়ে পত্র প্রেরণ করেন এবং অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করেন।
বিভিন্ন রাষ্ট্রনায়কদের কাছে পত্র প্রেরণ
রাসূল (সাঃ)সারা বিশ্বের রাসূল হিসেবে প্রেরিত হয়েছিলেন। সুতরাং পৃথিবীর সব জায়গায় ইসলামের আহ্বান পৌঁছ দেয়া তাঁর দায়িত্ব ছিল। হুদায়বিয়ার সন্ধির পর কুরাইশ ও অন্যান্য আরব গোত্রগুলো থেকে আশ্বস্ত হয়ে এ কাজে মননিবেশ করেন। সেসময়ে পৃথিবীর প্রধান রাজশক্তিগুলো ছিল ইউরোপের রোম সাম্রাজ্য (the holy roman empire),এশিয়ার পারস্য সাম্রাজ্য এবং আফ্রিকার হাবশা সাম্রাজ্য। এছাড়াও মিশরের ‘আযীয মুকাউকিস’,ইয়ামামার সর্দার এবং সিরিয়ার গাসসানী শাসনকর্তাও বেশ প্রতাপশালী ছিল। তাই ষষ্ঠ হিজরীর জিলহজ্জ মাসের শেষদিকে একইদিনে এদেঁর কাছে ইসলামের আহ্বানপত্রসহ ছয়জন দূত প্রেরণ করেন।
প্রেরিত দূতগণের তালিকা
দাহিয়া ক্বালবী (রাঃ) কে রোমসম্রাট কায়সারের কাছে।
আবদুল্লাহ বিন হুযাফা (রাঃ)কে পারস্যসম্রাট পারভেজের কাছে।
হাতিব বিন আবূ বুলতা’আ (রাঃ) কে মিশরৈর শাসনকর্তার কাছে।
আমর বিন উমাইয়া (রাঃ) কে হাবশার রাজা নাজ্জাশীর কাছে।
সলীত বিন উমর বিন আবদে শামস (রাঃ) কে ইয়ামামার সর্দারের কাছে।
শুজাইবনে ওয়াহাব আসাদী (রাঃ) কে গাসসানী শাসক হারিসের কাছে।
শাসকদের মধ্য হতে শুধুমাত্র বাদশাহ নাজ্জাসী ছাড়া আর কেউ ইসলাম গ্রহণ করেননি।
মক্কা বিজয়
দশ বছরমেয়াদি হুদাইবিয়ার সন্ধি মাত্র দু’বছর পরেই ভেঙ্গে যায়। খুযাআহ গোত্র ছিল মুসলমানদের মিত্র, অপরদিকে তাদের শত্রু বকর গোত্র ছিল কুরাইশদের মিত্র। একরাতে বকর গোত্র খুযাআদের ওপর অতর্কিতে হামলা চালায়। কুরাইশরা এই আক্রমণে অন্যায়ভাবে বকর গোত্রকে অস্ত্র দিয়ে সহয়োগিতা করে। কোন কোন বর্ণনামতে কুরাইশদের কিছু যুবকও এই হামলায় অংশগ্রহণ করে। এই ঘটনার পর মুহাম্মাদ (সঃ) কুরাইশদের কাছে তিনটি শর্তসহ পত্র প্রেরণ করেন এবং কুরাইশদেরকে এই তিনটি শর্তের যে কোন একটি মেনে নিতে বলেন। শর্ত তিনটি হলো;
কুরাইশ খুযাআ গোত্রের নিহতদের রক্তপণ শোধ করবে।
অথবা তারা বকর গোত্রের সাথে তাদের মৈত্রীচুক্তি বাতিল ঘোষণা করবে।
অথবা এ ঘোষণা দিবে যে, হুদায়বিয়ার সন্ধি বাতিল করা হয়েছে এবং কুরাইশরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।

কুরাইশরা জানালো যে, তারা শুধু তৃতীয় শর্তটি গ্রহণ করবে। কিন্তু খুব দ্রুত কুরাইশ তাদের ভুল বুঝতে পারলো এবং আবু সুফয়ানকে সন্ধি নবায়নের জন্য দূত হিসেবে মদীনায় প্রেরণ করলো। কিন্তু মুহাম্মাদ (সঃ) কুরাইশদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন এবং মক্কা আক্রমণের প্রস্তুতি শুরু করলেন।
৬৩০ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মাদ (সঃ) দশ হাজার সাহাবীর বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কাভিমুখে রওয়ানা হলেন। সেদিন ছিল অষ্টম হিজরীর রমজান মাসের দশ তারিখ। বিক্ষিপ্ত কিছু সংঘর্ষ ছাড়া মোটামুটি বিনাপ্রতিরোধে মক্কা বিজিত হলো এবং মুহাম্মাদ (সঃ) বিজয়ীবেশে সেখানে প্রবেশ করলেন। তিনি মক্কাবাসীর জন্য সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দিলেন। তবে দশজন নর এবং নারী এই ক্ষমার বাইরে ছিল। তারা বিভিন্নভাবে ইসলাম ও মুহাম্মাদ (সঃ)এর কুৎসা রটাত। তবে এদের মধ্য হতেও পরবর্তিতে কয়েকজনকে ক্ষমা করা হয়। মক্কায় প্রবেশ করেই মুহাম্মাদ (সঃ) সর্বপ্রথম কাবাঘরে আগমন করেন এবং সেখানকার সকল মূর্তি ধ্বংস করেন। মুসলমানদের শান-শওকত দেখে এবং মুহাম্মাদ (সঃ)এর ক্ষমাগুণে মুগ্ধ হয়ে অধিকাংশ মক্কাবাসীই ইসলাম গ্রহণ করে। কোরআনে এই বিজয়ের ঘটনা বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।

মক্কা বিজয়ের পর
যে মক্কা থেকে বিশ্বনবী (সা.) নির্যাতিত অবস্থায় বিতাড়িত হয়েছিলেন, সেখানে আজ তিনি বিজয়ের বেশে উপস্থিত হলেন এবং মক্কাবাসীদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন। মক্কা বিজয়ের দিন হযরত ওরম ফারুক (রা.) কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানকে গ্রেফতার করে মুহাম্মদ (সা.)-এর সম্মুখে উপস্থিত করেন। কিন্তু তিনি তাঁর দীর্ঘদিনের শত্রুকে হাতে পেয়েও ক্ষমা করে দেন। ক্ষমার এ মহান আদর্শ পৃথিবীর ইতিহাসে আজও বিরল। মক্কায় আজ ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীয়মান। সকল অন্যায়, অসত্য, শোষণ ও জুলুমের রাজত্ব চিরতরে বিলুপ্ত।
৬৩১ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক দশ হিজরিতে মুহাম্মদ (সা.) লক্ষাধিক মুসলিম সৈন্য নিয়ে বিদায় হজ সম্পাদন করেন এবং হজ শেষে আরাফাতের বিশাল ময়দানে প্রায় ১,১৪,০০০ সাহাবির সম্মুখে জীবনের অন্তিম ভাষণ প্রদান করেন, যা ইসলামের ইতিহাসে ‘বিদায় হজের ভাষণ’ নামে পরিচিত। বিদায় হজের ভাষণে বিশ্বনবী (সা.) মানবাধিকার সম্পর্কিত যে সনদপত্র ঘোষণা করেন দুনিয়ার ইতিহাসে তা আজও অতুলনীয়। তিনি দীপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন
(১) হে বন্ধুগণ, স্মরণ রেখ, আজিকার এ দিন, এ মাস এবং এ পবিত্র নগরী তোমাদের নিকট যেমন পবিত্র, তেমনি পবিত্র তোমাদের সকলের জীবন, তোমাদের ধন-সম্পদ, রক্ত এবং তোমাদের মান-মর্যাদা তোমাদের পরস্পরের নিকট। কখনো অন্যের ওপর অন্যায়ভাবে হস্তক্ষেপ করবে না।
(২) মনে রেখ, স্ত্রীদের ওপর তোমাদের যেমন অধিকার আছে, তোমাদের ওপরও স্ত্রীদের তেমন অধিকার আছে ।
(৩) সাবধান, শ্রমিকের মাথার ঘাম শুকানোর পূর্বেই তার উপযুক্ত পারিশ্রমিক পরিশোধ করে দেবে ।
(৪) মনে রেখে যে পেট ভরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে সে প্রকৃত মুসলমান হতে পারে না ।
(৫) চাকর-চাকরানিদের প্রতি নিষ্ঠুর হয়ো না। তোমরা যা খাবে, তাদের তাই খেতে দেবে, তোমরা যা পরিধান করবে, তাদের তাই (সমমূল্যের) পরিধান করতে দেবে।
(৬) কোনো অবস্থাতেই ইয়াতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করবে না। এমনিভাবে মানবাধিকার সম্পর্কিত বহু বাণী তিনি বিশ্ববাসীর উদ্দেশে পেশ করে যান। তিনি হলেন উত্তম চরিত্রের অধিকারী, মানবজাতির একমাত্র আদর্শ এবং বিশ্ব জাহানের রহমত হিসেবে প্রেরিত।

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর নবুয়্যতের ২৩ বছরের আন্দোলনে আরবের একটি অসভ্য ও বর্বর জাতিকে একটি সভ্য ও সুশৃঙ্খল জাতিতে পরিণত করেছিলেন। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক প্রভৃতি ক্ষেত্রে আমূল সংস্কার সাধন করেন। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে চিরাচরিত গোত্রীয় পার্থক্য তুলে দিয়ে, তিনি ঘোষণা করেন, ‘অনারবের ওপর আরবের এবং আরবের ওপর অনারবদের; কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের এবং শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের কোনো পার্থক্য নেই। বরং তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তি উত্তম যে অধিক মুত্তাকিন।’ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তিনি সুদকে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং জাকাতভিত্তিক অর্থনীতির মাধ্যমে এমন একটি অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যেখানে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক তাদের আর্থিক নিরাপত্তা লাভ করেছিল। সামাজিক ক্ষেত্রে নারীর কোনো মর্যাদা ও অধিকার ছিল না। বিশ্বনবী (সা.) নারী জাতিকে সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করলেন এবং ঘোষণা করলেন ‘মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত।’ নারী জাতিকে শুধুমাত্র মাতৃত্বের মর্যাদাই দেননি, উত্তরাধিকার ক্ষেত্রেও তাদের অধিকারকে করেছেন সমুন্নত ও সুপ্রতিষ্ঠিত। ক্রীতদাস আযাদ করাকে তিনি উত্তম ইবাদত বলে ঘোষণা করেন। ধর্মীয় ক্ষেত্রে যেখানে মূর্তিপূজা, অগ্নিপূজা এবং বিভিন্ন বস্তুর পূজা আরববাসীদের জীবনকে কলুষিত করেছিল সেখানে তিনি আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করেন। মোদ্দা কথা তিনি এমন একটি অপরাধমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যেখানে কোনো হানাহানি, রাহাজানি, বিশৃঙ্খলা, শোষণ, জুলুম, অবিচার, ব্যভিচার, সুদ, ঘুষ ইত্যাদি ছিল না।


মূল নিবন্ধ: মুহাম্মাদের (সঃ) মৃত্যু
বিদায় হজ্জ থেকে ফেরার পর হিজরী ১১ সালের সফর মাসে মুহাম্মদ (সাঃ) জ্বরে আক্রান্ত হন। জ্বরের তাপমাত্রা প্রচন্ড হওয়ার কারণে পাগড়ির ওপর থেকেও উষ্ণতা অনুভূত হচ্ছিল। অসুস্থ অবস্থাতেও তিনি এগারো দিন নামাজের ইমামতি করেন। অসুস্থতা তীব্র হওয়ার পর তিনি সকল স্ত্রীর অনুমতি নিয়ে আয়েশা (রাঃ)এর কামরায় অবস্থান করতে থাকেন। তাঁর কাছে সাত কিংবা আট দিনার ছিল, মৃত্যুর একদিন পূর্বে তিনি এগুলোও দান করে দেন। বলা হয়, এই অসুস্থতা ছিল খাইবারের এক ইহুদি নারীর তৈরি বিষ মেশানো খাবার গ্রহণের কারণে। এ মহামানব ১২ রবিউল আওয়াল, ১১ হিজরি মোতাবেক ৭ জুন, ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে ৬৩ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তিনি হলেন সর্বশেষ নবী ও রাসূল। পৃথিবীর বুকে কিয়ামত পর্যন্ত আর কোনো নবীর আবির্ভাব হবে না। এ সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। আলী (রাঃ) তাকেঁ গোসল দেন এবং কাফন পরান। আয়েশ (রাঃ)এর কামরার যে স্থানে তিনি মৃত্যুবরণ করেন, জানাযার পর সেখানেই তাকেঁ দাফন করা হয়। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) গোটা মুসলিম জাতিকে উদ্দেশ করে বলে গিয়েছেন, ‘আমি তোমাদের জন্য দুটি জিনিস রেখে গেলাম। যত দিন তোমরা এ দুটি জিনিসকে আঁকড়ে রাখবে তত দিন তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। একটি হলো আল্লাহর কিতাব অর্থাৎ কোরআন আর অপরটি হলো আমার সুন্নাহ অর্থাৎ হাদিস।’ বিশ্বনবী (সা.) এর জীবনী লিখতে গিয়ে খ্রিষ্টান লেখক ঐতিহাসিক উইলিয়াম মুর বলেছেন, ‘He was the mater mind not only of his own age but of all ages’ অর্থাৎ মুহাম্মদ (সা.) যে যুগে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন তাকে শুধু সে যুগেরই একজন মনীষী বলা হবে না, বরং তিনি ছিলেন সর্বকালের, সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মনীষী।
শুধুমাত্র ঐতিহাসিক উইলিয়াম মুরই নন, পৃথিবীর বুকে যত মনীষীর আবির্ভাব ঘটেছে প্রায় প্রত্যেকেই বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে তাঁদের মূল্যবান বাণী পৃথিবীর বুকে রেখে গেছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সূরা-আহযাব, আয়াত-২১)।

বর্তমানে অশান্ত, বিশৃঙ্খল ও দ্বন্দ্বমুখর আধুনিক বিশ্বে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর আদর্শকে অনুসরণ করা হলে বিশ্বে শান্তি ও একটি অপরাধমুক্ত সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা নিঃসন্দেহে সম্ভব।

ইসলামী বর্ণনামতে মুহাম্মদ (সা) এর অলৌকিকত্ব
ব্যতিক্রমের প্রতি আকর্ষন মানুষের স্বভাবজাত, অন্যদিকে অলৌকিকত্বের প্রভাব আমাদের লৌকিক জীবনে সুদূর প্রসারী। আরবী মু’জেযা শব্দের অর্থ আসাধারন বিষয়, অলৌকিকত্ব। মুহাম্মদের [স.] অসংখ্য মু’জেযার মধ্যে প্রকাশ্য মু’জেযার সংখ্যা দশ হাজারেরও অধিক। ব্যাখ্যাকারীগণ মুহাম্মদের [স.] মু’জেযাগুলোকে তিনভাগে বিভক্ত করে আলোচনা করেছেনঃ
প্রথমত যা তাঁর দেহ হতে বহির্ভূত। যথা- চন্দ্র দ্বিখন্ডিত হওয়া, বৃক্ষ নিকটে আসা, ঊট ও হরিনের অভিযোগ ইত্যাদি।
দ্বিতীয়ত যা তাঁর দেহসম্পৃক্ত যথা- ‘মহরে নবুওয়াত’ যা হলো দুই কাঁধের মাঝখানে আল্লাহর রাসূল মোহাম্মাদ (সঃ) বাক্যটি লেখা ছিল মৃত্যুর আগে পর্যন্ত। তৃতীয়ত তাঁর নৈতিক ও চারিত্রিক গুণাবলী যথা- নির্ভিক, অকুতোভয়, দানশীল, সত্য ভাষণকারী, দুনিয়াবিমুখ ইত্যাদি।
আল কোরানের সুরা ক্বামারে মুহাম্মদের [স.] আংগুল দ্বারা চন্দ্র দ্বিখন্ডিত হওয়ার কথা বলা আছে। বদর যুদ্ধের আগের দিন বদর নামক স্থানে পৌঁছে মুহাম্মদ [স.] বললেন ‘এটা আমুকের শাহাদাতের স্থান, এটা অমুকের (কাফেরের) হত্যার স্থান… সাহাবীরা (রা.) বলেন ‘রাসুলুল্লাহ! সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যার জন্য যে স্থান দেখিয়েছেন, তার সামান্য এদিক সেদিক হয়নি।’ (মুসলিম) বিভিন্ন যুদ্ধে আকাশের ফেরেশতাগন অংশগ্রহন করতো। যা আল্লাহর সাহায্য ও রাসুলুল্লাহ! সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মু’জেযার প্রমান। হযরত সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রাঃ) বলেন- ‘ ওহুদের যুদ্ধের দিন আমি রাসুলুল্লাহ! সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ডানে বামে সাদা পোষাকের দু জন কে (জিব্রাইল, মিকাইল) দেখলাম যাদের কে আর কোন দিন দেখেনি। (বুখারী, মুসলিম) সাহাবীর ভাংগা পা রাসুলুল্লাহ! সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর স্পর্শে ভালো হওয়া আরো একটি মু’জেযা। সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আতীক (রাঃ) এর পা ভেংগে গেলে তিনি তা রাসুলুল্লাহ! সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে জানালে রাসুলুল্লাহ! সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার পায়ের উপর হাত বুলালেন। সাহাবী বলেন- ‘এতে আমার পা এমনভাবে সুস্থ হয়ে গেলো যেন তাতে আমি কখনো আখাতই পাইনি। (বুখারী) স্বল্প খাদ্যে হাজার মানুষের পরিতৃপ্ত ভোজন হওয়া প্রিয়নবী রাসুলুল্লাহ! সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উল্লেখযোগ্য মু’জেযা। এরুপ বহু ঘটনা বহু সাহাবী বর্ণনা করেছেন। খন্দকের যুদ্ধের সময় যখন রাসুলুল্লাহ! সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সকল সাহাবীগন ক্ষুধায় অস্থির ও দুর্বল হয়ে পরেছিলেন তখন জাবের (রাঃ) একটি বকরীর বাচ্চা জবাই করলেন আর এক সা পরিমান জবের রুটি তৈরি করলেন আর তা দিয়েই সবাই তৃপ্তিতে খেলেন। সাহাবী জাবের (রাঃ) আল্লাহর শপথ করে বলেন- ‘সকলে তৃপ্তি সহকারে খেয়ে চলে যাওয়ার পরও চুলায় গোশত ভর্তি ডেকচি ফুটছিল এবং রুটি হচ্ছিল।’ (বুখারী, মুসলিম)

ইসলামিক সাধারণ জ্ঞান প্রশ্ন ও উত্তর


মুসলিম শরিফের হাদিস


ওহীর সূচনা


পরিচ্ছদঃ ১/ রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর প্রতি কিভাবে ওহী শুরু হয়েছিল

১। হুমায়দী (রহঃ) আলকামা ইবনু ওয়াক্কাস আল-লায়সী (রহঃ) থেকে বর্ণিত, আমি উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-কে মিম্বরের ওপর দাঁড়িয়ে বলতে শুনেছিঃ আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছিঃ প্রত্যেক কাজ নিয়তের সাথে সম্পর্কিত। আর মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী ফল পাবে। তাই যার হিজরত হবে দুনিয়া লাভের অথবা নারীকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে- সেই উদ্দেশ্যেই হবে তার হিজরতের প্রাপ্য।

২। আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, হারিস ইবনু হিশাম (রাঃ) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনার প্রতি ওহী কিভাবে আসে? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ কোন সময় তা ঘন্টাধ্বনির ন্যায় আমার নিকট আসে। আর এটি-ই আমার উপর সবচাইতে কষ্টদায়ক হয় এবং তা সমাপ্ত হতেই ফিরিশতা যা বলেন আমি তা মুখস্থ করে নই, আবার কখনো ফিরিশতা মানুষের আকৃতিতে আমার সঙ্গে কথা বলেন। তিনি যা বলেন আমি তা মুখস্থ করে ফেলি। আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমি প্রচন্ড শীতের দিনে ওহী নাযিলরত অবস্থায় তাঁকে দেখেছি। ওহী শেষ হলেই তাঁর কপাল থেকে ঘাম ঝরে পড়ত।

এই হাদিস পাঠে জানা যাচ্ছে যে, সাহাবী হারিস ইবনে হিশাম (রাঃ) রাসুলুল্লাহ (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার নিকট ওহী কিভাবে আসে? কিন্তু ইমাম বুখারী (রহঃ) অধ্যায় রচনা করেছেন, এই বলে যে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকট ওহী কিভাবে শুরু হয়েছিল? বস্তুতঃ ওহীর অবস্থা আর ওহী শুরু হওয়ার অবস্থা এক কথা নয়। অধ্যায় রচনার সাথে সামঞ্জস্য বিধান করতে যেয়ে আমরা বলব-সাহাবী হারিস (রাঃ) এর জিজ্ঞাসার তাৎপর্য এটাই যে, প্রথমে ওহী কিভাবে এসেছে?

৩। ইয়াহ্ইয়া ইবনু বুকায়র (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি সর্বপ্রথম যে ওহী আসে, তা ছিল ঘুমের মধ্যে সত্য স্বপ্নরূপে। যে স্বপ্নই তিনি দেখতেন তা একেবারে ভোরের আলোর ন্যায় প্রকাশ পেত। তারপর তাঁর কাছে নির্জনতা প্রিয় হয়ে পড়ে এবং তিনি হেরা'র গুহায় নির্জনে থাকতেন। আপন পরিবারের কাছে ফিরে আসা এবং কিছু খাদ্যসামগ্রী সঙ্গে নিয়ে যাওয়া এইভাবে সেখানে তিনি একাধারে বেশ কয়েক রাত ইবাদতে নিমগ্ন থাকতেন।
তারপর খাদীজা (রাঃ)-এর কাছে ফিরে এসে আবার অনুরূপ সময়ের জন্য কিছু খাদ্যসামগ্রী নিয়ে যেতেন। এমনিভাবে হেরা’ গুহায় অবস্থানকালে একদিন তাঁর কাছে ওহী এলো। তাঁর কাছে ফিরিশতা এসে বললেন, পড়ুন’। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ “আমি বললাম, আমি পড়িনা’। তিনি বলেনঃ তারপর তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে এমন ভাবে চাপ দিলেন যে, আমার অত্যন্ত কষ্ট হল। তারপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, পড়ুন’। আমি বললামঃ আমিতো পড়ি না। তিনি দ্বিতীয়বার আমাকে জড়িয়ে ধরে এমন ভাবে চাপ দিলেন যে, আমার অত্যন্ত কষ্ট হল। এরপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেনঃ পড়ুন’। আমি জবাব দিলাম, আমিতো পড়িনা’। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তারপর তৃতীয়বার তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে চাপ দিলেন। এরপর ছেড়ে দিয়ে বললেন, “পড়ুন আপনার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে আলাক থেকে। পড়ুন আর আপনার রব্ মহামহিমান্বিত। ” (৯৬: ১-৩)

তারপর এ আয়াত নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিরে এলেন। তাঁর অন্তর তখন কাঁপছিল। তিনি খাদীজা বিন্‌ত খুওয়ালিদের কাছে এসে বললেন, আমাকে চাঁদর দিয়ে ঢেকে দাও, আমাকে চাঁদর দিয়ে ঢেকে দাও। ’ তাঁরা তাঁকে চাঁদর দিয়ে ঢেকে দিলেন। অবশেষে তাঁর ভয় দূর হল। তখন তিনি খাদীজা (রাঃ) এর কাছে সকল ঘটনা জানিয়ে তাঁকে বললেন, আমি নিজের উপর আশংকা বোধ করছি। খাদীজা (রাঃ) বললেন, আল্লাহ্‌র কসম, কক্ষনো না। আল্লাহ্ আপনাকে কক্ষনো অপমানিত করবেন না। আপনিতো আত্মীয়-স্বজনের সাথে সদ্ব্যবহার করেন, অসহায় দুর্বলের দায়িত্ব বহন করেন, নিঃস্বকে সাহায্য করেন, মেহমানের মেহমানদারী করেন এবং দুর্দশাগ্রস্তকে সাহায্য করেন। এরপর তাঁকে নিয়ে খাদীজা (রাঃ) তাঁর চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনু নাওফিল ইবনু আবদুল আসা’দ ইবনু আবদুল উযযার কাছে গেলেন, যিনি জাহিলী যুগে ঈসায়ী ’ ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ইবরানী ভাষা লিখতে জানতেন এবং আল্লাহ্‌র তওফীক অনুযায়ী ইবরানী ভাষায় ইনজীল থেকে অনুবাদ করতেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বয়োবৃদ্ধ এবং অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। খাদীজা (রাঃ) তাঁকে বললেন, হে চাচাতো ভাই! আপনার ভাতিজার কথা শুনুন। ’ ওয়ারাকা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ভাতিজা! তুমি কী দেখ?’ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা দেখেছিলেন, সবই খুলে বললেন।
তখন ওয়ারাকা তাঁকে বললেন, ইনি সে দূত যাঁকে আল্লাহ্ মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে পাঠিয়েছিলেন। আফসোস! আমি যদি সেদিন যুবক থাকতাম। আফসোস! আমি যদি সেদিন জীবিত থাকতাম, যেদিন তোমার কাওম তোমাকে বের করে দেবে। ’ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাঁরা কি আমাকে বের করে দিবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, অতীতে যিনই তোমার মত কিছু নিয়ে এসেছেন তাঁর সঙ্গেই শত্রুতা করা হয়েছে। সেদিন যদি আমি থাকি, তবে তোমাকে প্রবলভাবে সাহায্য করব। ’ এর কিছুদিন পর ওয়ারাকা (রাঃ) ইন্তেকাল করেন। আর ওহী স্থগিত থাকে।

ইবনু শিহাব (রাঃ) জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ) ওহী স্থগিত হওয়া প্রসঙ্গে বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ একদা আমি হেঁটে চলেছি, হঠাৎ আকাশ থেকে একটি আওয়াজ শুনতে পেয়ে চোখ তুলে তাকালাম। দেখলাম, সেই ফিরিশতা, যিনি হেরায় আমার কাছে এসেছিলেন, আসমান ও যমিনের মাঝখানে একটি কুরসীতে বসে আছেন। এতে আমি ভয় পেয়ে গেলাম। তৎক্ষণাৎ আমি ফিরে এসে বললাম, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর। তারপর আল্লাহ তা'আলা নাযিল করলেন, "হে বস্ত্রাচ্ছাদিত! উঠুন, সতর্কবানী প্রচার করুন এবং আপনার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করুন। আপনার পোশাক পবিত্র রাখুন। অপবিত্রতা থেকে দূরে থাকুন (৭৪: ১-৪)। এরপর ব্যাপকভাবে পর পর ওহী নাযিল হতে লাগল। আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) ও আবূ সালেহ (রহঃ) অনুরুপ বর্ণনা করেছেন। হেলাল ইবনু রাদদাদ (রহঃ) যুহরী (রহঃ) থেকেও অনুরুপ বর্ণনা করেছেন। ইউনুস ও মা'মার - স্থলে শব্দ উল্লেখ করেছেন।

৪। মূসা ইবনু ইসমাঈল (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রহঃ) থেকে বর্ণিত, মহান আল্লাহর বাণীঃ তাড়াতাড়ি ওহী আয়ত্ত করার জন্য আপনার জিহ্বা তার সাথে নাড়বেন না’ (৭৫:১৬) এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহী নাযিলের সময় তা আয়ত্ত করতে বেশ কষ্ট স্বীকার করতেন এবং প্রায়ই তিনি তাঁর উভয় ঠোঁট নাড়াতেন। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, আমি তোমাকে দেখানোর জন্য ঠোঁট দুটি নাড়ছি যেভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাড়াতেন। ’

সা’ঈদ (রহঃ) (তাঁর শাগরিদদের) বললেন, আমি ইবনু ’আব্বাস (রাঃ)-কে যেভাবে তাঁর ঠোঁট দুটি নাড়াতে দেখেছি, সেভাবেই আমার ঠোঁট দুটি নাড়াচ্ছি। ’ এই বলে তিনি তাঁর ঠোঁট দুটি নাড়ালেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ তা’আলা নাযিল করলেনঃ “তাড়াতাড়ি ওহী আয়ত্ত করার জন্য আপনি আপনার জিহবা তার সাথে নাড়াবেন না। এর সংরক্ষণ ও পাঠ করানোর দায়িত্ব আমারই। ” (৭৫:১৬-১৮) ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন এর অর্থ হলঃ আপনার অন্তরে তা সংরক্ষণ করা এবং আপনার দ্বারা তা পাঠ করানো। সুতরাং যখন আমি তা পাঠ করি আপনি সে পাঠের অনুসরণ করুন (৭৫:১৯) ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন অর্থাৎ মনোযোগ সহকারে শুনুন এবং চুপ থাকুন। এরপর এর বিশদ ব্যাখ্যার দায়িত্ব আমারই (৭৫:১৯)। ’ অর্থাৎ আপনি তা পাঠ করবেন এটাও আমার দায়িত্ব। তারপর যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে জিবরাঈল আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসতেন, তখন তিনি মনোযোগ সহকারে কেবল শুনতেন। জিবরাঈল আলাইহি ওয়া সাল্লাম চলে গেলে তিনি যেমন পড়েছিলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও ঠিক তেমনি পড়তেন।

৫। আবদান (রহঃ) ও বিশর ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ দাতা। রমযানে তিনি আরো বেশী দানশীল হতেন, যখন জিবরাঈল আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতেন। আর রমযানের প্রতি রাতেই জিবরাঈল আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতেন এবং তাঁরা পরস্পর কুরআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন। নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রহমতের বাতাস থেকেও অধিক দানশীল ছিলেন।

৬। আবূল ইয়ামান হাকাম ইবনু নাফি (রহঃ) আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, আবূ সুফিয়ান ইবনু হরব তাকে বলেছেন, বাদশাহ হিরাকল একবার তাঁর কাছে লোক পাঠালেন। তিনি কুরাইশদের কাফেলায় তখন ব্যবসা উপলক্ষে সিরিয়ায় ছিলেন। সে সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ সুফিয়ান ও কুরাইশদের সাথে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সন্ধিবদ্ধ ছিলেন। আবূ সুফিয়ান তার সঙ্গীদের সহ হিরাকলের কাছে এলেন এবং তখন হিরাকল জেরুযালেমে অবস্থান করছিলেন। হিরাকল তাদেরকে তাঁর দরবারে ডাকলেন। তার পাশে তখন রোমের নেত্রীস্থানীয় ব্যাক্তিগন উপস্থিত ছিল। এরপর তাদের কাছে ডেকে নিলেন এবং দোভাষীকে ডাকলেন।

তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, এই যে ব্যাক্তি নিজেকে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে দাবী করে — তোমাদের মধ্যে বংশের দিক দিয়ে তাঁর সবচেয়ে নিকটাত্মীয় কে? আবূ সুফিয়ান বললেন, আমি বললাম, বংশের দিক দিয়ে আমই তাঁর নিকটাত্মীয়। ’ তিনি বললেন, তাঁকে আমার খুব কাছে নিয়ে এস এবং তাঁর সঙ্গীদেরও কাছে এনে পেছনে বসিয়ে দাও। ’ এরপর তাঁর দোভাষীকে বললেন, তাদের বলে দাও, আমি এর কাছে সে ব্যাক্তি সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসা করবো, সে যদি আমার কাছে মিথ্যা বলে, তবে সাথে সাথে তোমরা তাকে মিথ্যাবাদী বলে প্রকাশ করবে। ’ আবূ সুফিয়ান বলেন, আল্লাহ্‌র কসম! তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলে প্রচার করবে-এ লজ্জা যদি আমার না থাকত, তবে অবশ্যই আমি তাঁর সম্পর্কে মিথ্যা বলতাম।

এরপর তিনি তাঁর সম্পর্কে আমাকে প্রথম প্রশ্ন যে করেন তা হচ্ছে, তোমাদের মধ্যে তাঁর বংশমর্যাদা কেমন?’ আমি বললাম, তিনি আমাদের মধ্যে অতি সম্ভ্রান্ত বংশের। ’ তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে এর আগে আর কখনো কি কেউ একথা বলেছে?’ আমি বললাম, না। ’ তিনি বললেন, তাঁর বাপ-দাদাদের মধ্যে কি কেউ বাদশাহ ছিলেন?’ আমি বললাম, না। ’ তিনি বললেন, তারা কি সংখ্যায় বাড়ছে, না কমছে?’ আমি বললাম, তারা বেড়েই চলেছে। ’ তিনি বললেন, তাঁর দ্বীন গ্রহণ করার পর কেউ কি নারায হয়ে তা পরিত্যাগ করে?’ আমি বললাম, না। ’ তিনি বললেন, নবূয়তের দাবীর আগে তোমরা কি কখনো তাঁকে মিথ্যার দায়ে অভিযুক্ত করেছ?’ আমি বললাম, না। ’ তিনি বললেন, তিনি কি চুক্তি ভঙ্গ করেন?’ আমি বললাম, না। ’ তবে আমরা তাঁর সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট সময়ের চুক্তিতে আবদ্ধ আছি। জানিনা, এর মধ্যে তিনি কি করবেন। ’

আবূ সুফিয়ান বলেন, এ কথাটুকু ছাড়া নিজের পক্ষ থেকে আর কোন কথা সংযোজনের সুযোগই আমি পাইনি। ’ তিনি বললেন, তোমরা কি তাঁর সাথে কখনো যুদ্ধ করেছ?’ আমি বললাম, হাঁ। ’ তিনি বললেন, তাঁর সঙ্গে তোমাদের যুদ্ধ কেমন হয়েছে?’ আমি বললাম, তাঁর ও আমাদের মধ্যে যুদ্ধের ফলাফল কুয়ার বালতির ন্যায়। কখনো তাঁর পক্ষে যায়, আবার কখনো আমাদের পক্ষে আসে। ’ তিনি বললেন, তিনি তোমাদের কিসের আদেশ দেন?’ আমি বললাম, তিনি বলেনঃ তোমরা এক আল্লাহ্‌র ইবাদত কর এবং তাঁর সঙ্গে কোন কিছুর শরীক করো না এবং তোমাদের বাপ-দাদার ভ্রান্ত মতবাদ ত্যাগ কর। আর তিনি আমাদের সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করার, সত্য কথা বলার, নিষ্কলুষ থাকার এবং আত্মীয়দের সাথে সদ্ব্যবহার করার আদেশ দেন। ’

তারপর তিনি দোভাষীকে বললেন, তুমি তাকে বল, আমি তোমার কাছে তাঁর বংশ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছি। তুমি তার জওয়াবে উল্লেখ করেছ যে, তিনি তোমাদের মধ্যে সম্ভ্রান্ত বংশের। প্রকৃতপক্ষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গণকে তাঁদের কওমের উচ্চ বংশেই প্রেরণ করা হয়ে থাকে। তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি, এ কথা তোমাদের মধ্যে ইতিপূর্বে আর কেউ বলেছে কিনা? তুমি বলেছ, না। ’ তাই আমি বলছি যে, আগে যদি কেউ এ কথা বলে থাকত, তবে অবশ্যই আমি বলতে পারতাম, এ এমন ব্যাক্তি, যে তাঁর পূর্বসূরীর কথারই অনুসরণ করছে। আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি, তাঁর পূর্বপুরুষের মধ্যে কোন বাদশাহ ছিলেন কি না? তুমি তার জবাবে বলেছ, না। ’ তাই আমি বলছি যে, তাঁর পূর্বপুরুষের মধ্যে যদি কোন বাদশাহ থাকতেন, তবে আমি বলতাম, ইনি এমন এক ব্যাক্তি যিনি তাঁর বাপ-দাদার বাদশাহী ফিরে পেতে চান। আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি- এর আগে কখনো তোমরা তাঁকে মিথ্যার দায়ে অভিযুক্ত করেছ কি না? তুমি বলেছ, না। ’ এতে আমি বুঝলাম, এমনটি হতে পারে না যে, কেউ মানুষের ব্যাপারে মিথ্যা ত্যাগ করবে অথচ আল্লাহ্‌র ব্যাপারে মিথ্যা কথা বলবে। আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি, শরীফ লোক তাঁর অনুসরন করে, না সাধারণ লোক? তুমি বলেছ, সাধারণ লোকই তাঁর অনুসরণ করে। আর বাস্তবেও এরাই হন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গণের অনুসারী। আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি, তারা সংখ্যায় বাড়ছে না কমছে? তুমি বলেছ বাড়ছে। প্রকৃতপক্ষে ঈমানে পূর্ণতা লাভ করা পর্যন্ত এ রকমই হয়ে থাকে। আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি, তাঁরা দ্বীনে দাখিল হওয়ার পর নারায হয়ে কেউ কি তা ত্যাগ করে? তুমি বলেছ, না। ’ ঈমানের স্নিগ্ধতা অন্তরের সাথে মিশে গেলে ঈমান এরূপই হয়। আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি তিনি চুক্তি ভঙ্গ করেন কি না? তুমি বলেছ, না। ’ প্রকৃতপক্ষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গণ এরূপই, চুক্তি ভঙ্গ করেন না। আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি তিনি তোমাদের কিসের নির্দেশ দেন। তুমি বলেছ, তিনি তোমাদের এক আল্লাহ্‌র ইবাদত করা ও তাঁর সাথে অন্য কিছুকে শরীক না করার নির্দেশ দেন। তিনি তোমাদের নিষেধ করেন মূর্তিপূজা করতে আর তোমাদের আদেশ করেন সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করতে, সত্য কথা বলতে ও কলুষমুক্ত থাকতে। তুমি যা বলেছ তা যদি সত্য হয়, তবে শীঘ্রই তিনি আমার এ দু’পায়ের নীচের জায়গার মালিক হবেন। আমি নিশ্চিত জানতাম, তাঁর আবির্ভাব হবে; কিন্তু তিনি যে তোমাদের মধ্যে থেকে হবেন, এ কথা ভাবিনি। যদি জানতাম, আমি তাঁর কাছে পৌঁছাতে পারব, তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য আমি যে কোন কষ্ট স্বীকার করতাম। আর আমি যদি তাঁর কাছে থাকতাম তবে অবশ্যই তাঁর দু’খানা পা ধুয়ে দিতাম। এরপর তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সেই পত্রখানি আনতে বললেন, যা তিনি দিহ্য়াতুল কালবীর মাধ্যমে বসরার শাসকের কাছে পাঠিয়েছিলেন। তিনি তা পাঠ করলেন। তাতে লেখা ছিলঃ

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম (দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহ্‌র নামে)। আল্লাহ্‌র বান্দা ও তাঁর রাসুল মুহাম্মদএর পক্ষ থেকে রোম সমরাট হিরাকল এর প্রতি। --শান্তি (বর্ষিত হোক) তার প্রতি, যে হিদায়াতের অনুসরণ করে। তারপর আমি আপনাকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি। ইসলাম গ্রহণ করুন, নিরাপদে থাকবেন। আল্লাহ্ আপনাকে দ্বিগুণ পুরষ্কার দান করবেন। আর যদি মুখ ফিরিয়ে নেন, তবে সব প্রজার পাপই আপনার উপর বর্তাবে। হে আহলে কিতাব! এস সে কথার দিকে, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই; যেন আমরা আল্লাহ্ ব্যতীত আর কারো ইবাদত না করি, কোন কিছুকেই তাঁর শরীক না করি এবং আমাদের কেউ কাউকে আল্লাহ্ ব্যতীত রব রূপে গ্রহণ না করি। যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে বলো, তোমরা সাক্ষী থাক, আমরা মুসলিম’ (৩:৬৪)।

আবূ সুফিয়ান বলেন, হিরাকল যখন তাঁর বক্তব্য শেষ করলেন এবং পত্র পাঠও শেষ করলেন, তখন সেখানে শোরগোল পড়ে গেল, চীৎকার ও হৈ-হল্লা তুঙ্গে উঠল এবং আমাদের বের করে দেওয়া হল। আমাদের বের করে দিলে আমি আমার সঙ্গীদের বললাম, আবূ কাবশার ছেলের বিষয়তো শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, বনূ আসফার (রোম)-এর বাদশাহও তাকে ভয় পাচ্ছে। তখন থেকে আমি বিশ্বাস করতে লাগলাম, তিনি শীঘ্রই জয়ী হবেন। অবশেষে আল্লাহ্ তা’আলা আমাকে ইসলাম গ্রহণের তওফীক দান করলেন।

ইবনু নাতূর ছিলেন জেরুযালেমের শাসনকর্তা এবং হিরাকলের বন্ধু ও সিরিয়ার খৃষ্টানদের পাদ্রী। তিনি বলেন, হিরাকল যখন জেরুযালেম আসেন, তখন একদিন তাঁকে বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। তাঁর একজন বিশিষ্ট সহচর বলল, আমরা আপনার চেহারা আজ বিবর্ণ দেখতে পাচ্ছি, ’ ইবনু নাতূর বলেন, হিরাকল ছিলেন জ্যোতিষী, জ্যোতির্বিদ্যায় তাঁর দক্ষতা ছিল। তারা জিজ্ঞাসা করলে তিনি তাদের বললেন, আজ রাতে আমি তারকারাজির দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলাম, খতনাকারীদের বাদশাহ আবির্ভূত হয়েছেন। বর্তমান যুগে কোন্ জাতি খতনা করে?’ তারা বলল, ইয়াহূদী ছাড়া কেউ খতনা করে না। কিন্তু তাদের ব্যাপার যেন আপনাকে মোটেই চিন্তিত না করে। আপনার রাজ্যের শহরগুলোতে লিখে পাঠান, তারা যেন সেখানকার সকল ইয়াহূদীকে হত্যা করে ফেলে। ’ তারা যখন এ ব্যাপারে ব্যতিব্যস্ত ছিল, তখন হিরাকলের কাছে এক ব্যাক্তিকে উপস্থিত করা হল, যাকে গাসসানের শাসনকর্তা পাঠিয়েছিল। সে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সম্পর্কে খবর দিচ্ছিল। হিরাকল তার কাছ থেকে খবর জেনে নিয়ে বললেন, তোমরা একে নিয়ে গিয়ে দেখ, তার খতনা হয়েছে কি-না। ’ তারা তাকে নিয়ে দেখে এসে সংবাদ দিল, তার খতনা হয়েছে। হিরাকল তাকে আরবদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। সে জওয়াব দিল, তারা খতনা করে। ’ তারপর হিরাকল তাদের বললেন, ইনি [রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ] এ উম্মতের বাদশাহ। তিনি আবির্ভূত হয়েছেন। ’ এরপর হিরাকল রোমে তাঁর বন্ধুর কাছে লিখলেন। তিনি জ্ঞানে তাঁর সমকক্ষ ছিলেন। পরে হিরাকল হিমস চলে গেলেন। হিমসে থাকতেই তাঁর কাছে তাঁর বন্ধুর চিঠি এলো, যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আবির্ভাব এবং তিনই যে প্রকৃত নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম , এ ব্যাপারে হিরাকলের মতকে সমর্থন করছিল। তারপর হিরাকল তাঁর হিমসের প্রাসা’দ রোমের নেতৃস্থানীয় ব্যাক্তিদের ডাকলেন এবং প্রাসা’দর সব দরজা বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। দরজা বন্ধ করা হল। তারপর তিনি সামনে এসে বললেন, হে রোমবাসী! তোমরা কি কল্যাণ, হিদায়ত এবং তোমাদের রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব চাও? তাহলে এই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম 'র রায়’আত গ্রহণ কর। ’ এ কথা শুনে তারা জংলী গাধার মত ঊর্ধ্বশ্বাসে দরজার দিকে ছুটল, কিন্তু তারা তা বন্ধ অবস্থায় পেল। হিরাকল যখন তাদের অনীহা লক্ষ্য করলেন এবং তাদের ঈমান থেকে নিরাশ হয়ে গেলেন, তখন বললেন, ওদের আমার কাছে ফিরিয়ে আন। ’ তিনি বললেন, আমি একটু আগে যে কথা বলেছি, তা দিয়ে তোমরা তোমাদের দ্বীনের উপর কতটুকু অটল, কেবল তার পরীক্ষা করেছিলাম। এখন আমি তা দেখে নিলাম। ’ একথা শুনে তারা তাঁকে সিজদা করল এবং তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হল। এই ছিল হিরাকল এর শেষ অবস্থা। আবূ আবদুল্লাহ [বুখারী (রহঃ)] বলেন, সালেহ ইবনু কায়সান (রহঃ), ইউনুস (রহঃ) ও মা’মার (রহঃ) এ হাদীস যুহরী (রহঃ) থেকে রিওয়ায়েত করেছেন।

দাজ্জালের আগমন


এ নশ্বর পৃথিবীর যেদিন ধ্বংস হবে, সেদিনের নাম ক্বিয়ামত। ক্বিয়ামত সংঘটিত হওয়ার দিনক্ষণ আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। তবে এর কিছু পূর্বলক্ষণ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বর্ণনা করেছেন। তন্মধ্যে দাজ্জালের আগমন অন্যতম। এ বিষয়ে নিম্নোক্ত হাদীছ।-

ফাতিমা বিনতে কায়েস (রাঃ) বলেন, আমি রাসূল (ছাঃ)-এর ঘোষককে এ ঘোষণা দিতে শুনলাম যে, ‘ছালাতের জন্য মসজিদে যাও’। সুতরাং আমি মসজিদে গেলাম এবং রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে ছালাত আদায় করলাম। ছালাত শেষে তিনি মিম্বারে উঠে বসলেন এবং মৃদু হেসে বললেন, প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ নিজ ছালাতের স্থানে বসে থাক। অতঃপর বললেন, তোমরা কি জান, আমি তোমাদেরকে কেন একত্রিত করেছি? ছাহাবীগণ বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)ই অধিক জানেন। তিনি বললেন, আল্লাহ্র কসম! আমি তোমাদেরকে কিছু দেওয়ার জন্য বা কোন ভয়-ভীতি প্রদর্শনের জন্য সমবেত করিনি। বরং তামীম দারীর একটি ঘটনা তোমাদের শুনানোর জন্য তোমাদেরকে একত্রিত করেছি। তামীম দারী ছিল একজন খৃষ্টান লোক। সে আমার নিকট এসে ইসলাম গ্রহণ করেছে। সে আমাকে এমন একটি ঘটনা শুনিয়েছে, তা ঐ কথার সাথে মিল রাখে, যা দাজ্জাল সম্পর্কে আমি তোমাদেরকে শুনিয়েছি। সে বলল, একদা সে ‘লাখাম’ ও ‘জুজাম’ গোত্রের ত্রিশজন লোকের সঙ্গে একটি সামুদ্রিক নৌকায় সফরে বের হয়েছিল। সাগরের তরঙ্গ তাদেরকে দীর্ঘ এক মাস পর্যন্ত এদিক সেদিক ঘুরাতে থাকে। অবশেষে একদিন সূর্যাস্তের সময় একটি দ্বীপের কাছে গিয়ে পৌঁছল। অতঃপর তারা উক্ত বড় নৌকার গায়ের সাথে বাঁধা ছোট ছোট নৌকা যোগে দ্বীপটির অভ্যন্তরে প্রবেশ করল এবং সেখানে এমন একটি প্রাণীর সাক্ষাত পেল, যার সারা শরীর বড় বড় লোমে আবৃত। অধিক পশমের কারণে তার মুখ ও পিছন বুঝা যাচ্ছিল না। তখন তারা তাকে লক্ষ্য করে বলল, তোর অমঙ্গল হোক, তুই কে? সে বলল, আমি জাসসাস বা গুপ্ত সংবাদ অন্বেষণকারী। তোমরা ঐ ঘরে আবদ্ধ লোকটির কাছে যাও, সে তোমাদের সংবাদ জানার প্রত্যাশী। তামীম দারী বলেন, উক্ত প্রাণীর কাছে লোকটির কথা শুনে আমাদের অন্তরে ভীতির সঞ্চার হ’ল যে, সে শয়তান হ’তে পারে। তখন আমরা দ্রুত সেখানে গেলাম এবং সে ঘরে প্রবেশ করলাম। সেখানে এমন একটি প্রকান্ড দেহ বিশিষ্ট মানুষ দেখতে পেলাম, যা ইতিপূর্বে কোনদিন দেখিনি। সে খুব শক্তভাবে বাঁধা অবস্থায় ছিল। তার হাত ঘাড়ের সাথে এবং হাঁটুদ্বয় নীচের উভয় গিটের সাথে লোহার শিকল দ্বারা একত্রে বাঁধা ছিল। আমরা তাকে বললাম, তোর অমঙ্গল হোক! তুই কে? সে বলল, নিশ্চয়ই তোমরা আমার সম্পর্কে জানতে পারবে, আমি তা গোপন করব না। তবে তোমরা আমাকে প্রথমে বল তোমরা কারা? তারা বলল, আমরা আরবের লোক।

আমরা সমুদ্রে একটি নৌকায় আরোহী ছিলাম। দীর্ঘ এক মাস সাগরের ঢেউ আমাদেরকে এদিক সেদিক ঘুরিয়ে এখানে এনে পৌঁছিয়েছে। তারপর আমরা অত্র দ্বীপে প্রবেশ করলাম। এরপর ঘনপশমে সারা দেহ আবৃত একটি প্রাণীর সাথে আমাদের সাক্ষাত হ’ল। সে বলল, আমি গুপ্ত সংবাদ অন্বেষণকারী। সে আমাদেরকে এ ঘরে আসতে বললে আমরা দ্রুত তোমার নিকট এসে উপস্থিত হ’লাম। সে বলল, আচ্ছা তোমরা আমাকে বল দেখি, বায়সান এলাকার খেজুর গাছে ফল আসে কি? (বায়সান হেজাযের একটি জায়গার নাম)। আমরা বললাম, হ্যাঁ আসে। সে বলল, অদূর ভবিষ্যতে সে গাছে আর ফল ধরবে না। তারপর সে বলল, আচ্ছা বল দেখি, তাবারিয়া নামক বিলে পানি আছে কি? আমরা বললাম, হ্যাঁ তাতে প্রচুর পরিমাণে পানি আছে। সে বলল, অচিরেই তার পানি শেষ হয়ে যাবে। তারপর সে বলল, আচ্ছা বল দেখি, যোগার নামক ঝর্ণায় পানি আছে কি এবং সেখানকার অধিবাসীরা সে ঝরণার পানি দ্বারা কি জমি চাষ করে? আমরা বললাম, হ্যাঁ তাতে প্রচুর পানি আছে এবং সেখানকার লোকেরা পানি দ্বারা জমি চাষাবাদ করে। তারপর সে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা বল দেখি, নিরক্ষর নবীর সংবাদ কি? আমরা বললাম, তিনি এখন মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় অবস্থান করছেন। সে জিজ্ঞেস করল, বল দেখি আরবেরা কি তাঁর সাথে যুদ্ধ করেছিল? আমরা বললাম, হ্যাঁ করেছে। সে জিজ্ঞেস করল, তিনি তাদের সাথে কিরূপ আচরণ করেছেন? আমরা বললাম, তিনি আশপাশের আরবদের প্রতি জয়ী হয়েছেন এবং তারা তাঁর আনুগত্য স্বীকার করেছে। এসব শুনে সে বলল, তোমরা জেনে রাখ! তাঁর আনুগত্য করা তাদের জন্য মঙ্গলজনক। আচ্ছা এবার আমি আমার অবস্থা বর্ণনা করছি- আমি দাজ্জাল। অদূর ভবিষ্যতে আমাকে বের হওয়ার অনুমতি প্রদান করা হবে। আমি বের হয়ে যমীনে বিচরণ করব, মক্কা মদীনা ব্যতীত। চল্লিশ দিনের মধ্যে পৃথিবীর সব স্থান বিচরণ করব। এ দু’স্থানে আমার জন্য প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

যখনই আমি তার কোন একটিতে প্রবেশের ইচ্ছা করব, তখন ফেরেশতা উন্মুক্ত তরবারী হাতে নিয়ে আমাকে প্রবেশ করা হ’তে বাধা প্রদান করবে। বস্ত্তত তার প্রতিটি প্রবেশ পথে ফেরেশতা পাহারা রত রয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, এ পর্যন্ত বর্ণনা করে রাসূল আপন লাঠি দ্বারা মিম্বারে ঠোকা দিয়ে তিনবার বললেন, এটাই মদীনা, এটাই মদীনা, এটাই মদীনা। তারপর তিনি বললেন, বল দেখি ইতিপূর্বে আমি কি তোমাদেরকে এ হাদীছটি বর্ণনা করিনি? লোকেরা বলল, জি হ্যাঁ। তারপর তিনি বললেন, দাজ্জাল সিরিয়ার কোন এক সাগরে অথবা ইয়ামনের কোন এক সাগরে আছে। পরে বললেন, বরং সে পূর্ব দিক হ’তে আগমন করবে। এই বলে তিনি হাত দ্বারা পূর্ব দিকে ইশারা করলেন (মুসলিম, মিশকাত হা/৫২৪৮) ।

উপরোক্ত হাদীছের ন্যায় নিম্নোক্ত হাদীছটিতেও দাজ্জালের পৃথিবীতে অবস্থান, ঈসা (আঃ)-এর পৃথিবীতে আগমন ও অবস্থান সহ ক্বিয়ামতের কিছু আলামত বর্ণিত হয়েছে।-

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, দাজ্জাল বের হবে এবং চল্লিশ পর্যন্ত অবস্থান করবে। আব্দুল্লাহ্ ইবনে আমর (রাঃ) বলেন, আমি অবগত নই যে, রাসূল (ছাঃ) চল্লিশ দিন বললেন, না চল্লিশ মাস বললেন, না চল্লিশ বছর বললেন। তারপর আল্লাহ ঈসা ইবনে মারইয়ামকে প্রেরণ করবেন। দেখতে তিনি উরওয়া ইবনে মাস‘ঊদের মত। তিনি দাজ্জালের খোঁজ করবেন এবং তিনি তাকে হত্যা করবেন। ঈসা (আঃ) ৭ বছর এ যমীনে অবস্থান করবেন। সে সময় মানুষের মধ্যে এমন শান্তি বিরাজ করবে যে, দু’জনের মধ্যেও কোন শত্রুতা থাকবে না। তারপর আল্লাহ্ তা‘আলা সিরিয়ার দিক হ’তে শীতল বাতাস প্রবাহিত করবেন। সে বাতাস ভূপৃষ্ঠে এমন একজন লোককেও জীবিত রাখবে না, যার অন্তরে রেণু-কণা পরিমাণ নেকী বা ঈমান থাকবে। অর্থাৎ তোমাদের কেউ যদি পাহাড়ের মধ্যে আত্মগোপন করে তবুও সেখানে এ বাতাস প্রবেশ করবে এবং তাকে মেরে ফেলবে। নবী করীম (ছাঃ) বলেন, তারপর কেবল মাত্র নিকৃষ্ট ফাসেক ও বদকার লোকগুলি অবশিষ্ট থাকবে। তারা ব্যভিচারে পাখিদের ন্যায় দ্রুতগামী হবে এবং খুনখারাবীতে হিংস্র প্রাণীর ন্যায় পাষাণ হবে।

ভাল-মন্দ তারতম্য করার কোন যোগ্যতা তাদের থাকবে না। তখন শয়তান একটি আকৃতি ধারণ করে তাদের নিকট আসবে এবং বলবে তোমাদের কি লজ্জাবোধ হয় না? তখন লোকেরা বলবে আচ্ছা তুমিই বল, আমাদের কি করা উচিত? তখন শয়তান তাদেরকে মূর্তিপূজার আদেশ দিবে। এ অবস্থায় তারা অতি সুখ স্বাচ্ছন্দ্যে ও ভোগবিলাসে জীবন যাপন করতে থাকবে। অতঃপর সিংগায় ফুঁক দেওয়া হবে এবং যে ব্যক্তিই উক্ত ফুঁক শুনবে, সে ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় এদিক সেদিক মাথা ঘুরাতে থাকবে। নবী করীম (ছাঃ) বলেন, সর্ব প্রথম উক্ত আওয়ায সে ব্যক্তিই শুনতে পাবে যে তার উটের জন্য পানির চৌবাচ্চা মেরামত কাজে রত। তখন সে ভীত হয়ে সেখানেই মৃত্যুবরণ করবে এবং তার সাথে সাথে অন্যান্য লোকও মারা যাবে। অতঃপর আল্লাহ্ কুয়াশার ন্যায় খুব হালকা ধরনের বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। এতে ঐ সমস্ত দেহগুলি সজীব হয়ে উঠবে, যেগুলি কবরের মধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর দ্বিতীয়বার সিংগায় ফুঁক দেওয়া হবে। তখন সমস্ত লোক উঠে দাঁড়াবে। এরপর ঘোষণা দেওয়া হবে, হে লোক সকল! তোমরা দ্রুত তোমাদের প্রতিপালোকের দিকে ছুটে আস। ফেরেশতাদের আদেশ দেওয়া হবে তাদেরকে এখানে থামিয়ে রাখ, তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। অতঃপর ফেরেশ্তাদের বলা হবে, ঐ সমস্ত লোকদের বের কর, যারা জাহান্নামের উপযোগী হয়েছে। তখন ফেরেশতাগণ বলবেন, কতজন হ’তে কতজন বের করব? বলা হবে, প্রত্যেক হাযার হ’তে নয়শত নিরানববই জনকে জাহান্নামের জন্য বের কর। এ পর্যন্ত বলার পর রাসূল (ছাঃ) বললেন, এটা সেই দিন যেদিন সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে, يَوْمَ يَجْعَلُ الْوِلْدَانَ شِيْبًا ‘সেদিন শিশুদেরকে বৃদ্ধ করে দেওয়া হবে’ (মুয্যাম্মিল ১৭) । অর্থাৎ সেদিনের বিভীষিকায় শিশুও বৃদ্ধ হয়ে যাবে। সেদিন হবে খুব সংকটময়’ (মুসলিম, মিশকাত হা/৫২৮৬) ।

ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে, এ সত্যকে মুমিন মাত্রই বিশ্বাস করে। আর তার জন্য যথাসাধ্য প্রস্ত্ততি গ্রহণ করতে হবে এবং তার ভয়াবহতা থেকে বেঁচে থাকার জন্য প্রত্যেক মুমিন-মুসলমানকে আমলে ছালেহ করতে হবে। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন- আমীন!

ফেরাউন ও মুসা


মহাপ্লাবনের পর বহুকাল অতিবাহিত হয়েছে। নূহের বংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বংশে একজন পরম ধার্মিক লোক জন্মগ্রহণ করলেন, তাঁর নাম ইসরাইল। তিনি যে দেশে বাস করতেন তার নাম কেনান। মিশরের বাদশাহ ফেরাউন তাঁকে মিশরে এসে বাস করার আমন্ত্রণ করেন।

তিনি ইসরাইলকে যথেষ্ট প্রীতির চক্ষে দেখতেন। ফেরাউন কালক্রমে পরলোক গমন করলে অপর একজন ফেরাউন সিংহাসনে উপবেশন করলেন। ফেরাউন কোন লোকের নাম নয়। মিশরের বাদশাহদিগকে ফেরাউন বলা হতো, ইহা পদবী যাহা হউক, পরের এই ফেরাউন অত্যাচারী ছিলেন। তিনি পূর্ববর্তী ফেরাউনের একজন উজীর ছিলেন। প্রথমে তিনি খুব সৎস্বভাবের লোক ছিলেন। নানা রকমে প্রজাদের উপকার করতেন।

কোন বৎসর অজন্মা হলে তিনি নানা রকম কৌশল করে প্রজাদের খাজনা মওকুফ করবার বা শোধ করবার ব্যবস্থা করতেন। যদি রাজ্যে কখনও দুর্ভিক্ষ দেখা দিতো তাহলে তিনি বাদশাহের ধনাগার থেকে কৌশলে অর্থ বের করে গরীব প্রজাদিগকে অনাহারের কবল থেকে রক্ষা করতেন। এইজন্য প্রজারা তাঁকে খুব বেশি সম্মান ও ভক্তি করতো। ফেরাউন গত হলে মিশর দেশের লোকেরা তাঁকেই তাদের বাদশাহ নিযুক্ত করলেন।

কিন্তু বাদশাহ হবার পর তার মনের অবস্থা যেন আমূল পরিবর্তিত হয়ে গেলো। তিনি ইসরাইল ও তার বংশধরগণের ওপরে অত্যাচার আরম্ভ করলেন। তিনি অনেক দেশ জয় করে তাঁর রাজ্য আরও বৃদ্ধি করলেন। চারদিক থেকে রাজস্ব ও উপঢৌকন এসে তার ধনাগার পূর্ণ হতে লাগলো। সাধারণ ব্যক্তি সহসা বিত্তশালী হলে তার মনে অহঙ্কার জন্মে এবং তার নানা কু-পরামর্শতাদাও জোটে। সুতরাং ফেরাউনেরও এমন হিতৈষী বন্ধুর অভাব ঘটল না। হামান নামক একজন কূটবুদ্ধি উজীর তাঁকে দুনিয়ার বাদশাহ হবার স্বপ্ন দেখাতে লাগলো। প্রজারা যাতে নীরেট মূর্খ হয়ে থাকে এবং তাকে খোদা বলে মান্য করে তার জন্য নানা যুক্তি-পরামর্শ দিতে লাগলো।

মন্ত্রী হামানের পরামর্শ মতো ফেরাউন সমগ্র রাজ্যের মাতব্বর প্রজাদের ডেকে একটা বড় সভা করলেন। সেই সভাতে তিনি তাদের বুঝিয়ে দিলেন যে, লেখাপড়া শিখে মিছামিছি সময় নষ্ট করবার আর প্রয়োজন নেই। কারণ, লোকের পরমায়ু অতি অল্পকাল। এই সঙ্কীর্ণ সময়ের মধ্যে জীবনের বেশির ভাগ দিনই যদি মক্তবে এবং পাঠশালায় গমনাগমন করে এবং পড়ার ভাবনা ভেবে ভেবে কাটিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে আমোদ আহলাদ এবং স্ফুর্তি করবার অবসর পাওয়া যাবে না। সুতরাং সারাজীবন ভরে আমোদ করো –মজা করো। তাহলে মরবার সময়ে মনে বিন্দুমাত্র অনুতাপ আসবে না।

প্রজারা ফেরাউনের ও হামানের এই উপদেশ সানন্দে গ্রহণ করলো এবং বংশধরদের কাউকে আর বিদ্যালয়ে প্রেরণ করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিলো।

অতঃপর হামান পাঠশালা ও মক্তব রাজ্য থেকে উঠিয়ে ঢাক পিটিয়ে দেশময় প্রচার করে দিলো যে, কেউ আর লেখাপড়া শিখতে পারবে না। রাজার আদেশ অমান্য করলে সবংশে তার গর্দান যাবে।

প্রজারা ফেরাউনের আদেশ মতো চলতে লাগলো। লেখাপড়া আর কেউ শিখতে চেষ্টা করলো না। সারাদেশে কিছুকালের মধ্যে একেবারে গণ্ডমুর্খতে পূর্ণ হয়ে গেল। মূর্খের অশেষ দোষ। কোন ধর্মাধর্ম, হিতাহিত জ্ঞান তার থাকে না। তারা হয় কাণ্ডজ্ঞানবিবর্জিত এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন। দুনিয়ার এমন কোন অসৎ কাজ নেই যা মূর্খে না করতে পারে! যখন তার রাজ্যের প্রজাদের এই অবস্থা ফেরাউন মনে মনে হাসতে লাগলো। তার উদ্দেশ্য এতদিনে সিদ্ধ হয়েছে। তিনি প্রত্যেককে একটা করে নিজের প্রতিমূর্তি দিয়ে তাকে সৃষ্টিকর্তা এবং উপাস্য বলে পূজা করতে হুকুম দিলেন।

নিজের ঘরে বসে যদি খোদার উপাসনা করা যায় তবে কেউ কি মসজিদে দৌড়াদৌড়ি করে বেড়াতে চায়? ফেরাউনের আদেশে সকলে সন্তুষ্ট হলো। এমন করে অনেক দিন কেটে যাওয়ার পর একদিন তিনি প্রজাদের ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, তারা কাকে খোদা বলে মানে?

তারা বললোঃ ফেরাউনের প্রতিমূর্তিকেই খোদা বলে মান্য করে।

কিছুদিন যায়। একবার অনাবৃষ্টির জন্য দেশে দারুণ অজন্মা হয়েছিলো। এমন কি নীলনদের পানি পর্যন্ত শুকিয়ে গিয়েছিলো। প্রজারা সুযোগ মতো বাদশাহকে বললোঃ জাঁহাপনা আপনি যদি খোদা হন, তবে আপনি খেঅদার মতো ক্ষমতা আমাদের একবার দেখান।এবার বৃষ্টির অভাবে নীলনদ পর্যন্ত শুকিয়ে গেছে এবং মাঠের সমস্ত ফসল পুড়ে গেছে। আপনি নীলনদ পানিতে পূর্ণ করে আমাদের ফসল রক্ষা করে দেবার ব্যবস্থা করে দিন।

এবার ফেরাউন বড় বিপদে পড়লেন! কিন্তু চতুরতার সঙ্গে তাদের আশ্বাস দিয়ে বললেনঃ এর আর এমন বেশি কথা কি! আগে এ সংবাদ আমায় জানাও নি কেন? আজ আমার অনেক কাজ-আজ সময় হবেনা। আগামীকাল তোমাদের নীলনগ পানিতে ভর্তি করে দেবো। তোমরা সেই পানি দিয়ে ফসল রক্ষা করো।

প্রজারা খুশী হয়ে বাড়ি চলে গেলো।

প্রজারা বিদায় হলে ফেরাউন চিন্তা করতে লাগলেন, কি করা যায়! সারাদিন কেটে গেলো –তারপর সন্ধ্যা হয়ে এলো। গভীর রাত্রে একাকী ঘোড়ায় চড়ে রাজধানী থেকে বেরিয়ে পড়লেন। শহর থেকে ময়দান পার হয়ে গ্রাম, গ্রাম পার হয়ে এক ভীষণ জঙ্গলের মধ্যে প্রবেশ করলেন। সেখানে ছিল এক মস্ত বড় কূপ। সে কূপের ধারে এসে ফেরাউন ঘোড়া থেকে নামলেন। তারপর একগাছি দড়ি আপনার পায়ে বাঁধলেন, সে দড়ি একটা গাছের গোড়ায় শক্ত করে বেঁধে সেই কূপের মধ্যে ঝাঁপ দিয়ে পড়লেন। দোদুল্যমান অবস্থায় তিনি উচ্চঃস্বরে কেঁদে কেঁদে খোদার কাছে প্রার্থনা করতে লাগলেনঃ হে দয়াময় প্রভু, তুমি অনেক পাপীর ইচ্ছা পূরণ করছো। এক্ষণে আমি বিপদগ্রস্ত। আমাকে এ বিপদ থেকে রক্ষা করে মালিক। এবারের মতো তুমি আমার মান বাঁচাও। তা’না হলে আমি রাত্রি প্রভাতে আর কারো কাছে মুখ দেখাতে পারবো না। পরকালে তুমি আমাকে যে শাস্তি হয় দিও।

এমন সময় তিনি শুনতে পেলেন, ওপর থেকে যেন বলছেনঃ ফেরাউন তোমার ইচ্ছা পূর্ণ হবে। নীলনদ তোমার আদেশ মতো চলবে।

এই দৈববাণী শুনে ফেরাউন আনন্দে অধীর হয়ে কূপ থেকে উঠে রাজধানীর দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলেন। রাত্রি প্রভাত হতে না হতেই প্রজারা প্রসাদের সমুখে এসে সমবেত হতে লাগলো। ফেরাউন তাদের সঙ্গে নিয়ে নীলনদের কাছে এসে হাজির হলেনঃ চিৎকার করে বললেনঃ নীলনদ পানিতে পূর্ণ হয়ে থাকো।

কথা শেষ হতে না হতে শুষ্খ নদীর তটভূমি জোয়ারের পানিতে ভরে উঠলো। দিগন্ত বিস্তৃত শস্যক্ষেত্র পানিতে পরিপ্লুত হয়ে গেলো।

প্রজারা ক্ষুব্ধ হয়ে অভিযোগ করলোঃ জাঁহাপনা জমি জমা ডুবে গিয়ে ফসল নষ্ট হয়ে যাবার মতো হলো। হুজুর আমাদের জমির পানি একটু কমিয়ে দেবার ব্যবস্থা করুন।

ফেরাউন তাদের প্রার্থনা মতো নীলনদকে আদেশ করলেন। পানি সরে গেলো প্রজারা খুশী হয়ে তাকে খোদা বলে বিশ্বাস করে নিলো। এরা কপতী শ্রেণীর লোক। কিন্তু বনি ইসরাইল নামে অপর এক শ্রেণীর লোক ছিল, তারা তাকে কোনক্রমেই খোদা বলে স্বীকার করলো না। কিন্তু ফেরাউন নানা অসম্ভব ও আশ্চর্য কাজ করে প্রজাদের মনে দিনে দিনে বিশ্বাস জন্মিয়ে দিতে লাগলেন যে, তিনিই প্রকৃত খোদা।

ফেরাউনের এক পোষ্যপুত্র ছিলেন, নাম মুসা। তিনি কখনো তাকেখেঅদা বলে স্বীকার করতেন না। মুসার জন্ম সম্বন্ধে একটা কাহিনী আছে। মিশরে ইসরাইলদের বংশ খুব বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছিলো। ইসরাইলগণ ফেরাউনকে অবিশ্বাস এবং উপহাস করতেন এজন্য ফেরাউন এদের মোটেই পছন্দ করতেন না। তিনি নিয়ম করলেন যে, ইসরাইলদের পুত্রসন্তান হলেই তাকে নীলনদের পানিতে ফেলে দিতে হবে। এমনিভাবে কত সন্তান যে বধ করা হলো তার সীমা সংখ্যা নেই।

একদিন ফেরাউনের স্ত্রী গোসল করতে এসে হঠাৎ দেখতে পেলেন নীলনদের ধারে নলবনের মধ্যে একটা সিন্ধুক ভেসে এসে আটকে রয়েছে। তিনি বুঝতে পারলেন, ছেলেটি ইসরাইলদের। শিশুটি দেখে তার অতিশয় মমতা হলো। তিনি তাকে পালন করবেন ঠিক করলেন। একজ ধাত্রীও পাওয়া গেলো। তার হাতে ছেলের ভার দেওয়া হলো। ছেলেটির নাম রাখা হলো মুসা।

সেই ধাত্রী অপর কেউ নন, তিনি মুসার গর্ভধারিনী। কালক্রমে ছেলেটি বড় হয়ে উঠলে তাকে ফেরাউনের স্ত্রীর নিকটে ফিরিয়ে দেওয়া হলো। মুসা মিশরীদের সঙ্গে রইলেন বটে, কিন্তু সব সময় তাঁর মনে হতো তিনি যেন ইসরাইলী। একদিন মুসা দেখলেন, একজন মিশরীয় একজন ইসরাইলীকে বেদম প্রহার করছে। তিনি মিশরীয় লোকটিকে হত্যা করে বালিতে পুঁতে ফেললেন।

ফেরাউনের কাছে খবর গেলো। তিনি মুসাকে হত্যা করার হুকুম দিলেন। মুসা তখন পালিয়ে মিদিয়ান দেশে চলে গেলেন। সেখানে গিয়ে এক কৃষকের কন্যাকে বিবাহ করলেন। তারপর মাঠে মেষ চড়িয়ে কাল কাটাতে লাগলেন।

অনেকদিন চলে যাবার পর একদিন মুসা তার জ্যৈষ্ঠ ভ্রাতা হারুণকে সঙ্গে নিয়ে ফেরাউনের দরবারে এসে হাজির হলেন। বললেনঃ আপনি যে নিজেকে খোদা বলে প্রচার করছেন, এ অত্যন্ত অন্যায়। সর্বশক্তিমান খোদা ছাড়া আর কেউ মানবের উপাস্য নেই। আমি খোদার প্রেরিত পয়গম্বর।

ফেরাউন তাঁকে তাচ্ছিল্য করে হেসে উড়িয়ে দিলেন। বললেন, কেমন করে বুঝবো যে, খোদা তোমাকে পাঠিয়েছেন? তুমি তার কোন প্রমাণ দিতে পারো?

মুসা হাতের লাঠি মাটিতে ফেলে দিলেন, সঙ্গে সঙ্গে সেই লাঠি ভয়ানক অজগর সাপে পরিণত হয়ে গেলো। ফোঁস ফোঁস শব্দে সে যখন এগিয়ে যেতে লাগলো তখন তার মুখ হতে আগুনের হল্কা বের হতে লাগলো। সেই আগুনে গাছপালা মানুষ পশু-পাখি পুড়ে ছাই হয়ে যেতে লাগলো। ফেরাউন ছুটে গিয়ে মুসার হাত ধরে মিনতি করে বললেনঃ মুসা, খোদা নাকি তোমাকে লোকের মঙ্গল করবার জন্য পাঠিয়েছেন আর তুমি তাদের ধ্বংস করবার চেষ্টা করছো একে নিবৃত্ত কর।

মুসা অজগরের গায়ে হাত দিতেই পুনরায় লাঠিতে পরিণত হলো। তিনি তখন ফেরাউনকে বললেনঃ আশা করি আপনি এখন অহঙ্কার ত্যাগ করে ধর্মপথে আসবেন।

ফেরাউন বিবেচনা করে পরের দিন জবাব দেবেন বলে সেদিন মুসাকে যেতে বললেন।

মুসা চলে গেলেন।

ফেরাউন রঙমহলে ফিরে এসে কেমন করে মুসাকে জব্দ করা যায় সে বিষয়ে উজীর-নাজীরদের সঙ্গে পরামর্শ করতে লাগলেন। উজীর হামান অতিশয় কুচক্রী এবং কুটবুদ্ধি সম্পন্ন ছিলেন। তিনি ফেরাউনকে বুঝিয়ে দিলেন, মুসা একজন প্রথম শ্রেণীর যাদুকর এবং অতিশয় ধাপ্পাবাজ ব্যক্তি। তাকে জব্দ করার একমাত্র কৌশল রাজ্যের যত বড়বড় যাদুকর আছে সকলকে তলব করে আনতে হবে। তাদের বিদ্যাবুদ্ধির কাছে হার মেনে মুসা এখান থেকে পালিয়ে গেলেই আমাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে।

সুতরাং হামানের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ আরম্ভ হলো। রাজ্যের মধ্যে যেখানে যত ছোট-বড় যাদুকর ছিলো তাদের আনবার জন্য লোক পাঠানো হলো। তারা যথাসময়ে রাজধানীতে এসে হাজির হলো।

কার কত ক্ষমতা তা দেখবার দিন স্থির হলো। ফেরাউনের আহবানে মুসাও এলেন। একজন যাদুকর মন্ত্র উচ্চারণ করতে লাগলো, অমনি চারিদিক থেকে হাজার হাজার সাপ, বিছা, ভীমরুল সৃষ্টি হয়ে নানা রকম শব্দ করতে করতে মুসার দিকে ছুটে যেতে লাগলো। অপর একজন মন্ত্র উচ্চারণ করতে আরম্ভ করলো, অমনি শত শত সিংহ, ব্যাঘ্র চারিদিক থেকে ভীষণ গর্জন করে মুসার দিকে এগিয়ে গেলো।

মুসা বিসমিল্লাহ বলে তার লাঠি মাটিতে রেখে দিতেই অমনি এক ভয়ানক অজগর ভয়ঙ্কর গর্জন করে উঠলো। চক্ষের পলকে সে যাদুকরদের সেই সিংহ, বাঘ, সাপ, বিছা, টপাটপ গিলে ফেললো। তারপর ধরলো যাদুকরদের। তাদেরও গলাধকরণ করে ফেরাউনের দিকে এগিয়ে গেলো। ফেরাউন সেখান থেকে ছুটে রঙমহলে পালিয়ে প্রাসাদের সদর দরজা বন্ধ করে দিলেন।

এই ঘটনার পর কিছুদিন কেটে গেলো। হঠাৎ একদিন মুসা ফেরাউনের দরবারে এসে পুনরায় তাকে ধর্মকথা শোনাতে লাগলেন এবং ধর্মপথে চলবার জন্য উপদেশ দিতে লাগলেন। কিন্তু ‘চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী’।

আল্লাহতা’লা একদা স্বপ্নে মুসাকে বনি-ইসরাইলদিগকে পাপের ভূমি, অধর্মের রাজত্ব মিশর থেকে তাদের পিতৃভূমি কেনান দেশে ফিরে যাবার জন্য আদেশ দিলেন। সেই হুকুম অনুসারে মুসা ফেরাউনের কাছে ইসরা্লদের কেনান দেশে যাবার অনুমতি চাইলেন। কিন্তু ফেরাউন কিছুতেই এ প্রস্তাবে সম্মত হয়ে তাদের মিশর ত্যাগ করতে দিলেন না, বরং তাদের প্রতি অত্যাচার করতে লাগলেন।

ইসরাইলদিগকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে উদ্ধার করাবর কোন উপায় না পেয়ে মুসা খোদার নিকটে প্রার্থনা করতে লাগলেন। খোদা তখন তাকে মিশরীয়দের উপর অত্যাচার করবার হুকুম দিলেন। মূসা ও তার ভ্রাতা হারুন মিশরীয়দের উপর নতুন নতুন উৎপাত আরম্ভ করলেন। মুসা নদীতে লাঠির আঘাত করলেন। দেখতে দেখতে পানি রক্ত হয়ে গেলো। নদীর সমস্ত মাছ মরে গেল, তারপর পচে দুর্গন্ধ বের হতে লাগরো। এতটুকু পানি পান করাবর কিছুমাত্র উপায় রইলো না। ইসরাইলদের মিশর ত্যাগের অনুমতি প্রদানের জন্য মুসা পুনরায় ফেরাউনকে অনুরোধ করলেন। ফেরাউন বললেনঃ নদীর পানি শুধরে দাও, আমি সে বিষয়ে বিবেচনা করবো।

মুসা তাঁর অনুরোধ রক্ষা করলেন। কিন্তু মুসাকে কয়েকদিন ঘুরিয়ে ফেরাউন তাঁর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলেন না। মুসা ক্রুব্ধ হয়ে পানির দিকে লাঠি ছুঁড়ে দিলেন। অমনি দলে দলে ব্যাঙ মিশর ভূমি ছেয়ে ফেললো। ফেরাউন মুসাকে ব্যাঙের হাত থেকে রক্সা করবার জন্য অনুরোধ জানালেন, মুসা এবারও রক্ষা করলেন।

ব্যাঙের কবল থেকে উদ্ধার পেয়ে ফেরাউন প্রতিশ্রুতি ভুলে গেলেন। মুসাও পুনরায় তাদের প্রতি অত্যাচার আরম্ভ করলেন। উঁকুনের উৎপাত শুরু হলো; তারপর মাছির উৎপাত, পমুর মড়ক-একের পর এক আসতে লাগলো। এমন কি সকলের ভীষণ ফোঁড়া হলো। দেশে শিরাবৃষ্টি হয়ে গেলো। পঙ্গপাল এসে সব ফসল নষ্ট করে দিলো।

তারপর একবার তিনদিন-চারদিন এমন অন্ধকার হয়ে থাকলো যে, কোনদিকে কারো নজর করবার উপায় রইলো না।

মুসা আবার ফেরাউনকে অনুরোধ করলেন যে, এখনও ইসরাইলিদিগকে মিশর ছেড়ে যেতে অনুমতি দেওয়া হোক। যদি তাদের ছেড়ে যেতে দেওয়া না হয় তাহলে মিশরীয়দের ওপর যে ভীষণ অত্যাচার হবে তার তুলনায় বর্তমানের অত্যাচার অতি নগণ্য। ফেরাউনকে বার বার সতর্ক করে দেওয়া সত্ত্বেও তাঁর কথায় ফেরাউন একোরে কর্ণপাত করলেন না।

ইসরাইলদিগকে উদ্ধার করবার জন্য খোদা অসন্তুষ্ট হয় মিশরীয়দের প্রত্যেক বাড়ির বড় ছেলে ও বড় পশুকে মেরে ফেললেন। এবার ফেরাউনের বড় ভয় হলো। তিনি ইসরাইলদের চলে যাবার হুকুম দিলেন।

ইসরাইলরা অনুমতি পেয়ে দল বেঁধে রওনা হলেন, মুসা ও হারুন আগে চললেন। ইসরাইলদের চলে যেতে দেখে হামান প্রভৃতি উজীরগণ ফেরাউনকে কুপরামর্শ দিতে লাগলো, রাস্তাঘাট পরিস্কার, নালা-নর্দমা প্রভৃতি সাফ করা, রাজ্যের অনেক ছোটবড় কাজ যা তাদের দিয়ে জোর-জবরদস্তি করে করিয়ে নেওয়া হচ্ছিলো, তারা যদি চলে যায় তাহলে এসব কাজ কারা করবে? সুতরাং তারা যাতে মিশর ছেড়ে যেতে না পারে তার ব্যবস্থা করবার জন্য ফেরাউনকে অনুরোধ করতে লাগলো। ফেরাউন চিন্তা করে দেখলেন ইসরাইলরা চলে গেলে সত্যই কাজকর্মের যথেষ্ট অসুবিধা হবে। তখন তিনি নিজে ও মিশরীয়রা তাদের ফিরিয়ে আনবার জন্য সৈন্যসামন্ত নিয়ে তাদের পিছনে ধাওয়া করলেন।

ইসরাইলা ততক্ষণে লোহিত সাগরের তীরে এসে পৌঁছে গেছেন। এমন সময় তাঁরা পেছনে চেয়ে দেখতে পেলেন, ফেরাউনের অগণিত সৈন্য তাঁদের ধরতে আসছে। পেছনে এই বিপদ-সম্মুখে প্রকাণ্ড সাগর। ইসরাইলগণ কোথায় যাবেন ঠিক করতে পারছেন না, ভয়ে তাঁরা কাঁপতে লাগলেন। এমন সময় আল্লাহতা’লা মুসাকে বৈবাণীতে আদেশ করলেনঃ মুসা, তোমার লাঠি দিয়ে সমুদ্রের ওপর আঘাত করো।

মুসা তাই করলেনঃ বিশাল সাগর দুই ভাগে দেয়ালের মতো খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। সেই পথে দিয়ে হারুণ আগে চললেন, ইসরাইলরা নিরাপদে পিছু পিছু ওপারে চলে গেলেন। সমস্ত লোক পার হয়ে গেলো মুসা নিজেও।

তখনও সাগরের সেই রাস্তা তেমনি রয়ে গেলো। ফেরাউন তাঁহার লোকজন এবং সৈন্যসামন্ত নিয়ে ওপারে এসে থামলেন। তিনি দেখলেন, সাগরের মধ্যে এক আশ্চপর্য রাস্তা। আরও দেখলেন, সেই রাস্তা ধরে মুসা ও তাঁর লোকজনেরা নিরাপদে পার হয়ে গেলেন। যখন তারা সাগরের মাঝামাঝি এসেছে এমন সময় খোদা দৈববাণীতে মুসাকে বললেনঃ তাড়াতাড়ি সাগরের ওপরে তোমার লাঠি দিয়ে আবার আঘাত করো।

খোদার হুকুম মতো যেই তিনি সাগরের পানিতে আগাত করলেন, অমনি দুই দিন থেকে পান খাড়া উঁচু দেয়াল ফেরাউন ও তার সৈন্যদের ওপর পড়ে তাদের ভাসিয়ে নিয়ে গেলো। মরবার সময় তারা কাঁদবার অবসরটুকু পর্যন্ত পেলো না।

সংগৃহীত

কোরাণের গল্প-বন্দে আলী মিয়া

কৃপণ কারুণ


তোমরা হয়তো জানো মাটির নিচে সোনা, রূপা, হীরা, মণি-মাণিক্যের খনি এবং সমুদ্রের নিচে ইয়াকুত, জমরদ, প্রবাল ও মুক্তা অনেক আছে। তোমরা শুনে আশ্চর্য হবে যে, এই সবই আগে একজন মাত্র লোকের সম্পত্তি ছিলো।

এত বড়ো ধনী পৃথিবীতে আর একজনও ছিলো না এবং আর কেউ কখনো হবে না। তার সেই ধনসম্পত্তি কিরূপে ছড়িয়ে পড়লো এবং ভূগর্ভে ও সমুদ্রের মধ্যে কেমন করে প্রবেশ করলো সেই আজব কাহিনী আজ তোমাদের কাছে বলবো।

হযরত মুসার জ্ঞাতি সম্পকরঈয় এক চাচাতো ভাই –নাম ছিলো তার কারূণ। কারূণের বরাত ছিল খুব ভাল। দুনিয়ার সব জায়গায় তার মালগুদাম ছিলো। সমস্ত নদীতে ও সমুদ্রে ঝাঁকে ঝাঁকে তার নৌকা ও জাহাজ চলাফেরা করতো। পৃথিবীর সকল সওদাগরের সে ছিলো একমাত্র মহাজন, সুতরাং সমস্ত কাজ কারবারের মূল। নিজেও কারবার করে সে অনেক অর্থ উপার্জন করতা এবং সওদাগরীর মুনাফা থেকে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মুদ্রা তার আয় হতো।

হযরত মুসা তাকে খুব ভালবাসতেন। তাকে আদর করে মাটি দিয়ে সোনা তৈরি করবার কায়দা শিখিয়ে দিয়েছিলেন। এসব নানা ব্যাপারে চারিদিক থেকে কত টাকা যে তার আয় হতো তার লেখাজোখা ছিলো না। এই সব টাকার বদলে সে হীরা, মণি, মু্কতা, জহরৎ, চুনি, পান্না, ইয়াকুত, জমরদ যোগাড় করে লক্ষ লক্ষ সিন্দুক বোঝাই করে রাখতো। সেই সমস্ত সিন্দুকের চাবি একটা মজবুত সিন্দুকে রেখ সেই সিন্দুকের চাবি দড়িতে বেঁধে নিজের কোমরে সর্বদা ঝুলিয়ে রাখতো। সারাদিন রাতের মধ্যে তাকে বড় একটা কেউ বাইরে দেখতে পেতো না। চাবি হাতে করে সে প্রত্যেক দিন গুদামে গুদামে ঘুরে বেড়াতো। তোমরা হয়তো ভেবেছো, এত যার টাকাকড়ি, ধন-দৌলত সে নিশ্চয় খুব বিলাসী এবং ব্যয়ে মুক্ত হস্ত ছিলো। কিন্তু বিলাস বা সখ তার বিন্দুমাত্র ছিলো না। একটা চিন্ন ময়লা তালিযুক্ত পায়জামা এবং গায়ে একটা জামা ও পায়ে একজোড়া চটি জুতা ছিলো তার বেশ। ছেঁড়া চাটাই পেতে মাটিতে শুয়ে সে রাত্রি কাটাতো। দুই একখানি শুকনো রুটি, কিছু খেজুর ও কয়েক পাত্র পানি ছিলো তারা সারাদিনের আহার্য। কথিত আছে, কিছুদিন পরে তাও নাকি সে গ্রহণ করতো না। একখানি মাত্র রুটি এক পাত্র পানিতে ডুবিয়ে সেই পানি পান করে জীবন ধারণ করতো, তারপর সেই রুটিটি শুকিয়ে রাখতো। আত্মীয়-বন্ধু তাকে বলতোঃ তোমার এত ধন-দৌলত তুমি মিছামিছি এত কষ্ট করো কেন? তুমি একজোড়া জুতা কিংবা একটা জামাও কিনতে পারো না?

কারূণ হেসে বলতোঃ বাঃ তোমা তো আমাকে বেশ পরামর্শ দিচ্ছো! ক’টা পয়সা বা আমি সিন্দুকে বাক্সে তুলেছি যে তোমরা আমাকে ধনী বলে ঠাট্টা করছো। এখন আমিরীকরে এ ক’টি পয়সা যদি খরচ করে ফেলি তবে বুড়ো বয়সে ছেলেপুলে নিয়ে উপোস করলে দেবে কে বলো? তোমরা আমাকে পথে বসবার বেশ ফন্দি করছো দেখছি।

উপদেশ দাতারা এই কথা শুনে অবাক হয়ে চলে যেতো।

মুসা একদিন বললেনঃ কারূণ খোদা তোমাকে এত ধন-দৌলত দিয়েছেন, তার একটা সামান্য অংশ গরীব দুঃখীদের মধ্যে জাকাত (দান) দেওয়া তোমার উচিত। ধর্মে নিয়ম আছে যে, শতকরা আড়াই টাকা জাকাত দিতে হয়। আশা করি তুমি শতকরা একটি টাকা জাকাত দেবে।

কারূণে তার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে খানিকক্ষণ চেয়ে বললোঃ জাকাত কাকে বলে?

মুসা বললেনঃ শতকরা এক টাকা গরীব-দুঃখীদের দান করাকে জাকাত বলে।

অন্য কেউ যদি কারুণকে দান করার কথা বলতো তাহলে সে কি করতো বলা যায় না, কিন্তু মুসা সম্পর্কে তার বড় ভাই, কখনো তাঁর কথা সে অমান্য করেনি, সুতরাং মাথা নিচু করে খানিকক্ষণ চুপকরে থেকে জবাব দিলোঃ দেখতেই পাচ্ছো আমি অতি গরীব, টাকা-পয়সা কোথায় পাবো যে জাকাত দেবো?

মুসা বললেনঃ কারূণ এত যার ধন-দৌলত সে যদি গরীব হয় তবে ধনী লোক কাকে বলে?

কারূন প্রত্যুত্তর করলোঃ খেয়ে না খেয়ে, কত কষ্ট করে ক’টি পয়সাই বা জমেছে, তা’ যদি এখন দান-খয়রাত করে বসি বুড়ো বয়সে খাবো কি? ভিক্ষা করা ছাড়া তো আমারকোন উপায় থাকবে না ভাই। আমাকে মাফ করো, জাকাত আমি দিতে পারবো না।

মুসা বিরক্ত হয়ে বললেনঃ খোদা তোমাকে এত দিয়েছেন যে, তুমি যদি সারাজীবন দান করো তা’হলেও শেষ হবে না।

কথা শুনে কারূণ হো-হো করে হেসে উঠলো। বললোঃ না বুঝে দান করলে রাজার রাজত্ব উড়ে যায়, আর আমার তো সামান্য ঐ ক’টা পয়সা ও আর উড়তে কতক্ষণ।

মুসা বললেনঃ তুমি গরীব কি ধনী সে তর্ক তোমর সঙ্গে করতে আসি নাই। জাকাত দেওয়া তোমার পক্ষে একান্ত কর্তব্য, তাই তোমায় বলতে এসেছি। তুমি জাকাত দেবে কি না বলো?

নিরুপায় হয়ে কারূন আমতা আমতা করে বললোঃ আচ্ছা আজ ভেবে দেখি কাল জবাব দেবো।

কারূনের মনে আনন্দের লেশ মাত্র নেই। সমস্ত দিন তার একরূপে অনাহারে ও দুশ্চিন্তায় কাটলো। কি করা যায়, মুসাকে কি জবাব সে দেবে, ভেবে-চিন্তে কিছুই সে ঠিক করতে পারলো না। দিন গত হয়ে সন্ধ্যার আঁধার ঘনিয়ে এলো। একটা প্রদীপ জ্বেলে কারূণ হিসাব করতে বললো। একশত টাকায় এক টাকা, হাজার টাকায় দশ টাকা, এক লক্ষ টাকায় হবে এক হাজার! কারূণ আর হিসাব করতে পারলো না, তার মাথা ভোঁ ভোঁ করে ঘুরতে লাগলো। খানিক পরে আবার হিসাব করতে লাগলো, এক লক্ষ টাকায় দি এক হাজার টাকা হয় তাহলে এক কোটি টাকায় হবে এক লক্ষ টাকা।

কারূণ পাগলের মতো চিৎকার করে উঠলোঃ মুসা, তোমার উপদেশ শোনার পরিবর্তে আমার বুকে ছুরি মেরে আমাকে মেরে ফেলো। এক কোটি টাকায় এক লক্ষ টাকা আমায় দিতে হবে জাকাত! কেন? গরীব-দুঃখীরা তো টাকা রোজগার করে আমার কাছে জমা রাখেনি যে, আমাকে তাদের দান করতে হবে? আমি দেবো না, এক পয়সাও আমি দেবো না। কারূণ বালিশে মুখ গুঁজে চুপ করে পড়ে রইলো এবং মনে মনে মুসার মুণ্ডপাত করতে লাগলো। সে রাত্রে কারূণ আর ঘুমুতে পারলো না। হঠাৎ প্রদীপটার দিকে তার নজর পড়তেই চমকে উঠলোঃ আঃ তেল সবটা পুড়ে গেলো দেখছি অথচ এক পয়সাও আয় হলো না। বলে প্রদীপটা নিভিয়ে দিয়ে অন্ধকারে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে সারারাত বসে বসে আকাশ-পাতাল ভাবতে লাগলো।

পরদনি সকাল হতে না হতেই মুসা কারূণের বাড়িতে এসে হাজির। জিজ্ঞাসা করলেনঃ কিছু ঠিক করতে পেরেছো কি কারূণ?

কারূণ যেন আকাশ থেকে পড়লো। বিস্ময়পূর্ণ কণ্ঠে বললোঃ কি ঠিক করার কথা বলছো, সেই জাকাতের কথা? এ যাঃ একেবারেই ভুলে গেছি। আচ্ছা আজ তুমি যাও। কাল ঠিক তোমার কথার জবাব দেবো।

মুসা চলে গেলেন। কিন্তু পরদিনও এমনি ব্যাপার। এমনি করে রোজ রোজ মিথ্যা ওজর দেখিয়ে কারূণ দিন কাটাতে লাগলো।

একদিন মুসা বিরক্ত হয়ে বললেনঃ তোমার কি একটুখানি লজ্জা সরমও নেই কারূণ –রোজই টালবাহানা করো। আমি এখনই শুনতে চাই জাকাত দেবে কি না।

কারূনও খুব রাগের সঙ্গে জবাব দিলোঃ তুমি কি মনে করো তোমার কতা আমি বুঝতে পারি না। খেয়ে না খেয়ে, কত কষ্ট করে কিছু সঞ্চয় করেছি তা দেখে তোমাদের চোখ জ্বালা করছে। ফন্দি আটছো, কেমন করে সেগুলো বার করে তোমরা লুটপাট করে নেবে। অত বোকা আমি নই। সেটি কখনও হবে না। আমি এক পয়সাও দান-খয়রাত করবো না। তুমি যা খুশী করতে পারো।

মুসা অবাক! কিন্তু হতাশ হলেন না।

আরও অনেক দিন ধরে তিনি কারূণকে উপদেশ দিলেন। তিনি আল্লাহতা’লার গজবেরভয় পর্যন্ত দেখালেন, দোজখের দুঃখ, বেহেশতের সুখের কথা বললেন। কিন্তু কারূণ অটল-কিছুতেই তার মত গললো না।

এবার মুসা নিরুপায় হয়ে পড়লেন। তিনি খোদার দরগায় এই প্রার্থনা করলেনঃ হে প্রভু, কারূণকে সৎকার্যে দান করবার জন্য আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করলাম কিন্তু তার সদবুদ্ধি হলো না। এখন তোমার আদেশ আমাকে জানাও!

জিবরাইল খোদার আদেশ নিয়ে তাঁর কাছে হাজির হলেন। মুসাকে বললেনঃ মুসা, তুমি বনি-ইসরাইলদের মিশর থেকে চলে যেতে বলো।

মুসা সে আদেশ পালন করলেন।

জিবরাইল জানালেনঃ এখন থেকে বসুমতী তোমার আজ্ঞাধীন হলে। তার দ্বারা তোমার ইচ্ছা অনুযায়ী কার্য করতে পারো।

কয়েকদিন পরে মুসা পুনরায় কারূণের নিকট এসে তাকে বললেনঃ কারূণ, তুমি সৎকার্যে দান করো, খোদার পথে জাকাত দাও, নতুবা তোমার মহা অন্যায় হবে।

কারূণ জবাব দিলোঃ ভাই মুসা, তোমার এ-কথা অনেকদিন থেকে শুনে আসছি। কোন নতুন খবর থাকে বলতে পারো –বলে সে চলে যেতে উদ্যত হলো।

মুসা তাকে ধমন দিয়ে বললেনঃ এখনও হুঁশিয়ার।

কারূণ বললোঃ হুঁশিয়ার আগে থেকেই হয়ে আছি।

এই কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে তার কোমর পর্যন্ত মাটির মধ্যে প্রবেশ করলো। বিস্ময় ও ভয়ে তার মুখ শুকিয়ে গেলো। বললোঃ বাঃ বেশ তো ভেলকী শিখেছো! চালাকি করে টাকা আদায় করবে এমন কচি খোকা পাও নি।

এবারে তার গলা পর্যন্ত মাটির মধ্যে ডুবে গেলো।

তখন সে চিৎকার করে মুসাকে বললোঃ তুমি কি এমন করে আমাকে মেরে ফেলতে চাও নাকি?

মুসা ধমক দিয়ে বললোঃ খবরদার, এখনও যদি খোদার নামে সৎকাজে দান করো তাহলে পরিত্রাণ পেতে পারো।

কারূণ বললোঃ আমার যথাসর্বস্ব দান করে ভিক্ষে করে খাবার জন্য বেঁচে থাকতে আমি চাইনে।

সে আরো কানিকটা মাটির মধ্যে ঢুকে গেলো। তার দাড়ির হাডু ঠক করে মাটিতে এসে ঠেকলো। হাতের খানিকটা তখন অবধি বাইরে ছিলো। এইবার কারূণ হেসে ফেললো।

মুসা দৃঢ়কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেনঃ তুমি হাসছো কেন?

কারূণ জবাব দিলোঃ যে আশায় তুমি আমাকে মারবার চেষ্টা করছো সে আশা তোমার পূর্ণ হবে না। কারণ সমস্ত সিন্দুকের চাবি যে সিন্দুকে বন্ধ করা আছে –এই দেখ সেই চাবি আমার মুঠোর মধ্যে রয়েছে। দুনিয়াতে এমন কোন হাতিয়ার নেই যা দিয়ে সেই সিন্দুক কাটতে বা ভাঙতে পারবে, কাজেই আমাকে মেরে কোন লাভ নেই।

মুসা বললেনঃ মূর্খ, গরীব দুঃখীকে দান করো, খোদার পথে জাকাত দাও –তোমার জীবন রক্ষা হবে।

কারূণ কিছু জবাব দিলো না –শুধু সিন্দুকটার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইলো।

মুসা বললেনঃ কারূণ তোমার কি বাঁচার ইচ্ছা হয় না?

কারূণ মুসার দিকে চোখ না ফিরিয়েই চিৎকার করে বললোঃ না একেবারে না।

মুসা প্রশ্ন করলেনঃ বাঁচতে ইচ্ছা হয় না কেন?

কারূন জবাব দিলোঃ কেন জানতে চাও? আর কিছুদিন বেঁচে থাকলে তোমরা আমায় ‘ধনী’ ধনী বলে পাগল করে দিতে, আর হয়তো দান-খয়রাত করিয়ে সমস্ত বিষয় আশয় লুটিয়ে দিয়ে আমাকে পথে বসাতে। সুতরাং টাকা কয়টা থাকতে থাকতেই আমার মরা উচিত।

মুসা আবার বললেনঃ কারূণ তোমার কি একেবারে বাঁচতে ইচ্ছা হয় না?

এবারে কারূণ রেগে চোখ লাল করে বললোঃ টাকার বদলে আমারা বাঁচতে ইচ্ছে হয় না।

তারপর আস্তে আস্তে তার নাক, মুখ মাটির মধ্যে প্রবেশ করতে লাগলো। দেখতে দেখতে কারূণের দালান-কোঠা, ধন-দৌলত, সিন্দুক-বাক্স সমস্তই মাটির মধ্যে চলে গেলো।

সংগৃহীত

কোরাণের গল্প-বন্দে আলী মিয়া

পাপাচারী জমজম


অনেকদিন আগের কথা। একদিন হযরত ঈসা সিরিয়ার পথে যেতে যেতে একটা মানুষের মাথার খুলি পড়ে রয়েছে দেখতে পেলেন। সেই খুলিটার সঙ্গে কথা বলবার জন্য তাঁর খেয়াল হলো। তিনি তখনই খোদার দরগায় আরজ করলেনঃ হে প্রভু আমাকে এই খুলির সঙ্গে কতা বলবার শক্তি দাও।

খোদা তাঁর প্রার্থনা মঞ্জুর করলেন। হযরত ঈসা খুলিকে বললেনঃ হে অপরিচিত কঙ্কাল, তোমাকে যে কথা জিজ্ঞাসা করবো, তার ঠিক ঠিক উত্তর দাও।

বলবার সঙ্গে সঙ্গে ঈসা শুনতে পেলেন, পরিস্কার ভাষায় সেই খুলিটা ‘কলেমা শাহাদাত’ পাঠ করলো।

ঈসা জিজ্ঞাসা করলেনঃ তুমি পুরুষ না স্ত্রী?

খুলি উত্তর করলোঃ পুরুষ।

ঈসা বললেনঃ তোমার নাম কি?

খুলি উত্তর করলোঃ জমজম।

ঈসা আবার জিজ্ঞাসা করলেনঃ তুমি আগে কি ছিলে?

খুলি উত্তর করলোঃ আমি আগে বাদশাহ ছিলাম!

ঈসা বললেনঃ বটে। তোমার জীবনে কি কি কাজ করেছিলে?

খুলি উত্তর করলোঃ আমি আগে একজন বাদশাহ ছিলাম। ধন-দৌলত, লোক-লস্কর আমার এত বেশি ছিলো যে, দুনিয়ার বাদশাহরা তা দেখে অবাক হয়ে যেতো। তারা আমাকে খুব ভয় আর সম্মান করতো। আমি কিন্তু কারো ওপর কোন অত্যাচার করতাম না। গরীব-দুঃখীদের সাধ্যমতো দান করতান। সমস্ত দিন নিজের কাজে ব্যস্ত থাকতাম। কিন্তু ভুলেও কখনো খোদার নাম মুখে আনতাম না। এমনি করে অনেকদিন আমি বাদশাহী করেছিলাম। একদিন দরবারে বসে কাজ করছি, এমন সময় হঠাৎ আমার মাথা ব্যথা হলো। যন্ত্রণা ক্রমে বাড়তে লাগলো। কিন্তু যন্ত্রণা ক্রমে অহস্য হয়ে উঠলো। যেখানে যত বড় হেকিম ছিলো, চিকিৎসার জন্য তাদের সকলকে ডাকা হলো। কিন্তু কিচুতেই কিছু হলো না। যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগলাম। মাঝে মাঝে অজ্ঞান হয়ে পড়তে আরম্ভ করলাম। এমন সময় হঠাৎ একটা আওয়াজ আমার কাণে ঢুকলো। কেহ যেন চিৎকার করে বলছেঃ জমজমের প্রাণ বের করে দোজখে ফেলে দাও। সেই সঙ্গে সঙ্গে এক বিকট মূর্তি আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। উঃ, কি ভীষণ তার চেহারা! দেখে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়লাম। তারপর কি হলো আমার মনে নেই। যখন আমার জ্ঞান ফিরে এলো তখন দেখলাম প্রাণ নিয়ে যাবার জন্য আজরাইল একা আসেনি –তার সঙ্গে আরো অনেক ফেরেশতা এসেছে। তাদের কারো হাতে লোহার ডাণ্ডা, কারো হাতে শিক, কারো হাতে তলোয়ার। সমস্তই আগুনের পোড়ান জবাফুলের মতো রাঙ্গা। তারা সেই সমস্ত দিয়ে আমাকে সেঁকা ও খোঁচা দিতে লাগলো। আমি যন্ত্রনায় চিৎকার করে বলতে লাগলামঃ ওগো তোমরা খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আমায় মেরো না। আমায় ছেড়ে দাও। আমার ভাণ্ডারে যত ধন-দৌলত হীরা-জহরৎ আছে সব তোমাদের দেবো। এই কথা শুনে তাদের মধ্যে একজন লোহার মতো শক্ত হাতে আমার গালে একটা চাপর দিয়ে বললোঃ রে নাদান! খোদা কারো ধন-দৌলতের পরোয়া করে না।

যন্ত্রনায় অস্থির হয়ে কাতরভাবে তাদের মিনতি করে বললামঃ ওগো তোমরা আমায় ছেড়ে দাও। তার বদলে আমার বংশের প্রত্যেক আমি খোদার নামে কোরবানী করবো। এই বলে তাদের দয়ার ভিখিরী হয়ে কাতর নয়নে তাদেরদিকে চেয়ে রইলাম। তারা দাঁত কড়মড় করে ধমকে দিয়ে বললোঃ রে বেয়াদব! খোদা কি ঘোষখোর?

আজরাইল তখন ফেরশতাদের বললেনঃ আর দেরী করো না, এখনই এর প্রাণ বের করে দোজখে ফেলে দাও।

তারপর তারা আমার প্রাণ বের করে নিয়ে গেলো।

তারপর কি হলো আর জানবার ক্ষমতা রইলো না। হঠাৎ মনে হলো যেন আমার জ্ঞান ফিরে এসেছে। চোখ খুললাম। আমি কোথায় আছি প্রথমে বুঝতেই পারলাম না। অন্ধকার, চারিদিকে ঘন অন্ধকার –আলো নেই, বাতাস নেই। এই অবস্থা আমার অসহ্য হয়ে উঠলো, ক্রমে বুঝতে পারলাম যে আমাকে কবর দেওয়া হয়েছে আর সেই কবরের মধ্যে যেন হাজার ফেরেশতা এক সঙ্গে চিৎকার করে বলছেঃ রে নাদান! আমরা তোর প্রাণ বের করে নিয়ে গিয়েছিলাম পুনরায় তোর দেহের মধ্যে প্রাণ দিয়েছি। এখন এই কাফনের কাপড়ের উপর লেখ, দুনিয়ায় তুই কি কি কাজ করেছিস।

জীবনের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত যা যা করেছি সব আমার মনে স্পষ্ট জাগতে লাগলো। আমি এক এক করে অল্প সময়ের মধ্যে লিখে ফেললাম।

তারপর ফেরেশতারা ভয়ানক গর্জন করে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেনঃ বল তোর খোদা কে?

আমি ভয়ে ভয়ে উত্তর করলামঃ তোমরাই আমার খোদা। আমি অন্য খোদা জানি না। তোমরা আমাকে রক্ষা করো।

এই কথা শুনে তারা ভয়ানক রেগে গেলো। লোহর ডাণ্ডা দিয়ে আমাকে বেদম প্রহার আরম্ভ করলো। তারপর মনে হতে লাগলো, কবরের মাটি চারিদিক থেকে যেন আমাকে পিষে ফেলবার চেষ্টা করছে। ক্রমে দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগলো। মাটি চিৎকার করে বলতে লাগলোঃ রে বেঈমান! শত শত বৎসর আমার পিঠের উপরে বাদশাহী করে কত অত্যাচার করেছিস আর খোদার না-ফরমানী করেছিস তাই তোর এই শাস্তি। এই কথা বলে মাটি আমার হাড়গুলোকে গুঁড়ো করে ফেলবার চেষ্টা করতে লাগলো।

অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করেছি এমন সময়ে কতকগুলি ভীষণ-মূর্তিজীব আমাকে ধরে ওপরে নিয়ে গেলো। আমি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। ভাবলাম, খোদা মেহেরবানি করে আমাকে মাফ করবেন। কিন্তু সে ভরসা শূন্যে মিলিয়ে গেলো যখন দেখলাম তারা আমাকে ধরে নিয়ে গেলো আর একজন লম্বা সাদা দাড়িওয়ালা বিকট চেহারার লোকের কাছে। সে লোকটা ভীষণ চিৎকার করেবলে উঠলোঃ এই কমবখতকে (হতভাগ্যকে) আগুনের শিকল দিয়ে বেঁধে ফেলো, তারপর পায়ের দিক থেকে উল্টো করে ছিড়ে ফেলো।

তারা কখনই প্রভুর হুকুম তামিল করতে আরম্ভ করলো। এরপর তারা আমাকে পচা দুর্গন্ধময় একটি কূপের মধ্যে ফেলে দিলো।

ক্ষুধায়, পিপাসায় আর অসহ্য যন্ত্রণায় হৃদপিণ্ড যেন বন্ধ হয়ে যেতে লাগলো। আমি কাতরভাবে তাদের বললামঃ দোহাই তোমাদের, আমাকে এক পাত্র পানি দাও।

ফেরেশতারা কিসের রস এনে আমাকে খেতে দিলো। চোখ বুঁজে সেই রস মুখের মধ্যে ঢেলে দিলাম। উঃ কি বিশ্রী দুর্গন্ধ? মনে হতে লাগলো এ জিনিস না খাওয়াই আমার পক্ষে ভাল ছিলো! চিৎকার করে বলতে লাগলামঃ কে আছ, আমায় এক পাত্র পানি দাও, পিপাসায় আমার প্রাণ যায়।

সেই কাতরোক্তি শুনে অপর একজন ফেরেশতা এক গ্লাস পানি নিয়ে এলো। মনে ভরসা হলো, এইবার বুঝি বেঁচে গেলাম। চোখ বুঁজে এক নিঃশ্বাস সবটুকু পান করলাম। উঃ এ যে আরো কটু ও দুর্গন্ধ! সমস্ত অন্তরটা জ্বলে যেতে লাগলো। নাক, মুখ, চোখ, কান এমন কি লোমের গোড়া দিয়ে পর্যন্ত দুর্গন্ধ বের হতে লাগলো। আমি চিৎকার করতে লাগলামঃ তোমরা এমন তিল তিন করে যাতনা দিয়ে আমাকে না মেরে যা করবার একেবারেই করে ফেলো। আমি আর সহ্য করতে পারছি না।

তারা কেউ আমার কথা গ্রাহ্য তো করলোই না বরং আমার সেই অবস্থা দেখে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতে লাগলো। আমি যতই যন্ত্রণায় চিৎকার করতে লাগলাম, ততই তারা হো-হো করে হাসতে লাগলো। কিছুক্ষণ পরে একজন ভীষণদর্শন ব্যক্তি আমার সম্মুখে এসে দাঁড়ালো। তার ভয়াবহ আকৃতি দেখে আমার বুক শুকিয়ে গেলো। সে তার বিষ-মাখানো লম্বা নখে আমাকে গেঁথে শূন্যে সোকরাৎ নামক এক পাহাড়ে নিয়ে গেলো। সেই পাহাড়ে সাতটা কূপ। প্রত্যেক কূপ থেকে বিষাক্ত গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে। প্রত্যেক কূপে হাজার হাজার বিষাক্ত সাপ ও বিছা পরস্পর কামড়া-কামড়ি করছে আর তাদের মুখের বিষ-নিঃশ্বাসের এই ধুম নির্গত হচ্ছে। ফেরেশতারা আমার চুল ধরে সেই কূপের মধ্যে ফেলে দিলো। সাপ-বিছারা চারিদিক থেকে আমাকে কামড়াতে আরম্ভ করে দিলো। জ্বালায় চিৎকার করতে লাগলাম।

তারপর তারা আমাকে এক পুকুরের কাছে নিয়ে গেলো। সে পুকুরে পানি নেই, শুধু পুঁজ, রক্ত ও বিষে ভলা সেই পুকুর। আমার চুল ধরে সেই পুকুরের মধ্যে জোর করে তারা ডুবিয়ে রাখলো। যতই ওপরে উঠার চেষ্টা করি, ততই তারা জোর করে আমাকে চেপে ধরে রাখতে লাগলো। এই রকম করে এক কূপ থেকে আর এক কূপে এবং এক পুকুর থেকেআর এক পুকুরে হাজার বার ডুবিয়ে হাজার বার তুলে একশত বছর ধরে আমাকে কষ্ট দিলো।

তারপর আজ হঠাৎ শুনতে পেলাম কে যেন কাকে বলছে, যে পথে হযরত ঈসা যাচ্ছেন সেই পথে জমজমকে দোজখ থেকে তুলে ফেলে দাও। দুনিয়াতে সে অনেক ভাল কাজও করেছিলো। অন্নহীনকে অন্ন এবং বস্ত্রহীনকে বস্ত্রদান করেছিলো! সে আজ তার পুরস্কার পাবে। সে খোদার নাম একবারও মুখে আনেনি বলে যে পাপ করেছিলো তার শাস্তি পুরোমাত্রায় ভোগ করবার পর আবার দুনিয়াতে যাবে।

ঈসা জিজ্ঞাসা করলেনঃ জমজম তুমি আমার কাছে কি চাও?

জমজম বললোঃ তুমি খোদার কাছে এই প্রার্থনা করো, তিনি যেন আমার সমস্ত পাপ ক্ষমা করে আমাকে পুনরায় পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেন।

ঈসা দুই হাত তুলে জমজমের জন্য খোদার কাছে আরজ করলেন। তারপর বললেনঃ জমজমের হাড় মাংস সমস্ত একত্র হয়ে পুনর্জীবন লাভ করুক।

বলতে না বলতে একটি সুদর্শন যুবক মাটি থেকে দাঁড়িয়ে হযরত ঈসাকে সালাম করলো।

সংগৃহীত

কোরাণের গল্প-বন্দে আলী মিয়া

ইউসুফ ও জুলেখা


বৃদ্ধ বয়সে বিবি সারা খাতুনের গর্ভে হযতর ইব্রাহিমের এক পুত্র সন্তান জন্মে। তাঁহার নাম ইসরাইল (আঃ)। ইসরাঈলের দুই পুত্র ইয়াশা ও ইয়াকুব। ইয়াকুবের বারোটি পুত্র, তন্মধ্যে একাদশ পুত্র হযরত ইউসুফ। কনিষ্ঠ পুত্রের নাম বনি-ইয়ামিন।

হযরত ইয়াকুব জানতেন যে, ইউসুফ ভবিষ্যৎ জীবনে নবী হবেন। তিনি অতি গুণবান, শ্রী ও লাবণ্যমণ্ডিত ছিলেন। শৈশবেই ইউসুফ ও বনি ইয়ামিন মাতৃহীন হন। নানা কারণে হযরত ইয়াকুব অন্যান্য সন্তান অপেক্ষা ইউসুফকে একটু বেশী আদর যত্ন করতেন। এই জন্য বিমাতার গর্ভে অপর দশজন ভ্রাতা ইউসুফকে একটু ঈর্ষার চক্ষে দেখতেন।

ইউসুফ একদা রাত্রে স্বপ্ন দেখতে পেলেন –সূর্য চন্দ্র ও এগারটি নক্ষত্র তাঁকে যেন অভিবাদন করছে। পরদিন পিতার নিকটে কথাটা বললেন। ইয়াকুব স্বপ্ন-বৃত্তান্ত শুনে খানিকক্ষণ চিন্তা করে বললেনঃ তোমার পিতামাতা ও এগারটি ভাইয়ের চাইতে তুমি শ্রেষ্ঠ হবে। কিন্তু সাবধান করে দিচ্ছি তোমর অপর ভ্রাতাদের নিকটে এ বিষয়ে কিছু বলো না। কারণ তা হলে তারা তোমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করতে পারে।

পিতার মনে আশঙ্কা ছিলো একে তো ভাইরা ইউসুফকে হিংসার চোখে দেখে তার ওপরে তারা কোনো গতিকে স্বপ্নের কথা জানতে পেরে হয়তো আরো হিংস্র হয়ে উঠতে পারে।

কিন্তু সাবধানতা সত্ত্বেও ভ্রাতারা স্বপ্ন বৃত্তান্ত জানতে পারলো। তারা পরামর্শ করতে লাগলো, কিরূপে ইউসুফকে তাদের মধ্য থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়। অনেক যুক্তিতর্কের পর তারা স্থির করলো তাঁকে না মেরে কূপের মধ্যে ফেলে দেওয়া হবে। যদি ভাগ্যে থাকে কোন পথিকের দয়ায় তাঁর প্রাণরক্ষা হলেও হতে পারে।

এইরূপ পরামর্শ করে তারা পিতার নিকটে গিয়ে বললেনঃ আব্বা, ইউসুফ তো এখন বড়োসড়ো হয়েছে, ওকে আর বাড়িতে রাতদিন না রেখে আমাদের সঙ্গে মাঠে পাঠিয়ে দিন। সেখানে সে খেলাধূলা করবে। আমরা তাকে দেখাশুনা করবো।

হযরত ইয়াকুব প্রথমে তাদের কথায় রাজি হলেন না। কিন্তু তাদের পীড়াপীড়ি ও অনেক তর্কের পর অবশেষে তাদের সঙ্গে যেতে অনুমতি দিলেন।

পরের দিন তারা ইউসুফকে অনেক দূরে এক নির্জন মাঠের মধ্যে নিয়ে গিয়ে তার দেহ থেকে জামা কাপড় খুলে নিয়ে তাকে নির্দয়ভাবে প্রহার করলো। ইউসুফ প্রায় মরে যাবার মতো হলেন। তাদের সবচেয়ে বড় ভাই বললোঃ তোমরা ওকে মেরে ফেলো না। ওকে কূয়ার মধ্যে ফেলে দাও।

তখন নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে তারা কূপের মধ্যে ফেলে দিয়ে বাড়ি চলে গেলো।

বাড়ি এসে পিতার নিকটে তারা কপট দুঃখ প্রকাশ করতে করতে জানালোঃ আব্বা ইউসুফকে বাঘে খেয়েছে। এই দেখুন তার জামায় রক্ত।

হযরত ইয়াকুব আর কি করেন। তিনি শোকে মুহ্যমান হয়ে কাঁদতে লাগলেন। কয়েকদিন পরে একদল সওদাগর সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। মরুভূমির পথে সঙ্গে পানীয় প্রায় নিঃশেষ হওয়ার কূপ থেকে পানি সংগ্রহের ইচ্ছা করে তাঁরা বালতি নামিয়ে দিলেন। সেই সময়ে খোদার আদেশে ইউসুফ তাঁদের বালতির মধ্যে উঠে এলেন। ওদিকে তাঁর দশ ভাই তখন সেখানে ভেড়া চরাচ্ছিল। তারা ইউসুফকে দেখতে পেয়ে ছুটে এসে বললোঃ কি আশ্চর্য, এ যে আমাদের সেই গোলাম –কয়েক দিন থেকে পালিয়ে এসেছে। একে যদি আপনারা ক্রয় করেন তবে আমরা বিক্রি করতে পারি।

প্রতিবাদ করলে ভ্রাতারা পাছে তাঁকে বধ করে এই ভয়ে ইউসুফ চুপ করে রইলেন। কয়েকটি টাকা দিয়ে সওদাগরেরা তাঁকে কিনে নিলেন। সওদাগরের সঙ্গে ইউসুফ মিশর দেশে গিয়ে হাজির হলেন। সেখানে তাঁকে কিনে নিলেন। সওদাগরের সঙ্গে ইউসুফ মিশর দেশে গিয়ে হাজির হলেন। সেখানে তাঁকে তাঁরা বাদশাহের এক আত্মীয় কিৎফীর আজিজ নামক একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির নিকটে বিক্রয় করলেন। আজিজ ইউসুফকে তাঁর স্ত্রী জুলেখার খাস গোলাম করে দিলেন।

ইউসুফ বয়ঃপ্রাপ্ত হবার সঙ্গে সঙ্গে অসামান্য রূপবান হয়ে উঠতে লাগলেন। তাঁর অপরূপ শ্রী, লাবণ্য ও সুগঠিত দেহ সৌষ্ঠবের প্রতি প্রভু-পত্নী জুলেখা দিন দিন আকৃষ্ট হতে লাগলেন। একদিন তিনি তাঁর প্রতি আনুগত্য হবার জন্য অনুরোধ জানালেন। কিন্তু ইউসুফ সে কথায় একেবারে কর্ণপাত মাত্র করলেন না। জুরেখা নানা প্রকার প্রলোভন দিয়েও তার মন জয় করতে পারলেন না। অবশেষে নিরাশ হয়ে তিনি তাঁর স্বামীর নিকটে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেন।

ইউসুফ দোষারোপের প্রতিবাদ করে বললেনঃ এই নারীই আমাকে অন্যায় কার্যে লিপ্ত করবার চেষ্টা করেছে।

এইরূপে একে অন্যের নামে দোষ দেবার চেষ্টা করতে লাগলেন। ইউসুফ ও জুলেখার এই সকল কাহিনী ক্রমে প্রকাশ হয়ে পড়লো। অন্যান্য রমণীরা ছি ছি করতে লাগলো। তারা জুলেখার দোষ দিতে লাগলো।

জুলেখা যখন জানতে পারলেন যে, তাঁর সম্বন্ধে অপরাপর মহিলারা অন্যায় আলোচনা আরম্ভ করেছে, তখন তিনি তাদের জব্দ করার জন্য ফন্দী আঁটলেন। তিনি একদিন তাদের নিমন্ত্রণ করলেন এবং ছুরি দিয়ে কেটে খেতে হয় এমন একটি খাবার প্রস্তুত করলেন। সকলে খেতে এলে তাদের প্রত্যেককে এক একটি ছুরি দিলেন। তারা যখন খেতে আরসম্ভ করেছে ঠিক সেই সমেয় জুলেখা ইউসুফকে ডাকলেন। ইউসুফকে দেখে মেয়রা এত বিস্মিত ও মুগ্ধ হলো যে তারা খাবার কাটতে গিয়ে নিজেদের আঙ্গুল কেটে ফেললো। তারা বলাবলি করতে লাগলোঃ এত রূপ! এত সুন্দর! এ কি মানুষ না ফেরেশতা।

জুলেখা সেই সময়ে সুযোগ পেয়ে বললেনঃ তোমরা আমাকে দোষী করছিলে –এবার তো তোমরাও দোষী।

নিমন্ত্রিত মহিলারা এবাসের সত্য সত্যই লজ্জিত হলো।

ইউসুফের প্রতি নারীদের এইরূপ আসক্তির কথা জানতে পেরে সমাজের মাতব্বরেরা শঙ্কিত হলেন। তাঁরা নৈতিক জীবন পবিত্র রাখার জন্য ইউসুফের বিরুদ্ধে বাদশাহের নিকট অভিযোগ করলেন। বাদশাহ উপায়ান্তর না পেয়ে নিরপরাধ ইউসুফের কারাবাসের হুকুম দিলেন।

ইউসুফক কয়েদখানায় নেওয়া হলো। তাঁর সঙ্গে আরো দু’টি যুবককে কারাগারে প্রেরণ করা হলো।

একদা রাত্রে সেই যুবক দু’টি স্বপ্ন দেখলো। সেই স্বপ্নের কথা ইউসুফকে জানালো। একজন বললো, সে যেন আঙ্গুর থেকে রস বের করছে।

অপর একজন বললো, সে যেন মাথায় বয়ে রুটি নিয়ে যাচ্ছে! কতকগুলি পাখি সেই রুটিগুলো ঠুকরে খাচ্ছে।

ইউসুফ খোদাতা’লার কৃপায় প্রগাঢ় তত্ত্বদর্শী হয়েছিলেন। তিনি স্বপ্ন-বৃত্তান্ত শ্রবণ করে বললেনঃ দেখ, তোমাদরে একজন শীঘ্রই মুক্তি পাবে এবং বাদশাহের সঙ্গী নিযুক্ত হয়ে তাঁকে শরবত পান করাবে। অপরজনের ফাঁসী হবে এবং তার মাথা পাখিতে ঠুকরে খাবে।

কয়েকদিনের মধ্যেই ইউসুফের ভবিষ্যদ্বাণী সত্য সত্যই ফলে গেলো। একজন মুক্তি পেলো অপর জনের ফাঁসী হলো। যে ব্যক্তি মুক্তি পেয়েছিলো সে বাদশাহের অনুচর নিযুক্ত হলো।

কিছুদিন পরে বাদশাহ এক স্বপ্ন দেখলেন, সাতটি কৃশকায় গাভী সাতটি বলবতী গাভীকে খেয়ে ফেলছে এবং সাতটি শীর্ণ ধানের শীষ সাতটি সতেজ ধানের শীষকে খেয়ে ফেলছে। বাদশাহ পরদিন দরবারে স্বপ্ন বৃত্তান্ত প্রকাশ করে অনুচরদের কাছে এর অর্থ জানতে চাইলেন। কিন্তু কেউ সদুত্তর দিতে পারলো না। কারাগারের সেই যুবক সেখানে উপস্থিত ছিলো। ইউসুফের কথা তার মনে পড়ে গেলো তখনই তাঁর কাছে গিয়ে সে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাইলো। ইউসুফ বললেনঃ প্রথমে সাত বৎসর খুব ভীষণ অজন্মা ও দুর্ভিক্ষ হবে সে সময় তোমরা সেই সঞ্চিত শস্য থেকে খরচ করতে পারবে।

স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে পেয়ে বাদশাহ খুব সন্তুষ্ট এবং ইউসুফকে তাঁর নিকটে আনবার সঙ্কল্প করলেন।

যে সকল মেয়ে অসাবধানতায় নিজেদের আঙ্গুল কেটে ফেলেছিলো, তাদের কাছে অনুসন্ধান করে বাদশাহ জানতে পারলেন ইউসুফ তাদের সংগে কোনো অসদ্ব্যবহার করেননি। তারাই ইউসুফকে তাদের দিকে আকৃষ্ট করতে চেয়েছিলো। জুলেখাও সেখানে ছিলেন। তিনি এ কথার সত্যতা সম্পর্কে সাক্ষ্য দিলেন। বাদশাহ সব কথ শুনে অনুতপ্ত হলেন এবং ইউসুফকে মুক্তি দিয়ে তাঁকে রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করলেন।

ইউসুফের স্বপ্নের ব্যাখ্যা সত্য সত্যই সফল হলো। প্রথম সাত বৎসর ভাল ফসল হলো এবং পরের সাত বৎসর ভীষণ দুর্ভিক্ষ দেখা দিলো।

মিশরের সঞ্চিত খাদ্যের কথা জানতে পেরে নানা দেশ থেকে লোকজন আসতে লাগলো। ইউসুফের ভ্রাতারাও খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করতে এলো। তিনি তাদের দেখে চিনতে পারলেন, কিন্তু তারা তাঁকে চিনতে পারলো না। তিনি ভ্রাতাদের খাদ্য দিয়ে বলে দিলেনঃ আবার যখনআসবে তোমাদের ছোট ভাইকে সঙ্গে নিয়ে এসো। তাকে না নিয়ে এলে খাদ্য পাবে না। এই বলে অনুচরবর্গের দ্বারা কিছু অর্থ গোপনে খাদ্যের থলির মধ্যে পুরে দিলেন।

তারা বাড়ি গিয়ে তাদের পিতাকে মিশরের শাসনকর্তার অনেক গুণের কথা বর্ণনা করলো এবং এবারে ছোট ভাইকে নিয়ে যাবার জন্য বলে দিয়েছেন সে কথাও জানালো। হযরত ইয়াকুব তাদের পূর্বের কাজ স্মরণ করে কনিষ্ঠ পুত্র বনি ইয়ামিনকে তাদের সঙ্গে দিতে রাজি হলেন না।

খাদ্যের বস্তা খোলা হবার পর তার মধ্যে টাকা দেখতে পেয়ে তারা খুবই বিস্মিত হলো।

পুনরায় খাদ্যাভাব ঘটলে তারা তাদের পিতাকে গিয়ে শক্ত করে ধরে বললোঃ আব্বা, আপনি ছোট ভাইকে আমাদের সংগে যেতে দিন। খোদার নামে শপথ করে বলছি, আমরা তাকে অক্ষত দেহে ফিরিয়ে নিয়ে আসবো।

পিতা তাদের জিদের কাছে পরাজিত হয়ে অগত্যা অনুমতি দিলেন। বনি-ইয়ামিনকে সংগে নিয়ে তারা গেলো এবং ইউসুফের নির্দেশ অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে শহরে প্রবেশ করলো। ইউসুফের কাছে যখন তারা পৌঁছলো তখন ছোট ভাইকে ডেকে নিয়ে তিনি নিজের পরিচয় প্রদান করলেন।

অন্যবারের মতন এবারেও তাদের বস্তা বোঝাই করে খাদ্য দেওয়া হলো। ইউসুফের এক চাকর একটি পেয়ালা ইচ্ছা করে ছোট ভাইয়ের বস্তায় লুকিয়ে রেখে দিলো।

পেয়ালা হারিয়ে যাওয়ায় বিশেষ সোরগোল পড়ে গেলো। অবশেষে অনেক খোঁজা-খুঁজির পর বনি-ইয়ামিনের বস্তার মধ্যে সেটা পাওয়া গেলো।

বনি-ইয়ামিনকে বাদশাহের কাছে বিচারের জন্য নিয়ে যাওয়া হলো। তার ভ্রাতারা বললেনঃ আমাদের পিতা খুব বৃদ্ধ হয়েছেন। এটি তার সকলের ছোট ছেলে। একে ফিরিয়ে না নিয়ে গেলে পিতা বড়ই কষ্ট পাবেন। আপনি এর বদলে আমাদের একজনকে রাখুন!

ইউসুফ বললেনঃ তা হতে পারে না।

সকলের বড় ভাই অন্যান্য সকলকে বললোঃ তোমরা ফিরে যাও, আমি আল্লাহর নাম শপথ করে পিতাকে বলে একে নিয়ে এসেছি। কোন মুখে পিতার কাছে ফিরে যাবো। আমি বনি-ইয়ামিনের সঙ্গে এখানেই থাকবো‍!

তারা দেশে গিয়ে হযরত ইয়াকুবকে সমস্ত সংবাদ জানালো। তিনি শুনে দুঃসহ শোকে আর্তনাদ করতে লাগলেন। শোক কিঞ্চিৎ প্রশতিম হলে বললেনঃ দেখ আল্লাহর দয়ায় আমি অনেক কিছু জানি। তোমরা আল্লাহর ওপরে বিশ্বাস রেখে ইউসুফ ও বনি ইয়ামিনের খোঁজ করো।

পিতার আদেশে তারা পুনরায় মিশরে গেলো এবং খাদ্য কিনতে চাইলো। সেই সময় ইউসুফ তাদের কাছে নিজের পরিচয় প্রদান করলেন। বললেনঃ আল্লাহতা’লা তোমাদের ক্ষমা করবেন, তিনি ক্ষমাশীল। তোমরা আমার এই জামা পিতার কাছে নিয়ে যাও, তাহলে তিনি জানতে পারবেন।

আল্লাহর কৃপায় ইয়াকুব সব জানতে পারলেন। ইউসুফের ভাইরা এসে তার জামা পিতাকে দিলেন। হযরত ইয়াকুব খুশী হয়ে বললেনঃ পূর্বেই বলেছি, আমি যা জানি তোমরা তা জান না।

ইউসুফের পরামর্শ মতো তাঁর ভ্রাতারা তাদের পিতামাতা ও অন্যান্য পরিজনদের নিয়ে মিশরে গেলেন। সেখানে ইউসুফ তাঁদের বসবাস করবার ব্যবস্থা করে দিলেন।

সংগৃহীত

কোরাণের গল্প-বন্দে আলী মিয়া

ইসমাইল হোসেন