26 September, 2018

৬৯. বাংলাদেশের ষড়ঋতু,বাংলা রচনা

বাংলা রচনা

(সংকেত: ভূমিকা; ষড়ঋতুর পরিচয়; তাপদগ্ধ গ্রীষ্মকাল; সজল বর্ষা; শুভ্র শরৎ; ফসলের হেমন্ত; উদাসী শীত; ঋতুরাজ বসন্ত; বাঙালি জীবনে ষড়ঋতুর প্রভাব; উপসংহার।)

ভূমিকাঃ সুজলা, সুফলা, শস্য, শ্যামলা এই রূপসী বাংলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বৈচিত্র্যময় ঋতু। গোটা পৃথিবীর আবহাওয়ায় চারটি ঋতু পাওয়া যায়। কিন্তু বাংলার প্রকৃতিতে ছয়টি ঋতুর স্বতন্ত্র উপস্থিতি এদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। ভিন্ন ভিন্ন রূপ-রস-গন্ধ নিয়ে পালাক্রমে ছয়টি ঋতু ঘুরে ফিরে আসে। প্রতিটি ঋতুই স্বতন্ত্র সৌন্দর্যে অপরূপ। ঋতুতে ঋতুতে এদেশে চলে সাজ বদল। এই সাজ বদলের পালায় বাংলাদেশের প্রকৃতি চির সজীব, চির বৈচিত্র্যময়। এমন অপরূপ বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি খুব কম দেশেই আছে। তাইতো কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় আবেগ আপ্লুত হয়ে বলেন-

‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি
সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি।’
ষড়ঋতুর পরিচয়ঃ গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত- এই ছয়টি ঋতুৃ নিয়ে বাংলাদেশ। প্রতি দুই মাস পর পর ঋতু বদল ঘটে। অর্থাৎ দুই মাসে একটি ঋতু। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ এই দুই মাস মিলে গ্রীষ্মকাল, একইভাবে আষাঢ়-শ্রাবণ মিলে বর্ষাকাল, ভাদ্র-আশ্বিন শরৎকাল, কার্তিক-অগ্রহায়ণ হেমন্তকাল, পৌষ-মাঘ শীতকাল এবং ফাল্গুন-চৈত্র এই দুই মাসব্যাপী বসন্তকাল। এরা চক্রাকারে আবর্তিত হতে থাকে। এক ঋতু বিদায় নেয়, আসে অন্য ঋতু। নতুন ঋতুর ছোঁয়ায় প্রকৃতি সাজে নতুন রূপে, উপহার দেয় নতুন নতুন ফুল-ফল ও ফসল।

তাপদগ্ধ গ্রীষ্মকালঃ ঋতুচক্রের শুরুতেই ‘ধূলায় ধূসর রুক্ষ, পিঙ্গল জটাজাল’ নিয়ে আর্বিভাব ঘটে গ্রীষ্মের। বাংলা মাসের বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ এবং ইংরেজি সাধারণত মে থেকে জুন, এর মাঝামাঝি পর্যন্ত গ্রীষ্মকালের পরিধি। প্রকৃতিতে গ্রীষ্ম আসে তার দূরন্ত ও রুদ্র রূপ নিয়ে। গ্রীষ্মের প্রচ- দাবদাহে খাল-বিল, নদী-নালা শুকিয়ে যায়। জলশূন্য মাটিতে ফাটল ধরে। গাছের পাতা রুক্ষ হয়ে যায়। অসহ্য গরমে একটু শীতল বাতাস ও ছায়ার জন্য মানুষসহ সমস্ত পশু-পাখি কাতর হয়ে পড়ে। কবির ভাষায়-

‘ঘাম ঝরে দর দর গ্রীষ্মের দুপুরে
মাঠ-ঘাট চৌচির, জল নেই পুকুরে।’
গ্রীষ্ম শুধু জনজীবনে রুক্ষতাই ছড়িয়ে দেয় না, একই সঙ্গে অকৃপণ হাতে দান করে আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, তরমুজ প্রভৃতি রসালো ফল। আর এ কারণে গ্রীষ্মকালের অন্য নাম হলো মধুমাস। আম, কাঁঠালের সুগন্ধে ম ম করে ঘর-বাড়ি।

সজল বর্ষাঃ গ্রীষ্মের বিদায়ের সাথে সাথে আসে বর্ষা। উত্তপ্ত প্রকৃতিকে স্নিগ্ধতায় ভরিয়ে তুলতে দূর আকাশে জমে ওঠে মেঘের স্তুপ। আষাঢ়-শ্রাবণ (জুন থেকে আগস্ট) মাস পর্যন্ত এর ব্যাপ্তি। যদিও দুই মাস মিলে এক ঋতু, কিন্তু বর্ষাকাল প্রায় তিনমাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়। বর্ষার আগমনে দগ্ধ মাঠ-ঘাটে প্রাণ ফিরে আসে। নদী-নালা কানায় কানায় ভরে ওঠে। অবিরাম বর্ষণে গ্রীষ্মের রুক্ষ প্রকৃতিতে সজীবতা ফিরে আসে। জনজীবনে ফিরে আসে প্রগাঢ় শান্তি। যেন প্রকৃতিতে ছড়িয়ে দেয় নিবিড় মায়ার কাজল। কবি সুফিয়া কামালের ভাষায়,

‘আমি বর্ষা, আসিলাম গ্রীষ্মের প্রদাহ শেষ করি
মায়ার কাজল চোখে, মমতায় বর্মপুট ভরি।’
অন্যদিকে বর্ষা আসে কৃষকের জীবনে ফসলের প্রতিশ্রুতি নিয়ে। বর্ষার শুরুতেই কৃষকেরা জমিতে ধান ও পাটের চারা রোপণ করে। বাতাসে সুবাস ছড়ায় কেতকী, কেয়া আর কদম। গাছে গাছে ধরে পেয়ারা, আনারস প্রভৃতি ফল। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়-

‘গুরু গুরু ডাকে দেয়া, ফুটিছে কদম কেয়া
ময়ূর পেখম তুলে সুখে তান ধরছে
বর্ষার ঝরঝর সারাদিন ঝরছে।’
শুভ্র শরৎঃ

‘আজি ধানের ক্ষেত্রে রৌদ্র ছায়ার লুকোচুরি খেলা
নীল -আকাশে কে ভাসালো সাদা মেঘের ভেলা।’
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বাংলার ঋতুচক্রে এভাবেই আসে শরৎ। কালো মেঘ আর বর্ষার দিনকে বিদায় জানিয়ে শুভ্র মেঘ আর রোদের লুকোচুরি খেলায় মেতে শরৎ আসে অনাবিল সৌন্দর্য নিয়ে। ভাদ্র -আশ্বিন অর্থাৎ ইংরেজি আগস্ট-অক্টোবর মিলে শরৎকাল। শিউলির সুগন্ধে পরিপূর্ণ শরৎ এর বাতাস। নীল আকাশে তুলোর মতো ভেসে বেড়ায় শুভ্র মেঘ আর নদীর দু’ তীর উজ্জ্বল হয়ে ওঠে সাদা কাশফুলের সমারোহে। শিউলি, কামিনী, জুঁই প্রভৃতি ফুলের সৌরভে মেতে ওঠে শরৎ এর প্রকৃতি। মৃদুমন্দ বাতাসে ঢেউ খেলে সবুজ ফসলের মাঠে। শরৎ এর ভোরে শিশিরের হালকা ছোঁয়া আর মিষ্টি রোদের সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে কবিগুরু বলে ওঠেন- ‘আজিকে তোমার মধুর মুরতি হেরিনু শারদ প্রভাতে’।

ফসলের হেমন্তঃ শরতের রূপময়তাকে বিদায় জানিয়ে বৈরাগ্যের ঢঙে আসে হেমন্ত। কার্তিক-অগ্রহায়ণ অর্থাৎ ইংরেজি অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত হেমন্তকাল স্থায়ী হয়। হেমন্তে বৈরাগ্যের রঙে সাজে প্রকৃতি অর্থাৎ এ ঋতুতে হলুদ রঙের প্রাচুর্য থাকে প্রকৃতিতে। সর্ষে ফুলে ছেয়ে যায় মাঠের পর মাঠ। অন্যদিকে থাকে, সোনালি রঙের পাকা ধান। হেমন্ত মূলত ফসলের ঋতু। এ সময় মাঠে-ঘাটে থাকে শস্যের সমারোহ। তাই রবীন্দ্রনাথ যথার্থই গেয়েছেন-

‘ওমা, অঘ্রানে তোর ভরা ক্ষেতে
কী দেখেছি মধুর হাসি।’
এ সময় কৃষকেরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে ফসল কাটার কাজে। পাকা ধানের মনমাতানো গন্ধে বাতাস ভরে যায়। সোনালি ধানে ভরে ওঠে কৃষকের গোলা, কৃষক বধূর মুখে ফোটে আনন্দের হাসি। নবান্নের উৎসবে মেতে ওঠে গ্রাম-বাংলার জনজীবন। ঘরে ঘরে তৈরি করা হয় নতুন ধানের পিঠা-পুলি ও পায়েস।

উদাসী শীতঃ হেমন্ত বিদায় নিতে না নিতেই ঘন কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে উত্তুরে হাওয়ায় ভেসে আসে শীত। বাংলা মাসের পৌষ ও মাঘ এবং ইংরেজি ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির প্রায় শেষ অংশ পর্যন্ত শীত স্থায়ী হয়। শীত আসে হিম শীতল বাতাস আর কুয়াশা নিয়ে। বছরের সর্বাপেক্ষা শীতল ঋতু এই শীতকাল। কনকনে শীতে মানুষ ও প্রকৃতি জড়োসড়ো হয়ে পড়ে। তীব্র শীতে গাছের পাতা বিবর্ণ হয়ে ঝরে পড়ে। শীতের প্রকোপ বেশি হলে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় শিশু, বৃদ্ধ ও গরীব-দুঃখী মানুষের। শীতের এতসব শূন্যতা-রিক্ততার মাঝেও সকালের রোদের স্পর্শ আর খেজুরের রস ও পিঠা-পুলির মিষ্টি স্বাদে মন ভরে ওঠে। নানা রকম শাক-সবজি, ফল ও ফুলের সমারোহ শীতকে জনপ্রিয় করে তোলে। একদিকে শীতের কষ্ট অন্যদিকে ফুল-ফল-ফসল ও পিঠা-পুলির সমারোহে বাংলাদেশের শীতের আনন্দ রোমাঞ্চকর। কবি গুরু তাই শীতকে নিয়েও কবিতা লিখতে ভোলেননি-

‘শীতের হাওয়া লাগল আজি
আমলকির ঐ ডালে ডালে।’
ঋতুরাজ বসন্তঃ সবশেষে রাজার বেশে আসে ঋতুরাজ বসন্ত। শীতের রিক্ততাকে মুছে ফেলে ফুলে ফুলে ভরে ওঠে প্রকৃতি। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে এপ্রিল এর মাঝামাঝি পর্যন্ত বসন্তকাল। এ সময় গাছে গাছে নতুন পাতার প্রাণস্পন্দন পরিলক্ষিত হয়। দক্ষিণা মৃদু বাতাসে প্রকৃতি ও মনে দোলা লাগে। কোকিলের কুহুতানে প্রকৃতি যেন জেগে ওঠে। শিমুল, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, অর্জুন প্রভৃতি রঙ-বেরঙের ফুলে বসন্ত সাজে অপার সৌন্দর্যে। বসন্ত যেন ফুলের ঋতু। মালতী-মল্লিকা, পারুল, পিয়াল, চাঁপা, করবী ফুলের যেন কোনো শেষ নেই। ফুলে ফুলে উড়ে মধু সংগ্রহ করে নানা রঙের প্রজাপতি আর মৌমাছি। আমের মুকুলের মৃদু সৌরভে বাতাস ম ম করে। বসন্ত ঋতুতে অফুরন্ত প্রাণোচ্ছ্বাসে জেগে ওঠে বাংলার প্রকৃতি। চিরযৌবনা বসন্তের মোহময় রূপ বাংলা ঋতুবৈচিত্র্যে পূর্ণাঙ্গতা দান করে। বসন্তের মোহময়তায় মুগ্ধ হয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেন-

‘আহা! আজি এ বসন্তে-
কতফুল ফোটে, কত বাঁশি বাজে, কত পাখি গায়’।
বাঙালি জীবনে ষড়ঋতুর প্রভাবঃ বাংলার এই ঋতুবৈচিত্র্য কেবল প্রকৃতির বুকে নয়,সমান তালে মানব মনে এবং জীবনযাপনের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলে। গ্রীষ্মের দাবদাহে কিংবা শীতের প্রকোপে যেমন মানব জীবনের গতি রুদ্ধ হয়ে যায়, ঠিক তেমনি অন্যান্য ঋতুগুলিতে জীবনে গতি সঞ্চারিত হয়। গ্রীষ্মের রুক্ষ্মতার পর বর্ষায় দ্বিগুণ উৎসাহে কৃষক মাঠে নেমে পড়ে, ফসল বোনে। হেমন্তে আবার সেই ফসল ঘরে তোলার ধুম লেগে যায়। ঋতুর প্রভাব বাঙালির সংস্কৃতি,কাব্য-সাহিত্য ও সংগীতে বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়। একেক ঋতু একেক রকম সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে কবিরা রচনা করেছেন অসংখ্য কবিতা ও গান। চিত্রশিল্পীরা তাদের চিত্রকর্মে ফুটিয়ে তুলেছেন প্রকৃতির সৌন্দর্য। ঋতুভেদে গ্রাম বাংলার জীবনে উদযাপিত হয় নানারকম পূজা-পার্বণ, মেলা ও উৎসব। অর্থাৎ বাংলাদেশের ষড়ঋতুর পালাবদলের সাথে এ দেশের জনজীবন নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত।

উপসংহারঃ সত্যিই অনবদ্য সৌন্দর্যে ভরপুর বাংলাদেশের ঋতুবৈচিত্র। ষড়ঋতুর স্বতন্ত্র সৌন্দর্যের কোনো তুলনা হয় না। কিন্তু আশঙ্কার কথা হলো-ধীরে ধীরে শহরজীবন ঋত্যুবেচিত্র্যের প্রভাব থেকে দূরে সরে, কেবলই যান্ত্রিক সভ্যতা অভিমুখে এগিয়ে চলছে। যা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। অচিরেই শহরবাসী-মানুষের জীবন থেকে যান্ত্রিকতাকে দূরে সরিয়ে, বাংলার প্রকৃতি ও ষড়ঋতু সম্পর্কে তাদের সচেতন করে তুলতে হবে।

৬৮. সড়ক দুর্ঘটনা : কারণ ও প্রতিকার,বাংলা রচনা

বাংলা রচনা


(সংকেত: ভূমিকা; বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা; সড়ক দুর্ঘটনার ধরন; সড়ক দুর্ঘটনার কারণ; সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি; সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধের উপায়; সড়ক নিরাপত্তা ও সরকার; উপসংহার।)

ভূমিকাঃ বর্তমান সমাজে ঘর থেকে বের হলেই প্রত্যেক মানুষকে সড়ক দুর্ঘটনা নামক আতংক তাড়া করে বেড়ায়। প্রতিদিন দেশের কোনো না কোনো অঞ্চলে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেই থাকে। যার ক্ষয়ক্ষতি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়। জনসচেতনতা এবং প্রয়োজনীয় সরকারি বেসরকারি পদক্ষেপই এই মহামারীকে রুখে দিতে পারে।

বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা: বাংলাদেশের তিন ধরণের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিদ্যমান। (ক) সড়ক পথ, (খ) নৌপথ এবং (গ) আকাশপথ। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১১ হাজার কিলোমিটার পাকা রাস্তা আছে। এছাড়া রয়েছে রেলপথ। রেলপথে ব্রডগেজ, মিটারগেজ এবং ডাবলগেজ এ তিন ধরণের পথই আছে। এছাড়া নৌপথ ও আকাশপথ দেশের অভ্যন্তরীণ ও বর্হিবিশ্বে যোগাযোাগের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে সার্বিক বিবেচনায় সড়কপথের যোগাযোগ সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তাই এই পথের গুরুত্ব অনেক বেশি।

সড়ক দুর্ঘটনার ধরনঃ প্রতিদিন সংবাদপত্রে যে খবরটি অনিবার্য তা হলো সড়ক দুর্ঘটনা। এই দুর্ঘটনাগুলো ঘটে বিভিন্নভাবে যানবাহনগুলোর মুখোমুখি সংঘর্ষে। এছাড়া গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়া, এমন কি পায়ে হেঁটে রাস্তা পার হওয়ার সময়ও দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। এসব দুর্ঘটনা দেখে মনে হয় মৃত্যু যেন ওঁত পেতে বসে আছে রাস্তার অলিতে-গলিতে।

সড়ক দুর্ঘটনার কারণঃ নিম্নে সড়ক দুর্ঘটনার বিভিন্ন কারণ আলোচনা করা হলো-

অতিরিক্ত গতি ও ওভারটেকিং: সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে গাড়িগুলোর অতিরিক্ত গতি ও ওভারটেকিং কে দায়ী করা হয়। পুলিশ রিপোর্টেও বলা হয় অতিরিক্ত গতি ও চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানো এ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। এছাড়া গাড়ি দ্রুতবেগে ব্রিজে ওঠার সময় দুর্ঘটনা ঘটার ইতিহাস অনেক রয়েছে।

অপ্রশস্ত রাস্তাঃ বাংলাদেশের অধিকাংশ রাস্তাই অপ্রশস্ত। যার ফলে দিন দিন সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েই চলেছে। ঢাকা থেকে যাতায়াতের সবচেয়ে ব্যস্ত ঢাকা-আরিচা এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে। এই রাস্তাগুলো প্রয়োজনের তুলনায় প্রশস্ত নয়। ফলে এ দুটি পথেই দুর্ঘটনা ও হতাহত বেশি হয়। তাছাড়া দেশের সর্বত্র অপ্রশস্ত রাস্তায় অতিরিক্ত গাড়ি চলাচলের জন্য প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে।

ওভার লোডিংঃ ওভার লোড মানে ধারণক্ষমতার বেশি মাল বহন করা। ফলে চালকরা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটায়।

আইন অমান্যঃ সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ আইন অমান্য করা। এক জরিপে দেখা যায় ৯১ শতাংশ চালক জেব্রা ক্রসিংয়ে অবস্থানরত পথচারীদের আমলই নেয় না। পাশাপাশি ৮৫ ভাগ পথচারী নিয়ম ভেঙ্গে রাস্তা পার হয়। তাছাড়া এক সমীক্ষায় বলা হয় ঢাকা শহরের ৮৪ শতাংশ রিকশাচালক ট্রাফিক আইন ও নিয়ম সম্পর্কে অজ্ঞ। ফলে দুর্ঘটনা ঘটছে অহরহ।

জনসংখ্যার চাপ ও অপ্রতুল পরিবহন ব্যবস্থাঃ দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে যানবাহনের সংখ্যাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। রাজধানী ঢাকায় বর্তমানে প্রতি কিলোমিটারে ২৪৭টির বেশি গাড়ি চলে। ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার আওতাধীন মোট ২২৩.৩০ কিলোমিটার রাস্তায় আনুমানিক গাড়ি চলে ৫ লাখ ৫০ হাজার। অন্যান্য বড় শহরেও অনেকটা একই চিত্র পরিলক্ষিত হয়। ফলে দুর্ঘটনার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ট্রাফিক অব্যবস্থাপনাঃ বাংলাদেশে সড়ক পথের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৫ হাজার কিলোমিটার। এসব পথে প্রতিদিন অসংখ্য যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এই বিশাল যানবাহন সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার মধ্যে আনার মতো ট্রাফিক ব্যবস্থা এদেশে আজও গড়ে ওঠেনি।

প্রযুক্তির ব্যবহারঃ আধুনিক যুগ সম্পূর্ণ প্রযুক্তি নির্ভর। এই প্রযুক্তির ব্যবহার সঠিকভাবে না করলে অনেক সময় বড় ধরণের দুর্ঘটনা ঘটে যায়। গাড়ির চালকরা গাড়ি চালানোর সময় ফোনে কথা বলে, গান শোনে। ফলে অসতর্ক হয়ে পড়েন। এতে করে গাড়ি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে।

এছাড়া ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, অদক্ষ ও লাইসেন্স বিহীন চালক, সড়কের ওপর অবৈধ হাটবাজার, অবৈধ স্থাপনা, বিকল্প রাস্তার ব্যবহার না করে যখন-তখন রাস্তা খোঁড়াখুড়ি, যানবাহনে ব্যবহৃত তেলে ভেজাল এবং রাস্তার মধ্যে প্রয়োজনীয় ডিভাইডার না থাকা প্রভৃতির কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে।
সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতিঃ সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি অসীম। এর ফলে কেবল মানুষের মৃত্যু নয়, অপূরণীয় আরো হাজারো ক্ষতির বোঝা চাপিয়ে দেয় জনসাধারণের জীবনে। নিম্নে সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি কিছু পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো-

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা World Health Organisation (WHO)-এর হিসাব মতে ২০১০ সালে সারা পৃথিবীতে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ১০ লাখ ১৮ হাজার মানুষ নিহত হয়। ২ কোটিরও বেশি মানুষ আহত হয় এবং প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করে। যা খুবই মর্মান্তিক ও অপ্রত্যাশিত। যে হারে সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২০ সাল নাগাদ সড়ক দুর্ঘটনা বর্তমানের তুলনায় ৬০ ভাগ বৃদ্ধি পাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী ২০০৮ সালে সারা দেশে ৭০৪৮ জন সড়ক দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয় যার মধ্যে ৩,৭৬৪ জন নিহত ও ৩,২৮৪ জন আহত হয়। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, দুর্ঘটনায় হতাহতের দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ সেক্টর (এআরসি)-এর গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশে বছরে গড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয় ১২০০০ এবং আহত হয় ৩৫,০০০ জন।
সড়ক দুর্ঘটনায় শিশুদের ক্ষয়ক্ষতিঃ বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)- এর মতে, সারা পৃথিবীতে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় ১ লাখ ৮০ হাজার শিশু মারা যায়। আর আহত হয় হাজার হাজার শিশু যাদের বয়স ১৫ বছরের নিচে। ২০১০ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৯৬ শতাংশ শিশু অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের ।

সড়ক দুর্ঘটনায় অর্থনৈতিক ক্ষতিঃ বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় যে ক্ষতি হয় তার আর্থিক পরিমাণ দাঁড়ায় বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা যা জিডিপির দুই ভাগ। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর হিসাব মতে আন্তর্জাতিকভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ৫২০ বিলিয়ন ডলার। উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশে এর পরিমাণ ৬৫ বিলিয়ন ডলার।

সড়ক দুর্ঘটনায় পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষতিঃ সড়ক দুর্ঘটনা পারিবারিক ও সামাজিক জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। এর ফলে হঠাৎ করে বিপর্যয় নেমে আসে একটি পরিবারে। সেই শোক গোটা পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনদের বুকে শেলের মতো বিধে থাকে সারা জীবন। অনেক সময় সড়ক দুর্ঘটনায় সমাজ ও দেশ হারায় তার কৃতি সন্তানদের। এ দুর্ঘটনা অনেককে চিরদিনের জন্য পঙ্গু করে দেয়।

সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধের উপায়ঃ সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের দেশের স্বাভাবিক ঘটনা। আমাদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক বিশ্বের খুব কম দেশেই আছে। তাই সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। এ জন্য করণীয়-

বেপরোয়া গতি ও ওভারটেকিং নিষিদ্ধকরণ। আর এ জন্য গাড়ির সর্বোচ্চ গতিসীমা বেঁধে দেয়া উচিত।
ট্রাফিক আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
লাইসেন্স প্রদানে জালিয়াতি প্রতিরোধ করতে হবে।
লাইসেন্স প্রদানের আগে চালকের দক্ষতা ও যোগ্যতা যাচাই-বাছাই করতে হবে।
ফিটনেস, সার্টিফিকেটবিহীন গাড়ি রাস্তায় নামানো প্রতিরোধ করতে হবে।
পথচারীকে সতর্কভাবে চলাফেরা করা।
অতিরিক্ত যাত্রী ও মালামাল বহন বন্ধ করা।
মহাসড়কের পাশে হাট-বাজার ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা।
সড়ক দুর্ঘটনার শাস্তি অর্থাৎ সিআরপিসির ৩০৪ বি ধারায় শাস্তির মেয়াদ ৩ বছর থেকে ১০ বছর করা।
মোটরযান অধ্যাদেশের ১৪৩, ১৪৬ ও ১৪৯ ধারায় যে আর্থিক ক্ষতিপূরণ এবং শাস্তির বিধান উল্লেখ আছে তা বাড়ানো।
সড়ক নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট আইনের ভূমিকা আরো বেশি সক্রিয় করা।
প্রতিমাসে মহাসড়কে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে যানবাহনের ত্রুটি-বিচ্যুতি পরীক্ষা করা।
প্রতিটি গাড়ির চালককে স্মরণ রাখতে হবে সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি।
সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি পরিবহন মালিক, পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন, গাড়ি চালক সমিতি এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব।

সড়ক নিরাপত্তা ও সরকারঃ সরকার সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সংস্থা বা কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান করে। ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোট অথরিটি (বিআরটিএ) গঠন করা হয়। এর আগে সড়ক ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য ১৯৬১ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি জারিকৃত এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) গঠিত হয়। এছাড়া গঠিত হয়েছে ঢাকা যানবাহন সমন্বয় বোর্ড (ডিটিসিবি) এসব সংস্থা বা কর্তৃপক্ষ গঠন করে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কাজ করে চলেছে। এছাড়া এর পাশাপাশি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) দুর্ঘটনা রিসার্চ সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। দেশের সড়ক বা মহাসড়কে হাইওয়ে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ২০০৫ সালের ১১ জুন দেশের হাইওয়ে সড়কগুলিতে হাইওয়ে পুলিশ নিযুক্ত করা রয়েছে। সরকার এবং এসব সংস্থা যদি সর্বদা সতর্ক থাকে তাহলে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বাংলাদেশ অবশ্যই এগিয়ে যাবে।

উপসংহারঃ প্রত্যেক মানুষকেই মৃত্যুবরণ করতে হবে। কিন্তু দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ কারোই কাম্য নয়। আমরা সবাই চাই স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি। সড়ক দুর্ঘটনা যতো বড় সমস্যা হোক না কেনো সকলের সামগ্রিক চেষ্টা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে এটি প্রতিরোধে কাজ করতে হবে। যাতে আর কোনো মায়ের কোল খালি না হয়। সচেতন হতে হবে আমাদের সবাইকে। তাই আজ আমাদের স্লোগান হোক ‘নিরাপদ সড়ক চাই।’

15 September, 2018

যে কারণে মুসলমাদের কাফনের কাপড়ের রং সাদা হয়

জন্মিলে মরিতে হবে এটাই বিধাতার চিরন্তন নিয়ম। মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন, ‘কুল্লুন নাফসিন জায়্যিকাতুল মাউন’। অর্থ্যাৎ প্রতিটি প্রাণীই একদিন মৃত্যুর শরাব পান করবে। মুত্যুর পর মুসলমানেরা ইসলামের ব্যাখ্যা অনুযায়ি গোসলের পর মৃতদেহকে কাফনের কাপড় পরিধান করানো হয়। এরপর জানাজা করে দাফন করা হয়।
কিন্তু আপনি জানেন কি, অন্য রঙের কোন কাপড়কে কাফনের কাপড় হিসেবে কেন ব্যবহার করা হয় না? এ প্রসঙ্গে ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত হাদিসে পাওয়া যায়, তিনি বলেন, রাসুল (স.) বলেছেন, তোমরা সাদা রঙের কাপড় পরিধান করো। তোমাদের জীবিতরা যেনো সাদা কাপড় পরিধান করে, আর মৃতদের সাদা কাপড় দিয়ে দাফন দেয়। কেননা, সাদা কাপড় তোমাদের সর্বোত্তম পোশাক। (নাসায়ি, হাদিস-৫৩২৩)
হযরত সামুরা ইবনে জুনদুব (রা.) বলেন, রাসুল (স.) বলেছেন, তোমরা সাদা কাপড় পরিধান করো। কেননা, তা সর্বাধিক পবিত্র ও উত্তম। আর তা দিয়েই তোমরা মৃতদের কাফন দাও। (মুজামুল কাবীর, হাদিস-৯৬৪)

11 September, 2018

পাবনা জেলার ইতিহাস

পাবনা জেলার ইতিহাস
সৃষ্টির প্রেক্ষাপট : ১৭২৭-১৭৩৯ সাল পর্যন্ত পাবনা জেলা তৎকালীন সুবেদার।
নবাব সুজা উদ্দিনের শাসনাধীনে ছিল এবং রাজশাহীর জমিদারির রাজস্ব শাসন।
পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন রাম জীবন। ১৭৩০ সালের পর রাম জীবনের
উত্তরাধিকারী মহারাজ রামকান্তের উপর রাজস্ব শাসন ব্যবস্থা অর্পিত হয়।
আলীবর্দী খাঁ ১৭৪২-১৭৫৬ সাল পর্যন্ত বাংলার সুবেদার ছিলেন। আলীবর্দী খার
শাসনামলে পাবনা জেলা মারাঠা আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল । ১৭৫৬
সালে আলীবর্দী খাঁর মৃত্যুর পর তাঁর দৌহিত্র উত্তরাধিকারী নবাব সিরাজ-উদ
দৌলা বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং এক বছরকাল পাবনা জেলাসহ।
সমগ্র বাংলার শাসন ক্ষমতা বজায় রাখেন। ১৭৫৭ সালে ঐতিহাসিক পলাশীর
যুদ্ধে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে পরাজিত করে
বাংলায় তাদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে বক্সারের যুদ্ধে বিজয়ের
মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী বাংলার দেওয়ানী লাভ করে। ১৭৮৭ সাল পর্যন্ত
বাংলার ফকির সম্প্রদায়ের দলপতি শাহ মস্তান বোরহান উত্তর বাংলার বিস্তীর্ণ
অঞ্চলে ব্রিটিশ বিরোধী কাজে তৎপর ছিলেন। এ সময় সিরাজগঞ্জের নিকটে
ফকিররা খুবই তৎপর ছিল। মজনু শাহ ১৭৮৭ সালে তার মৃত্যুকাল পর্যন্ত ।
পাবনা ও পাশ্ববর্তী জেলাসমূহে (রাজশাহী, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর ও
ময়মনসিংহ) তৎপর ছিলেন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় জেলার বেশিরভাগ
অংশ রাজশাহী জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল । বাংলার এই অংশে প্রধানত: বহু সংখ্যক
ডাকাত দলের অস্তিত্ব বিদ্যমান থাকায় ১৮২৮ সালে এটিকে স্বতন্ত্র জেলা
হিসেবে গঠন করা হয়।
২. নামকরণ : পাবনা নামকরণ নিয়ে মতামতের অন্ত নেই। একমতে ‘পাবনী
নামক পুর্বগামিনী ধারা হতে পাবনা নামের উৎপত্তি হয়েছে । অপর সূত্র মতে, ।
পাবনা নামের একজন দস্যর আন্ডাস্থলই এক সময় পাবনা নামে পরিচিতি লাভ
করে। অন্য মতে, পাবনা নাম এসেছে পদুম্বা থেকে। কালক্রমে পদুম্বাই
স্বরসঙ্গতি রক্ষা করতে গিয়ে বা শব্দগত অন্য ভূৎপত্তি হয়ে পাবনা হয়েছে।
আবার অনেকের মতে, প্যেভুবর্ধন হতে পাবনা নামের উৎপত্তি হয়েছে। তারা
বলেন পৌড্রবর্ধনের বহু জনপদ গঙ্গার উত্তর দিকে অবস্থিত ছিল। চলতি ভাষায়।
পুড্রবর্ধন বা পৌড্রবর্ধন পোনবর্ধন বা পোবাবর্ধন রুপে উচ্চাতি হতে হতে পাবনা
হয়েছে ।
৩. আয়তন : (প্রায়)২,৩৭১.৫০ বৰ্গ কি. মি.।
৪. লোকসংখ্যা : মোট- (প্রায়) ২৫২৩১৭৯ জন। পুরুষ- ১২,৬২,৯৩৪ ও মহিলা
১২,৬০২৪৫ । বৃদ্ধির হার : ১৪৭% ও ঘনত্ব (বৰ্গ কি. মি.) : ১০৬২ জন।
৫. উপজেলার সংখ্যা ও নাম  ঃ ০৯টি। পাবনা সদর, আটঘড়িয়া, ঈশ্বরদী,
ফরিদপুর, ভাংগুড়াচাটমহল, সুজানগর, সাথিয়া ও বেড়া।



৬. থানার সংখ্যা ও নাম : ১০টি। পাবনা সদর, আটঘড়িয়া, ঈশ্বরদীফরিদপুর,
ভাংগুড়াচাটমহল, সুজানগর, সাথিয়া, বেড়া ও আতাইকুলা ।
৭. সংসদীয় আসন : ০৫টি। (১) সাঁথিয়া উপজেলা ও বেড়া উপজেলার নিম্নবর্ণিত
এলাকাসমূহ : বেড়া পৌরসভা, হাটুরিয়া নাকালিয়া ইউনিয়ন, নতুন ভারেংগা
চাকলা ও কৈটোলা ইউনিয়ন। (২) সুজানগর উপজেলা ও নিম্নবর্ণিত।
ইউনিয়নসমূহ ব্যতীত বেড়া উপজেলাবেড়া পৌরসভাহাটুরিয়া নাকালিয়া
ইউনিয়ন, নতুন ভারেংগা, চাকলা ও কৈটোলা ইউনিয়ন। (৩) চাটমোহর ও
ভাংগুড়া উপজেলা । (৪) আটঘরিয়া ও ঈশ্বরদী উপজেলা। (৫) পাবনা সদর
উপজেলা ।
৮. বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ : কবি বন্দে আলী মিয়া, অধ্যাপক মনসুর উদ্দিন, অধ্যাপক ড:
আবু হেনা মোস্তফা কামাল, কবি ওমর আলীরশীদ হায়দার, ফজল এ খোদা,
গণিত বিশারদ যাদব চন্দ্র চক্রবর্তী, প্রমথ চৌধুরী, সরকার জয়েন উদ্দিন,
এয়ারভাইস মার্শাল এ. কে. খন্দকার, স্কয়ার গ্রুপের কর্ণধার স্যামসন এইচ
চৌধুরী।
৯. ঢাকা থেকে দূরত্ব : সড়ক পথে-১৬১ কি. মি.।
১০. যোগাযোগ ব্যবস্থা : বাস : পাবনা কেন্দ্রীয় বাস স্টেশন, কাশিনাথপুর বাস।
স্টেশন। রেল-ইশ্বরদী রেলওয়ে স্টেশন, পাকশী রেলওয়ে স্টেশন, চাট মোহর
রেলওয়ে স্টেশন। লঞ্চ : নাজিরগঞ্জ নগরবাড়ি। এনডব্লিউডি কোড নম্বর :
০৭৩১ ও পোস্ট কোড-৬৬০০।
১১. পত্রপত্রিকা : দৈনিক ইছামতি, পাবনা বার্তাজীবন কথা, বিবৃতি ও সিনসা।
১২. পৌরসভা০৯টি ও ইউনিয়ন-৭৩টি।
১৩. উপজেলা ভূমি অফিস-০৯টি ও ইউনিয়ন ভূমি অফিস-৬৬টি।
১৪. গ্রামের সংখ্যা-১৫৪৯টি ও মৌজার সংখ্যা-১৩২১টি।
১৫. আদর্শ গ্রাম-২৩টি ও শিক্ষার হার-৪২.৪৪%।
১৬. উল্লেখযোগ্য ফসল : ধান, আখতামাক, পাট, গম, ভুট্টা, সরিষা ও ডাল।
১৭. শিক্ষা প্রতিষ্ঠান : প্রাথমিক বিদ্যালয়-১,০৮৬টি, মাধ্যমিক বিদ্যালয়-২০২টি, নিম্ন
মাধ্যমিক বিদ্যালয়-৪৯টি, কলেজ-৪৮টি, মাদ্রাসা-১২৯টি ও অন্যান্য স্কুল
১২টি।
১৮. ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান : মসজিদ-২,১১২টি, মন্দির-৩৪৫টি ও গীর্জা-০৯টি।
১৯. চিকিৎসা কেন্দ্র: হাসপাতাল-০২টি, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স-০৯টি ও ক্লিনিক
১৫টি ।
২০. নদনদীর নাম : যমুনাপদ্মা, আত্রাই, বড়াল ইত্যাদি।
২১. দর্শনীয় স্থান : হেমায়েতপুর মানসিক হাসপাতাল, হার্ডিঞ্চ ব্রিজ, বাংলাদেশ ইক্ষু
গবেষণা কেন্দ্র।
২২. জেলার ঐতিহ্য : এ জেলার ঐতিহ্য হচ্ছে তার্ত শিল্প।

17 August, 2018

৬৭. অর্থনৈতিক উন্নয়নে যোগাযোগ ব্যবস্থা,বাংলা রচনা

বাংলা রচনা


(সংকেত: ভূমিকা; বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা; যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রকারভেদ; রেলপথ, সড়ক পথ, নৌপথ, বিমানপথ, যোগাযোগের ক্ষেত্রে অন্যান্য মাধ্যমের ভূমিকা; ডাক ব্যবস্থা; টেলিফোন ও মোবাইল; টেলিভিশন, বেতার, ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র, টেলেক্স, ফ্যাক্স ও ইন্টারনেট, অর্থনৈতিক উন্নয়নে যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্ব; উপসংহার।)

ভূমিকাঃ যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে যোগাযোগ ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে একটি দেশের উন্নয়ন কর্মকান্ড আবর্তিত হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হলে কৃষিপণ্য, শিল্পের কাঁচামাল এবং শিল্পজাত পণ্য সামগ্রী সহজে ও স্বল্প ব্যয়ে স্থানান্তর করতে সুবিধা হয়। এর ফলে দেশের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, শিল্প ও ব্যবসার প্রসার ঘটে। এজন্য যোগাযোগ ব্যবস্থাকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বাংলাদেশে যোগাযোগ ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থাঃ বাংলাদেশ আকারে ছোট হলেও এখানে নানা রকম বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। এদেশে নদী-নালা, খাল-বিল ও হাওড় পরিপূর্ণ বলে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সাথে দক্ষিণাঞ্চলের অনেক অমিল রয়েছে। উত্তরাঞ্চলের মানুষ যোগাযোগের জন্য স্থলপথের উপর নির্ভরশীল। আবার দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ যোগাযোগের জন্য জলপথের উপর নির্ভরশীল। এদেশের আবহাওয়া সব সময় এক থাকে না। বর্ষাকালে দেশের অধিকাংশ জায়গা পানির নিচে চলে যায়। ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দেয়। বাংলাদেশের এই ভিন্ন বৈশিষ্টের কারণে এখানে নানা ধরণের যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। বর্তমানে প্রায় সারাদেশকেই যোগাযোগ ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে।

যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রকারভেদঃ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির ফলে বিশ্ব আজ যোগাযোগ ও তথ্য বিপ্লবের যুগে প্রবেশ করছে। মানুষ তার সকল বাধা-বিপত্তি ও সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে নিজেকে যোগাযোগের মহাসড়কে যুক্ত করছে। বর্তমান বিশ্বে যোগাযোগ ব্যবস্থা ও উন্নয়ন এখন সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় যেসব মাধ্যমগুলো ব্যবহৃত হয় সেগুলো নিচে দেওয়া হলো-

রেলপথঃ বাংলাদেশের সর্বপ্রথম ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর দর্শনা হতে জগতী পর্যন্ত ৫২.৮ কিমি রেলপথ চালু হয়। রেলপথ সাধারণত ৩ প্রকারের হয়ে থাকে। এগুলো হলো মিটার গেজ, ব্রড গেজ এবং ডুয়েল গেজ বা মিশ্র গেজ। বাংলাদেশে প্রথম আন্তঃনগর ট্রেন সার্ভিস চালু হয় ১৯৮৬ সালে। ২০১১ সালের ৪ ডিসেম্বর রেল ব্যবস্থার উন্নতির জন্য আলাদা রেলমন্ত্রণালয় গঠিত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৪৪১টি রেল স্টেশন আছে। দেশের রাজধানী, শহর ও বন্দরের সাথে যোগাযোগের জন্য রেল পথের গুরুত্ব অপরিসীম। ২০১৩ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুসারে বাংলাদেশে মোট রেলপথের দৈর্ঘ্য ২৮৭৭ কি.মি। এদের মধ্যে ১৮৪৩ কি.মি মিটার গেজ, ৬৫৯ কিমি ব্রড গেজ এবং ৩৭৫ কি.মি হলো ডুয়েল বা মিশ্র গেজ।

সড়ক পথঃ বর্তমানে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের সড়ক পথ গুরত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। কিন্তু আমাদের দেশের সড়ক ব্যবস্থা যথেষ্ট উন্নত নয়। বাংলাদেশে সড়ক পরিবহনের সাথে নিয়োজিত সরকারি সংস্থাটির নাম হলো বিআরটিসি। এটি ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৩ সালের প্রতিবেদন অনুসারে এদেশে ৩৫৭৫ কি.মি জাতীয় মহাসড়ক, ৪৩২৩ কি.মি আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং ১৩৬৭৮ কি.মি জেলা রোড রয়েছে। তবে সাম্প্রতিককালে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হলেও পূর্ণাঙ্গ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব এখনও হয়নি।

নৌপথঃ বাংলাদেশের পরিবহন ব্যবস্থায় নৌপথের বিশেষ অবদান রয়েছে। নদী-মাতৃক দেশ হওয়ায় অভ্যন্তরীণ যাতায়াত ব্যবস্থায় এর গুরুত্ব সর্বাধিক। বাংলাদেশ নৌ-পরিবহন সংস্থার নাম হলো ‘বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কতৃপক্ষ’। বর্তমানে বাংলাদেশের নদীপথের দৈর্ঘ্য ৮৪০০ কি.মি। বাংলাদেশে সারা বছর নাব্য নদী পথের দৈর্ঘ্য ৫২০০ কি.মি। নৌপথে স্টিমার, লঞ্চ, কার্গো, ইঞ্জিন চালিত নৌকা ও সাধারণ নৌকা চলাচল করে। দেশে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনেও এর অবদান রয়েছে। আমাদের দেশের মোট যাত্রী ও পণ্য সামগ্রীর প্রায় ৭৫ ভাগই নৌপথে পরিবাহিত হয়।

বিমানপথঃ আকাশ পথে বিমানের মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে যাওয়া সম্ভব। ১৯৭২ সালের ৪ জানুয়ারি বিমান বাংলাদেশ এয়ার লাইন্স প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ৩টি বিমান বন্দর রয়েছে। এগুলো হলো ঢাকায় অবস্থাত হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর, চট্টগ্রামে অবস্থিত শাহ-আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর ও সিলেটে অবস্থিত ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর। শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরটি ১৯৮০ সালে চালু হয়। বাংলাদেশের যশোর, কক্সবাজার, বরিশাল, রাজশাহী, ঈশ্বরদী, সৈয়দপুর এবং ঠাকুরগাঁয়ে অভ্যন্তরীণ বিমান বন্দর রয়েছে। বাংলাদেশের বিমান পরিবহনের উন্নতির জন্য প্রথম বেসরকারি এয়ারলাইন্স চালু হয় ১৯৯৫ সালের ১৬ জুলাই। বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোর মধ্যে অ্যারোবেঙ্গল এয়ারলাইন্স, জিএমজি এয়ারলাইন্স, বেস্ট এভিয়েশন এবং এয়ার পারাবত ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

যোগাযোগের ক্ষেত্রে অন্যান্য মাধ্যমের ভূমিকাঃ শুধু পরিবহন ব্যবস্থার মাঝেই আমাদের যোগাযোগ সীমাবদ্ধ নয়। যোগাযোগের ক্ষেত্রে আরো কিছু মাধ্যম আছে যেগুলো আমরা নিত্যদিন ব্যবহার করে যাচ্ছি। এগুলো যোগাযোগের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করছে। যেমন ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া। এই ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া বলতে মোবাইল, টেলিফোন, ইন্টারনেট ইত্যাদিকে বুঝানো হয়। এই প্রযুক্তিগুলো ব্যবহারের ফলে মানুষ ঘরে বসেই বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের খবর নিতে পারে। এছাড়া বিভিন্ন গণ মাধ্যম আমাদের যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। নিম্নে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

ডাক ব্যবস্থাঃ ডাক ব্যবস্থা বাংলাদেশের যোগাযোগের সবচেয়ে প্রাচীন মাধ্যম। ভারতীয় উপমহাদেশে ১৭৭৪ সালে ডাক সার্ভিস চালু হয়। বাংলাদেশ ডাক বিভাগ ইসরাইল ব্যতীত পৃথিবীর সকল দেশের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেছে। ডাক বিভাগকে আধুনিক করার জন্য ১৯৮৬ সালে পোস্ট কোড চালু করে। ২০১৩ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুসারে বাংলাদেশে ডাকঘরের সংখ্যা ৯৮৮৬ টি।

টেলিফোন ও মোবাইলঃ ২০০১ সালের ১৬ এপ্রিল বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের প্রথম ডিজিটাল ফোন চালু হয় ১৯৯০ সালের ৫ জানুয়ারি। ১৯৯২ সালের ৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে কার্ড ফোন চালু হয় এবং ১৯৯৩ সালের ৮ আগস্ট সেলুলার ফোন চালু হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে ৬টি মোবাইল ফোন কোম্পানি রয়েছে। সেগুলো হলো- সিটিসেল, গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংক, টেলিটক এবং এয়ারটেল। বাংলাদেশের একমাত্র সরকারি মোবাইল ফোন কোম্পানি টেলিটক বাংলাদেশ লিঃ ২০০৫ সালে যাত্রা শুরু করে। ২০১৩ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুসারে বাংলাদেশে ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৯.৮৪ কোটি।

টেলিভিশনঃ ১৯৬৪ সালে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম টেলিভিশন কেন্দ্র স্থাপিত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে ২টি পূর্ণাঙ্গ সরকারি টেলিভিশন কেন্দ্র এবং ১৪টি উপকেন্দ্র বা রিলে কেন্দ্র রয়েছে। ২০০০ সালে বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে ‘একুশে টিভি’ নামে একটি টিভি চ্যানেল খোলা হয়। তবে ইতোমধ্যে অনেকগুলো স্যাটেলাইট বাংলা চ্যানেল এদেশে তাদের অনুষ্ঠান প্রচার করছে। এগুলো হলো- চ্যানেল আই, এটিএন বাংলা, এনটিভি, বাংলা ভিশন, বৈশাখী ইত্যাদি।

বেতারঃ ১৯৪৭ সালে এদেশে মাত্র একটি বেতার কেন্দ্র ছিল। বর্তমানে বাংলাদেশ বেতারের ১২টি আঞ্চলিক কেন্দ্র রয়েছে। বেতারের মাধ্যমে বহির্বিশ্বের কার্যক্রমে বেশ কয়েকটি ভাষায় অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে থাকে। এগুলো হলো- বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, আরবি ও নেপালি ইত্যাদি। এছাড়াও ১২টি বেসরকারি এফএম রেডিও রয়েছে। গ্রাম অঞ্চলে রেডিওগুলো তাদের বার্তা প্রচার করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক সময় আবহাওয়া সম্পর্কে পূর্বাভাস দেওয়া হয় এবং সমুদ্র উপকূলবর্তী মানুষগুলোকে এ বিষয়ে সচেতন থাকতে বলা হয়। এভাবে বেতারের মাধ্যমে নানা ধরণের উন্নতি সাধিত হয়।

ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রঃ বর্তমানে বিশ্বে যোগাযোগের জন্য ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র একটি শক্তিশালী মাধ্যম। বাংলাদেশে ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রের সংখ্যা ৪টি। এগুলো হলো- রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়া, গাজীপুরের তালিবাবাদ উপগ্রহ ভূ-কেন্দ্র। ঢাকার মহাখালী এবং সিলেট ভূ উপগ্রহ কেন্দ্র। এদের মধ্যে রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়া উপগ্রহ ভূ-কেন্দ্র সর্বপ্রথম ১৯৭৫ সালে চালু হয়।

টেলেক্স, ফ্যাক্স ও ইন্টারনেটঃ বর্তমান যুগে বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে দ্রুত সংবাদ আদান-প্রদান করা সম্ভব হয়েছে। ফ্যাক্সের মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোনো দেশে মুহূর্তের মধ্যে শব্দ, ছবি, ডকুমেন্ট ইত্যাদি প্রেরণ করা যায়। আবার ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে মানুষ পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে। ১৯৯৬ সালে ৪ জুন বাংলাদেশের প্রথম ইন্টারনেট ব্যবহার শুরু হয়।

অর্থনৈতিক উন্নয়নে যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্বঃ যোগাযোগ এবং যাতায়াত ব্যবস্থাকে যেকোনো দেশের উন্নয়নের পূর্বশর্ত বলা হয়ে থাকে। যেসব দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত সেসব দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাও উন্নত। কোনো দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম। কৃষি পণ্যের এবং শিল্পজাত পণ্যের বাজারজাতকরণ, শ্রমিকদের চলাচল, ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজন উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। যোগাযোগ ব্যবস্থার সাথে বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবিকার প্রশ্ন জড়িত। পল্লী যোগাযোগের জন্য সড়ক যোগাযোগ বিশেষ ভূমিকা পালন করে। উপকূলীয় অঞ্চলের যোগাযোগে, দুর্যোগ মোকাবিলা, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং রাজস্ব আয় ইত্যাদি ক্ষেত্রে নৌ-ব্যবস্থার বিকল্প নেই। এছাড়াও সংবাদপত্র আদান-প্রদান, প্রশাসনিক কাজ এবং দ্রব্যমূল্যের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ ও শিক্ষা ইত্যাদি ক্ষেত্রে যোগাযোগ ব্যবস্থা গুরুত্বও কম নয়।

উপসংহারঃ মানবজীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে হলে মানব সম্পদের উন্নয়ন এবং মানুষের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। আর এ দুটি বিষয়ই যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা মানুষকে গতিশীল করে। যেহেতু যোগাযোগ ব্যবস্থাকে উন্নয়নের মূল শক্তি বলা যায় তাই আমাদের দেশের সার্বিক উন্নতির জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থার সমন্বয় ঘটাতে হবে।

৬৬. সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম,বাংলা রচনা

বাংলা রচনা


(সংকেত: ভূমিকা; সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম; ফেসবুক; ব্লগ; টুইটার; গুগল প্লাস; উইকিপিডিয়া; ইউটিউব; স্কাইপ; অন্যান্য মাধ্যম; সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বাংলাদেশ; সুবিধা; অসুবিধা; উপসংহার।)

ভূমিকাঃ বর্তমান যুগ তথ্য প্রযুক্তির যুগ। এ যুগের উল্লেখযোগ্য একটি বিষয় হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম। মানুষকে সামাজিক জীব হিসেবে সমাজে বসবাস করার পাশাপাশি প্রতিনিয়তই একে অপরের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতে হয়। সেই কাজটি অত্যন্ত সহজতর করার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম।

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমঃ যোগাযোগের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় একটা সময় কবুতর কিংবা হাতের লেখা চিঠির উপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু সময়ের পথ-পরিক্রমায় বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে মানুষ সহজতর মাধ্যমগুলো ব্যবহার করছে। এই যোগাযোগের এমনই একটি মাধ্যম হচ্ছে Social Networking site বা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম। এটি ব্যবহার করে উন্নত দেশগুলো তাদের যোগাযোগকে সম্পূর্ণ প্রযুক্তি নির্ভর করে ফেলেছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশও পিছিয়ে নেই। নিম্নে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

ফেসবুকঃ ফেসবুক (Facebook) বিশ্ব-সামাজিক আন্তঃযোগাযোগ ব্যবস্থার একটি ওয়েবসাইট। ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর মধ্যে ফেসবুকই বৃহত্তম। এর প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছেন মার্ক জাকারবার্গ। তার হাত ধরেই ২০০৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ফেসবুক যাত্রা শুরু করেছিল। এটি ব্যবহারকারীগণ বন্ধু সংযোজন, বার্তা প্রেরণ এবং তাদের ব্যক্তিগত তথ্যাবলী হালনাগাদ ও আদান-প্রদান করতে পারেন। সেই সাথে একজন ব্যবহারকারী শহর, কর্মস্থল, বিদ্যালয় এবং অঞ্চলভিত্তিক নেটওয়ার্কেও যুক্ত হতে পারেন।

ব্লগঃ ব্লগ (Blog) শব্দটি ওয়েবলগ থেকে এসেছে। যার অর্থ আলোচনা বা তথ্য সম্পর্কিত সাইট। বর্তমান বিশ্বে তথ্যের চাহিদা খুবই প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। বই বা লাইব্রেরিতে হাজার হাজার বই ঘেটে প্রয়োজনীয় তথ্য যোগাড় করা কষ্টকর এবং সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। আর এই প্রয়োজন মেটানোর জন্য অনলাইনভিত্তিক ওয়েব লগ এর যাত্রা শুরু হয় যা পরবর্তীতে ব্লগ হিসেবে প্রচলিত হয়। যিনি ব্লগে পোস্ট করেন তাকে ব্লগার বলা হয়। মানুষের তথ্য চাহিদা পূরণের জন্য ব্লগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রতিনিয়তই মানুষ ব্লগের কল্যাণে চাহিদার উপরে ভিত্তি করে তথ্য অনুসন্ধান করছে এমনকি গবেষণাসহ বিভিন্ন জরিপ পরিচালনা করছে। ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার নতুন ব্লগের জন্ম হচ্ছে। সেই সাথে তৈরি হচ্ছে অনলাইনে লক্ষ লক্ষ নিবন্ধ।

টুইটারঃ বর্তমান বিশ্বে যতগুলো সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম রয়েছে তার মধ্যে টুইটার (Twitter) অন্যতম। টুইটার সামাজিক আন্তঃযোগাযোগের ব্যবস্থা এবং মাইক্রোব্লগিংয়ের একটি ওয়েবসাইট, যেখানে ব্যবহারকারীরা সর্বোচ্চ ১৪০ শব্দের বার্তা আদান-প্রদান ও প্রকাশ করতে পারেন। ২০০৬ সালের মার্চ মাসে টুইটারের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে এটি এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে যে, হলিউড, বলিউড থেকে শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ টুইটার ব্যবহার করে থাকেন।

গুগল প্লাসঃ গুগুল প্লাস (Google+) হচ্ছে সার্চ ইঞ্জিন গুগলের সামাজিক যোগাযোগের একটি সাইট। এটি চালু হওয়ার পর থেকেই মূলত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। গুগল প্লাস জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগের সাইট ফেসবুকের মতো নয় বলে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে ফেসবুকের সাথে কিছুটা মিল থাকলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ব্যবহারকারীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতেই এ ধরণের উদ্যোগ।

উইকিপিডিয়াঃউইকপিডিয়া (Wikipaedia) তথ্য, সেবা প্রদানের লক্ষ্যে সৃষ্ট ওয়েবভিত্তিক, বহুভাষিক, মুক্ত বিশ্বকোষ হিসেবে পরিচিত। বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় ও বহুল প্রচলিত এ অনলাইন তথ্যকোষের প্রতিষ্ঠাতা জিমি ওয়েলস এবং ল্যারি স্যাংগার। ২০০১ সালের জানুয়ারি মাসের ১৫ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে পথচলা শুরু হয় ওয়েবসাইটটির। বর্তমানে এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং সর্বাধিক জনপ্রিয় ইন্টারনেটভিত্তিক তথ্যসূত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ইউটিউবঃ ইউটিউব (Youtube) একটি ভিডিও আদান-প্রদান করার ওয়েবসাইট। এটি বর্তমানে ইন্টারনেট জগতের অত্যন্ত জনপ্রিয় ভিডিও শেয়ারিং সাইট, যার মাধ্যমে এর সদস্যরা ভিডিও আপলোড, দেখা এবং আদান-প্রদানের কাজ করে থাকে। এখানে ভিডিও পর্যালোচনা ও অভিমত প্রদানের সুবিধাও রয়েছে। ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রতিষ্ঠিত এ সাইটটি নির্মাণের পেছনে ছিলেন মূলত পে-প্যাল প্রতিষ্ঠানের তিন প্রাক্তন চাকুরীজীবী- চ্যাড হারলি, স্টিভ ব্যান আর বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জাভেদ করিম।

স্কাইপঃ স্কাইপ (Skype) একটি ভিওআইপি সেবা এবং সফটওয়্যার অ্যাপ্লিকেশন। সামাজিক যোগাযোগের এই মাধ্যমে ব্যবহারকারী ইন্টারনেটে যুক্ত হয়ে পরস্পরের সাথে ভয়েস, ভিডিও এবং তাৎক্ষণিক বার্তার সাহায্যে যোগাযোগ করে থাকেন। ২০০৩ সালে ডেনমার্কের ধমিজা, জানুজ ফ্রিজ এবং সুইডেনের নিকলাস জেনস্ট্রম স্কাইপ প্রতিষ্ঠা করেন।

অন্যান্য মাধ্যমঃ উপরে বর্ণিত সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ছাড়াও আরও কিছু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম রয়েছে যেমন : মাইস্পেস, ব্লগিমেট, এওএল ইন্সট্যান্ট মেসেঞ্জার, ফেসটাইম (ম্যাকিন্টোল), গুগল টক, গুগল ভয়েস, আইসিকিউ, আইবিএম লোটাস সেমটাইম, উইন্ডোজ লাইভ মেসেঞ্জার, জিমেইল, ইয়াহু মেসেঞ্জার ইত্যাদি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বাংলাদেশঃ সামাজিক যোগাযোগের আন্তর্জাতিক মাধ্যমগুলোর ব্যাপক প্রভাব দেখা যায় সারা বিশ্বজুড়ে। যার ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশও পিছিয়ে না থেকে দেশীয় কিছু যোগাযোগের মাধ্যম গড়ে তুলেছে। যেমন-

>* বেশতো ডট কম হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগের প্রথম বাংলা মাধ্যম। যার দ্বারা বাংলা ভাষাভাষীরা সম্পূর্ণ বাংলায় নিজের মতামত ও অনুভূতিগুলো পরস্পরের সাথে বিনিময়ের সুযোগ পায়।

* সাম হোয়্যার ইন ব্লগ একটি সামাজিক ব্লগিং সাইট। টুইটার বা অন্যান্য সার্ভিসে ১৪০ শব্দের বেশি লেখা যায় না কিন্তু এই ব্লগ সাইট ছোট বড় ব্লগ লেখার সুবিধা রয়েছে।

* সব ধরণের তথ্য সম্বলিত আরেকটি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হচ্ছে বিডি অল ইনফো। যেটি রুয়েটের তড়িৎকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী মারছুছ, যন্ত্রকৌশল বিভাগের সাদ্দাম মিলে তৈরি করেছেন।

* ফেসবুকের সব ধরণের সুবিধা নিয়ে বাংলাদেশে চালু হয়েছে ‘হাউকাউ’ ডটকম। এটি ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন বন্ধুত্ব তৈরি, চ্যাট, ভিডিও আপলোড এবং গ্রুপ তৈরি করা যায়।

* বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের লোকজনের কেনাকাটার খবর জানার জন্য তৈরি হয়েছে ফেরিওয়ালা নামক সাইট।

* বাংলাদেশে প্রথম পূর্ণাঙ্গ সামাজিক মাধ্যম হলো ক্যাফে ইয়ার্ড। সামাজিক নেটওয়ার্কিং এর সকল সুবিধাসহ এই ওয়েবসাইটে বিশেষ কিছু ফিচার সুবিধা রয়েছে।

* ইন্টারনেটের বিশাল জগতে বয়স্ক থেকে তরুণ সবার ধারণা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে নগরবালক নামক মাধ্যমটি।

* সংগীত প্রেমীদের সামাজিক মাধ্যমগুলো হলোÑ মিউজিক জলসা, মূর্ছনা, পোলাপাইন মিউজিক, মিউজিক ফূর্তি, ফ্রী ডট কম, বিডি বাংলা প্রভৃতি।

এছাড়া আরো কিছু দেশীয় মাধ্যম হচ্ছে ফেসকই, মাইলিমেক্স, রংমহল, বিডিস্পট, আওয়াজ, ফ্রেইন্ডফেইস বাংলাদেশ, এফএনএফ পিয়ার ডট কম ইত্যাদি।

সুবিধা: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর বহুবিধ সুবিধা রয়েছে। যেমন-

- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ভৌগোলিক দূরত্বের বাধাকে অতিক্রম করে মানুষকে খুব কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।

- যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে পুরনো বন্ধু খোঁজা, নতুন বন্ধু তৈরি করা ছাড়াও নিজের বৃত্তের বাইরে অন্যকেও আমন্ত্রণ জানানো সম্ভব।

- এই মাধ্যমগুলোতে খুব সহজে বিভিন্ন সংবাদ ও তথ্য পাওয়া যায় ।

- এর সদস্য হতে খুব একটা খরচ লাগে না। একইভাবে কম শিক্ষিতরাও সহজে ব্যবহার করতে পারে।

- সামাজিক মাধ্যমগুলো বিভিন্ন ভাষা সমর্থন করে। পাশাপাশি এগুলোর ব্যবহারিক শব্দও মোটামুটি সহজ।

- স্বাধীন মত প্রকাশ এবং ভালো লেখক সৃষ্টিতে সামাজিক মাধ্যমগুলোর ভূমিকা রয়েছে।

অসুবিধা: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর সুবিধার পাশাপাশি বেশ কিছু অসুবিধাও রয়েছে। যেমন-

- সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে অপব্যবহারে নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক বিপর্যয় ঘটছে।

- এই মাধ্যমগুলো সহজে ব্যবহার করে সন্ত্রাসীরা তাদের সন্ত্রাসমূলক কর্মকান্ড চালাচ্ছে।

- শিশুদের সুস্থ বিকাশের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে সামাজিক মাধ্যম। সেই সাথে তাদের শরীরের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ছে যেমন- আর্থরাইটিস, স্থুলতা, স্মৃতিশক্তি দুর্বল, ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হওয়া ইত্যাদি সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।

- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে মানুষ তাদের জীবনের নানা দিক তুলে ধরছে। ফলে সুবিধাবাদী দেশগুলো গোয়েন্দা ও নিরাপত্তায় এই মাধ্যমগুলোকে কাজে লাগাচ্ছে।

উপসংহারঃ বিশ্বব্যাপী সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। যেটি পৃথিবীর দূরত্বকে হাতের মুঠোয় আনতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে। এর নেতিবাচক দিকগুলো সচেতনতার সাথে পরিহার করে ইতিবাচক দিকগুলো কাজে লাগাতে পারলে দেশ ও তার জনগণ উভয়ই উপকৃত হবে।

৬৫. ইন্টারনেট,বাংলা রচনা

বাংলা রচনা


(সংকেত: ভূমিকা; ইন্টারনেট কী; ইন্টারনেটের উৎপত্তি; ইন্টারনেটের সম্প্রসারণ; ইন্টারনেটের প্রকারভেদ ইন্টারনেটের ব্যবহার; ইন্টারনেটের ক্ষতিকর দিক; বাংলাদেশ ও ইন্টারনেট; ডিজিটাল বাংলাদেশ ও ইন্টারনেট; তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়নে করণীয়; উপসংহার।)

ভূমিকাঃ মানব সভ্যতার বিকাশে বিজ্ঞানের যে সব আবিষ্কার অনন্য ভূমিকা পালন করেছে তার মধ্যে অন্যতম একটি হলো ইন্টারনেট। বিশ্ববিস্তৃত যোগাযোগ ব্যবস্থার যুগান্তকারী এক মাধ্যমের নাম ইন্টারনেট। এটি কম্পিউটারভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থা। ইন্টারনেটের মাধ্যমে দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে সারাবিশ্বের দেশগুলি আজ যেন নিকট প্রতিবেশী। এই ব্যবস্থা ‘বিশ্বগ্রাম’ (Global Village)ধারণাকে বাস্তব রূপ দিয়েছে। বর্তমানে ব্যাপক ও বহুমুখী কাজে ইন্টারনেট ব্যবহৃত হচ্ছে। আধুনিক ইলেকট্রনিক্স প্রযুক্তিকে মানবকল্যাণে বিপুলভাবে সম্ভাবনাময় করে তুলেছে ইন্টারনেট।

ইন্টারনেট কীঃ ইন্টারন্যাশনাল নেটওয়ার্ক (আন্তর্জাতিক জাল) শব্দটির সংক্ষিপ্ত রূপ হলো ইন্টারনেট। আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি জনপ্রিয় মাধ্যম হলো এই ব্যবস্থা। কম্পিউটার নেটওয়ার্কের একটি পদ্ধতি হিসেবে গড়ে উঠেছে এই সিস্টেম। সারাবিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যবহৃত কম্পিউটারকে একটি বিশেষ পদ্ধতিতে যুক্ত করে ইন্টারনেট যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। এ প্রযুক্তিতে কম্পিউটার ভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ ও প্রেরণ করা যায়। সারাবিশ্বের অগণিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গবেষণাগার, সংবাদ সংস্থা, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানসহ কোটি কোটি গ্রাহক ইন্টারনেটের সাহায্যে যুক্ত হয়ে এই মহাযোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত হয়ে কম্পিউটার, মোবাইল ফোন কিংবা অনুরূপ যেকোনো ডিভাইস মুহূর্তেই তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। এ জন্য প্রয়োজন কম্পিউটার বা অনুরূপ ডিভাইস, মডেম এবং ইন্টারনেট সংযোগ।

ইন্টারনেটের উৎপত্তিঃ ইন্টারনেট আধুনিক কালের আবিষ্কার। ১৯৬৯ সালে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ এটি আবিষ্কার করে। যোগাযোগের গোপন এবং নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে এটি প্রতিরক্ষা বিভাগের গবেষণাগারে টেলিফোনের বিকল্প হিসেবে স্থান করে নেয়। এটি টেলিফোন লাইন নির্ভর একটি যোগাযোগ পদ্ধতি। ডেস্কটপ কম্পিউটারের আবিষ্কার হলে টেলিনেটওয়ার্কের সাথে কম্পিউটারের সংযুক্তি ঘটে। তখন এর নাম ছিল ARPANET । এক সময় কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে নেটওয়ার্কের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। ১৯৯০-এর দশকে ইন্টারনেট সারাবিশ্বে ব্যাপক আকারে বিস্তার লাভ করে। অপটিক্যাল ফাইবারের ব্যবহার ইন্টারনেটের বিপ্লবে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।

ইন্টারনেটের সম্প্রসারণঃ মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ ৪টি কম্পিউটারের সংযোগ ঘটিয়ে যে ব্যবস্থার শুরু করে, পরবর্তী তিন বছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬টিতে। ১৯৮৪ সালে মার্কিন ন্যাশনাল সাইন্স ফাউন্ডেশন সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য একটি ব্যবস্থা চালু করে। এরপর অল্প সময়ের মধ্যে এটি সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু তখনও সুযোগ-সুবিধা ছিল সীমিত। সমগ্র ব্যবস্থাটি নিয়ন্ত্রণের জন্য ৯০-এর দশকের শুরুতে কেন্দ্রীয় নেটওয়ার্ক হিসেবে ইন্টারনেট গড়ে তোলা হয়। ১৯৯৩ সালে ইন্টারনেটের বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হয়। অতি অল্প সময়েই তা দ্রুত বিস্তার লাভ করে। বর্তমান বিশ্বে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা শত কোটির ঊর্ধ্বে।

ইন্টারনেটের ব্যবহারিক দিকঃ ইন্টারনেট সিস্টেমে বহুল ব্যবহৃত কয়েকটি ব্যবহারিক দিক হলো

* ই.মেইল: দ্রুত সময়ে তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা হলো ইলেকট্রনিক্স মেইল বা ই-মেইল।

* ওয়েব: ইন্টারনেটের মাধ্যমে সংযুক্ত কম্পিউটারগুলোতে রাখা তথ্য দেখার পদ্ধতি।

* নেট নিউজ: ইন্টারনেটের তথ্য ভান্ডারে রক্ষিত সংবাদ।

* চ্যাট: অনলাইনে দুই বা ততোধিক ব্যক্তির কথা বা টেক্সট আড্ডা।

* ইউজনেট: সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত তথ্য ভান্ডার।

* ই-ক্যাশ: অর্থনৈতিক লেনদেন ও বাণিজ্যিক সুবিধা।

ইন্টারনেটের ব্যবহারঃ বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট সভ্য সমাজের মানুষের জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে। ইন্টারনেট ছাড়া জীবন অচল। এর মাধ্যমে মুহূর্তেই বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকে তথ্য সংগ্রহ করা যায়। লেখাপড়া, গবেষণা, সাহিত্য চর্চার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য, বই, ইন্টানেটের মাধ্যমে যেকোনো সময় পাওয়া সম্ভব। এটি মানুষের হাতের মুঠোয় জ্ঞানভান্ডার তথা লাইব্রেরিকে এনে দিয়েছে। পর্যটকদের প্রয়োজনীয় সব তথ্য ইন্টারনেটের মাধ্যমে পাওয়া যায়। হোটেল রির্জাভেশন, টিকেট কাটা সবই সম্ভব অনলাইনে। এছাড়াও ইন্টারনেটে টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসেও বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া যায়। ঘরে বসে বিশ্ববিখ্যাত সব সিনেমা-নাটক দেখা যায় যা বিনোদনকে সহজ করেছে। বর্তমান সময়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ সাইটগুলি যেমন ফেসবুক, টুইটার ইত্যাদির মাধ্যমে বন্ধুত্ব স্থাপন এবং যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারে ইন্টারনেট এনেছে নতুন দিগন্ত। অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইনে কেনাবেচা ইত্যাদি ক্ষেত্রে দিয়েছে নতুনমাত্রা। এতে সময় ও ব্যয় সাশ্রয় হচ্ছে। সংবাদপত্র এবং খেলাধুলার ক্ষেত্রকেও ইন্টারনেট অনেক সহজ করে দিয়েছে।

ইন্টারনেটের ক্ষতিকর দিকঃ ইন্টারনেটের বহুমাত্রিক উপকারিতার পাশাপাশি এর নেতিবাচক দিকও আছে। অবশ্য তা নির্ভর করে এর ব্যবহারের উপর। বর্তমানে এর সাহায্যে মিথ্যা খবর, অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ ছবি ও ভিডিও প্রদর্শন, মানুষকে হুমকি দেওয়া ইত্যাদি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব বিষয় যুবসমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে, নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটাচ্ছে। কেউ কেউ খারাপ উদ্দেশ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে দিচ্ছে, যা অসংখ্য কম্পিউটারকে অকেজো করে দিচ্ছে বা ক্ষতিগ্রস্ত করছে। হ্যাকাররা ইন্টারনেটের মাধ্যমে তথ্য চুরি করে বিভিন্নভাবে মানুষের ক্ষতি করছে। এছাড়াও অন্যের একাউন্ট হ্যাক করে অর্থ-সম্পদ নিজের দখলে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। আবার ফেসবুকে অতিরিক্ত সময় নষ্ট করেও অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে এসবের দায় ইন্টানেটের নয়, ব্যবহারকারীর। অপরাধীরা এর সুযোগ নিচ্ছে।

বাংলাদেশ ও ইন্টারনেটঃ ১৯৯৩ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে ইন্টারনেট চালু হয়। তবে তখন এর ব্যবহার ছিল খুবই সীমিত এবং তা কেবল ই-মেইলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ১৯৯৬ সালে ইন্টারনেট সংযোগের প্রসার ঘটতে থাকে। ২০০০ সালের শুরুতে ইন্টারনেটের গ্রাহক ছিল প্রায় ৬০,০০০। ২০০৪ সালে বাংলাদেশ তথ্য প্রযুক্তির মহাসড়ক সাবমেরিন ক্যাবলে যুক্ত হয়। এতে দেশে ইন্টারনেটের গতি অনেক বেড়ে যায়। ২০১৭ সাল নাগাদ সাবমেরিন ক্যাবলের দ্বিতীয় মহাসড়কে যুক্ত হবে বাংলাদেশ। বর্তমানে ব্রডব্যান্ড এবং মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১.৫ কোটি। সরকার ইন্টারনেটের প্রসারে অনেক কাজ করে যাচ্ছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ ও ইন্টারনেটঃ বাংলাদেশ সরকার ২০২১ সালের মধ্যে তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়নের মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পদক্ষেপ নিয়েছে। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি অর্জন করলেও তা পর্যাপ্ত নয়। দেশের সরকারি অফিস আদালত, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, সেবা সংস্থা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সেবা এখন অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে। ই-গর্ভনেন্স এবং ই-বিজনেসের ফলে সরকারি কাজ এবং ব্যবসা-বাণিজ্য অনেক সহজ হয়ে এসেছে। অনলাইন ব্যাংকিং ব্যবস্থা আর্থিক কর্মকান্ডকে অনেক বেশি গতি দান করেছে। তবে একথা সত্য যে, উন্নত বিশ্বের তুলনায় বাংলাদেশ এখনও অনেক পিছিয়ে আছে।

তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়নে করণীয়ঃ জ্ঞান বিজ্ঞান ও ইন্টারনেট ব্যবহারে নিজ অবস্থান সুদৃঢ় করতে তথ্য প্রযুক্তির বিকাশের কোনো বিকল্প নেই। বর্তমানে এক্ষেত্রে যারা পিছিয়ে পড়ছে, তারা এক ধরণের বৈষম্যের শিকার হচ্ছে, যাকে ডিজিটাল বৈষম্য বলা হয়। বাংলাদেশও এরূপ বৈষ্যমের শিকার। এই বৈষম্য দূর করতে চাইলে যে কাজগুলো করতে হবে তা হলো-

* আমাদের তরুণ সমাজকে তথ্য প্রযুক্তি শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে।

* ব্যাপক সংখ্যক জনগণের নিকট ইন্টারনেট পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য তথ্য প্রযুক্তির অবকাঠামোর উন্নয়ন ঘটাতে হবে।

* টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হবে।

* তথ্য প্রযুক্তির জগতে ভাষা হিসেবে ইংরেজির অধিপত্য একক। তাই ইংরেজির ব্যবহারে দক্ষতা বাড়াতে হবে।

* তথ্য প্রযুক্তিতে দক্ষ জনসম্পদ এবং সরকার গড়ে তুলতে হবে।

উপসংহারঃ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিই বর্তমান বিশ্বের সকল প্রকার উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের মূল চালিকাশক্তি। এক্ষেত্রে যারা যতো বেশি অগ্রগামী, তারা ততো উন্নত। ইন্টারনেট এখন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি স্তরকে জয় করে মহাকাশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু আমরা তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো এখনও পিছিয়ে আছি। আমাদের উচিত হলো ইন্টারনেটের ব্যাপক ও বহুমাত্রিক ব্যবহারের প্রসার ঘটিয়ে দেশকে আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলার উপযোগী করে গড়ে তোলা।

৬৪. এইডসঃ এ যুগের ঘাতক ব্যাধি,বাংলা রচনা

বাংলা রচনা


(সংকেত: ভূমিকা; ভাইরাস ও এইচআইভি ভাইরাস; এইডস; এইডস-এর ইতিহাস; এইডস ভাইরাসের বিস্তার ও কারণ; বিশ্বব্যাপী এইডস-এর বিস্তার; এইডস ও এশিয়া; এইডস ও বাংলাদেশ প্রেক্ষিত; এইডস এর লক্ষণসমূহ; এইডস প্রতিরোধে করণীয়; এইডস প্রতিরোধে জনসচেতনতামূলক শিক্ষা কার্যক্রম; উপসংহার।)

ভূমিকাঃ সারাবিশ্ব যেখানে ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি আন্দোলনে উদ্বেলিত, এইডস নামক ভয়ানক মারাত্মক ব্যাধির উপস্থিতি সেখানে সভ্যতার গতিরোধক। বিশ্বের প্রতিটি দেশেই আজ এইডস-এর উপস্থিতি লক্ষণীয়। সবাই জানে এইডস এর ফলাফল মৃত্যু, কিন্তু এর কারণ সম্পর্কে সমাজে নানা রকম মত প্রচলিত। এর অধিকাংশ মতই ভ্রান্ত অর্থাৎ এইডস সম্পর্কে সমাজে প্রচুর ভ্রান্ত ধারণা বিদ্যমান। এসব ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে হলে সচেতনতা বৃদ্ধি একান্ত আবশ্যক, যা একমাত্র শিক্ষার মাধ্যমেই সম্ভব। এইডস এমন এক দূরারোগ্য ব্যাধি, যার প্রতিরোধ আছে কিন্তু কোনো প্রতিকার নেই।

ভাইরাস (Virus) ও এইচআইভি (HIV)ভাইরাসঃ ভাইরাস নিউক্লিক প্রোটিন দ্বারা গঠিত, অকোষীয় রোগ সৃষ্টিকারী, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম এক ধরণের জীবাণু, যা কিনা সুনির্দিষ্ট পোষক কোষে অনুপ্রবিষ্ট হয়ে কেবল সেখানেই বংশ বিস্তার করতে সক্ষম। মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর, এমন কিছু ভাইরাস রোগের নাম হলোÑ ইনফ্লুয়েঞ্জা, পোলিও, এইডস, ক্যান্সার, হার্পিস, বসন্ত, হাম, ভাইরাল হেপাটাইটিস ইত্যাদি। এইডস রোগের জীবাণু বা ভাইরাসের নাম হলো এইচআইভি (HIV) ভাইরাস। HIV এমন এক ধরণের রেট্রো (Retro) ভাইরাস যা কয়েকটি সুনির্দিষ্ট উপায়ে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সম্পূর্ণ নষ্ট করে দেয়। HIV-এর পূর্ণরূপ হলো Human Immune Deficiency Virus পৃথিবীতে দুই ধরণের এইচআইভি পাওয়া গেছে। এগুলো হলো - HIV1, HIV2|

এইডস (AIDS): এইডস এর পূর্ণরূপ হলো Acquired Immune Deficiency Syndrome| এটি একটি ঘাতক ব্যাধি, যা এইচআইভি (HIV) থেকে জন্ম নেয় এই ভাইরাস দেহের রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয়। HIV অন্যান্য সব ভাইরাসের মতোই, কিন্তু এর কার্যপদ্ধতি ভিন্ন।

এইডস (AIDS)-এর ইতিহাসঃ HIV আক্রান্ত ব্যক্তির প্রথম সন্ধান পাওয়া যায় ১৯৫৯ সালে ব্রিটেনে। সত্তর এর দশকে আফ্রিকায় এইডস ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৮১ সালে আমেরিকা এবং ১৯৭৭-৭৮ সালে হাইতি, হাভানাসহ বিশ্বের অনেক স্থানে এইডস ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৮১ সালেই প্রথম এইডসকে মারাত্মক ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং এই রোগের কারণসমূহও চিহ্নিত হয়। হলিউডের খ্যাতনামা অভিনেতা হাডসন ১৯৮৫ সালে যখন এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন, তখন বিশ্বব্যাপী আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ, ১৯৮৫ সালেই মানব রক্তে এইডস ভাইরাস আছে কিনা তার পরীক্ষা পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়।

এইডস ভাইরাসের বিস্তার ও কারণঃ কিছু সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে শরীরের চার ধরণের তরল পদার্থের মাধ্যমে এইডস ভাইরাস ছড়ায়। এগুলো হলো রক্ত, বীর্য, যোনিরস ও মাতৃদুগ্ধ। এই চারটি তরল পদার্থ যদি কোনো এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তির শরীর থেকে কোনো সুস্থ ব্যক্তির দেহে প্রবেশ করে তবেই তিনি এইচআইভি দ্বারা আক্রান্ত হতে পারেন।

HIV-তে আক্রান্ত হওয়ার কারণগুলো হলো-

এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে অনিরাপদ যৌন মিলন।

এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত সূচ বা সিরিঞ্জ ব্যবহার।

এইচআইভি বহনকারী মা এর মাধ্যমে তার গর্ভস্থ সন্তান, অথবা জন্মদানের সময় বা জন্মের পর দুগ্ধদানের মাধ্যমে সন্তান এইচআইভিতে আক্রান্ত হতে পারে।

রক্তদানের সময় দানকৃত ব্যক্তির এইচআইভি থাকলে তা গ্রহীতার রক্তে সঞ্চালনের মাধ্যমে গ্রহীতার এইচআইভি হতে পারে।

মাদকাসক্ত ব্যক্তি যারা ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদকদ্রব্য সরাসরি শরীরে প্রবেশ করায়, তাদের এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি অনিরাপদ যৌন মিলনের চেয়েও বেশি।

বিশ্বব্যাপী এইডস এর বিস্তারঃ UNAIDS ও WHO এর হিসাব অনুযায়ী ২০০৩ সাল পর্যন্ত সারা পৃথিবীতে ৪০ মিলিয়ন পূর্ণবয়স্ক ও শিশু ছিল যারা এইচআইভিতে আক্রান্ত। বর্তমানে নারী ও পুরুষ উভয়ক্ষেত্রেই সমানভাবে এইডস ছড়াচ্ছে। বিশ্বে এ পর্যন্ত মোট ৬ কোটির বেশি লোক এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছে। ২০০৭ সালের হিসাব অনুযায়ী, এইডস আক্রান্ত মৃত ব্যক্তির সংখ্যা ৩৩.২ মিলিয়ন, এর মধ্যে ৩,৩০,০০০ জনই ছিল শিশু। আর বাকি ৩ কোটি ৩২ লাখ লোক আক্রান্ত হয়েই বেঁচে আছে।

এইডস ও এশিয়াঃ ২০০৩ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ ও দক্ষিণ পশ্চিম এশিয়াতে এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তি ও শিশু ছিল ৫.৮ মিলিয়ন। একই অঞ্চলে ২০০০ সালের হিসাব অনুযায়ী ৭,০০,০০০ জন এইচআইভি আক্রান্ত ছিল। এদের মধ্যে ৪,৫০,০০০ জন পুরুষ ও ২৫,০,০০০ জন মহিলা। বর্তমানে এ অঞ্চলে ৭২ লাখ লোক এইচআইভিতে আক্রান্ত। যার মধ্যে ২০০২ সালে ১০ লাখ বয়স্ক ও শিশু নতুনভাবে আক্রান্ত হয়েছে। সর্বদিক বিচারে এশিয়ার বর্তমান অবস্থা খুবই শোচনীয়।

এইডস ও বাংলাদেশ প্রেক্ষিতঃ বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ। এর পাশ্ববর্তী দেশ ইন্ডিয়া, থাইল্যান্ড, মায়ানমার, ভুটানে এইচআইভি সংক্রমণের হার ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে। বাংলাদেশের সাথে এসব দেশের যোগাযোগ থাকার কারণে বাংলাদেশেও এইডস এর বিস্তার ঘটছে। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী দুটো জেলা সিলেট ও চট্টগ্রামে এইডসে আক্রান্তের হার বেশি। এছাড়া সীমান্তবর্তী জেলা যশোর ও রাজশাহীতেও এই হার চোখে পড়ার মতো। বাংলাদেশের জন্য এই ক্রমবর্ধমান পরিস্থিতি থাইল্যান্ডের মতো হুমকিস্বরূপ।

HIV-তে আক্রান্ত হওয়ায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী হলো যৌনকর্মীরা। এছাড়াও এদেশে ইনজেকশন-এর মাধ্যমে মাদক সেবনকারীরাও মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশের এইডস-এ আক্রান্ত হওয়ার কিছু ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী হলো-

কিশোর ও তরুণ সমাজ যারা মাদক দ্রব্য সেবন করে।

অল্প বয়স্ক মহিলা ও মেয়ে শিশু, যাদের অধিকাংশ শিক্ষা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত।

নিজের পরিবার পরিজন ও সমাজ ছেড়ে আসা ভাসমান জনগোষ্ঠী, যারা প্রায়ই একাকিত্বের কারণে যৌন কর্মীদের সাথে যৌন মিলন করে থাকে।

মাদকসেবী জনগোষ্ঠী যারা অর্থের জন্য অনিরাপদ যৌন মিলনে বাধ্য হয়।

এইডস এর লক্ষণসমূহ : এইডস এর লক্ষণসমূহ নিম্নরুপ -

* মাঝে মাঝে জ্বর, মাথা ব্যথা ও দৃষ্টিশক্তি হ্রাস।

* মুখের ভেতর, ঠোঁটে ও জিভে সাদা পর্দা পড়া।

* অসীম দুর্বলতা ও হজম শক্তি হ্রাস।

* স্মৃতিশক্তি হ্রাস।

* শুকনা কাশি, গলাব্যথা, শ্বাসকষ্ট।

* গ্রন্থিসমূহ বিশেষ করে গলা, বগল ও কুচকী ফুলে যাওয়া।

* রাতে ঘাম হওয়া, অনিদ্রা ও ওজন কমে যাওয়া।

* পিঠে, মুখে ও গলায় ফুসকুরি।

এইডস প্রতিরোধে করণীয়ঃ এইডস প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এইডস প্রতিরোধে করণীয়গুলো নিম্মরূপ-

প্রথমতঃ ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা। বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের বিশ্বস্ততা বজায় রাখা।

দ্বিতীয়ঃ যৌন সম্পর্ক স্থাপনে নিরাপদ পদ্ধতি ব্যবহার করা। এছাড়া বহুগামীতা ও পতিতালয়ে যাতায়াত বন্ধ করা।

তৃতীয়তঃ রক্তদানের পূর্বে রক্তদাতার রক্তে HIV- আছে কিনা তা পরীক্ষা করা।

চতুর্থতঃ অন্যের সুই, সিরিঞ্জ, ব্লেড, রেজার, ক্ষুর ইত্যাদি ব্যবহার না করা।

পঞ্চমঃ এইডস আক্রান্ত মায়ের গর্ভধারণ থেকে বিরত থাকা।

ষষ্ঠতঃ মাদক দ্রব্য সেবন থেকে বিরত থাকা এবং সরকারি, বেসরকারি, দেশি, বিদেশি সকল প্রচার মাধ্যমে সতর্কতামূলক প্রচার চালানো।

এইডস প্রতিরোধে সমাজ সচেতনতামূলক শিক্ষা কার্যক্রমঃ এইডস প্রতিরোধে জীবনমুখী ও গণশিক্ষা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। শিক্ষিত সমাজে সচেতনতা থাকলে, পুরো সামজকে সচেতন করে তোলা সম্ভব। কিন্তু আমাদের দেশে প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতি জীবনমুখী বা বাস্তবমুখী শিক্ষা দিতে পারে না। পাঠ্য পুস্তকে এইডস-এর সচেতনতামূলক কার্যক্রম অন্তর্ভূক্ত করা দরকার। শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় বর্তমানে নতুন এক দিগন্ত হলো জীবন দক্ষতামূলক শিক্ষা (LSE=Life Skill Education) এর মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করে এইডস-এর মতো ভয়াবহ ব্যাধি মোকাবিলা করা সম্ভব।
উপসংহারঃ এইডস একটি ঘাতক ব্যধি। সারাবিশ্বে অতি দ্রুত এটি ছড়িয়ে পড়ছে। এখনো পর্যন্ত এর কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয়নি। তাই ব্যাপক হারে সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম চালাতে হবে। এই সচেতনতা কার্যক্রম ফলপ্রসু না হলে কিংবা প্রতিকার ব্যবস্থা না আসলে এটি মহামারীর আকার ধারণ করবে এবং পৃথিবীকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে। মানুষের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। তাই এইডস প্রতিরোধে সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে।

ইসমাইল হোসেন