12 June, 2018

২৭শে রজব,লাইলাতুল মিরাজ


ইসরা শব্দের অর্থ রাতের সফর। মহানবী (সা.) কে রাতের একাংশে মক্কার হারাম থেকে বাইতুল মোকাদ্দাসের এলাকায় যে সফর করানো হয়েছে সেটাকে ইসরা বলা হয়েছে। আর মিরাজ হচ্ছে, ওপরে আরোহণ। আল্লাহ তার হাবিব মুহাম্মদ (সা.)কে ভূমি থেকে আকাশে আরোহণ করিয়ে ১ম আকাশ থেকে শুরু করে সপ্তাকাশ ভেদ করে সিদরাতুল মুন্তাহা পেরিয়ে তার নিজের কাছে ডেকে নিয়েছিলেন। সেটাকেই মিরাজ বলা হয়। পবিত্র কোরআনের সুরা আল-ইসরা বা বনি ইসরাইলে বলা হয়েছে, পবিত্র ও মহান সে সত্তা যিনি তার বান্দাকে সফর করিয়েছেন রাতের একাংশে মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসার দিকে, যার চতুষ্পার্শ্বকে তিনি করেছেন বরকতময়, যাতে তিনি তাকে দেখাতে পারেন তার নিদর্শনগুলো। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। (আল-ইসরা : ১)।

২৬ রজব পবিত্র লাইলাতুল মিরাজ। সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তার জীবদ্দশায় হিজরি মাসের এ দিবাগত রাতে মহান আল্লাহর নির্দেশে তারই বিশেষ ব্যবস্থায় মহান আল্লাহর সানি্নধ্য লাভ করেন। প্রত্যক্ষ করেন সপ্তাকাশ, বেহেশত, দোজখসহ আল্লাহর সৃষ্টি রহস্য। সাক্ষাৎ ও কুশল বিনিময় করেন সপ্তাকাশে অবস্থানকারী নবী-রাসুলদের সঙ্গে। জিব্রাইলকে (আ.) দেখেন তার নিজ অবয়বে। আল্লাহর কাছ থেকে নিয়ে আসেন উম্মতের জন্য ৫ ওয়াক্ত নামাজের বিধান। রাসুল (সা.) এর মিরাজ তথা আল্নাহর সানি্নধ্য লাভ ইসলামের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তাই রাতটি মুসলমানদের কাছে খুবই মর্যাদাপূর্ণ। মুসলমানরা এ রাতে আলোচনা, নফল নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত, জিকিরসহ বিশেষ ইবাদত করে থাকেন।

মিরাজের সঠিক তারিখ নিয়ে কিছুটা মতভেদ থাকলেও হিজরতের কয়েক বছর আগে ঘটে এ ঘটনা। বেশির ভাগ মত অনুযায়ী ২৬ রজব দিবাগত রাতে অর্থাৎ ২৭ রজব এশার নামাজের পরই ঘটে মিরাজের ঘটনা। তখন নবী (সা.) রাতের সালাত আদায় করে হজরত উম্মে হানির (রা.) ঘরে শায়িত ছিলেন। এমতাবস্থায় ঘরের ছাদ ভেদ করে ফেরেশতারা অবতরণ করলেন। জিব্রাইল (আ.) এসে তাকে ঊর্ধ্বাকাশে গমনে আল্লাহর নির্দেশনার কথা জানান। জিব্রাইল আলাইহিস সালাম রাসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জমজমের কাছে নিয়ে গেলেন। তারপর তার সাক্কুস সাদর বা বক্ষ বিদীর্ণ করলেন। তারপর তাকে জমজমের পানিতে ধুয়ে আবার যথাস্থানে লাগিয়ে দিয়ে বক্ষ মিলিয়ে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় ভ্রমণ। তিনি প্রথমে বোরাক নামের একটি বাহনে মক্কা মোকাররমা থেকে পবিত্র মসজিদে আকসায় যান। সেখানে ৩ রাকাত নামাজ শেষে ঊর্ধ্বাকাশে গমন শুরু করেন।

বুখারির বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে আকাশের দিকে যাত্রা করা হয়। সেখানে প্রথম আকাশে আদম, দ্বিতীয় আকাশে ঈসা ও ইয়াহিয়া, তৃতীয় আকাশে ইউসুফ, চতুর্থ আকাশে ইদ্রিস, পঞ্চম আকাশে হারুন, ৬ষ্ঠ আকাশে মুসা এবং সপ্তম আকাশে ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেখানে তিনি বাইতুল মামুর দেখতে পেলেন। তাকে দুধ, মধু ও মদ- এ ৩ প্রকার পানীয় দেয়া হয়। তিনি দুধ পছন্দ করেন। তখন জিব্রাইল বললেন যে, আপনি স্বাভাবিক বিষয় গ্রহণ করতে সমর্থ হলেন। তারপর তিনি সিদরাতুল মুন্তাহায় উপনীত হলেন। তারপর এত উঁচুতে গেলেন যে, কলমের লেখার খসখস আওয়াজ শুনতে পেলেন। এরপর আল্লাহ তাঁর ও উম্মতের ওপর ৫০ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করে দিলেন। এরপর মুসা (আ.) এর কাছে আসার পর তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)কে সালাতের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে কমানোর আবেদন করার পরামর্শ দিলেন। প্রথমে অর্ধেক, তারপর ৫ ওয়াক্ত পর্যন্ত কমানো হয়। আরেক বর্ণনায় আছে, প্রতিবারে ৫, বর্ণনান্তরে ১০ করে কমানোর পর সব শেষে ৫ ওয়াক্ত সালাতে এসে শেষ হয়। এরপর তিনি দুনিয়াতে আসেন।

রাসুল (সা.) এর মিরাজ সশরীরে না আত্মিক হয়েছিল এ নিয়ে বিজ্ঞানী ও আলেমদের মধ্যে কিছুটা মতান্তর আছে। তবে অধিকাংশ আলেম ও ইসলামী গবেষকের মতে, মিরাজ ছিল একটি বাস্তব ঘটনা। আল্লাহতায়ালা বিশেষ ব্যবস্থায় এ কাজটি করিয়েছেন সশরীরেই। যদি আত্মিক বা স্বপ্নেই এ ঘটনা ঘটত তা হলে এ নিয়ে এত আলোচনা বা একে স্বীকার-অস্বীকারের প্রশ্ন আসত না। কারণ তখন এ খবর প্রকাশ হওয়ার পর কাফির মুশরিকরা ঠাট্টা বিদ্রূপ করেছিল। স্বপ্নে হলে এ নিয়ে এত আলোচনা হতো না। তাছাড়া পবিত্র কোরআনের সুরা বনি ইসরাইল ও সুরা নজমে রাসুল (সা.) এর মিরাজের কথা পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে। ফলে এ নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।

ইসরা ও মিরাজে নবীদের ইমামতির মাধ্যমে এ বিষয় প্রমাণিত হল যে, সব নবীর নবুওয়তের মাধ্যমে প্রাপ্ত শরিয়ত শেষ হয়েছে। এখন মুহাম্মদ (সা.) এর নবুওয়ত ও তারই শরিয়ত চলবে। আর তার শরিয়তই সর্বশেষ শরিয়ত। তিনিই শেষ নবী ও রাসুল। রাতের একটি অংশে ইসরা ও মিরাজ সংঘটিত হওয়ার মধ্যে এটাই উদ্দেশ্য যে, মহান আল্লাহর কাছে রাতের কাজই বেশি পছন্দ। কারণ তখন প্রকৃতি শান্ত থাকে। কাজে মন বসে। ইবাদতে একনিষ্ঠতা ও একাগ্রতা অর্জিত হয়। আল কুরআনের পাশাপাশি বহুসংখ্যক বিশুদ্ধ হাদিসেও ইসরা ও মেরাজের ঘটনা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। প্রখ্যাত ফরাসী চিকিত্সক ও চিন্তাবিদ মরিস বুকাইলি (১৯২০-১৯৯৮) তাঁর The Bible, The Qur'an and Science (১৯৭৬) গ্রন্থে কুরআনে বর্ণিত তথ্য অকাট্য এবং সেখানে কল্পনার কোনো স্থান নেই বলে অভিমত রেখেছেন। তিনি কোরআনে বর্ণিত 'অলৌকিক' ঘটনাবলীর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি প্রমাণের প্রয়াসও পেয়েছেন।

আল কোরআনে ইসরা ও মেরাজের মত এমন আরও বাস্তব ঘটনা বর্ণিত হয়েছে যেমন হযরত মুসা (আ.)-এর দলবলসহ হেঁটে নীলনদ পার হওয়ার ঘটনা (৭ম সূরা আরাফ), হযরত ইবরাহিম (আ.) এর নমরুদের বিশাল অগ্নিকুণ্ড থেকে রক্ষা পাওয়া (২১ সূরা আম্বিয়া আয়াত ৬৮- ৬৯), হযরত ঈসা (আ.)-এর উম্মতের জন্য আকাশ থেকে গায়েবি খাদ্য মান্না ও সালওয়া নামিয়ে দেয় (২ সূরা বাকারা ৫৭ আয়াত), হজরত ঈসা (আ.)-এর উম্মতের জন্য খাদ্যসজ্জিত টেবিল আকাশ থেকে নামিয়ে দেয়া (৫ সূরা মায়েদা ১১২-১৩ আয়াত), হযরত সুলাইমান (আ.)-এর নির্দেশে বিশেষ ফিতারের জ্ঞানী এক ব্যাক্তিত্ব রাষ্ট্রের রানী বিলকিসের সিংহাসনকে চোখের পলকে ইয়ামন থেকে উঠিয়ে আনা (২৭ সূরা নামল, আয়াত ৪০)। ১৪০০ বছর আগে রাসূল (স.) আল্লাহর আরশ পর্যন্ত ৫ হাজার বছরের পথ মুহূর্তের মধ্যে ভ্রমণ করে ফিরে আসার ঘটনা জগতের চিন্তাশীল ও বিজ্ঞানীদের গবেষণা কর্মের প্রেরণাকে প্রজ্জলিত করে।

মহাকাশ সম্পর্কে অনুসন্ধিত্সা এবং চিন্তাভাবনা বহু আগে থেকে থাকলেও মহাকাশ বিজ্ঞানীদের সশরীরে মহাকাশ অভিযান শুরু হয় বিশ শতকের পাঁচের দশকে। এ অভিযানে প্রথম সফলতা আসে ১৯৬৯ নালে ২১ জুলাই। ২ লাখ ৫২ হাজার মাইল ভ্রমণ শেষে (অ্যাপোলো ১১ নভোযানে) নীন আর্মস্ট্রং চাঁদের বুকে প্রথম পা রাখেন। আধুনিক যুগে মানুষ মহাশুন্যে পাড়ি দিচ্ছে। মানুষ এখন পৃথিবী থেকে সাড়ে ৩ কোটি মাইলদূরের মঙ্গলগ্রহেও বসবাসের চিন্তা করছে। বিজ্ঞানময় কোরআন, পদার্থ বিজ্ঞান, মহাজাগতিক বিজ্ঞান, আলোক বিজ্ঞান গতি বিজ্ঞানসহ সময়ের সর্বশেষ গবেষণালব্ধ ঘটনাগুলো ধরাবাহিকভাবে পর্যালোচনায় প্রমাণিত হয়েছে ইসরা ও মিরাজের সত্যতা স্পষ্ট ও সুপ্রমাণিত।

বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন, ঘণ্টায় ২৫ হাজর মাইল বেগে ঊর্ধ্বালোকে ছুটতে পারলে পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ শক্তি থেকে মুক্তি লাভ করা যায়। একসময় মনে করা হতো পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ শক্তি অতিক্রম করে ঊর্ধ্বালোকে গমন সম্ভব নয়। কিন্তু এখন প্রমাণিত হয়েছে শূন্যে অবস্থিত কোনো স্থূলবস্তুকে পৃথিবী যে সব সময় সমভাবে আকর্ষণ করতে পারে না। কেননা প্রত্যেক গ্রহের একটি নিজস্ব আকর্ষণী শক্তি আছে। পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে এমন একটা স্থান আছে যেখানে কোনো আকর্ষণ-বিকর্ষণ নেই। তাই পৃথিবীর কোনো বস্তু যদি এই নিউট্রন জোনে পৌঁছতে পারে অথবা এই সীমানা অতিক্রম করে সূর্যের সীমানায় পৌঁছে যেতে পারে তবে তার আর পৃথিবীতে ছিটকে পড়ার সম্ভাবনা থাকে না। গতি বিজ্ঞান স্থির করেছে, পৃথিবী থেকে কোনো বস্তুকে যদি প্রতি সেকেন্ড ৬.৯০ অর্থাৎ মোটামুটি সাত মাইল বেগে ঊর্ধ্বালোকে ছুড়ে দেয়া যায়, তবে তা আর পৃথিবীর বুকে ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই।

বোরাক আরবি বারকু শব্দ থেকে উদ্ভুত, যার অর্থ হলো বিদ্যুৎ (Electricity)। আর রফ রফের আভিধানিক অর্থ নরম তুলতুলে, সবুজ বিছানা। রফ রফ হলো বোরাকের চেয়েও শক্তিশালী, যা মানুষ কল্পনাও করতে পারবে না। বোরাক এবং রফ রফ এ গতি আলো বা বিদ্যুতের চেয়ে বেশি ছিল বলেই নবীজির (স.) পক্ষে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ভেদ করা সম্পূর্ণ সম্ভব ছিল। গতির তারতম্যে সময়ের তারতম্য ঘটে। আধুনিক বিজ্ঞানীরা বলেন, আলোর গতির যতই কাছে যাওয়া যায় সময় ততই শ্লথ হয়ে আসে এবং আলোর গতি অপেক্ষা বেশি দ্রুতগতি হলে সময় উল্টা দিকে প্রবাহিত হয়। রাসূল (স.)-এর বাহনের গতি আলোর গতির চেয়ে বেশি ছিল বলেই অল্প সময়ের মধ্যে ইসরা ও মিরাজের মতো এত বড় দীর্ঘ ভ্রমণ সম্ভব হয়েছিল।

স্থান, কাল, জগত সব কিছুই গতির ওপর নির্ভরশীল। চোখের পলকে লাখ কোটি মাইল পথ অতিক্রম করার ক্ষমতা আল্লাহপাক বোরাক ও রফ রফকে দিয়েছেন। সূর্যরশ্মির চেয়েও ক্ষিপ্র রফ রফের গতিবেগ। এটা নূরের তৈরি জান্নাতি বাহন। আলোর গতিবেগ অপেক্ষা অনেক বেশি অর্থাৎ এর গতি অকল্পনীয় দ্রুত। বিদ্যুৎ বা আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে ১ লাখ ৮৬ হাজার মাইল। বোরাকের গতির চেয়েও দ্রুত হওয়ার কারণেই অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে রাসূল (স.) এর সপ্তাকাশ ভ্রমণ সম্ভব হয়েছে।

No comments:

Post a Comment

ইসমাইল হোসেন