মাকামে ইব্রাহিম, জমজম, সাফা-মারওয়া, মাথা মুন্ডন,ওকুফে আরাফ্, ওকুফে মুযদালিফা, ওকুফে মিনা, কংকর নিক্ষেপ, কুরবানি
মাকামে ইব্রাহিম
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে মাকামে ইব্রাহিমকে নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করে এটাকে নামাযের স্থান বানানোর আদেশ দিয়েছেন। হাজিরা তওয়াফ শেষে মাকামে ইব্রাহিমের পিছনে দু‘রাকাত তওয়াফের নামায আদায় করে।
মাকাম অর্থ ঠিকানা, গন্তব্য, আবাসস্থল, চিহ্ন ইত্যাদি। মাকামে ইব্রাহিম শুধুমাত্র পায়ের ছাপ সম্বলিত পাথরের স্থান নয় বরং এ স্থানটি হলো আল্লাহ তায়ালার প্রিয় পাত্র ইব্রাহিম আ. এর আবাসস্থান।যে কোন নিদর্শন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়। এটা শুধুই চোখের দেখা নয়, এটা চুমু খাওয়া বা দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরা, আর বুক-ফাটা আর্তনাদে ডুকরে কেঁদে উঠার জন্যে নয়। এখানে অনুভব করতে হয় ইব্রাহিম আ. এর অস্তিত্বের কথা। তাঁর আল্লাহ প্রেমের কথা। তাঁর স্ত্রী ও সন্তানের ইতিহাস। মহান মালিকের প্রতি তাঁর বিশ্বাস আনুগত্য ও পরিশ্রম মালিক এতটাই পছন্দ করেছিলেন যে তিনি পরবর্তী বান্দাদের জন্য ইব্রাহিম আ. ও তাঁর পরিবারের বিষয়টিকে নমুনা বা প্রমাণ হিসেবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন। যুগ-যুগান্তরের মানুষ ইব্রাহিম আ. এর এই স্মৃতিস্তম্ভ দেখে উৎসাহিত হয়, মালিকের প্রতি বিশ্বাস-আনুগত্য ও কার্যক্রমকে বেগবান করে। অন্যদিকে যারা অমান্যকারী ও অবিশ্বাসী তাদেরকে বুঝিয়ে দেয়- তোমরা মিথ্যাবাদী, অনাচারী।তোমরা তোমাদের মালিককে বিশ্বাস কর না? ইতিহাসকে অস্বীকার কর ও বাস্তবতাকে গোপন কর। ইব্রাহিম আ. এর এ নিদর্শন সকল মিথ্যাচার অন্যায় ও বাড়াবাড়ির বিপক্ষে এক অবিস্মরণীয় সাক্ষী হয়ে রয়েছে।এ পৃথিবীতে ইব্রাহিম আ. এর মাকাম দেখা হাজির মনে পরকালেও ইব্রাহিম আ. এর মাকাম দেখার তীব্র আকাঙ্খা জাগ্রত করে। আল্লাহর কাছে আকুল আবেদন জানায়, তিনি যেন দয়া করে সেই সৌভাগ্য দান করেন।
জমজম: বিশ্বাসের বারিধারা
জমজম ইব্রাহিম আ. ও তাঁর পরিবারের স্মৃতির সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। সে হিসেবে জমজম মাকামে ইব্রাহিমের অংশ বলা যায়। জমজম সম্পর্কে রসূলুল্লাহ স. এর অনেক মন্তব্য রয়েছে। প্রত্যেক তওয়াফ শেষে মাকামে ইব্রাহিমে নামায অন্তে জমজমের পানি পান করার বিষয়টি যুক্ত হওয়ায় জমজমের গুরুত্ব অনেক বৃদ্ধি পায়। কোন বিশেষ কারণ ব্যতিত জমজমের পানি পান না করার সিদ্ধান্ত শরিয়ত পরিপন্থি। জমজমের কারণেই ইতিহাসের এক পর্যায়ে পরিত্যাক্ত মক্কা পুনরায় জনবসতিতে রূপান্তরিত হয়। জমজমকে কেন্দ্র করেই মৃত মক্কা আধুনিক মক্কা অভিমুখে পা বাড়ায়। জমজম ব্যতিত হজ্জ পরিপূর্ণ হয় না, হাজিরা তৃপ্ত হয় না, হজ্জের স্বাদ সম্প্রসারিত হয় না।
ইব্রাহিম আ. ইসমাইল আ. ও হাযেরা আ. এর যে বিশ্বাস ত্যাগ পরিশ্রমের ফলে এ অলৌকিক জমজমের সৃষ্টি হয়েছে, সে প্রেক্ষাপট অনুসন্ধান এবং তার আলোকে নিজেদের জীবনকে সাজানোর আগ্রহ নিয়ে জমজমের কাছে যেতে হয়। জমজমের অস্তিত্ব জমজমের গুনাগুণ বুঝতে পারলে জমজমের অস্তিত্ব দাতা এবং জমজমের ব্যবস্থাপকের কথা মান্যকারীর সংখ্যাও বৃদ্ধি হয়। বিশ্বাসের পৃথিবী ব্যাপক পানি- শূন্যতায় মরুভুমিতে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা পায়। জমজম আর দশটা পানির উৎসের মত প্রতিনিয়ত হাজার লক্ষ মানুষের পিপাসা নিবৃত্ত করে। একইভাবে জমজম মহান স্রষ্টাকে পাওয়ার তীব্র পিপাসা নিবারণেও অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করে ।
হজ্জ ও উমরা পালনকারী মানুষের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি হওয়ার কারণে জমজমের উৎপত্তি স্থান চলে গেছে লোকচক্ষুর অন্তরালে। সাবধান সতর্ক না থাকলে জমজম নিয়ে হাজিদের গতানুগতিক চিন্তা চেতনার কারণে জমজম কেন্দ্রিক বিশ্বাসও মিশে
যেতে পারে অবিশ্বাসের আঁধারে। এ শূন্যতা পূরণের অসাধ্য সাধনে হজ্জ ও উমরা পালনকারীদেরকে নিরন্তর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হয়। ইব্রাহিমের মত বাবা, হাযেরার মত মা, আর ইসমাঈলের মত সন্তানের সম্মিলিত আল্লাহপ্রেম বিশ্বাসের শূন্যতায় ডুবে যাওয়া পৃথিবীতে হাজারো জমজমের উৎপত্তি ঘটাতে পারে।
সাফা-মারওয়া: আল্লাহর নিদর্শন
সাফা-মারওয়া মাসজিদে হারাম বা কাবা সংলগ্ন ঐতিহাসিক নিদর্শনের মধ্যে অন্যতম। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা সাফা-মারওয়াকে তাঁর নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ইব্রাহিমকে স্মরণের জন্যে মাকামে ইব্রাহিম, ইসমাঈলের জন্যে জমজম আর হাযেরার জন্যে সাফা-মারওয়া। আল্লাহর জন্যে নিবেদিত এক পরিবারকে স্মরণীয় করে রাখার এক অভিনব ব্যবস্থা করেছেন মহান প্রভু আল্লাহ তায়ালা। হাযেরার পদধূলিতে ধন্য হওয়া সাফা-মারওয়াকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষের বোকামী ও বাড়াবাড়িতে কলঙ্কিত করার অপচেষ্টা প্রতিরোধের শ্লোগান দিয়ে অমর করে রাখেন।
সাফা- মারওয়ার সাঈতে হাজি উৎফুল্ল হয়, আশান্বিত হয়। মহান মালিক তার প্রচেষ্টা মঞ্জুর করবেন, তার আশা পূরণ করবেন। হাজি সকল সাধ্য ঢেলে দেয় মালিকের সন্তুষ্টি কামনায় নিরলস প্রচেষ্টার নিদর্শন হয়ে থাকার অভিলাষে।
যে আল্লাহ একজন হাযেরার ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন সে আল্লাহ লক্ষ হাজির সম্মিলিত আহ্বানে অবশ্যই সাড়া দিবেন। হাযেরার পরিশ্রম আন্তরিকতা আর সাধনায় জড় পাহাড় যেভাবে আল্লাহর নিদর্শন হয়ে আছে হাজির জীবনের অগণিত নিয়ামতগুলোকেও
সেভাবে আল্লাহর নিদর্শন হিসেবে কবুল করাতে হাজির উত্তেজনা ও আরাধনার শেষ
থাকে না।
হাযেরার চেয়ে ঢের সুযোগ সুবিধা ভোগকারী হাজি লক্ষ্যে পৌঁছতে প্রবল পরাক্রমে
শেষ করে সাত চক্করের সাঈ। যদিও সাফা-মারওয়ার প্রাচীন আকার আকৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন করে হাজির শ্রম মেধা আর আন্তরিকতায় নানাবিধ বাধার পাহাড় দাঁড় করানো হয়েছে। আল্লাহর নিদর্শনের গভীরে প্রবেশ করে নিজের ও জগতের অগণিত নিদর্শন তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আল্লাহহীনতার অভিশাপ থেকে হাজি স্থায়ীভাবে মুক্তি পায়।
মাথা মুন্ডন বা চুল কাটা
মাথা মুন্ডন বা চুল কাটা হজ্জ বা উমরার অন্যতম একটি ওয়াজিব। উমরার সময় তওয়াফ ও সাঈ শেষ করে মাথা মু-ানো বা চুল কাটতে হয়। আর হজ্জের সময় ১০-১২ জিলহজ্জ মিনায় কংকর নিক্ষেপের পর কুরবানি শেষ করে মাথা মু-ানো বা চুল কাটতে হয়। হাজি বা উমরা পালনকারী মাথা মু-ন না করে ইহরাম খুলতে পারে না।
মানব শরীরের প্রত্যেকটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কোনটিকেই অস্বীকার করে মানুষ স্বাভাবিকভাবে জীবন যাপন করতে পারে না। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মাথা। মানব দেহের সবচেয়ে উঁচুতে অবস্থিত। শরীরের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যেমন মুখ চোখ নাক কান বাহ্যিকভাবে মাথাতেই সংযুক্ত থাকে। অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মস্তিস্ক মাথার ভিতরেই অবস্থিত। মাথা হলো মানব সত্তার পরিচয়ের সর্বশ্রেষ্ঠ নমুনা। চুল হলো মাথার বাইরের আবরণ যা সমগ্র শরীরের সৌন্দর্য নিরুপণ করে।
কারো চুল ধরে টানা, চুলের ঝুঁটি ধরা ইত্যাদি অপমানজনক মনে করা হয়। চুলের রং, চুলের সাইজ, চুলের ডিজাইন একেকজন একেকরকম করে। এ ব্যাপারে অন্য কারো হস্তক্ষেপ মানুষ পছন্দ করে না। চুলবিহীন মাথা বা টাক মাথা সাধারণত কোন মানুষ পছন্দ করে না। ভাল চুলের কদর করে সবাই এবং এ নিয়ে মানুষের আগ্রহ উদ্দীপনার
শেষ নেই। চুলের যতেœ কত সময় ব্যয় হয়, কত অর্থ খরচ হয় তার সীমা সংখ্যা নেই।
ইহরাম থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য হাজিকে সে প্রিয় চুলকে কেটে ফেলতে হয়। চুলকে
কেন্দ্র করে মানুষের যে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ রুচি-অভিরুচি সেটার মাথায় কাঁচি
ব্লেড-খুর লাগাতে হয়। চুলের ব্যাপারে সব আগ্রহ উদ্দীপনাকে শেষ করতে হয়।
ইহরাম অবস্থায় কেউ ইচ্ছাকৃত একটা চুলও ছিঁড়তে বা কাটতে পারে না। অথচ ইহরাম
খোলার সময় সে চুলেরই বিসর্জন দিতে হয়। মহিলাদের জন্য ইহরামের আলাদা
পোশাক না থাকলেও ইহরাম খুলতে তাদেরকেও চুল ছাঁটতে হয়। চুল যেহেতু মাথার নমুনা। সেহেতু চুল কাটার মাধ্যমে মূলত মাথা ছাঁটা/ কাটার অনুভূতি সৃষ্টি করা হয়।
“আমার মাথা আমার চুল”, এ ধারণা ধূলায় মিশে যায়।
হজ্জের অনুষ্ঠানে বিশেষ করে কুরবানীর পরে চুল কাটার বিষয়টি থাকাতে এটা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে হাজি মহান স্রষ্টাকে খুশী করার জন্য এমন কি তার জীবনও বিলিয়ে দিতে পারে। তার মন-মগজ চিন্তায় তার নিজস্ব যা কিছু সবকিছুকে সে আল্লাহর জন্য নিবেদন করতে পারে।
ওকুফে আরাফা/ মিলন মেলা
বিশ্বের প্রায় সকল দেশেই রয়েছে মুসলমান। এক আল্লাহ ও রসূলের প্রতি বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও তাদের রং, বর্ণ, ভাষা, পোষাক, চেহারা,আকৃতি, পেশা, জাতি, গোত্র, কৃষ্টি ও সংস্কৃতিগত ভিন্নতা আছে।
লক্ষ লক্ষ হাজি যখন ৯ জিলহজ্জ আরাফার মাঠে একত্রিত হয় তখন মুসলিম উম্মাহর ঐক্য পরিপূর্ণ রূপ লাভ করে। প্রত্যেক হাজি সব ভেদাভেদ ভুলে মুসলিম জাতি সত্তার মধ্যে নিজেকে বিলীন করে দেয়। কেউ নিজেকে আলাদা কোন সত্তা বলে অনুভব করে না। সবাই মুসলিম সত্তার একটি অংশ বলে মনে করে। ইহরামের বিশেষ পোষাক পোষাকের যাবতীয় ভিন্নতা চূর্ণ বিচূর্ণ করে দেয়, তালবিয়া ভাষাগত ভিন্নতাকে অকার্যকর করে দেয়। একই আরাধনা, একই প্রার্থনা পেশাগত বিভিন্নতা দূর করে। সব হাজির সকল চিন্তাকে কেবলমাত্র আল্লাহকে খুশী করার প্রতি কেন্দ্রীভূত করে হাজিদের চিন্তা চেতনার ভিন্নতা দূর করা হয়। যুহর ও আসর নামায সংক্ষিপ্ত ও সহজ করা এবং সূর্যাস্ত পর্যন্ত আর কোন বিশেষ ইবাদতের ব্যবস্থা না রাখার মাধ্যমে কর্ম সম্পাদনের পদ্ধতিগত জটিলতা দূরীভূত করা হয়।
পাপই মানুষের অনৈক্যের কারণ। ৯ জিলহজ্জ হজ্জ পালনকারী হিসেবে আরাফার সমাবেশে সমবেত জনগোষ্ঠীর সবাইকে সে পাপ থেকে সম্পূর্ণভাবে ক্ষমা করার ঘোষণা দিয়ে বিশ্বাসগত দিক থেকেও সবাইকে পাপমুক্ত অবস্থানে নিয়ে আসা হয়।
হাজিকে একযোগে এক স্থানে একত্রিত করার মাধ্যমে আরাফা ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের প্রশিক্ষণের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন এলাকা থেকে শত রকমের ভিন্নতায় অভ্যস্ত একটা বিশাল জনগোষ্ঠীকে সকল কৃত্রিম ভেদাভেদের উর্ধ্বে ওঠার ব্যবস্থা করা হয়। মহান স্রষ্টার প্রতি নিষ্ঠা ও আনুগত্য কীভাবে মানব গোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করে হাজি তা স্বচক্ষে অবলোকন করে। হজ্জ থেকে ফিরে নিজ নিজ এলাকার কৃত্রিম ভিন্নতার মূলোৎপাটনে তারা বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে। ক্ষুদ্র গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকা ব্যক্তি মুসলমান হয়ে ওঠে বিশ্ব মানবতার প্রতিনিধিত্বকারী দলের সদস্য। একজন হাজি তাঁর বিশ্বাসের প্রসারতা কর্মকা-ের ব্যাপকতা এবং সমস্যা সম্ভবনার বিশ্বব্যাপী ক্ষেত্র অনুভব করে। তাঁর শক্তি ক্ষমতা ও চিন্তা চেতনার সংকীর্ণতা দূর হয় এবং সাফল্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।
ওকুফে মুযদালিফা
মহান মালিকের সান্নিধ্য পাওয়ার আকাক্সক্ষায় আরাফায় ক্ষমা প্রাপ্তির পর পার্থিব সব কিছু পরিত্যাগ করে ক্লান্ত শ্রান্ত অবসন্ন শরীর ও উৎফুল্ল মন নিয়ে হাজি রাতে মুযদালিফার ধূ ধূ বালি চত্বরে পৌঁছে, একেবারে খোলা আকাশের নিচে। দুনিয়ার আকর্ষণে সুন্দর সাজানো গোছানো যে জীবনের পেছনে সে এতদিন ঘুরঘুর করেছিল লজ্জা-শরম, নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে, আরাফার আরাধনার পুরস্কার নিতে বসে থাকে মুযদালিফায়। আরাফার মাঠে তাঁবু ছিল, মুয়াল্লিমের লোকজন ছিল, খাওয়া দাওয়ার বন্দোবস্তও ছিল। মুযদালিফায় এসবের কোন সুযোগ নেই। কোন রকম পলিথিনের পাটি নয়তোবা পাতলা একখানা চাদর বিছিয়ে মুহূর্তের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে। কোন আফসোস নেই, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই। কারও কাছে কোন চাহিদাও নেই। এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। মানব জীবনের স্বাভাবিক চাওয়া পাওয়ার যে পরিবেশ ও পদ্ধতি, তার কোন কিছুর সাথে এখানের মিল নেই। জীবনের অতৃপ্তির পরিসমাপ্তি হয় মুযদালিফার এ বালুভূমিতে। পিঠের নিচে বালুকণা আর মাথার উপরে নীল আকাশের অগণিত তারকারাজি এই সাফল্যে মিট মিট করে হাসে। মুযদালিফায় হাজির অবস্থা সদ্য প্রসূত এক শিশুর মত। শিশুর নিজস্ব শক্তি ক্ষমতা, সহায় সম্পদ চাহিদা কিছুই থাকে না। কিন্তু সেজন্যে তার কোন চিন্তা হয় না, ভয় হয় না। অসুবিধা হয় না। কারণ তার মা তার পাশে থাকেন। তিনিই শিশুর সব প্রয়োজন মিটান। মানব জীবনের সবচেয়ে ভাবনাহীন অংশ হলো মায়ের কোলের সময়। শিশু যখন বড় হয় শক্তি-ক্ষমতা, সহায় সম্পদের মালিক হয় তখন অনেক অসুবিধা আর বাধা বিপত্তি তাকে পেয়ে বসে। মায়ের কোলের মত নিশ্চিন্ত সুখ আর কোনদিনই সে উপভোগ করতে পারে না। মুযদালিফায় হাজি তার মহান মালিকের আশ্রয় গ্রহণ করে নিশ্চিন্ত নির্বিঘœ হয়। মুযদালিফার মাটি আর মুযদালিফার আকাশ চিরে তার কাছে নেমে আসে গোটা বিশ্ব জাহানের স্রষ্টা ও নিয়ন্ত্রক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার সাহায্য ও করুণা। আর কোন ভয় নেই, অসুবিধা নেই। হাজি এখন সম্পূর্ণ নিরাপদ ও পুরোপুরি সফল।
ওকুফে মিনা
হজ্জের আহকাম পালন করার সাথে মূলত যে চারটি স্থান সম্পর্কিত তার মধ্যে আরাফার মাঠে থাকতে হয় অর্ধবেলা। মুযদালিফাতে থাকতে হয় রাতের একটি অংশ। আর তওয়াফে যিয়ারত ও সাঈ-এর জন্যে কিছু সময় দিতে হয় কাবা বা মসজিদে হারামে। কিন্তু সময় ব্যয় করতে হয় মিনায়, তিন দিন, কমপক্ষে দু’দিন।
প্রশ্ন হল পৃথিবীর সবচেয়ে দামী, সম্মানিত এবং পুণ্যভূমি কাবা এবং মসজিদে হারামকে
বাদ দিয়ে মিনাতে দীর্ঘ সময় অবস্থান করার জন্য বাছাই করা হল কেন?
মিনায় অবস্থান করে কুরবানি করা ও জামারাতে পাথর মারার মাধ্যমে হাজি হজ্জের মূল
রহস্য ও তাৎপর্য বুঝে এগুলো থেকে প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করে।
সময় সম্পদ ও শক্তি ক্ষমতা ব্যয়ের বাস্তব প্রমাণ পেশ করতে হয় মিনাতে।
পাথর মারার মাধ্যমে শয়তানকে ত্যাগ করার মহড়াও প্রস্ফুটিত হয় মিনায়। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত লাখ মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া, তাদের সুখ
দুঃখের খবর নেওয়া এবং মুসলিম উম্মাহকে বিশ্বমানবতার মুক্তিদাতা গোষ্ঠী হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করার কলাকৌশল ও কর্মপ্রণালী নির্ধারণের উপযুক্ত ক্ষেত্র হলো মিনা।
কংকর নিক্ষেপ
১০ জিলহজ্জ ভোরে হাজি মিনার উদ্দেশ্যে বের হয়। যেখানে আল্লাহর এক অতি প্রিয় বান্দাহ ইব্রাহিম আ. বিলিয়ে দিয়েছিলেন নিজের জীবনের সর্বাপেক্ষা প্রিয় সন্তানকে। সে পথ ধরে এগিয়ে যায় হাজি কুরবানি করতে। পথ আগলে দাঁড়ায় চির-দুশমন শয়তান। সমস্ত শক্তি নিয়ে সে প্রতিরোধের প্রাচীর গড়ে তোলে হাজির সামনে। যেমনভাবে
সে বাধা দিয়েছিল ইসমাইল আ. কে। আত্মপ্রত্যয়ে উজ্জীবিত হাজি অনেক কষ্ট আর সাধনায় অর্জিত পাপ থেকে মুক্তি ও আল্লাহর ক্ষমা ও রহমত অর্জন করে, তা হাতছাড়া করতে চায় না। প্রতিরোধ সৃষ্টি করে। ধ্বংস করে দেয় শয়তানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। চূর্ণ বিচূর্ণ করে দেয় শয়তানের আস্তানা।
লক্ষ্য স্থির রেখে শান্ত ও সাহসের সাথে অগ্রসর হয়। স্তম্ভের কাছাকাছি এসে আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে গুনে গুনে পাথর নিক্ষেপ করে। শরীর ও মনের প্রতিটি কণা থেকে শয়তানের শেষ চিহ্নটুকুও ছুঁড়ে ফেলে দেয় সামনের স্তম্ভে। শয়তানের প্রভাব থেকে চিরতরে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে নিজের পুরো সত্তাকে।
হাজি জানে মতলববাজ শয়তানের চালাকির কোন শেষ নেই। প্রথম আক্রমণে সব
শেষ মনে করার কোন কারণ নেই। হাজিদের সম্মিলিত ধাক্কা সামাল দিতে না পারলেও
সে পথ ছাড়বে না। উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে। শক্তি সামর্থ মাল-মসলা সংগ্রহ করে আবারও হামলা করবে। আগের চেয়ে অনেক সতর্ক ও সচেতন হাজি। শয়তানের আপাত ধ্বংস দেখেই নিশ্চিত না হয়ে ঘরে ফিরে যায় না। পরপর আরও দুদিন এবং প্রয়োজনে আরও একদিন শয়তানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে অংশ নিতে প্রশিক্ষণ নেয়। শয়তানের ধ্বংস নিশ্চিত করে। শয়তানের পরিম-ল থেকে মুক্ত হাজি এখন মনের সুখে প্রাণের প্রিয় সবকিছু ঢেলে দেয় মালিকের পদতলে।
কুরবানি
কুরবা অর্থ নিকটবর্তী হওয়া। মহান আল্লাহর নিকটবর্তী বা প্রিয়তম হওয়ার জন্যে
নির্দিষ্ট নিয়মে ত্যাগ স্বীকার করার নাম কুরবানি। কুরবানি হজ্জের একটি অন্যতম
গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কুরবানি পশুত্ব বিসর্জন দিয়ে মনুষ্যত্বকে রক্ষা করতে শিক্ষা দেয়। মানুষ আকার আকৃতিতে অন্য সকল পশুর চেয়ে ভিন্ন হলেও তার মধ্যে নানাবিধ পাশবিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক পর্যায়ে যাবতীয় অনাচার ও বিশৃঙ্খলার জন্যে এসব পাশবিক আচরণই দায়ী। পাশবিকতা থেকে মানুষকে উদ্ধার করার জন্যে আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। হজ্জকালীন পশু কুরবানি এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পশুর গলায় ছুরি চালানোর মাধ্যমে প্রকৃত পক্ষে হাজি তার অভ্যন্তরের পাশবিক বিষয়াদীকে জবাই করে।
কুরবানি নিজের ভবিষ্যত সুনাম সুখ্যাতি ও সম্ভাবনা সাফল্যকে আল্লাহর কাছ সমর্পণের বলিষ্ঠ প্রমাণ। মানুষ মাত্রই ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে। প্রতিটি মানুষ ভবিষ্যতের আশাতেই অগ্রসর হয়। জৈবিক দৃষ্টিতে সন্তানই মানুষের সর্বোত্তম ভবিষ্যতের উৎস। সন্তানকে
কেন্দ্র করেই মানুষ ভবিষ্যতে বেঁচে থাকার বড় হওয়ার সফল হওয়ার স্বপ্ন দেখে।
সন্তানের কারণেই মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আল্লাহ রসূল দ্বীন ধর্ম থেকে দূরে
থাকে। অথচ হাজিকে সন্তানকে কুরবানি করার ইতিহাসের পুনরাবর্তন করতে হয়
মিনাতে। পৃথিবীতে যত নবি এবং রসূল এসেছেন তাঁদের সবাইকে আল্লাহর দ্বীনের জন্য অসম্ভব কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। তাঁরা স্ত্রী সন্তানাদিসহ গোটা পরিবারকে সাথে নিয়ে আল্লাহর পথে সফলতার সাথে অগ্রসর হয়েছেন।
এ ক্ষেত্রে ইব্রাহিম আ. ছিলেন অগ্রগামী। মিনার প্রান্তরে ইব্রাহিম আ. ও তাঁর পুত্র ইসমাইল আ. এর ত্যাগের ঘটনা আল্লাহ তায়ালা এত পছন্দ করেছেন যে সেটাকে কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী করার ব্যবস্থা করেছেন।
আল্লাহ তায়ালা প্রথমে ইব্রাহিম আ. কে সরাসরি ওহী নাযিল করে নবি বানান নি।
ইব্রাহিম আ. আকাশের তারকা, চাঁদ, সূর্য ইত্যাদি প্রাকৃতিক অবস্থা থেকে স্রষ্টার সন্ধান
করেন। এ সময় তিনি সুস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেন যে চারপাশের সবকিছুই সৃষ্টি,
নয়। ইব্রাহিম আ. সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর আনুগত্য মেনে নেওয়ার ঘোষণা দেন।
পরবর্তীতে নমরুদের আগুনের গর্তে পড়া, দেশ ত্যাগ করা, যাযাবরের মত এক
দেশ থেকে আর এক দেশে ঘুরে বেড়ানো এবং শেষ বয়সে প্রাপ্ত সন্তানকে নির্বাসনে পাঠানোর মত একাধিক কঠিনতম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রমাণ করেন যে তাঁর ঈমান কত দৃঢ় ছিল। ক্ষণিকের জন্যেও তিনি আল্লাহর আনুগত্য করার প্রতিজ্ঞা থেকে বিচ্যূত হননি। এতগুলো পরীক্ষায় পাশ করা র্ইরাহীম আ. কে আল্লাহ তায়ালা আরো এক অত্যন্ত কঠিন ও অস্বাভাবিক পরীক্ষার মুখোমুখি করেছিলেন, যখন ইব্রাহিম আ. এর মনে হারানো ইসমাইলকে বুকে জড়িয়ে পিতৃত্বের স্বাদ নতুনভাবে জেগে উঠেছিল। সংসার জীবনের নতুন অধ্যায় জমে উঠেছিল। আল্লাহ দেখতে চেয়েছিলেন ইব্রাহিম আ. আল্লাহর ভালবাসায় স্থির থাকে কি না। বারবার একই স্বপ্ন দেখে ইব্রাহিম আ. গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা করে তাঁর জীবনের সবচেয়ে প্রিয় বস্তু হিসেবে ইসমাইলকে চিহ্নিত করলেন এবং কালবিলম্ব না করে তাকে কুরবানি করার ব্যবস্থা করলেন। ইব্রাহিম আ. পরীক্ষায় উর্ত্তীণ হলেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর কুদরতে ইসমাইলের পরিবর্তে একটি দুম্বা জবাই করিয়ে দিলেন।
আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করলেন, “হে ইব্রাহিম তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছ। এভাবেই আমি আমার মুহসিন বান্দাকে পুরস্কৃত করে থাকি।”
আল্লাহ তায়ালা ইব্রাহিম আ. কে মানবজাতির নেতা পদে অধিষ্ঠিত করলেন। এ
নেতৃত্বের অংশ হিসেবে ইব্রাহিম আ. কে পবিত্র কাবার তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দিলেন। আর তাঁর বংশধরদের মধ্যে যারাই এভাবে আল্লাহর জন্য ত্যাগ স্বীকার করবে, তাদের জন্যই তিনি নেতৃত্ব অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিলেন।
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে মাকামে ইব্রাহিমকে নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করে এটাকে নামাযের স্থান বানানোর আদেশ দিয়েছেন। হাজিরা তওয়াফ শেষে মাকামে ইব্রাহিমের পিছনে দু‘রাকাত তওয়াফের নামায আদায় করে।
মাকাম অর্থ ঠিকানা, গন্তব্য, আবাসস্থল, চিহ্ন ইত্যাদি। মাকামে ইব্রাহিম শুধুমাত্র পায়ের ছাপ সম্বলিত পাথরের স্থান নয় বরং এ স্থানটি হলো আল্লাহ তায়ালার প্রিয় পাত্র ইব্রাহিম আ. এর আবাসস্থান।যে কোন নিদর্শন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়। এটা শুধুই চোখের দেখা নয়, এটা চুমু খাওয়া বা দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরা, আর বুক-ফাটা আর্তনাদে ডুকরে কেঁদে উঠার জন্যে নয়। এখানে অনুভব করতে হয় ইব্রাহিম আ. এর অস্তিত্বের কথা। তাঁর আল্লাহ প্রেমের কথা। তাঁর স্ত্রী ও সন্তানের ইতিহাস। মহান মালিকের প্রতি তাঁর বিশ্বাস আনুগত্য ও পরিশ্রম মালিক এতটাই পছন্দ করেছিলেন যে তিনি পরবর্তী বান্দাদের জন্য ইব্রাহিম আ. ও তাঁর পরিবারের বিষয়টিকে নমুনা বা প্রমাণ হিসেবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন। যুগ-যুগান্তরের মানুষ ইব্রাহিম আ. এর এই স্মৃতিস্তম্ভ দেখে উৎসাহিত হয়, মালিকের প্রতি বিশ্বাস-আনুগত্য ও কার্যক্রমকে বেগবান করে। অন্যদিকে যারা অমান্যকারী ও অবিশ্বাসী তাদেরকে বুঝিয়ে দেয়- তোমরা মিথ্যাবাদী, অনাচারী।তোমরা তোমাদের মালিককে বিশ্বাস কর না? ইতিহাসকে অস্বীকার কর ও বাস্তবতাকে গোপন কর। ইব্রাহিম আ. এর এ নিদর্শন সকল মিথ্যাচার অন্যায় ও বাড়াবাড়ির বিপক্ষে এক অবিস্মরণীয় সাক্ষী হয়ে রয়েছে।এ পৃথিবীতে ইব্রাহিম আ. এর মাকাম দেখা হাজির মনে পরকালেও ইব্রাহিম আ. এর মাকাম দেখার তীব্র আকাঙ্খা জাগ্রত করে। আল্লাহর কাছে আকুল আবেদন জানায়, তিনি যেন দয়া করে সেই সৌভাগ্য দান করেন।
জমজম: বিশ্বাসের বারিধারা
জমজম ইব্রাহিম আ. ও তাঁর পরিবারের স্মৃতির সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। সে হিসেবে জমজম মাকামে ইব্রাহিমের অংশ বলা যায়। জমজম সম্পর্কে রসূলুল্লাহ স. এর অনেক মন্তব্য রয়েছে। প্রত্যেক তওয়াফ শেষে মাকামে ইব্রাহিমে নামায অন্তে জমজমের পানি পান করার বিষয়টি যুক্ত হওয়ায় জমজমের গুরুত্ব অনেক বৃদ্ধি পায়। কোন বিশেষ কারণ ব্যতিত জমজমের পানি পান না করার সিদ্ধান্ত শরিয়ত পরিপন্থি। জমজমের কারণেই ইতিহাসের এক পর্যায়ে পরিত্যাক্ত মক্কা পুনরায় জনবসতিতে রূপান্তরিত হয়। জমজমকে কেন্দ্র করেই মৃত মক্কা আধুনিক মক্কা অভিমুখে পা বাড়ায়। জমজম ব্যতিত হজ্জ পরিপূর্ণ হয় না, হাজিরা তৃপ্ত হয় না, হজ্জের স্বাদ সম্প্রসারিত হয় না।
ইব্রাহিম আ. ইসমাইল আ. ও হাযেরা আ. এর যে বিশ্বাস ত্যাগ পরিশ্রমের ফলে এ অলৌকিক জমজমের সৃষ্টি হয়েছে, সে প্রেক্ষাপট অনুসন্ধান এবং তার আলোকে নিজেদের জীবনকে সাজানোর আগ্রহ নিয়ে জমজমের কাছে যেতে হয়। জমজমের অস্তিত্ব জমজমের গুনাগুণ বুঝতে পারলে জমজমের অস্তিত্ব দাতা এবং জমজমের ব্যবস্থাপকের কথা মান্যকারীর সংখ্যাও বৃদ্ধি হয়। বিশ্বাসের পৃথিবী ব্যাপক পানি- শূন্যতায় মরুভুমিতে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা পায়। জমজম আর দশটা পানির উৎসের মত প্রতিনিয়ত হাজার লক্ষ মানুষের পিপাসা নিবৃত্ত করে। একইভাবে জমজম মহান স্রষ্টাকে পাওয়ার তীব্র পিপাসা নিবারণেও অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করে ।
হজ্জ ও উমরা পালনকারী মানুষের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি হওয়ার কারণে জমজমের উৎপত্তি স্থান চলে গেছে লোকচক্ষুর অন্তরালে। সাবধান সতর্ক না থাকলে জমজম নিয়ে হাজিদের গতানুগতিক চিন্তা চেতনার কারণে জমজম কেন্দ্রিক বিশ্বাসও মিশে
যেতে পারে অবিশ্বাসের আঁধারে। এ শূন্যতা পূরণের অসাধ্য সাধনে হজ্জ ও উমরা পালনকারীদেরকে নিরন্তর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হয়। ইব্রাহিমের মত বাবা, হাযেরার মত মা, আর ইসমাঈলের মত সন্তানের সম্মিলিত আল্লাহপ্রেম বিশ্বাসের শূন্যতায় ডুবে যাওয়া পৃথিবীতে হাজারো জমজমের উৎপত্তি ঘটাতে পারে।
সাফা-মারওয়া: আল্লাহর নিদর্শন
সাফা-মারওয়া মাসজিদে হারাম বা কাবা সংলগ্ন ঐতিহাসিক নিদর্শনের মধ্যে অন্যতম। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা সাফা-মারওয়াকে তাঁর নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ইব্রাহিমকে স্মরণের জন্যে মাকামে ইব্রাহিম, ইসমাঈলের জন্যে জমজম আর হাযেরার জন্যে সাফা-মারওয়া। আল্লাহর জন্যে নিবেদিত এক পরিবারকে স্মরণীয় করে রাখার এক অভিনব ব্যবস্থা করেছেন মহান প্রভু আল্লাহ তায়ালা। হাযেরার পদধূলিতে ধন্য হওয়া সাফা-মারওয়াকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষের বোকামী ও বাড়াবাড়িতে কলঙ্কিত করার অপচেষ্টা প্রতিরোধের শ্লোগান দিয়ে অমর করে রাখেন।
সাফা- মারওয়ার সাঈতে হাজি উৎফুল্ল হয়, আশান্বিত হয়। মহান মালিক তার প্রচেষ্টা মঞ্জুর করবেন, তার আশা পূরণ করবেন। হাজি সকল সাধ্য ঢেলে দেয় মালিকের সন্তুষ্টি কামনায় নিরলস প্রচেষ্টার নিদর্শন হয়ে থাকার অভিলাষে।
যে আল্লাহ একজন হাযেরার ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন সে আল্লাহ লক্ষ হাজির সম্মিলিত আহ্বানে অবশ্যই সাড়া দিবেন। হাযেরার পরিশ্রম আন্তরিকতা আর সাধনায় জড় পাহাড় যেভাবে আল্লাহর নিদর্শন হয়ে আছে হাজির জীবনের অগণিত নিয়ামতগুলোকেও
সেভাবে আল্লাহর নিদর্শন হিসেবে কবুল করাতে হাজির উত্তেজনা ও আরাধনার শেষ
থাকে না।
হাযেরার চেয়ে ঢের সুযোগ সুবিধা ভোগকারী হাজি লক্ষ্যে পৌঁছতে প্রবল পরাক্রমে
শেষ করে সাত চক্করের সাঈ। যদিও সাফা-মারওয়ার প্রাচীন আকার আকৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন করে হাজির শ্রম মেধা আর আন্তরিকতায় নানাবিধ বাধার পাহাড় দাঁড় করানো হয়েছে। আল্লাহর নিদর্শনের গভীরে প্রবেশ করে নিজের ও জগতের অগণিত নিদর্শন তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আল্লাহহীনতার অভিশাপ থেকে হাজি স্থায়ীভাবে মুক্তি পায়।
মাথা মুন্ডন বা চুল কাটা
মাথা মুন্ডন বা চুল কাটা হজ্জ বা উমরার অন্যতম একটি ওয়াজিব। উমরার সময় তওয়াফ ও সাঈ শেষ করে মাথা মু-ানো বা চুল কাটতে হয়। আর হজ্জের সময় ১০-১২ জিলহজ্জ মিনায় কংকর নিক্ষেপের পর কুরবানি শেষ করে মাথা মু-ানো বা চুল কাটতে হয়। হাজি বা উমরা পালনকারী মাথা মু-ন না করে ইহরাম খুলতে পারে না।
মানব শরীরের প্রত্যেকটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কোনটিকেই অস্বীকার করে মানুষ স্বাভাবিকভাবে জীবন যাপন করতে পারে না। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মাথা। মানব দেহের সবচেয়ে উঁচুতে অবস্থিত। শরীরের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যেমন মুখ চোখ নাক কান বাহ্যিকভাবে মাথাতেই সংযুক্ত থাকে। অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মস্তিস্ক মাথার ভিতরেই অবস্থিত। মাথা হলো মানব সত্তার পরিচয়ের সর্বশ্রেষ্ঠ নমুনা। চুল হলো মাথার বাইরের আবরণ যা সমগ্র শরীরের সৌন্দর্য নিরুপণ করে।
কারো চুল ধরে টানা, চুলের ঝুঁটি ধরা ইত্যাদি অপমানজনক মনে করা হয়। চুলের রং, চুলের সাইজ, চুলের ডিজাইন একেকজন একেকরকম করে। এ ব্যাপারে অন্য কারো হস্তক্ষেপ মানুষ পছন্দ করে না। চুলবিহীন মাথা বা টাক মাথা সাধারণত কোন মানুষ পছন্দ করে না। ভাল চুলের কদর করে সবাই এবং এ নিয়ে মানুষের আগ্রহ উদ্দীপনার
শেষ নেই। চুলের যতেœ কত সময় ব্যয় হয়, কত অর্থ খরচ হয় তার সীমা সংখ্যা নেই।
ইহরাম থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য হাজিকে সে প্রিয় চুলকে কেটে ফেলতে হয়। চুলকে
কেন্দ্র করে মানুষের যে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ রুচি-অভিরুচি সেটার মাথায় কাঁচি
ব্লেড-খুর লাগাতে হয়। চুলের ব্যাপারে সব আগ্রহ উদ্দীপনাকে শেষ করতে হয়।
ইহরাম অবস্থায় কেউ ইচ্ছাকৃত একটা চুলও ছিঁড়তে বা কাটতে পারে না। অথচ ইহরাম
খোলার সময় সে চুলেরই বিসর্জন দিতে হয়। মহিলাদের জন্য ইহরামের আলাদা
পোশাক না থাকলেও ইহরাম খুলতে তাদেরকেও চুল ছাঁটতে হয়। চুল যেহেতু মাথার নমুনা। সেহেতু চুল কাটার মাধ্যমে মূলত মাথা ছাঁটা/ কাটার অনুভূতি সৃষ্টি করা হয়।
“আমার মাথা আমার চুল”, এ ধারণা ধূলায় মিশে যায়।
হজ্জের অনুষ্ঠানে বিশেষ করে কুরবানীর পরে চুল কাটার বিষয়টি থাকাতে এটা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে হাজি মহান স্রষ্টাকে খুশী করার জন্য এমন কি তার জীবনও বিলিয়ে দিতে পারে। তার মন-মগজ চিন্তায় তার নিজস্ব যা কিছু সবকিছুকে সে আল্লাহর জন্য নিবেদন করতে পারে।
ওকুফে আরাফা/ মিলন মেলা
বিশ্বের প্রায় সকল দেশেই রয়েছে মুসলমান। এক আল্লাহ ও রসূলের প্রতি বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও তাদের রং, বর্ণ, ভাষা, পোষাক, চেহারা,আকৃতি, পেশা, জাতি, গোত্র, কৃষ্টি ও সংস্কৃতিগত ভিন্নতা আছে।
লক্ষ লক্ষ হাজি যখন ৯ জিলহজ্জ আরাফার মাঠে একত্রিত হয় তখন মুসলিম উম্মাহর ঐক্য পরিপূর্ণ রূপ লাভ করে। প্রত্যেক হাজি সব ভেদাভেদ ভুলে মুসলিম জাতি সত্তার মধ্যে নিজেকে বিলীন করে দেয়। কেউ নিজেকে আলাদা কোন সত্তা বলে অনুভব করে না। সবাই মুসলিম সত্তার একটি অংশ বলে মনে করে। ইহরামের বিশেষ পোষাক পোষাকের যাবতীয় ভিন্নতা চূর্ণ বিচূর্ণ করে দেয়, তালবিয়া ভাষাগত ভিন্নতাকে অকার্যকর করে দেয়। একই আরাধনা, একই প্রার্থনা পেশাগত বিভিন্নতা দূর করে। সব হাজির সকল চিন্তাকে কেবলমাত্র আল্লাহকে খুশী করার প্রতি কেন্দ্রীভূত করে হাজিদের চিন্তা চেতনার ভিন্নতা দূর করা হয়। যুহর ও আসর নামায সংক্ষিপ্ত ও সহজ করা এবং সূর্যাস্ত পর্যন্ত আর কোন বিশেষ ইবাদতের ব্যবস্থা না রাখার মাধ্যমে কর্ম সম্পাদনের পদ্ধতিগত জটিলতা দূরীভূত করা হয়।
পাপই মানুষের অনৈক্যের কারণ। ৯ জিলহজ্জ হজ্জ পালনকারী হিসেবে আরাফার সমাবেশে সমবেত জনগোষ্ঠীর সবাইকে সে পাপ থেকে সম্পূর্ণভাবে ক্ষমা করার ঘোষণা দিয়ে বিশ্বাসগত দিক থেকেও সবাইকে পাপমুক্ত অবস্থানে নিয়ে আসা হয়।
হাজিকে একযোগে এক স্থানে একত্রিত করার মাধ্যমে আরাফা ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের প্রশিক্ষণের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন এলাকা থেকে শত রকমের ভিন্নতায় অভ্যস্ত একটা বিশাল জনগোষ্ঠীকে সকল কৃত্রিম ভেদাভেদের উর্ধ্বে ওঠার ব্যবস্থা করা হয়। মহান স্রষ্টার প্রতি নিষ্ঠা ও আনুগত্য কীভাবে মানব গোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করে হাজি তা স্বচক্ষে অবলোকন করে। হজ্জ থেকে ফিরে নিজ নিজ এলাকার কৃত্রিম ভিন্নতার মূলোৎপাটনে তারা বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে। ক্ষুদ্র গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকা ব্যক্তি মুসলমান হয়ে ওঠে বিশ্ব মানবতার প্রতিনিধিত্বকারী দলের সদস্য। একজন হাজি তাঁর বিশ্বাসের প্রসারতা কর্মকা-ের ব্যাপকতা এবং সমস্যা সম্ভবনার বিশ্বব্যাপী ক্ষেত্র অনুভব করে। তাঁর শক্তি ক্ষমতা ও চিন্তা চেতনার সংকীর্ণতা দূর হয় এবং সাফল্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।
ওকুফে মুযদালিফা
মহান মালিকের সান্নিধ্য পাওয়ার আকাক্সক্ষায় আরাফায় ক্ষমা প্রাপ্তির পর পার্থিব সব কিছু পরিত্যাগ করে ক্লান্ত শ্রান্ত অবসন্ন শরীর ও উৎফুল্ল মন নিয়ে হাজি রাতে মুযদালিফার ধূ ধূ বালি চত্বরে পৌঁছে, একেবারে খোলা আকাশের নিচে। দুনিয়ার আকর্ষণে সুন্দর সাজানো গোছানো যে জীবনের পেছনে সে এতদিন ঘুরঘুর করেছিল লজ্জা-শরম, নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে, আরাফার আরাধনার পুরস্কার নিতে বসে থাকে মুযদালিফায়। আরাফার মাঠে তাঁবু ছিল, মুয়াল্লিমের লোকজন ছিল, খাওয়া দাওয়ার বন্দোবস্তও ছিল। মুযদালিফায় এসবের কোন সুযোগ নেই। কোন রকম পলিথিনের পাটি নয়তোবা পাতলা একখানা চাদর বিছিয়ে মুহূর্তের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে। কোন আফসোস নেই, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই। কারও কাছে কোন চাহিদাও নেই। এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। মানব জীবনের স্বাভাবিক চাওয়া পাওয়ার যে পরিবেশ ও পদ্ধতি, তার কোন কিছুর সাথে এখানের মিল নেই। জীবনের অতৃপ্তির পরিসমাপ্তি হয় মুযদালিফার এ বালুভূমিতে। পিঠের নিচে বালুকণা আর মাথার উপরে নীল আকাশের অগণিত তারকারাজি এই সাফল্যে মিট মিট করে হাসে। মুযদালিফায় হাজির অবস্থা সদ্য প্রসূত এক শিশুর মত। শিশুর নিজস্ব শক্তি ক্ষমতা, সহায় সম্পদ চাহিদা কিছুই থাকে না। কিন্তু সেজন্যে তার কোন চিন্তা হয় না, ভয় হয় না। অসুবিধা হয় না। কারণ তার মা তার পাশে থাকেন। তিনিই শিশুর সব প্রয়োজন মিটান। মানব জীবনের সবচেয়ে ভাবনাহীন অংশ হলো মায়ের কোলের সময়। শিশু যখন বড় হয় শক্তি-ক্ষমতা, সহায় সম্পদের মালিক হয় তখন অনেক অসুবিধা আর বাধা বিপত্তি তাকে পেয়ে বসে। মায়ের কোলের মত নিশ্চিন্ত সুখ আর কোনদিনই সে উপভোগ করতে পারে না। মুযদালিফায় হাজি তার মহান মালিকের আশ্রয় গ্রহণ করে নিশ্চিন্ত নির্বিঘœ হয়। মুযদালিফার মাটি আর মুযদালিফার আকাশ চিরে তার কাছে নেমে আসে গোটা বিশ্ব জাহানের স্রষ্টা ও নিয়ন্ত্রক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার সাহায্য ও করুণা। আর কোন ভয় নেই, অসুবিধা নেই। হাজি এখন সম্পূর্ণ নিরাপদ ও পুরোপুরি সফল।
ওকুফে মিনা
হজ্জের আহকাম পালন করার সাথে মূলত যে চারটি স্থান সম্পর্কিত তার মধ্যে আরাফার মাঠে থাকতে হয় অর্ধবেলা। মুযদালিফাতে থাকতে হয় রাতের একটি অংশ। আর তওয়াফে যিয়ারত ও সাঈ-এর জন্যে কিছু সময় দিতে হয় কাবা বা মসজিদে হারামে। কিন্তু সময় ব্যয় করতে হয় মিনায়, তিন দিন, কমপক্ষে দু’দিন।
প্রশ্ন হল পৃথিবীর সবচেয়ে দামী, সম্মানিত এবং পুণ্যভূমি কাবা এবং মসজিদে হারামকে
বাদ দিয়ে মিনাতে দীর্ঘ সময় অবস্থান করার জন্য বাছাই করা হল কেন?
মিনায় অবস্থান করে কুরবানি করা ও জামারাতে পাথর মারার মাধ্যমে হাজি হজ্জের মূল
রহস্য ও তাৎপর্য বুঝে এগুলো থেকে প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করে।
সময় সম্পদ ও শক্তি ক্ষমতা ব্যয়ের বাস্তব প্রমাণ পেশ করতে হয় মিনাতে।
পাথর মারার মাধ্যমে শয়তানকে ত্যাগ করার মহড়াও প্রস্ফুটিত হয় মিনায়। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত লাখ মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া, তাদের সুখ
দুঃখের খবর নেওয়া এবং মুসলিম উম্মাহকে বিশ্বমানবতার মুক্তিদাতা গোষ্ঠী হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করার কলাকৌশল ও কর্মপ্রণালী নির্ধারণের উপযুক্ত ক্ষেত্র হলো মিনা।
কংকর নিক্ষেপ
১০ জিলহজ্জ ভোরে হাজি মিনার উদ্দেশ্যে বের হয়। যেখানে আল্লাহর এক অতি প্রিয় বান্দাহ ইব্রাহিম আ. বিলিয়ে দিয়েছিলেন নিজের জীবনের সর্বাপেক্ষা প্রিয় সন্তানকে। সে পথ ধরে এগিয়ে যায় হাজি কুরবানি করতে। পথ আগলে দাঁড়ায় চির-দুশমন শয়তান। সমস্ত শক্তি নিয়ে সে প্রতিরোধের প্রাচীর গড়ে তোলে হাজির সামনে। যেমনভাবে
সে বাধা দিয়েছিল ইসমাইল আ. কে। আত্মপ্রত্যয়ে উজ্জীবিত হাজি অনেক কষ্ট আর সাধনায় অর্জিত পাপ থেকে মুক্তি ও আল্লাহর ক্ষমা ও রহমত অর্জন করে, তা হাতছাড়া করতে চায় না। প্রতিরোধ সৃষ্টি করে। ধ্বংস করে দেয় শয়তানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। চূর্ণ বিচূর্ণ করে দেয় শয়তানের আস্তানা।
লক্ষ্য স্থির রেখে শান্ত ও সাহসের সাথে অগ্রসর হয়। স্তম্ভের কাছাকাছি এসে আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে গুনে গুনে পাথর নিক্ষেপ করে। শরীর ও মনের প্রতিটি কণা থেকে শয়তানের শেষ চিহ্নটুকুও ছুঁড়ে ফেলে দেয় সামনের স্তম্ভে। শয়তানের প্রভাব থেকে চিরতরে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে নিজের পুরো সত্তাকে।
হাজি জানে মতলববাজ শয়তানের চালাকির কোন শেষ নেই। প্রথম আক্রমণে সব
শেষ মনে করার কোন কারণ নেই। হাজিদের সম্মিলিত ধাক্কা সামাল দিতে না পারলেও
সে পথ ছাড়বে না। উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে। শক্তি সামর্থ মাল-মসলা সংগ্রহ করে আবারও হামলা করবে। আগের চেয়ে অনেক সতর্ক ও সচেতন হাজি। শয়তানের আপাত ধ্বংস দেখেই নিশ্চিত না হয়ে ঘরে ফিরে যায় না। পরপর আরও দুদিন এবং প্রয়োজনে আরও একদিন শয়তানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে অংশ নিতে প্রশিক্ষণ নেয়। শয়তানের ধ্বংস নিশ্চিত করে। শয়তানের পরিম-ল থেকে মুক্ত হাজি এখন মনের সুখে প্রাণের প্রিয় সবকিছু ঢেলে দেয় মালিকের পদতলে।
কুরবানি
কুরবা অর্থ নিকটবর্তী হওয়া। মহান আল্লাহর নিকটবর্তী বা প্রিয়তম হওয়ার জন্যে
নির্দিষ্ট নিয়মে ত্যাগ স্বীকার করার নাম কুরবানি। কুরবানি হজ্জের একটি অন্যতম
গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কুরবানি পশুত্ব বিসর্জন দিয়ে মনুষ্যত্বকে রক্ষা করতে শিক্ষা দেয়। মানুষ আকার আকৃতিতে অন্য সকল পশুর চেয়ে ভিন্ন হলেও তার মধ্যে নানাবিধ পাশবিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক পর্যায়ে যাবতীয় অনাচার ও বিশৃঙ্খলার জন্যে এসব পাশবিক আচরণই দায়ী। পাশবিকতা থেকে মানুষকে উদ্ধার করার জন্যে আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। হজ্জকালীন পশু কুরবানি এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পশুর গলায় ছুরি চালানোর মাধ্যমে প্রকৃত পক্ষে হাজি তার অভ্যন্তরের পাশবিক বিষয়াদীকে জবাই করে।
কুরবানি নিজের ভবিষ্যত সুনাম সুখ্যাতি ও সম্ভাবনা সাফল্যকে আল্লাহর কাছ সমর্পণের বলিষ্ঠ প্রমাণ। মানুষ মাত্রই ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে। প্রতিটি মানুষ ভবিষ্যতের আশাতেই অগ্রসর হয়। জৈবিক দৃষ্টিতে সন্তানই মানুষের সর্বোত্তম ভবিষ্যতের উৎস। সন্তানকে
কেন্দ্র করেই মানুষ ভবিষ্যতে বেঁচে থাকার বড় হওয়ার সফল হওয়ার স্বপ্ন দেখে।
সন্তানের কারণেই মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আল্লাহ রসূল দ্বীন ধর্ম থেকে দূরে
থাকে। অথচ হাজিকে সন্তানকে কুরবানি করার ইতিহাসের পুনরাবর্তন করতে হয়
মিনাতে। পৃথিবীতে যত নবি এবং রসূল এসেছেন তাঁদের সবাইকে আল্লাহর দ্বীনের জন্য অসম্ভব কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। তাঁরা স্ত্রী সন্তানাদিসহ গোটা পরিবারকে সাথে নিয়ে আল্লাহর পথে সফলতার সাথে অগ্রসর হয়েছেন।
এ ক্ষেত্রে ইব্রাহিম আ. ছিলেন অগ্রগামী। মিনার প্রান্তরে ইব্রাহিম আ. ও তাঁর পুত্র ইসমাইল আ. এর ত্যাগের ঘটনা আল্লাহ তায়ালা এত পছন্দ করেছেন যে সেটাকে কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী করার ব্যবস্থা করেছেন।
আল্লাহ তায়ালা প্রথমে ইব্রাহিম আ. কে সরাসরি ওহী নাযিল করে নবি বানান নি।
ইব্রাহিম আ. আকাশের তারকা, চাঁদ, সূর্য ইত্যাদি প্রাকৃতিক অবস্থা থেকে স্রষ্টার সন্ধান
করেন। এ সময় তিনি সুস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেন যে চারপাশের সবকিছুই সৃষ্টি,
নয়। ইব্রাহিম আ. সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর আনুগত্য মেনে নেওয়ার ঘোষণা দেন।
পরবর্তীতে নমরুদের আগুনের গর্তে পড়া, দেশ ত্যাগ করা, যাযাবরের মত এক
দেশ থেকে আর এক দেশে ঘুরে বেড়ানো এবং শেষ বয়সে প্রাপ্ত সন্তানকে নির্বাসনে পাঠানোর মত একাধিক কঠিনতম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রমাণ করেন যে তাঁর ঈমান কত দৃঢ় ছিল। ক্ষণিকের জন্যেও তিনি আল্লাহর আনুগত্য করার প্রতিজ্ঞা থেকে বিচ্যূত হননি। এতগুলো পরীক্ষায় পাশ করা র্ইরাহীম আ. কে আল্লাহ তায়ালা আরো এক অত্যন্ত কঠিন ও অস্বাভাবিক পরীক্ষার মুখোমুখি করেছিলেন, যখন ইব্রাহিম আ. এর মনে হারানো ইসমাইলকে বুকে জড়িয়ে পিতৃত্বের স্বাদ নতুনভাবে জেগে উঠেছিল। সংসার জীবনের নতুন অধ্যায় জমে উঠেছিল। আল্লাহ দেখতে চেয়েছিলেন ইব্রাহিম আ. আল্লাহর ভালবাসায় স্থির থাকে কি না। বারবার একই স্বপ্ন দেখে ইব্রাহিম আ. গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা করে তাঁর জীবনের সবচেয়ে প্রিয় বস্তু হিসেবে ইসমাইলকে চিহ্নিত করলেন এবং কালবিলম্ব না করে তাকে কুরবানি করার ব্যবস্থা করলেন। ইব্রাহিম আ. পরীক্ষায় উর্ত্তীণ হলেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর কুদরতে ইসমাইলের পরিবর্তে একটি দুম্বা জবাই করিয়ে দিলেন।
আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করলেন, “হে ইব্রাহিম তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছ। এভাবেই আমি আমার মুহসিন বান্দাকে পুরস্কৃত করে থাকি।”
আল্লাহ তায়ালা ইব্রাহিম আ. কে মানবজাতির নেতা পদে অধিষ্ঠিত করলেন। এ
নেতৃত্বের অংশ হিসেবে ইব্রাহিম আ. কে পবিত্র কাবার তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দিলেন। আর তাঁর বংশধরদের মধ্যে যারাই এভাবে আল্লাহর জন্য ত্যাগ স্বীকার করবে, তাদের জন্যই তিনি নেতৃত্ব অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিলেন।
সে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পৃথিবীতে আগমন করলেন সর্বশেষ নবি মুহাম্মাদ স.। ইব্রাহিম আ. এর পথ অনুসরণ করে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ভয় ভালবাসা ও আনুগত্যের ইতিহাসকে নতুনভাবে সাজিয়ে দিলেন মানব জাতির সামনে।
মুহাম্মাদ স. কে দিলেন সর্বশেষ নবির মর্যাদা, আর তাঁর উম্মতকে বানালেন উত্তম
উম্মত। আল্লাহর পথে ত্যাগ স্বীকারে তারা অন্যান্য নবির উম্মতের চেয়ে পারদর্শী হবে।
কুরবানির মাধ্যমে হাজি ভোগের উদ্দেশ্যে নেতৃত্ব ও ক্ষমতা অর্জনের প্রতিযোগিতার পরিবর্তে ত্যাগের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নেতৃত্ব পাওয়া ইব্রাহিম আ. এর উদাহরণ সমুন্নত রাখতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
No comments:
Post a Comment