12 June, 2018

১১ই রবিউস সানি,ফাতেহা ইয়াজদাহাম


আবু মুহম্মদ মুহীউদ্দীন সৈয়দ আবদুল কাদের জিলানি রাহমাতুল্লাহি আলাইহির ওফাত দিবস পালিত হয় ফাতেহা-ই-ইয়াজদহম নামে। এই দিবসের তাৎপর্য অপরিসীম। তার কারণ এই দিবসটি যে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানেই কেবল পালিত হয় তা কিন্তু নয়, বরং বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশে এবং মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলেও বিভিন্ন নামে পালিত হয়। ইলমে তাসাউফে যেসব তরিকা রয়েছে তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ তরিকা হিসেবে বিবেচিত হয় গাউসুল আজম (রহ.) কর্তৃক বিন্যাসকৃত কাদিরিয়া তরিকা এবং এই তরিকার বিস্তৃতি ঘটেছে বিশ্বের নানা দেশে ব্যাপকভাবে, যা অন্যসব তরিকার ক্ষেত্রে দেখা যায় না। যে কারণে গাউসুল আজমের পরিচিতি বিশ্বজুড়ে প্রসারিত হয়েছে। কাদিরিয়া তরিকা অনুযায়ী শিক্ষা গ্রহণের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বহু খানকা গড়ে উঠেছে। ফাতেহা-ই-ইয়াজদহম অর্থাৎ ১১-এর ফাতিহা। ইয়াজদহম ফারসি শব্দ। এর অর্থ ১১।

৫৬১ হিজরি মোতাবেক ১১৬৬ খ্রিস্টাব্দের ১১ রবিউস সানি সোমবার রাতের শেষ প্রহরে তিনি ইন্তেকাল করেন। যে কারণে এই ১১ বলতে ১১ রবিউস সানিকেই বোঝানো হয় এবং এই ১১ এমন বৈশিষ্ট্যম-িত হয়ে যায় যে, অনেক খানকা শরিফে ১১ শরিফ বা গিয়ারা শরিফও অনুষ্ঠিত হয়। হজরত গাউসুল আজম আবু মুহম্মদ মুহীউদ্দীন সৈয়দ আবদুল কাদের জিলানি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি এমন এক যুগসন্ধিক্ষণে আবির্ভূত হন যখন গ্রিক ও ভিন্নধর্মী দর্শন মুসলিম শিক্ষা ও চিন্তা জগতে দারুণভাবে বিভ্রান্তির কালো থাবা বিস্তার করে ফেলছিল। শিরক, কুফর ও বেদাতের খপ্পর থেকে, অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কারের কবজা থেকে তাওহিদ ও রিসালতের পথ থেকে ছিটকে পড়া উম্মতে মুহাম্মদিকে সঠিক পথের দিশা দেয়ার জন্য তার মতো একজন মহান সংস্কারকের, একজন দ্বীনকে জিন্দাকারী ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব হওয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছিল।

তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১০৭৭ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ৪৭০ হিজরির রমজান মাসের ১ তারিখ সেহরির ওয়াক্তে পারস্যের অন্তর্গত কাস্পিয়ান সাগরের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত জিলান বা গিলান অঞ্চলের নায়ফ মহল্লায় হজরত ইমাম হাসান (রা.) এর বংশধারায় এক ঐতিহ্যবাহী সৈয়দ পরিবারে।

তার আম্মা সৈয়দা উম্মুল খায়ের ফাতিমা (রহ.) ছিলেন হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) এর বংশধারার এক ঐতিহ্যবাহী সৈয়দ পরিবারের কন্যা। তিনি মায়ের কাছ থেকে প্রাথমিক দ্বীনি শিক্ষা গ্রহণ করে জিলান নগরীর এক মাদরাসায় অধ্যয়ন করেন। বাগদাদ এসে তিনি সেকালের শ্রেষ্ঠ আলেম, ফকিহ ও মুহাদ্দিসদের সান্নিধ্যে থেকে এলমে জাহিরের তাবৎ বিষয়ে অগাধ পা-িত্য অর্জন করলেন। তিনি এলমে তাসাউফে সর্বোচ্চ কামালিয়ত হাসিল করলেন। তিনি প্রথমে এলমে তাসাউফের তালিম গ্রহণ করেন বিখ্যাত সুফি হজরত আবুল খায়ের মুহম্মদ দাবক্ষাস (রহ.) এর কাছে। হজরত আবুল খায়ের মুহম্মদ দাবক্ষাস তার রুহানি শক্তির ঔজ্জ্বল্য অবলোকন করে মন্তব্য করেন যে, তিনি এক সময় সর্বশ্রেষ্ঠ সুফি হবেন। হজরত আবদুল কাদের জিলানি (রহ.) পরবর্তীকালে তাসাউফের সামগ্রিক জ্ঞানে পারদর্শিতা অর্জন করার স্বীকৃতিস্বরূপ সুফি হজরত শায়খ আবু সাঈদ মুখররিমী (রহ.) এর কাছ থেকে সনদপত্র বা খেলাফতপ্রাপ্ত হন। এরই মধ্যে শ্রেষ্ঠ আলেম হিসেবে, শ্রেষ্ঠ সুফি হিসেবে, শ্রেষ্ঠ ফকিহ হিসেবে তার নাম ছড়িয়ে পড়ে মুসলিম দুনিয়ায়। বহু লোক তার দরবারে এসে ভিড় জমাতে থাকে।

তিনি এলমে তাসাউফ তথা শরিয়ত, তরিকত, হাকিকত ও মারেফতের সমন্বয়ে বিন্যাসিত ইসলামের এ অনন্য বিজ্ঞানকে আরও সহজে চর্চার সুবিধার্থে এক আলোকিত ধারার পদ্ধতি বিন্যাস করেন। এটা অচিরেই কাদিরিয়া তরিকা নামে পরিচিতি লাভ করে। তিনি এলমে তাসাউফের আলখেল্লা পরা তার কালের সব বাতিল ফেরকা চিহ্নিত করেন। তিনি সেই সময়কার ৭২টি বাতিল ফেরকা চিহ্নিত করে তাদের সান্নিধ্যে না যাওয়ার জন্য আহক্ষান জানান। তিনি কী কী কারণে ওইসব ফেরকা বাতিল তাও উল্লেখ করে পুস্তক লিখে তা জনগণের মধ্যে প্রচার করেন। তিনি এলমে তাসাউফের সংজ্ঞা নির্ণয় করে বলেন, এলমে তাসাউফ লিখতে তা, সোয়াদ, ওয়াও, ফাÑ এই চারটি হরফ ব্যবহৃত হয়। এই চারটি হরফের একেকটি হরফ মূলত একেকটি অর্থবহ শব্দের আদ্যাক্ষর। যেমনÑ ‘তা’ অক্ষরটি হচ্ছে তওবা শব্দের আদ্যাক্ষর। তওবা দুই প্রকারের আর তা হচ্ছে জাহিরি ও বাতিনি। জাহিরি তওবা হচ্ছে প্রকাশ্যভাবে তাবৎ গোনাহের জন্য অনুতাপ সহকারে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করা। বাতিনি তওবা হচ্ছে তাবৎ গোনাহর কাজ থেকে নিজেকে রক্ষা করা। এমনকি গোনাহর কাজের চিন্তাও নিজের থেকে দূর করে সর্বান্তকরণে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া। তাসাউফ লিখতে দ্বিতীয় যে হরফ লাগে তা হচ্ছে সোয়াদ। এই সোয়াদ হচ্ছে সাফা শব্দের আদ্যাক্ষর। এটাও দুই ধরনের আর তা হচ্ছে বাহ্যিকভাবে নিজেকে পরিচ্ছন্ন করা এবং আন্তরিকভাবে নিজেকে পরিচ্ছন্ন করা। তৃতীয় হরফ ওয়াও হচ্ছে বেলায়েত শব্দের আদ্যাক্ষর। বেলায়েত হচ্ছে আল্লাহর অলিদের জন্য নির্ধারিত বিশেষ মর্যাদার রাজত্ব যাকে অলিত্ব বলা হয়।

চতুর্থ শব্দ ফা হচ্ছে ফানা শব্দের আদ্যাক্ষর। এটা আল্লাহর মারেফতে ধন্য আরিফবিল্লাহদের চূড়ান্ত অবস্থা। এই পর্যায় উন্নীত আল্লাহর অলিরা আল্লাহ প্রেমে সামগ্রিকভাবে বিভোর হয়ে যান। তারা ফানাফিল্লাহ পর্যায়ে উপনীত হয়ে যান। হজরত গাউসুল আজম (রহ.) মুহীউদ্দীন খেতাব দ্বারা রুহানি জগৎ থেকে ভূষিত হয়েছিলেন। এই মুহীউদ্দীন শব্দের অর্থ দ্বীনের পুনর্জীবনদানকারী।

No comments:

Post a Comment

ইসমাইল হোসেন